রবিবার, জুন ২৫, ২০১৭

ওমিক্রনের কথাঃ হস্তাক্ষর (শর্ট ফিকশন)



বেশ অনেক সময় ধরে চেষ্টা করছি মানুষের মত লিখার জন্যে, কিন্তু হচ্ছে না। মানুষের এই ব্যাপারটি একদম অন্যরকম, ঠিক যেমন তাদের স্বভাবের মত। এক একজন মানুষের স্বভাব যেমন এক এক রকম হতো, ঠিক তাদের হাতের লেখা গুলিও এক এক রকমের। যদিও অনেকের সাথে অনেকের স্বভাব আর হাতের লেখার মিল পাওয়া যেতো, তবুও সূক্ষ্ম একটা পার্থক্য কোথাও না কোথাও ঠিকই থেকে যেতো। যদিও কখনো ক্রিয়েটিভ হিসেবে ব্যাপারটাকে গ্রহণ করা হয়নি, তবুও আমার যুক্তি অনুযায়ী এটা তাদের ক্রিয়েটিভিটির একটা অংশ হিসেবেই ছিল।

এই যেমন আমি চেষ্টা করছি আমার নিজের, একদম আমার নিজের মত করে লিখার জন্যে। কিন্তু এতটা সময় নষ্ট করার পরও আমি তা পারছি না। অবশ্য এর পেছনে অনেক অনেক যুক্তি দেখানো যেতে পারে। এই যেমন তারা লিখার জন্যে কলম বা পেনসিল জাতীয় কিছু একটা ব্যবহার করত। কিন্তু আমি তেমন কিছু করতে পারছি না। আমাকে আমার প্রিন্টিং ডিভাইসের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমার প্রিন্টিং ডিভাইসটিকে নানা রকম সিগন্যাল পাঠিয়ে তারপর আমার লেখাটি প্রিন্ট করছি। কিন্তু যতবারই প্রিন্ট করছি, ততবারই কোন না কোন ফন্ট স্টাইলের সাথে ওটা ম্যাচ হয়ে প্রিন্ট হচ্ছে। 

এতবার চেষ্টার পর মানুষ হয়তো ক্লান্তি অনুভব করত। কিন্তু ওমিক্রন হবার সুবিধা হচ্ছে এইসব অনুভব আর অনুভূতি থেকে আমরা মুক্ত। কপোট্রন অবশ্য বেশ অনেক পরিমাণে এনার্জি ব্যবহার করছে সেই শুরু থেকে। আধুনিক কপোট্রন বলেই হয়তো এত সময় কাজ করার পরও সেটাতে কোন সিগন্যাল জ্যাম হয়ে যাচ্ছে না বা রিবুট নিতে চাচ্ছে না। কিন্তু আমি ধারণা করতে পারি, আমার স্থানে কোন ৫ম প্রজাতির ওমিক্রন হলে সেটি এরই মাঝে কয়েকবার রিবুট করতে চাইতো। 

আমার আজকের এই আজব কাজটি করার পেছনে কারণ হিসেবে বলতে গেলে বলতে হবে একটা ভিডিও ক্লিপের কথা। ভিডিও ক্লিপটি অনেক অনেক পুরনো একটি আর্কাইভ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সময়কাল হিসেব করলে ওটা বিংশ শতাব্দীর কোন একটা সময়ের হবে। সেখানে মানব প্রজাতির এক মা তার ছেলেকে হাতের লিখা শেখাচ্ছে। আর ছেলেটি লিখতে লিখতে ধীরে ধীরে তার মত করে লিখতে শিখে যাচ্ছিল। আর সেখানে মা'য়ের লেখাটার সাথে ছেলের লেখাটার বেশ কিছু মিল আর অমিলও থেকে যাচ্ছিল।

মানুষের লেখা গুলি যেন শুধুমাত্র তার লেখা নয়, বরং তার থেকেও বেশি কিছু। যেন তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ থাকে তাদের ঐ হাতের লেখাতে। তাদের রুচি আর সংস্কৃতি যেন উঠে আসে ঐসব আঁকা-বাঁকা চিহ্ন গুলিতে। তাদের মনের ভাবনা গুলি শুধুমাত্র তাদের শব্দের বুননে নয়, বরং ঐসব আঁকিবুঁকিতেও উঠে আসত। আর এই ব্যাপারটা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে। এরপর আমি আর্কাইভ থেকে মানুষের লেখা এই ব্যাপার নিয়ে আরও বেশ কয়েকটি ফুটেজ দেখেছি। যদিও ফুটেজ গুলোর বিষয়বস্তু ভিন্ন ভিন্ন ছিল। কিন্তু প্রতিটি ফুটেজেই এই ব্যাপার গুলিই আমার কাছে একটা আলাদা বিষয় মনে হয়েছে।

এর পর থেকেই চেষ্টা করে যাচ্ছি আমার মত করে লিখার জন্যে, যা একদম আলাদা হবে। একদম ভিন্ন কিছু, ঠিক মানুষের লিখার মত। কিন্তু যতবারই আমি আমার ইমেজিং প্রসেসরে কিছু একটা লেখা রেন্ডার করতে চাইছি ততবারই কোন না কোন টেক্সট স্যাম্পলের ব্যবহার হয়ে সেটা রেন্ডার হচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষে এসেও এই জায়গাটাতে ওমিক্রনেরা যে কতটা অপারগ সেটাই যেন প্রমাণ করছে ছোট্ট এই ব্যাপারটি। আমার এই লিখতে না পারাটাই যেন আমার অক্ষমতা। হাজার হাজার ইউনিট এনার্জি নষ্ট করেও আমার বিফলতা যেন আমাকেই বিদ্রূপ করছে। 

কপোট্রনের সিগন্যালের একটা চাপ খুব ভালোই বুঝতে পারছি। আগেও বলেছি, অনুভূতি বা অনুভব ব্যাপারটি থেকে আমরা মুক্ত। কিংবা আমাদের এই অগ্রগামী প্রযুক্তিও অক্ষম আমাদের মত ওমিক্রনকে এইসব অনুভূতি কিংবা অনুভব দেবার ব্যাপারে। যদি আমার ডেটা বিশ্লেষণ ভুল না হয়ে থাকে তবে কপোট্রনের সিগন্যালের ঐ অতিরিক্ত চাপটুকুকে মানুষের অনুভূতির সাথে তুলনা করলে তা তাদের অক্ষমতার আর নিজের সাথে যুদ্ধে হেরে যাবার অনুভূতির কাছাকাছিই কিছু একটা হবে। তবে চেষ্টা করা ছেড়ে দিচ্ছি না। কিছু একটা আছে এর মধ্যে, যেন আমাকে বলছে এক সময় না এক সময় আমি ঠিকই মানুষের মত করে লিখতে পারবো, একদম আলাদা রকম একটা লেখা, একদমই আমার নিজের একটা লেখা!





শনিবার, জুন ০৩, ২০১৭

মুখোশ



মাঝে মাঝে হারিয়ে যাবার প্রচণ্ড তৃষ্ণা পায় আমার। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে পরিচিত এই ভুবন ছেড়ে। কিন্তু এটা নিছকই এক ছেলেমানুষি ইচ্ছা। যেখানে ভুবন বলতে আমার জানা শোনা রয়েছেই কেবল এই একটাই, সেখানে আর কোথায় গিয়ে হারাবো?

কিন্তু তবুও হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। সমাজবদ্ধ হয়ে ভদ্র মুখোশের ভিড়ে আমি যেন দিনকে দিন কেবল হাঁপিয়ে উঠছি। দৈনন্দিন জীবনে এখানে কারও বেঁচে থাকার ছোঁয়া দেখি না আর আমি। আমি শুধু দেখি একদল মানুষ কেবলই একটা ঘোরে পড়ে ছুটছে। মানুষের চামড়ার আড়ালে এরা যেন এক একটা চলমান যন্ত্র-মানব। যেন কলকব্জা গুলোর উপরে স্তর স্তরে চামড়া জুড়ে দিয়ে মানুষের রূপে নিজেকে টিকিয়ে রাখছে। এদের ছুটোছুটি দেখলে মনে হয় নিশ্বাসটাও যেন এরা নিজের জন্যে নেয় না। কেবল পচে গলে পিছু পড়ে যাবে বলেই ভয়ে ভয়ে নিশ্বাস টেনে চলেছে নিয়ম করে।

এদের খাবার আছে, সেই খাবারও নিয়ম করে গ্রোগ্রাসে গিলছে, কিন্তু এদের খিদে নেই। খাবারের স্বাদ এদের জিহ্বাকে স্পর্শ করে না। এদের মনে স্বাদকে উপভোগের সখ জাগে না, আহ্লাদ করে এরা দু'টুকরো রুটিও চিবায় না। এরা কেবল নিয়ম করে তিন বেলা খাবার গিলতে পারে। কেবল পরে সকাল, সন্ধ্যা আর রাতে মেকি আয়োজনে নিজের ভাগের খাবার সাবাড় করতে। আর পারে খাওয়া শেষে ফের নিজেকে ঘোরে টেনে নিয়ে ছুটতে। 

তবে এদের জন্যে আমার আফসোস হয় না, দুঃখও হয় না। কেবল নিজের মনে বিষাদ জাগে। জীবনকে এরা কখনোই জীবনের মত করে দেখতে পারে না বলেই এই বিষাদ জাগে। সুশৃঙ্খল হতে গিয়ে এরা বিশৃঙ্খলার আনন্দ নিতে ভুলে গেছে বলে বিষাদ জাগে। ছন্দে চলার লোভে পড়ে ছন্দ পতনের বিরক্তি বোঝার ক্ষমতা হারিয়েছে বলে আমার বিষাদ জাগে। আমার বিষাদ লাগে, কারণ এরা উড়তে চায়, কিন্তু বাসাতকে স্পর্শ করতে চায় না বলে। বিষাদ লাগে, কারণ এরা সাতরে যায়, কিন্তু নিজেকে পানিতে ছোঁয়ায় না বলে। প্রকৃতির মাঝে কৃত্রিমতা যেন এদের গ্রাস করে নিয়েছে।

কোন একদিন হুট করে যদি এদের মোহের অবসান ঘটে, তবে আমি নিশ্চিত এরা নিজ নিজ বিছানা ছাড়বার আগেই আত্মহত্যার পথ খুঁজবে। মায়ামরা এই প্রকৃতি দেখে নিজেরাই ডুকরে কাঁদবে। সু-শৃঙ্খল জীবনে বাঁচতে গিয়ে এরা যে শৃঙ্খলে বন্দী দাশ ছিল তা অনুধাবন করে এরা নিজেদের আফসোসের আগুনে পুড়িয়ে মারবে। 

এরা কখনো সূর্যোদয় দেখে না, এরা শুধু দিনের শুরু হতে দেখে। এরা কখনো সূর্যাস্তের কোমলতাও অনুভব করে না, এরা কেবলই দিনের সমাপ্তি দেখে। এরা সন্ধ্যার মায়ায় নিজেকে নিমজ্জিত করতে জানে না, রাতের নিস্তব্ধতার ছন্দ শুনতে পারে না। এরা জাগে না, এরা ঘুমায় না। এরা কেবলই ছোটে, শুধু ছুটেই চলে।

আর এসব দেখেই আমার হারিয়ে যাবার তৃষ্ণা বাড়ে। বাড়তে বাড়তে একদম অতিষ্ঠ করে তোলে। ছটফট করে, চিৎকার করে, ভাংচুর করে সেই তৃষ্ণা মেটাতে ইচ্ছে করে। ইচ্ছে করে ইকারাসের মত ডানা ছড়িয়ে দিগন্তের এই প্রান্ত থেকে ঐ প্রান্ত পর্যন্ত দাপিয়ে বেড়াতে।

কিন্তু এসবের কিছুই আমার করা হয় না। আফসোসকে আবারও চেপে রেখে আমি সামনে এগিয়ে যাই। চুপিসারে আমিও আমার মিথ্যে মুখোশটা পড়ে নেই। সেই মুখোশের চোখ দিয়ে আমিও এক অদৃশ্য মোহের দেখা পাই। এটাই সেই মোহ, যা সবাইকে এই একঘেয়ে যান্ত্রিক গতিতে চালিয়ে নিচ্ছে। আর এভাবেই আমার আর হারিয়ে যাবার তৃষ্ণাটা মেটানো হয় না। অতৃপ্ত তৃষ্ণাকে মিথ্যে মুখোশে মুড়িয়ে আমিও বাকি সবার মত ছুটে চলি। ছুটে চলি এক মিথ্যে আশ্বাসের গন্তব্যে...