কিছু মানুষ চলে গেলে আমরা কেবল মানুষের শূন্যতা অনুভব করি। আর কিছু মানুষ চলে গেলে মনে হয়, আমাদের চেনা একটা সময়ই হারিয়ে গেল। আজ ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার বাড়িতে হঠাৎ হৃদ্রোগে থেমে গেলেন বিশ্বনাথ পাটেকর। সারা ভারত যাঁকে ডাকত ‘নানা’ বলে। খবরটা শোনার পর প্রথমে কারও মনে পড়বে একটা তীক্ষ্ণ সংলাপ, কারও একজোড়া স্থির চোখ, কারও ‘ক্রান্তিবীর’-এর সেই আগুনঝরা গলা। কিন্তু একটু পরেই টের পাওয়া যায়, শুধু সিনেমার স্মৃতি দিয়ে এই মানুষটিকে বিদায় জানানো যায় না। পর্দার নানাকে আমরা চিনেছি, আর পর্দার বাইরের নানা ছিলেন তাঁর চেয়েও অনেক বড়।
তাঁর শৈশব বলে কিছু ছিল না। তেরো বছর বয়সে বাবার ব্যবসা ভেঙে গেল, আর ছেলেটি সিনেমার পোস্টার এঁকে সংসারের হাল ধরতে নামল। মাসে পেত পঁয়ত্রিশ টাকা আর একবেলা খাবার। রোজ প্রায় আট কিলোমিটার হেঁটে কাজে যেত। কলেজে পড়ার সময় রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেও পয়সা জোগাড় করেছে। এই গল্প শুনে আমরা সহজেই বলে ফেলি, কী কষ্টের জীবন। অথচ নানা সেই কষ্টকে কখনো নালিশের জায়গা বানাননি। ক্ষুধা আর অপমান তিনি নিজের শরীরে চিনেছিলেন বলেই পর্দায় তাঁর দরিদ্র, ক্ষুব্ধ বা পরাজিত মানুষগুলোকে কখনো অভিনয় মনে হয়নি। মনে হতো, কেউ নিজের জীবনটাই সামনে এনে রেখেছে।
‘পরিন্দা’য় তিনি এমন এক অন্ধকার তৈরি করেছিলেন, যা শুধু একটা খলচরিত্রের ছিল না, ছিল ভয়ের সরাসরি উপস্থিতি। ‘ক্রান্তিবীর’-এ তাঁর কণ্ঠ সংলাপ বলত না, ফেটে পড়ত। ‘প্রহার’-এর কঠোর সৈনিকের ভেতরেও তিনি একজন কোমল মানুষকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ‘অব তক ছাপ্পান’ আমাদের শিখিয়ে দিয়েছিল, সব অভিনয়ে চিৎকার লাগে না, কখনো একটা তাকানোই যথেষ্ট। আর ‘নটসম্রাট’-এ তাঁর সারা জীবনের একাকিত্ব, অহংকার, ভালোবাসা আর হারানোর ব্যথা যেন একসঙ্গে এসে দাঁড়িয়েছিল। ভেঙে পড়া সেই বৃদ্ধকে তিনি এমনভাবে বাঁচিয়েছিলেন যে দর্শক একসময় চরিত্রটার কথা ভুলে গিয়ে মানুষটার জন্যই কষ্ট পেতে শুরু করেছিল। নানাকে নকল করা যায়, তাঁর সংলাপ বা ভঙ্গি মুখস্থ করে ফেলা যায়। কিন্তু তাঁর মতো নীরব থাকা কেউ শেখেনি, শিখবেও না।
তিনটি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন, পদ্মশ্রী পেয়েছেন। তবু সেই আলো তাঁর গায়ে কখনো তারকার অহংকার হয়ে লেগে থাকেনি। কোটি টাকা রোজগারের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তিনি থেকেছেন সাধারণ ফ্ল্যাটে, সময় কাটিয়েছেন গ্রামের বাড়িতে। ১৯৭৮ সালে নীলকান্তিকে বিয়ে করেছিলেন মাত্র সাতশো পঞ্চাশ টাকা খরচ করে। বিয়ের পর পকেটে বাকি ছিল চব্বিশ টাকা, সেই টাকায় অতিথিদের জন্য কিনে এনেছিলেন গোল্ড স্পট। এমন বিয়ের গল্প কোনো তারকার জীবনে শোনা যায় না। হয়তো তিনি আগেই বুঝে গিয়েছিলেন, জীবনের দাম জিনিসের দামে মাপা হয় না।
একবার ‘ক্রান্তিবীর’-এর জন্য নিজের বাড়ি পর্যন্ত বন্ধক রেখেছিলেন। ছবি সফল হওয়ার পর পরিচালক তাঁকে একটা স্কুটার উপহার দিলেন, আর সেটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম নিজস্ব বাহন। ভাবলে চোখ ভিজে আসে। যে মানুষ পরে কোটি টাকার পারিশ্রমিক নিতে পারতেন, তাঁর প্রথম গাড়ি ছিল দুই চাকার একটা উপহার। হলিউড থেকেও ডাক এসেছিল। রিডলি স্কটের সঙ্গে কাজের সুযোগ, লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর সঙ্গে অভিনয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু চরিত্রটি এক সন্ত্রাসীর শুনে তিনি মুখের ওপরই না বলে দিয়েছিলেন। সব সুযোগ লুফে নেওয়ার মানুষ তিনি ছিলেন না। নিজের কাছে নিজের একটা সীমারেখা ছিল, আর সেটাকে তিনি সারা জীবন সম্মান করেছেন।
নানা সবচেয়ে বেশি মানুষ হয়ে উঠেছিলেন পর্দার বাইরে। ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রের খরা আর কৃষকদের আত্মহত্যার খবর তাঁকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি খবর পড়ে বসে থাকেননি, নিজে গিয়েছিলেন সেই পরিবারগুলোর দরজায়। কিন্তু একবার টাকা দিয়ে চলে এলে যে মানুষের জীবন বদলায় না, সেটা তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝেছিলেন। তাই মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে গড়ে তুললেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’। জল ধরে রাখা, শুকিয়ে যাওয়া জলাধার ফিরিয়ে আনা, কৃষকের হাতে ভরসা তুলে দেওয়া, এই কাজগুলো ধীরে ধীরে গ্রামের পর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। এটাই ছিল তাঁর দূরদৃষ্টি। দান একটা দিনের স্বস্তি দেয়, কিন্তু জল আর কাজ আর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জোর দেয় বছরের পর বছরের ভরসা। অথচ এই কাজ নিয়ে ঢাকঢোল পেটানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। লোকে দীপাবলিতে আতশবাজি কিনলে তিনি খুশি হতেন কারও ঘরে একটু আলো পৌঁছে দিতে পেরে।
১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের সময় তিনি ষাট দিন সেখানে কাটিয়েছিলেন। পরে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে জবাব দিয়েছিলেন, দেশের জন্য এটুকু তো করাই যায়। এত বড় একটা কাজকে এত ছোট করে বলার ক্ষমতা সবার থাকে না। এই সরলতাই ছিল তাঁর আসল পরিচয়।
আর মৃত্যু নিয়ে তাঁর যে রসিকতা, সেটা মনে পড়লে আজ বুক মুচড়ে ওঠে। বহু বছর আগে তিনি নিজের শেষযাত্রার জন্য বারো মণ কাঠ আলাদা করে রেখেছিলেন, আর সবটাই শুকনো কাঠ। কারণ জিজ্ঞেস করলে হেসে বলতেন, ভেজা কাঠে ধোঁয়া হয়, ধোঁয়ায় লোকের চোখে জল আসে, তখন সবাই ভাবে আমার জন্য কাঁদছে। আমি ভুল বোঝাতে চাই না। হাসির আড়ালে তিনি আসলে একটা গভীর সত্য বলে গিয়েছিলেন। মানুষ কাঁদবে, তারপর ঘরে ফিরবে, বাজার খুলবে, ট্রেন চলবে, নতুন অভিনেতা আসবে। তাই বেঁচে থাকার সময়টুকুই আসল। জীবনকে তিনি তাই বেশি গম্ভীর করে নেননি, অথচ ভেতরে ভেতরে ভেবেছেন তাকে নিয়ে অনেক গভীরভাবে।
পর্দায় এত রাগ, বাস্তবে এত মায়া। পর্দায় এত কঠিন, মানুষের কষ্টের সামনে এত নরম। জীবন তাঁকে সহজ কিছু দেয়নি, কিন্তু তিনিও জীবনকে কখনো জিততে দেননি। কখনো রাগ করে, কখনো হেসে, কখনো মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, কখনো মৃত্যুকে নিয়েও ঠাট্টা করে তিনি নিজের মতো করে বেঁচে গেছেন।
আজ থেকে নতুন কোনো পোস্টারে আর তাঁর মুখ থাকবে না। কোনো পরিচালক আর বলবেন না, এই চরিত্রটা নানার জন্য। কিন্তু ‘পরিন্দা’ দেখলে আমাদের তাঁকে মনে পড়বে, ‘ক্রান্তিবীর’ দেখলে বুকের ভেতর আবার আগুন জ্বলবে, ‘ওয়েলকাম’ দেখলে আমরা না হেসে পারব না। আর ‘নটসম্রাট’ দেখতে বসলে একসময় হাসতে হাসতেই চোখ ভিজে যাবে। সেই চোখের জল দেখে তিনি হয়তো কোথাও বসে মুচকি হাসছেন, আর বলছেন, বলেছিলাম না, ভেজা কাঠ ব্যবহার কোরো না।
বিদায়, নানা। বিদায় সেই কিশোরকে, যে পঁয়ত্রিশ টাকার জন্য পোস্টার আঁকত। বিদায় সেই অভিনেতাকে, যাঁর চোখ কথা বলত। বিদায় সেই মানুষটিকে, যিনি খ্যাতির চেয়ে মানুষের কষ্টকে বড় করে দেখেছিলেন। আপনি অনেক চরিত্রে অভিনয় করেছেন, কিন্তু জীবনটাকে কখনো অভিনয় করেননি। হয়তো সেটাই ছিল আপনার সবচেয়ে বড় অভিনয়। আপনার মতো মানুষ আসলে পুরোপুরি চলে যান না। তাঁরা থেকে যান কোনো সংলাপে, কোনো কৃষকের হাসিতে, কোনো শুকনো জলাধারে ফিরে আসা জলে, আর পুরোনো সিনেমা চলতে থাকা টেলিভিশনের সামনে বসা কোনো দর্শকের ভেজা চোখে।
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় বিদায়, নানা পাটেকর।⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀
⠀⠀

