আম্মা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আম্মা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬

শূন্য সোফার রুম এবং হারানো এক আলোকবর্তিকা


জানালার কাচে তখনো বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আলতো করে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও প্রকৃতির বুকে যে উন্মাতাল তাণ্ডব চলল, তাকে একরকম রূপকথা বলেই ভ্রম হয়। দমকা ঝড়ো বাতাস, মেঘের গুরুগুরু গগনবিদারী গর্জন, আর সাথে বুক কাঁপানো দুই-একটি বজ্রপাত -সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল এই আধঘণ্টায়।

তারপর হঠাৎ করেই শান্ত। আকাশ তার রাগ ঝেড়ে এখন হালকা, শান্ত। ঘরের কোণে জমে উঠেছে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া, যা গায়ে লাগলেই কেমন যেন একটা আলসেমি জড়িয়ে ধরে। মন বলে, এই চমৎকার ঠান্ডা আবহে কম্বলটা গায়ে টেনে দিয়ে একটা লম্বা, নিটোল ঘুম দেওয়া যাক। কিন্তু চোখ বুজলেই কি আর ঘুম আসে? কিছু কিছু আবহাওয়া আসলে ঘুমের চেয়ে বেশি জাগিয়ে তোলে ভেতরের মানুষকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্মৃতির ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তাকে তুলে ধরে মনের দৃষ্টিতে।

যেমন আজ এই বৃষ্টির শেষলগ্নে এসে বুকটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠল। খুব মনে পড়ছে আম্মাকে।

আসলে ‘ইদানীং মনে পড়ছে’ বলাটা ভুল হবে। আম্মা চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে তার ছায়া আমি খুঁজে না। এখন প্রতিটা ছোটোখাটো কাজেই আম্মা অবধারিতভাবে চলে আসেন। কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, ‘আচ্ছা, আম্মা থাকলে তো কাজটা এভাবে করতেন না, তিনি হয়তো অন্য কোনো সহজ উপায়ে করে দিতেন!’ কিংবা কোনো জিনিস অগোছালো দেখলে কানের কাছে যেন মায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘এটা এখানে রাখছিস কেন? ঐখানে রাখ।’ অথবা কোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, আম্মা থাকলে ঠিকই এই সমস্যার কোনো সমাধান বলে দিতেন। এই রকম হাজারো হাবিজাবি, টুকরো টুকরো ভাবনা এখন আমার একাকিত্বের সঙ্গী।

তবে আজকের এই ঝড়-বৃষ্টির রাতটা যেন আম্মার স্মৃতিকে বড্ড বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। আম্মাকে আমাদের চেনা-পরিচিত সবাই খুব সাহসী এক নারী হিসেবেই জানত। যে কোনো বড়ো বিপদ বা কঠিন পরিস্থিতি তিনি এত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতেন যে, অবাক হতে হতো। দেখে মনে হতো, তার কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন এক অদ্ভুত জাদুবলে সবটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অদৃশ্য কেউ একজন এসে তার হয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো, এই পাহাড়সম সাহসী মানুষটারও একটা দুর্বল জায়গা ছিল। ঝড়-বৃষ্টির সময় আম্মাকে আমার বড্ড ভীতু মনে হতো। যদিও তিনি মুখে কখনো ভয়ের কথা স্বীকার করতেন না, চোখে-মুখেও ভয়ের কোনো রেখা ফুটতে দিতেন না, তাও একজন সন্তানের চোখ তো! মায়ের ভেতরের চাপা অস্থিরতাটুকু আমি ঠিকই টের পেতাম।

সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফোটে, আবার পরক্ষণেই চোখটা ভিজে আসে। বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই নিয়ম করে এলাকার বিদ্যুৎ চলে যেত। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আম্মা তড়িঘড়ি করে এসে বসতেন আমাদের ড্রয়িংরুমে, যেটাকে আমরা বলতাম ‘সোফার রুম’। সোফার রুমে বসেই উচ্চকণ্ঠে বাড়ির সবাইকে ডাকতেন, ‘কই রে তোরা, সব এখানে আয়!’

আম্মার ডাক শোনামাত্রই আমরা যে যেখানে থাকতাম সবাই মিলে টর্চ, চার্জার লাইট কিংবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেই সোফার রুমে গিয়ে জড়ো হতাম। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকার ঘরটা আলো আর মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতো। এরপর শুরু হতো এক তুমুল আড্ডা। বাচ্চারা আলো-আধারেই নিজেদের মতো খেলা শুরু করে দিতো, চিৎকার করত, ঝগড়া করতো আবার খুনসুটিতে মেতে উঠত।

আম্মা কখনো কখনো সোফায় কিংবা মেঝেতে বসতেন। বাকিরা যে যার সুবিধা মতো জায়গা করে বসতো। তারপর আম্মা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করতেন। কত গল্প বলতেন, কত মানুষকে নিয়ে বলতেন, কত-কত সময়কে নিয়ে বলতেন। কী ছিলো না তার সেই টুকরো টুকরো কথায়! আমি সাধারণত সেসব আড্ডায় খুব একটা কথা বলতাম না, নিজের মতো এক কোণে বসে আম্মার গল্প শুনতাম, বাচ্চাদের আনন্দ দেখতাম, মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রাখতাম, আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে আম্মাকে একটু দেখতাম। অন্ধকারের মাঝেও আম্মার হাসিমুখটা দেখতে বড্ড ভালো লাগত।

আম্মা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন এমন না, বরং ঝড়ের মাঝেই মোবাইলে কাছের-দূরের আত্মীয়, পরিচিত সব মানুষকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন। কে কেমন আছে, কার বাড়ির চাল উড়ে গেল কি না, কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো কি না -এমন সব খোঁজ-খবর নেয়া চলতো। পুরো ঘরটা তখন এক অদ্ভুত ওমে, ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকত। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির হুংকার তখন আর আমাদের ছুঁতে পারত না।

আজ আম্মা নেই, দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। প্রকৃতিতে আজও ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক আগের মতোই অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের আর সেই সোফার রুমে একত্রে বসা হয় না। সত্যি বলতে, এখন আর ওভাবে বসতে ইচ্ছেও করে না। যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে আমাদের সেই অন্ধকারের উৎসব জমে উঠত, সেই মানুষটাই যখন নেই, তখন সোফার রুমের ওই শূন্যতাটুকু বড্ড বেশি কামড়ে ধরে। সবার হৃদয়ে আলো জ্বালানোর মানুষটাই আজ অন্ধকার ঘরে একাকী নিদ্রা যাপন করছে।

মাঝে মাঝে এই রকম দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির রাতে বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি হাহাকার করে ওঠে। তীব্র ইচ্ছে জাগে, সব ফেলে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই ছুটে যাই আম্মার কবরের পাশে। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, যেভাবে একসময় সোফার রুমে এক কোণে বসতাম। আম্মার মাটির বিছানার পাশে বসে বলি, ‘আম্মা, ডরাইয়েন না। এই বৃষ্টি একটু পরেই থাইমা যাইবো।’

কিন্তু সময় আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার বেড়াজালে আটকে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয় না। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগে, আর আমি একা ঘরের বিছানায় শুয়ে স্মৃতির কম্বল মুড়ি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি।

আম্মা ভালো থাকুক তার এই দীর্ঘ নিদ্রায়। পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো মেঘের গর্জন কিংবা কোনো বজ্রপাত আর কখনোই যেন তাকে বিচলিত না করতে পারে। অনন্তকাল পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে থাকুক নিশ্চিন্তে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀