শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৬

একাকীত্বের সঙ্গী


টেলিপোর্টার আবিষ্কারের পর পৃথিবী থেকে সবার আগে হারিয়ে গিয়েছিল 'দূরত্ব' নামক ধারণাটি। কোথাও পৌঁছানোর ব্যাপারে মানুষ মুক্ত হয়েছিল অপেক্ষার হাত থেকে। প্রথম দফায় যন্ত্রগুলো বসানো হয়েছিল এমন সব স্থানে যেগুলো ছিলো মানুষের চিরচেনা গন্তব্য। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্র, কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দর, ঝলমলে সমুদ্রসৈকত আর পাহাড়ি রিসোর্টের চূড়ায়। এক প্যাডে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে।

দ্বিতীয় দফায় টেলিপোর্টার গুলো হয়ে উঠে আরও উন্নত, আরও দ্রুত এবং আরও সহজ। টেলিপোর্টার গুলো মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দুর্গম সব জায়গার দরজা খুলে দিল। বরফের তলদেশের গবেষণাকেন্দ্র, মেঘছোঁয়া পর্বতচূড়া, সমুদ্রের গভীর পর্যবেক্ষণ কক্ষ, জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এক করুণ সত্য আবিষ্কার করল। সত্যটি হলো- দূরে চলে যাওয়া আর সত্যিকার অর্থে একা থাকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা আছে, তার প্রতিটি কোনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের পায়ের ছাপ পড়তে লাগলো, আর মানুষ পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমে উঠলো, শব্দ গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো কোলাহলে, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে হারাতে থাকলো মানুষের একাকিত্ব।

বেশ অনেক পরে আগমন ঘটলো তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের। তবে এবারের টেলিপোর্টেশনের ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেলো। ততদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছিলো একান্তে সময় কাটানোর মর্ম। তাই টেলিপোর্টার গুলোও তৈরি হয়েছিল সেই ধারণাকে ভিত্তি করে। এবার আর গন্তব্য গুলো নির্দিষ্ট ছিলো না। ছিলো না কোন নাম, কোনো ছবি ছিল না, কোনো পরিচিতিও ছিল না। যাত্রীরা কেবল বেছে নেয়ার সুযোগ পেতো তাদের পছন্দ মতো সময়। আর টেলিপোর্টার কোম্পানি কেবল একটা নিশ্চয়তা দিত- নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে পৃথিবীর আর কোনো জীবিত মানুষ উপস্থিত থাকবে না। বিজ্ঞাপনের একদম নিচে সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকত, “কিছু নীরবতা শুধু একজনের জন্যই তৈরি হয়।”

পাঁচ বছর আগে তার স্ত্রী মেঘলাকে হারানোর পর থেকে রাইয়্যানের কাছে সন্ধ্যার সময়টা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের বেলায় সে আর দশ জনের মতোই একদম স্বাভাবিক একজন মানুষ। অফিসের কাজ সারে, সহকর্মীদের সাথে হাসে, বাজার করে, প্রয়োজনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কও করে। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এলেই বাড়ির দরজা পেরিয়ে এক ধরনের বিস্তৃত শূন্যতা তাকে গিলে ফেলে, মনে হয় দিনের ঐ মানুষটি দরজার বাইরেই আটকে আছে।

শুরুতে সে মেঘলাকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত, তার কথা বলার ভঙ্গি, ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গান গাওয়ার সুর .....সবকিছু। কিন্তু বছর গড়াতে থাকতেই স্মৃতিগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত হতে লাগল, মেঘলার মুখ মনে করতে গেলে কখনো তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ দেখাত, আবার কখনো মনে হতো মুখটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেত সে এই দ্বিতীয় অনুভূতিটাকে, মেঘলাকে হারানোর চেয়েও তাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।

তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের ঐ অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটি রাইয়্যান প্রথম দেখেছিল এমনই এক সন্ধ্যায়; ঠিক সেই সময় যখন ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছিল। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, হয়ত তিন দিনের জন্য পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে অন্তত নিজের স্মৃতিগুলোর সাথে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। সেখানে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবে না, কেউ বলবে না যে- আহা! পাঁচটা বছর কেটে গেছে, এবার তোমার সামনে তাকানো উচিত।

সিদ্ধান্তটা সে খুব দ্রুতই নিয়েছিল, যেন দীর্ঘদিনের জমানো একটা সিদ্ধান্ত অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। যদিও এবারের টেলিপোর্টেশনের টিকিটের দাম ছিলো তার নাগালের বাইরে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো সে এটা করবেই। সেই সিদ্ধান্তেই আট মাসের ইউনিট জমা করে যখন টিকিটটি কিনলো তখন তাকে বেশ দীর্ঘ কয়েকটা ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। তার নিজের সম্পর্কে বেশ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জানাতে হয়েছিল টেলিপোর্টেশন কোম্পানিকে। তার ঠিক দু'দিন পর তার যাত্রার দিন নির্ধারিত হলো।

যাত্রার দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভ্রমণে যাচ্ছে না, বরং এমন এক সিদ্ধান্তের গভীরে ঢুকে পড়ছে- যার শেষটা সে নিজেও জানে না। টার্মিনালটি ছিল আশ্চর্যরকম নীরব, বিশাল সাদা ঘরের মাঝখানে গোলাকার প্যাডটি ছাড়া আর কিছু নেই, দেয়ালজুড়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো কর্মচারী নেই, শুধু মেঝের নিচে নীল আলো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে।

রাইয়্যান প্যাডের ওপর দাঁড়াতেই একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল-
-- “আপনি কি নিশ্চিত?”

প্রশ্নটা শুনে সে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করলো- "কীসের ব্যাপারে?"

কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না, তারপর কণ্ঠটি আবার বলল-‌
-- “আপনি কি একাই যেতে চান?”

রাইয়্যানের হাসিটা মিলিয়ে গেল, সে বলল- “হ্যাঁ।”

আলো জ্বলে উঠল, আর পৃথিবী সরে গেল। চোখ খুলে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ছিল বাতাসের; বাতাসে লবণের গন্ধ, তার সাথে ভেজা কাঠের একটা মৃদু গন্ধ মিশে আছে। সামনে সমুদ্র, দূরে জলরাশি আকাশের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মাঝখানে কোনো দিগন্তরেখা নেই, যেন পৃথিবীটা ওই পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। রাইয়্যান টেলিপোর্টেশন প্যাড থেকে নেমে ধীরে ধীরে বালির ওপর হাঁটল, পায়ের নিচে নরম বালি দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো শব্দ হচ্ছিল না, সে থেমে নিজের পায়ের ছাপের দিকে তাকাল, এরপর পর আবার হাঁটা শুরু করলো।

সামনে একটি ছোট বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কাঠের তৈরি, নিচু ছাদ, সামনে বারান্দা। বাড়িটাকে দেখে রাইয়্যানের মনে হলো, সে যেন আগে কোথাও এই বাড়িটা দেখেছে, হয়ত কোনো ছবিতে, হয়ত কোনো স্বপ্নে, নয়তো এমন কোনো কল্পনায় যেটা সে কখনো নিজেকেই ঠিকমতো বলতে পারেনি। ভেতরে ঢুকে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হলো, সবকিছু অপরিচিত, অথচ খুব অদ্ভুত রকমের পরিচিত। টেবিলের উপর রাখা কফির জারটি ঠিক সেই ব্র্যান্ডের যা সে বাড়িতে ব্যবহার করে; বইয়ের তাকের তৃতীয় সারিতে তার প্রিয় লেখকের সেই বইটি, যেটার শেষ কয়েক পাতা সে কোনোদিন পড়েনি; জানালার পাশে একটি কাঠের চেয়ার, যেটাতে বসে মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে চা খেত।

রাইয়্যান প্রথমে এসবকে প্রযুক্তির পরিশীলিত সৌজন্য বলেই ভেবেছিল, বুকিংয়ের আগে কোম্পানি তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা নীল কাপটি দেখে তার সেই ব্যাখ্যাটা আর যথেষ্ট মনে হলো না। নীল রঙের কাপটির কিনারে সূক্ষ্ম একটি ফাটল, হুবহু সেখানেই যেটা মেঘলার কাপেও ছিলো।

এক সকালে কাপটি হাতে নিয়ে মেঘলা বলেছিল, “দেখেছ? এখনও টিকে আছে।” রাইয়্যান তখন বলেছিল, “একদিন ভেঙে যাবে।” মেঘলা হেসে বলেছিল, “ভেঙে গেলেই কি সবকিছু ফেলে দেয়া যায়? যায় না, বুঝলে।” স্মৃতিটা এত হঠাৎ, এত স্পষ্টভাবে ফিরে এল যে রাইয়্যানের মনে হলো, কেউ যেন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে গেল। সে কাপটির দিকে হাত বাড়িয়েও ছুঁয়ে দেখলো না, কারণ তার মনে হচ্ছিল, একবার ছুঁয়ে দেখলেই হয়ত তাকে মেনে নিতে হবে- এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।

বিকেল নামার পর দ্বীপের রং বদলে গেল, সূর্যের আলো নরম হতে হতে সমুদ্রের বুকের উপর গলিত তামার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আকাশে জমল অস্পষ্ট গোলাপি আভা। রাইয়্যান বারান্দায় বসে ছিল, পাশাপাশি দুটি চেয়ার, সে যে চেয়ারে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটি খালি। কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, খালি চেয়ারটির ওপর একটি ভাঁজ করা কাপড় রাখা, সকালে সেটা সেখানে ছিল না। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, কাপড়টা ছিল হালকা ধূসর রঙের একটি শাল। সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল, পরিচিত কোনো গন্ধ নেই, কোনো নাম নেই, কিছুই নেই যা প্রমাণ করবে এটি মেঘলার। তবু সে খুব যত্ন করে ভাঁজটা ঠিক করে আবার চেয়ারটির উপর রেখে দিল, এমনভাবে, যেন খুব পরিচিত কেউ পরে এসে সেটা গায়ে জড়াবে।

নিজের এই আচরণের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে সে জোরে বলে উঠল, “আমি কী করছি?”

প্রশ্নটা সে জোরে বলেছিল, উত্তর আসেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত লাগছে, যেন বহুদিন ধরে সে কারও সাথে কথা বলেনি।

সন্ধ্যার একটু আগে রাইয়্যান সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বের হলো। এবার সে নিজের পায়ের ছাপগুলো লক্ষ্য করছিল, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দিচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল বালির ওপর একটি ছোট পাথরের বৃত্ত। কেউ যেন খুব যত্ন করে পাথরগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বৃত্তটির মাঝখানে একটি শুকনো শামুকের খোলস, রাইয়্যান সেখানে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, মেঘলা সমুদ্রতীরে শামুক দেখলেই সবসময় একটা শামুকের খোলস কুড়িয়ে নিত, তারপর কিছুক্ষণ হাতের তালুতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার ফেলে দিত। “নেবে না?” রাইয়্যান একবার জিজ্ঞেস করেছিল। “না,” মেঘলা বলেছিল, “ওটার জায়গা ওখানেই।” রাইয়্যানের বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, সে চারদিকে তাকাল, কেউ নেই, সমুদ্র, আকাশ আর তার নিজের ছায়া, তবু পাথরগুলো কেউ সাজিয়েছে। সে কি সকালে এখানে এসেছিল?! অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না।

সেই রাতে রাইয়্যান ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি, বিছানায় শুয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিনের বেলায় যে সমুদ্র প্রায় শব্দহীন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ঢেউয়ের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, জল তীরে এসে ভাঙছে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল, কেউ বাড়ির চারপাশে খুব ধীর পায়ে হাঁটছে। কিন্তু রাইয়্যান জানত, সেখানে কেউ নেই, সে নিজেকেই বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দিল- আমি একাই এসেছি। রাতের কোনো এক সময় তার ঘুম এসে গিয়েছিল, সকালে ঘুম ভাঙার পর সে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী তাকে জাগিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, ঘর নিস্তব্ধ, তারপর তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর, সেখানে দুটো কাপ রাখা। একটিতে আগের রাতের কফির শুকিয়ে যাওয়া দাগ, অন্যটিতে চা, ধোঁয়া নেই, কিন্তু চায়ের রং এখনও গাঢ়।

রাইয়্যান বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, সে জানত, দ্বিতীয় কাপটি সে রাখেনি। তারপরও তার প্রথম ভাবনায় এলো- ভোর সকাল করে মেঘলাও এমন কড়া চা খেত; পরক্ষণেই সে এই চিন্তাটার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছিল, তার অবচেতন মন নিজে থেকেই প্রতিটি ঘটনার সাথে মেঘলাকে জুড়ে দিচ্ছে। নীল রঙা মেঘলার কাপ, ভাজ করা মেঘলার শাল, সমুদ্র তীরে মেঘলার হাতে শামুকের খোলস, আর এখনকার এই কড়া চা - সেটাও মেঘলার। হয়ত এসব কিছুই তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, হয়ত কোম্পানির কোনো অ্যালগরিদম তার স্মৃতির দুর্বল জায়গাগুলো জানে। অথবা... -এই শেষ সম্ভাবনাটাই সে ভাবতে চাইলো না।

দুপুরের দিকে রাইয়্যান বাড়ির ভেতরে আরও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল, বইয়ের তাকের ওপর যে বইটি আগের দিন বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেটি এখন খোলা, পাতার মাঝখানে একটি শুকনো পাতা রাখা। রাইয়্যান বইটি তুলে নিল, পাতাটি কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না, কিন্তু বইয়ের যে পাতায় সেটি রাখা, সেখানে একটি বাক্য দাগ দেওয়া-

“মানুষ কখনো কখনো ফিরে আসে না, তবু তার জন্য জায়গা থেকে যায়।”

রাইয়্যান বইটি বন্ধ করে ফেলল, তার হাত কাঁপছিল না, সে ভয়ও পাচ্ছিল না, বরং তার ভেতরে অন্যরকম একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। যদি সত্যিই কেউ এখানে থাকে? আর যদি কেউ না থাকে? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সে বেশি ভয় পায়, রাইয়্যান বুঝতে পারছিল না। কারণ কেউ থাকলে তাকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে হবে, যা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়, আর কেউ না থাকলে তাকে স্বীকার করতে হবে, সে নিজেই হয়ত এসব ঘটাচ্ছে- কখনো জেগে, কখনো ঘুমের ভেতর এসব সাজিয়ে যাচ্ছে; এবং পরে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, যা হয়ত তার চেয়েও ভয়াবহ।

সেদিন বিকেলে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর কোনো কিছু নিয়ে অনুমান করবে না, সে রান্নাঘরের টেবিল পরিষ্কার করে দিল, দুটি কাপ ধুয়ে উলটো করে রাখল, চেয়ার দুটো পাশাপাশি ঠেলে দিল, বারান্দায় থাকা শালটি ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দিল। তারপর সে বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল, কোথাও কেউ নেই, সে দরজা বন্ধ করল, জানালা আটকাল, মেঝের ওপর এক টুকরো বালি ছড়িয়ে দিল, যাতে কেউ হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে। সবশেষে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, বিকেল ৫টা ৪০। সে সিদ্ধান্ত নিল, সূর্য ডোবার আগে আর কোথাও যাবে না। বারান্দার চেয়ারে বসে থাকবে, কেউ এলে দেখবে, কেউ না এলে অন্তত নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে।

সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, সমুদ্রের ওপর আলো ছোট হয়ে আসছিল, আকাশের রং কমলা থেকে গাঢ় বেগুনিতে বদলে যাচ্ছিল, দ্বীপের বাতাসের নোনা স্বাদের সাথে যেন এক ধরনের চাপা প্রতীক্ষার চাপ তৈরি হতে থাকলো। রাইয়্যান চেয়ারে বসে ছিল, চোখ বাড়ির দরজার দিকে। সময় যাচ্ছিল, কেউ আসেনি, বালির উপর কেন পায়ের ছাপ পড়লো না, কোথাও অস্বাভাবিক কোন শব্দও হলো না।

তারপর হঠাৎ সে খেয়াল করল, বারান্দার অন্য চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই ঠিকই, কিন্তু চেয়ারটি সামান্য দোল খাচ্ছে, যেন কেউ একটু আগে উঠে গেছে চেয়ারটি থেকে। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল না, সে নিজের শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল, "বাতাস", সে মনে মনে বলল, কিন্তু তার মুখে কথা বেরোল না, কারণ বাতাস থেমে ছিল। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল, খুব সাধারণ শব্দ, ড্রয়ারের শব্দ, কেউ যেন রান্নাঘরের ড্রয়ার খুলল। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার বসে পড়ল, সে বুঝতে পারছিল, তার শরীর বাড়ির ভেতরে যেতে চাইছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যদি না যায়, তাহলে বাকি সময়টা সে আর এখানে কাটাতে পারবে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, দরজার কাছে গিয়ে থামল, তারপর ভেতরে ঢুকল, রান্নাঘর ফাঁকা, কিন্তু ড্রয়ারটি খোলা, ভেতরে একটি ছোট নোটবুক রাখা।

রাইয়্যান জানে, নোটবুকটি তার নয়। সে সেটি হাতে নিল, প্রথম কয়েকটি পাতা খালি, তারপর একটি পাতায় লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো করেও লেখা নয়, যেন কেউ শান্তভাবে বসে লিখেছে- "আজ সে আবার চেয়ার দুটো পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।"

রাইয়্যানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এল, সে পরের লাইনটি পড়ল- "আজও সে বলবে, সে একা। আমি এখনও তাকে বলিনি যে সে গতকাল রাতে সমুদ্রের ধারে অনেকক্ষণ আমার সাথে বসে ছিল।"

রাইয়্যান আর পড়তে পারল না, সে নোটবুক বন্ধ করে দিল, মনে করার চেষ্টা করল গত রাতের কথা, বিছানায় শোয়ার আগে সে কী করেছিল? সে কি সত্যিই বাইরে গিয়েছিল? তার মনে পড়ল না। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো নোটবুকটি ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে। তারপর মনে হলো, সেটা করলে হয়ত সে শুধু প্রমাণটাই নষ্ট করবে, প্রশ্নটা নয়। সে নোটবুকটি টেবিলের ওপর রেখে টেলিপোর্টার প্যাডের দিকে হাঁটল, আজ দ্বিতীয় দিন, আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর তার ফেরার অনুমতি।

টেলিপোর্টারের স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল, সেখানে লেখা ছিল-
RETURN AVAILABLE IN 23:17:42

তার নিচে আরেকটি লাইন জ্বলছিল-
PASSENGERS READY: 1

রাইয়্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, একজন, সে নিজেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা ঝিলমিল করে উঠল, তারপর স্ক্রিনে নতুন করে লেখা এল-
PASSENGERS READY: 2

রাইয়্যান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে পেছনে ঘুরে দেখল, দ্বীপে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, বারান্দার দুটি চেয়ার পাশাপাশি, দূর থেকে মনে হলো, একটি চেয়ারে কেউ বসে আছে। রাইয়্যান চোখ কুঁচকে তাকাল, পরের মুহূর্তেই সেখানে শুধু শালটা পড়ে থাকতে দেখল- যেটা সে নিজের হাতে আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল, সংখ্যাটা তখনো দুই। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে বাড়ির দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল।

রাইয়্যান চোখ বন্ধ করল, তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ আছে। একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই শহরে, যেখানে পাঁচ বছর ধরে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে মেঘলা আর নেই। অন্য পথটি কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না, শুধু এটুকু জানে- পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, অথবা দাঁড়িয়ে নেই।

ঠিক তখনই তার হাতের কনসোলটি কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে ফেরার সময় হঠাৎ বদলে গেল-
RETURN AVAILABLE NOW

তার নিচে লেখা উঠল- “দয়া করে যাত্রীর সংখ্যা নিশ্চিত করুন।” রাইয়্যান ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার আঙুল দুটি সংখ্যার মাঝখানে স্থির হয়ে রইল- 1 অথবা 2। পেছন থেকে তখন খুব পরিচিত স্বরে কেউ বলল- "রাইয়্যান, এবার কি আমাকে সত্যিই রেখে যাবে?"

রাইয়্যান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা কোনোদিন জানা যায়নি। পরদিন সকালে তৃতীয় তরঙ্গের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে শুধু একটাই সংকেত পৌঁছেছিল- টেলিপোর্টার প্যাড সক্রিয় হয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, কিন্তু যাত্রীসংখ্যার তথ্য অসম্পূর্ণ।

রাইয়্যানের বুকিং ফাইলের একেবারে শেষ লাইনে, যা পরে কোম্পানির কোনো ইঞ্জিনিয়ার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো তদন্তকারী দল ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানে শুধু একটি ছোট্ট নতুন নোট যোগ হয়েছিল লাল অক্ষরে “RETURN NUMBER ERROR!”

সেই দ্বীপে যদি কেউ কোনোদিন আবার যায়, তবে সে হয়ত দেখতে পাবে, বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো পাশাপাশি রাখা, একটি চেয়ারের উপর একটি হালকা ধূসর শাল ভাঁজ করা, আর টেবিলের উপর দুটো কাপ। একটি খালি, অন্যটিতে অপেক্ষারত কড়া লিকারের ঠান্ডা চা।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀


মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬

শূন্য সোফার রুম এবং হারানো এক আলোকবর্তিকা


জানালার কাচে তখনো বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আলতো করে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও প্রকৃতির বুকে যে উন্মাতাল তাণ্ডব চলল, তাকে একরকম রূপকথা বলেই ভ্রম হয়। দমকা ঝড়ো বাতাস, মেঘের গুরুগুরু গগনবিদারী গর্জন, আর সাথে বুক কাঁপানো দুই-একটি বজ্রপাত -সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল এই আধঘণ্টায়।

তারপর হঠাৎ করেই শান্ত। আকাশ তার রাগ ঝেড়ে এখন হালকা, শান্ত। ঘরের কোণে জমে উঠেছে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া, যা গায়ে লাগলেই কেমন যেন একটা আলসেমি জড়িয়ে ধরে। মন বলে, এই চমৎকার ঠান্ডা আবহে কম্বলটা গায়ে টেনে দিয়ে একটা লম্বা, নিটোল ঘুম দেওয়া যাক। কিন্তু চোখ বুজলেই কি আর ঘুম আসে? কিছু কিছু আবহাওয়া আসলে ঘুমের চেয়ে বেশি জাগিয়ে তোলে ভেতরের মানুষকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্মৃতির ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তাকে তুলে ধরে মনের দৃষ্টিতে।

যেমন আজ এই বৃষ্টির শেষলগ্নে এসে বুকটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠল। খুব মনে পড়ছে আম্মাকে।

আসলে ‘ইদানীং মনে পড়ছে’ বলাটা ভুল হবে। আম্মা চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে তার ছায়া আমি খুঁজে না। এখন প্রতিটা ছোটোখাটো কাজেই আম্মা অবধারিতভাবে চলে আসেন। কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, ‘আচ্ছা, আম্মা থাকলে তো কাজটা এভাবে করতেন না, তিনি হয়তো অন্য কোনো সহজ উপায়ে করে দিতেন!’ কিংবা কোনো জিনিস অগোছালো দেখলে কানের কাছে যেন মায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘এটা এখানে রাখছিস কেন? ঐখানে রাখ।’ অথবা কোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, আম্মা থাকলে ঠিকই এই সমস্যার কোনো সমাধান বলে দিতেন। এই রকম হাজারো হাবিজাবি, টুকরো টুকরো ভাবনা এখন আমার একাকিত্বের সঙ্গী।

তবে আজকের এই ঝড়-বৃষ্টির রাতটা যেন আম্মার স্মৃতিকে বড্ড বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। আম্মাকে আমাদের চেনা-পরিচিত সবাই খুব সাহসী এক নারী হিসেবেই জানত। যে কোনো বড়ো বিপদ বা কঠিন পরিস্থিতি তিনি এত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতেন যে, অবাক হতে হতো। দেখে মনে হতো, তার কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন এক অদ্ভুত জাদুবলে সবটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অদৃশ্য কেউ একজন এসে তার হয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো, এই পাহাড়সম সাহসী মানুষটারও একটা দুর্বল জায়গা ছিল। ঝড়-বৃষ্টির সময় আম্মাকে আমার বড্ড ভীতু মনে হতো। যদিও তিনি মুখে কখনো ভয়ের কথা স্বীকার করতেন না, চোখে-মুখেও ভয়ের কোনো রেখা ফুটতে দিতেন না, তাও একজন সন্তানের চোখ তো! মায়ের ভেতরের চাপা অস্থিরতাটুকু আমি ঠিকই টের পেতাম।

সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফোটে, আবার পরক্ষণেই চোখটা ভিজে আসে। বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই নিয়ম করে এলাকার বিদ্যুৎ চলে যেত। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আম্মা তড়িঘড়ি করে এসে বসতেন আমাদের ড্রয়িংরুমে, যেটাকে আমরা বলতাম ‘সোফার রুম’। সোফার রুমে বসেই উচ্চকণ্ঠে বাড়ির সবাইকে ডাকতেন, ‘কই রে তোরা, সব এখানে আয়!’

আম্মার ডাক শোনামাত্রই আমরা যে যেখানে থাকতাম সবাই মিলে টর্চ, চার্জার লাইট কিংবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেই সোফার রুমে গিয়ে জড়ো হতাম। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকার ঘরটা আলো আর মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতো। এরপর শুরু হতো এক তুমুল আড্ডা। বাচ্চারা আলো-আধারেই নিজেদের মতো খেলা শুরু করে দিতো, চিৎকার করত, ঝগড়া করতো আবার খুনসুটিতে মেতে উঠত।

আম্মা কখনো কখনো সোফায় কিংবা মেঝেতে বসতেন। বাকিরা যে যার সুবিধা মতো জায়গা করে বসতো। তারপর আম্মা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করতেন। কত গল্প বলতেন, কত মানুষকে নিয়ে বলতেন, কত-কত সময়কে নিয়ে বলতেন। কী ছিলো না তার সেই টুকরো টুকরো কথায়! আমি সাধারণত সেসব আড্ডায় খুব একটা কথা বলতাম না, নিজের মতো এক কোণে বসে আম্মার গল্প শুনতাম, বাচ্চাদের আনন্দ দেখতাম, মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রাখতাম, আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে আম্মাকে একটু দেখতাম। অন্ধকারের মাঝেও আম্মার হাসিমুখটা দেখতে বড্ড ভালো লাগত।

আম্মা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন এমন না, বরং ঝড়ের মাঝেই মোবাইলে কাছের-দূরের আত্মীয়, পরিচিত সব মানুষকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন। কে কেমন আছে, কার বাড়ির চাল উড়ে গেল কি না, কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো কি না -এমন সব খোঁজ-খবর নেয়া চলতো। পুরো ঘরটা তখন এক অদ্ভুত ওমে, ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকত। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির হুংকার তখন আর আমাদের ছুঁতে পারত না।

আজ আম্মা নেই, দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। প্রকৃতিতে আজও ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক আগের মতোই অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের আর সেই সোফার রুমে একত্রে বসা হয় না। সত্যি বলতে, এখন আর ওভাবে বসতে ইচ্ছেও করে না। যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে আমাদের সেই অন্ধকারের উৎসব জমে উঠত, সেই মানুষটাই যখন নেই, তখন সোফার রুমের ওই শূন্যতাটুকু বড্ড বেশি কামড়ে ধরে। সবার হৃদয়ে আলো জ্বালানোর মানুষটাই আজ অন্ধকার ঘরে একাকী নিদ্রা যাপন করছে।

মাঝে মাঝে এই রকম দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির রাতে বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি হাহাকার করে ওঠে। তীব্র ইচ্ছে জাগে, সব ফেলে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই ছুটে যাই আম্মার কবরের পাশে। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, যেভাবে একসময় সোফার রুমে এক কোণে বসতাম। আম্মার মাটির বিছানার পাশে বসে বলি, ‘আম্মা, ডরাইয়েন না। এই বৃষ্টি একটু পরেই থাইমা যাইবো।’

কিন্তু সময় আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার বেড়াজালে আটকে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয় না। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগে, আর আমি একা ঘরের বিছানায় শুয়ে স্মৃতির কম্বল মুড়ি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি।

আম্মা ভালো থাকুক তার এই দীর্ঘ নিদ্রায়। পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো মেঘের গর্জন কিংবা কোনো বজ্রপাত আর কখনোই যেন তাকে বিচলিত না করতে পারে। অনন্তকাল পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে থাকুক নিশ্চিন্তে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀


শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬

আমরা আসলে কিছুই বুঝি না


লাভ বুঝি না লোকসান বুঝি না
ভালো বুঝি না মন্দ বুঝি না
কিংবা তাদের মিসেল বুঝি না
হাসি বুঝি না কান্না বুঝি না
কাছের মানুষ হারাবার আগে
তাদের চোখের ভাষাটা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা


গ্রাম ভেঙে শহর করার আগে
গ্রাম্য জীবনের সরলতা বুঝি না
নদী ভরাট জমি করার আগে
নিরালা বাতাসের শীতলতা বুঝি না
মাটির ঘর পাঁকা করার আগে
আপন নিবাসের ঠিকানা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা


ধুলো মাখা পথে পিচ ঢালার আগে
খালি পায়ে হাঁটার সুখটা বুঝি না
ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বালাবার আগে
আঁধারে বসার শান্তি বুঝি না
জোনাকি দল হারাবার আগে
অন্ধকারের ভাষাটা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা


উজ্জ্বল এলইডিতে হারাবার আগে
কুপির বাতির নাচন বুঝি না
স্ক্রিনের আড্ডায় হারাবার আগে
উঠোনে গল্পের আসর বুঝি না
গোছানো ফ্ল্যাটে হারাবার আগে
মুক্তপ্রাঙ্গণের বিস্তার বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


হাঁসে ভরা বিল হারানোর আগে
মন জুড়ানো বিকাল বুঝি না
ধান ক্ষেতের দোল হারানোর আগে
সবুজের মোহ মাত্রা বুঝি না
বরই-পেয়ারা গাছ হারানোর আগে
লংকা-লবণের স্বাদ বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


ডাঙ্গুলির শৈশব হারানোর আগে
মায়ের বকুনির মমতা বুঝি না
কৈশোরের দুরন্ত হারান‌োর আগে
নিস্বার্থের বন্ধুর মায়াটা বুঝি না
সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হারানোর আগে
মুক্তো আকাশের বিশালতা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


যান্ত্রিক চাকায় শান্তি হারাবার আগে
ধীর জীবনের ছন্দ বুঝি না
নগর বিনিদ্রায় হারাবার আগে
নিশি গ্রামের নিদ বুঝি না
শ্রুতিকটু অ্যালার্মে ভোর হারাবার আগে
পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


শহুরে ভিড়ে হারাবার আগে
চেনা মুখের মায়া বুঝি না
জেব্রাক্রসিং এ হারাবার আগে
আঁকা বাঁকা পথের জাদু বুঝি না
শহুরে জঞ্জালে হারাবার আগে
সরল গ্রামের বিপুলতা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা...

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬

অন্ধকারের দর্শন

 


বহুকাল আমি নিজেকে একজন ভুল মানুষ ভেবে এসেছি। আমার পৃথিবীটা ছিল কুয়াশায় ঢাকা, যেখানে স্পষ্ট বলতে কিছুই ছিল না। আমার ভেতরে নিজেকে প্রকাশ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু যতবারই আমি মুখ খুলতে চেয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে যেন কেউ একজন আমার কথাগুলো বন্দি করতে ছুটে আসছে। ভয় ছিল আমার ছায়াসঙ্গী। তাই আলো থেকে পালিয়ে বারবার আমি ফিরে এসেছি আমার পরিচিত অন্ধকারে, আর সেই অন্ধকারই হয়ে উঠেছিল আমার একমাত্র পরিচয়। আমি মেনেই নিয়েছিলাম- আমি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত ভুলে ভরা এক মানুষ, যার জন্মই হয়েছে ভুল করার জন্য।

কিন্তু একদিন সবকিছু বদলে গেল, যেদিন আমার ভাবনার সাগর নিজের গতিপথ বদলে গিয়ে পড়ল ছোট্ট একটি বীজের উপর।

মাটির গভীরে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটি বীজ পড়ে থাকে। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, "কেন তুমি এই অন্ধকারে? বাইরে এসো, আলোর পৃথিবী তোমাকে ডাকছে," সে হয়তো কোনো উত্তরই দেবে না। কারণ সে জানে, ঐ অন্ধকার তার শত্রু নয়, বরং তার আশ্রয়। ঐ মাটি, ঐ চাপ, আর ঐ একাকিত্ব.. এগুলো ছাড়া তার শেকড় গজাবেই না। আলোতে মাথা তোলার আগে, ঐ অন্ধকারকে তার আপন করে নিতে হয়, মাটির প্রতিটি কণার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়।

সেই বিকেলে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি তো সেই বীজটার মতোই। আমার ভয়, আমার অস্পষ্টতা, আমার ভুলগুলো… ওগুলো আসলে আমার শত্রু ছিল না, ওগুলোই ছিল আমার মাটি। যতবার আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, ততবার আমি আসলে নিজের শেকড়কে আরও গভীরে চালনা করেছি। 

এই ভাবনাটা আমাকে পৃথিবীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখালো। আমি দেখলাম, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো শিল্পীও তাঁর সেরা কাজগুলো অসম্পূর্ণ রেখে গেছেন, কিন্তু তাতে তাঁর মহত্ত্ব কমেনি। আমি বুঝলাম, পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অমাবস্যার রাতের প্রয়োজন বেশি, কারণ সেই অন্ধকারই আমাদের আকাশের আসল রূপ চেনায়, কোটি কোটি তারার জগৎ চোখের সামনে মেলে ধরে। প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো এই যেমন আমাদের চিরচেনা ক্ষণস্থায়ী সূর্যাস্ত বা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা -কোনোটিই চিরস্থায়ী বা নিখুঁত নয়, কিন্তু তাদের সৌন্দর্য অসীম। 

আর ঠিক তখনই, আমার নিজের পরিচয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি "অন্ধকারের মানুষ" নই। আমি সেই মানুষ, যে অন্ধকারকে চেনে। যে অন্ধকারের অতল গভীরতাকে ভয় পায় না, বরং তাকে আলিঙ্গন করে নিতে শিখেছে। আমার ভুলগুলো আমার ব্যর্থতার ইতিহাস নয়, বরং আমার পথচলার চিহ্ন। আমার ভেতরের দ্বিধাগুলো আমার দুর্বলতা নয়, সেগুলো আমার চিন্তাশীল মনের প্রমাণ। 

সেদিন আমি বুঝতে পারলাম, আমি ভুলে ভরা এক মানুষ নই, বরং আমি অভিজ্ঞতায় ভরা এক জীবন্ত সত্তা।

⠀⠀


⠀⠀

এখন আর আমি আলো খোঁজার জন্য দৌড়াই না। ভয় এলে তাকে তাড়িয়ে দিই না, বরং তার কথা শুনি। ভুল করলে নিজেকে দোষারোপ করি না, বরং হাসি মুখে ভাবি, "বেশ, এখান থেকে নতুন কী শিখলাম?" আমার সেই অন্ধকার ঘরটা এখন আর ভয়ের জায়গা নয়, ওটা আমার শক্তির উৎস -আমার শেকড়ের মাটি। 

আলোর দিকে দৌড়ানোর প্রয়োজনটাই হয়তো ফুরিয়ে গেছে। কারণ যখন একজন মানুষ নিজের অন্ধকারকে আপন করে নিতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের আলো হয়ে ওঠে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

রাজকীয় ছাগল উৎপাদনে আমাদের অবদান

 


মানুষ ঠিক ততটুকুই সম্মানেই সবচেয়ে মানবিক থাকে, যতটুকু তার প্রাপ্য। এর বেশি দিলেই বিপদ। এটি কোনো দার্শনিক অনুমান নয়, এটি জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া একটি অকাট্য সত্য। 

অতিরিক্ত সম্মান মানুষের মস্তিষ্কে এক বিচিত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। প্রথমে সে এই অযাচিত সম্মান পেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এবং তারপর- এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ; সে ধরেই নেয় যে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল!!

এই উপলব্ধির পর থেকে সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে তার মতামত অমোঘ, তার রুচি অতুলনীয়, এবং পৃথিবীর বাকি সবাই মূলত তার জ্ঞানের অপেক্ষায় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, অতিনগণ্য। এরপর থেকে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না; সে আচরণ করে একজন রাজকীয় ছাগলের মতো। যেদিকে খুশি যায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে, যা খুশি তাতে মুখ লাগায়, যা খুশি তাই খায়, আর কেউ সামান্য বাধা দিলে উলটো শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

⠀⠀

একটাই উপায় তার, তা হলো 'সম্মান প্রত্যাহার'।
কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে করলে কাজ হয় না, কারণ মানুষ নিজের সম্মান হারানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সৃজনশীল(!)। প্রতিটি ধাপে সে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। সে ভাবে এবং বলে- “ওরা আসলে আমাকে বোঝে না”, “ওরা হিংসুটে, আমাকে হিংসা করে”, “ওরা আমার কদর বুঝলো না”, “আমি যে ওদের জন্য কী করেছি তা ওরা বুঝলো না”, কিংবা “এই যুগ/লোকগুলো আমার উপযুক্ত নয়”। এমনকি প্রয়োজনে সে ইতিহাসের দুই-একজন মহামানবের সাথে নিজের তুলনাও টেনে বসে, কারণ তারাও নাকি জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাননি। এই জাতীয় দার্শনিক সান্ত্বনা সে নিজেই নিজেকে অবিরাম দিতে থাকে, এবং ছাগলামি নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখে। 

সম্মান পুরোপুরি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থামে না। শূন্যের কোঠায় এসে সে কিছুটা থমকায়, চারদিকে তাকায়, এবং ধীরে ধীরে আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে যায়, এবং দর্শকরাও ততদিনে তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে। 

তাই কাউকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করলে, তাকে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই সম্মান দিন, তার বিন্দু বেশি নয়। 

কারণ অতিরিক্ত সম্মান আসলে সম্মান নয়, এটি একটি ধীরগতির বিষ, একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই অভিশাপ মানুষকে নিজের অজান্তেই, ধীরে ধীরে, অত্যন্ত নিপুণভাবে অন্য একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত করে।

এবং সেই প্রাণীটির নাম ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

⠀⠀

~ বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ ছেঁকে সংগৃহীত

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

জীবনের জটিল সমীকরণঃ সফলতার ভ্রম ও বাস্তবতা

⠀⠀

আমরা সাধারণত চোখের সামনে যা দেখি, তাকেই সত্য ধরে নিই। আজ কার লাভ হলো, কে উন্নতি করল, কে ক্ষমতার চেয়ারে বসল -এসব দিয়েই আমরা সফলতা আর ব্যর্থতার বিচার করি। অথচ জীবন এত সরল নয়। জীবনের হিসাব অনেক গভীর, অনেক বিস্তৃত। এখানে সময়ের সাথে সাথে জীবনের সমীকরণ বদলায়, আরও বদলে যায় সফলতার সংজ্ঞা।

একদিন তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে বাদামের ঝুড়ি হাতে রফিক মিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্র্যাফিক ছেড়ে দেওয়ায় কয়েকটি গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হলো তার সারা দিনের পুঁজি -বাদামের ঝুড়ি। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল তার রুজি-রুটি। অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। 

অন্যদিকে একই রুটে বাদাম বিক্রি করা শফিক মিয়ার সেদিন দারুণ লাভ হলো। রফিক না থাকায় দ্বিগুণ বিক্রি করল সে। হাতে এলো ভালো অঙ্কের টাকা। আপাতদৃষ্টিতে ঐদিনের জন্য শফিক হলো সফল, আর রফিক হলো ব্যর্থ, নিঃস্ব একজন। কিন্তু সন্ধ্যায় সারা দিনের আয় নিয়ে শফিক বসে গেল জুয়ার আসরে। রাত শেষ হতেই উপার্জিত সব টাকা হারিয়ে সেও শূন্যে নেমে এলো। সকালে দেখা গেল- রফিক আর শফিক দুজনকেই আবার শূন্য শুরু করতে হবে। তবে পার্থক্য এক জায়গায়। 

রফিক মিয়া ছিল সৎ, ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। সবাই তাকে বিশ্বাস করত। তাই সে যখন নতুন করে ব্যাবসা শুরু করতে চাইল, তখন মানুষ বিনা দ্বিধায় তাকে বাকীতে মাল দিল। মানুষের বিশ্বাসই হয়ে উঠল তার নতুন মূলধন। অন্যদিকে শফিকের জুয়ার নেশা আর অবিশ্বস্ততা কথা সবাই জানত। তাই কেউ তাকে বাকীতে মাল দিতে চাইল না। বিশ্বাসহীন মানুষের জন্য পৃথিবীর কোনো দরজাই কখনো খোলা থাকে না। 

এবার চলুন আরেকটি গল্প শুনি। গল্পটা সুমন নামের এক অফিসের সহকারী ম্যানেজারের। সারাদিন বসকে তোষামোদ করে সময় কাটাত, আবার আড়ালে তারই বদনাম করে বেড়াত। তবে তার একটা সুপ্ত ও গোপন ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছেটি ছিল- কবে বসের চাকরি যাবে আর সে সেই চেয়ারে বসবে। অনেক দিন পর তার সেই চাওয়া পূরণ হলো। তার বস চাকরি ছেড়ে চলে গেল, আর সুমন পদোন্নতি পেয়ে হলো ম্যানেজার। 

মানুষের চোখে সে সফল। কিন্তু সফলতা আর ইচ্ছে পূরণ তো আর তার চরিত্র বদলাতে পারে না। আগের মতোই চললল তার অফিস পলিটিক্স, ষড়যন্ত্র, স্বজনপ্রীতি আর তোষামোদের রাজনীতি। ফলে বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও যোগ্য কর্মচারীরা একে একে চাকরি ছাড়তে লাগল। শূন্য পদে নিয়োগ পেল অদক্ষ, তেলবাজ ও অনভিজ্ঞ লোকজন। আর এসব কারণে কোম্পানির ক্ষতি বাড়তে থাকল। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সুমন ও তার গড়া পুরো দলকেই ছাঁটাই করলো। 

আরও একটি গল্প শোনা যাক। পরীক্ষায় একজন নকল করে ভালো রেজাল্ট করল, আর অন্যজন সততার সাথে পরিশ্রম করে মাঝারি ফল পেল। সবাই প্রথমজনকে মেধাবী বলল। কিন্তু সময়ের সাথে দেখা গেল- নকলের সাফল্য টেকেনি, আর পরিশ্রমী মানুষটি ধীরে ধীরে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। 

এই গল্পগুলো আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। গল্প গুলো আমাদের শেখায়- সফলতা একদিনের অর্জন নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। সাময়িক লাভ, ক্ষমতা কিংবা বাহবা প্রকৃত সাফল্যের পরিচয় নয়। প্রকৃত সাফল্য গড়ে ওঠে সততা, পরিশ্রম, নৈতিকতা, ধৈর্য ও মানবিকতার ওপর ভর করে।

⠀⠀

⠀⠀

জীবনে দ্রুত সফল হওয়ার চেয়ে সঠিক পথে এগোনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জীবন এক নিরন্তর প্রবহমান ধারা। এই ধারার সামনে টিকে থাকার জন্যে সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও নৈতিকতা -এই চারটি স্তম্ভ শক্ত করে গড়তে হবে। আর এই স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। তাই কাউকে সফল বা ব্যর্থ বলার আগে একটু থামা উচিত। কারণ আমরা দেখি ঢেউয়ের তোড়, কিন্তু জানি না স্রোতের গতি। আর এই অদেখা স্রোতের কাছেই তো শেষ কথা বলার অধিকার থাকে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀



শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৬

ডায়েরির পাতা: মনের জ্যোৎস্না ও জ্বর



মৌসুমী ভৌমিকের গানটা আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল- "কেন শুধু শুধু ছুটে চলা, একে একে কথা বলা, নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে.."। গানটা কেমন যেন আজকের দিনগুলোর মুখপাত্র হয়ে উঠেছে। শব্দগুলো শুধু সুর নয়, এখন আমার নিঃশ্বাসের অনুষঙ্গ।

দিনগুলি এখন হিসাবের বাইরে, বিচ্ছিন্ন পাথরের মতো যার যার মত ছড়িয়ে পড়ে আছে। গতকালের সকাল আর আজকের বিকালের মধ্যে কোনো সীমানা খুঁজে পাই না। দুই দিনকে আলাদা করার জন্য নতুন কোনো শব্দ নেই অভিধানে। প্রতিদিন একই জানালা, একই আলোছায়া, একই ঘড়ির কাঁটার দৌড়। বিরক্তির ভাঁজ কপালে জমে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়- এইটুকুই বা কম কী? সময় তো আরো ভাঙচুর করতে পারত, তবু কিছুটা শৃঙ্খলা এখনো টিকে আছে।

গত কয়েকদিন ধরে শরীর বিদ্রোহ করে চলেছে। একদিন তো জ্বর এসে সময়ের হিসাবই লোপাট করে দিল। চোখ মেললাম- সকাল, আবার মেললাম- দুপুর, আরেকবার- দেখলাম সন্ধ্যা ইতোমধ্যে বিদায় জানাচ্ছে। জ্বর যদিও সেরে গেছে, কিন্তু ছেড়ে গেছে গলা-ব্যথা আর তার নিষ্ঠুর সঙ্গী মাথা-ব্যথাকে। সঙ্গে সঙ্গ দেয়ার জন্যে রয়ে গেছে মৃদু কাশি- অতি পরিচিত শত্রু। কাশির স্মৃতি আমার জন্য সাবান পানিতে ভেজা চামড়ার মতো, পুরোনো এক অসুখের ছায়া মনে ভর করে। কখনো কখনো শরীর মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতি শুধু মনের নয়, দেহের কোষেও লেখা থাকে। 

আগে যা ভালো লাগত, এখন তা ধূসর মনে হয়। বইপত্র, গান, মুভি -সব যেন পানিতে ভেজা ধূসর কাগজের মতো নিষ্প্রাণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- শিশুদের দেখলে আগে যে হৃদয় গলে যেত, এখন সেখানে কোনো না কোনো জায়গায় একটি বিরক্তি দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ওদের কোলাহল থেকে দূরে থাকি, নিঃশব্দে থাকি। এই পরিবর্তনটাই বেশি ভয়ংকর -আগে যা জীবনকে স্পর্শ করত, আজ তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। 

ছুটি!
শব্দটা এখন প্রার্থনার সমার্থক। কিন্তু, এ ছুটি কেবল দৈনন্দিন রুটিন থেকে নয়, এ ছুটি এই অভ্যন্তরীণ নীরবতা থেকে, এই আবেগহীন প্রবাহ থেকে। কখনো কখনো জীবন থেকেই ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে জাগে, একটা দীর্ঘ, শান্ত নিদ্রার মতো। কিন্তু জীবনের প্রতি এক গভীর অনুক্ত মায়া, এখনো রয়ে গেছে। যেমন- একটা পুরোনো বাড়ি, যার দরজা-জানালা ভাঙছে, কিন্তু যার প্রতিটি ধূলিকণায় স্মৃতি লেগে আছে। তাই মায়াটাও এখনো রয়ে গেছে। 

জীবন কালের এই বয়সে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে, জীবন একইসাথে 'বোঝা' ও 'বরাদ্দ'। অনেকটা পাহাড়ের মাঝপথে উঠে পেছনে ফিরে তাকানোর মতো। নিচের পথটুকু পেরিয়েছি, কিন্তু শীর্ষ ছোঁয়া এখনও বহুদূর। আর শরীরে জমা হয়েছে ক্লান্তি। তবুও এগোতে হচ্ছে, কারণ নিচে নামার পথটা অসম্ভব দুর্গম। 

আজকের এই এলোমেলো ভাবনা গুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম; হয়তো এই শূন্যতা পূর্ণতারই আরেক রূপ। সময় হয়তো হৃদয়কে শূন্য করে তুলছে পরবর্তী কোনো গভীর অনুভবের জন্য জায়গা তৈরি করতে। জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর যেমন একটু বেশি সংবেদনশীল হয়, তেমনই হয়তো এই আত্মিক স্তব্ধতার পর কিছু দেখা বা বোঝার সূক্ষ্ম ক্ষমতা ফিরে আসবে। 

আজ শুধু এই কথাগুলোই লিখে রাখি, যেন এই মুহূর্তের ভার্চুয়াল সাক্ষী থাকে এই শব্দগুলো। হয়তো কোনো এক ভবিষ্যৎ দিনে ফিরে দেখব, এই শব্দগুলো পড়ব, আর তখন বোঝার চেষ্টা করব- যে ব্যক্তি এগুলো লিখেছিল, সে আসলে হারিয়ে যাচ্ছিল নাকি নতুন কোনো উপকূলের খোঁজ পেয়েছিল। 

জানালার বাইরে এখন রাত। দূরে কোনো বাড়ির জানালায় একটি বাতি জ্বলে আছে, এক টুকরো মানবিক উষ্ণতা। হয়তো জীবন আসলে এটাই- একটা অন্ধকারে জ্বলা বাতি খোঁজা, যে বাতি হয়তো অন্যের বারান্দায়, কিন্তু তার আলো আমাদের জানালাতেও পড়ে। আজকের মতো এটুকুই যথেষ্ট। আজ শুধু থাকব, আর শ্বাস নেব। এই অস্থির হৃদয় নিয়েই, এই অসুস্থ শরীর নিয়েই, এই স্তব্ধ সময় ধরেই। 

হয়তো, নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থই হলো- এই ভাঙাচোরা মুহূর্তগুলোকেও আস্তে আস্তে, একটু একটু করে, স্পর্শ করে যাওয়া...

বুধবার, জানুয়ারি ২৮, ২০২৬

মানুষ, প্রয়োজন আর অনুভূতির অদ্ভুত হিসাবঃ Rental Family


কিছু সিনেমা আমরা গল্পের টানে দেখি, কিছু দেখি অভিনেতার জন্য। Rental Family (2025) আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দলে পড়লেও, সিনেমা শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর সময় বুঝলাম- এটা শুধু একজন অভিনেতার কামব্যাক নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন, শূন্যতা আর অনুভূতির এক গভীর পাঠ।


ব্রেন্ডন ফ্রেজার - এই নামটা আমার কাছে মানেই সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যুব পথে এগিয়ে যাওয়া বয়সের রোমাঞ্চ। The Mummy, Journey to the Center of the Earth - এই সিনেমাগুলোয় তার উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী, আলোয় ভরা। বহুদিন পর তার চেহারাটি পোস্টারে চোখে পড়তেই যেন পুরোনো স্মৃতি গুলো ঝলমল করে উঠলো, আর সেই টানেই বসে পড়েছিলাম "ভাড়া পরিবার" বা 'Rental Family' দেখতে। কিন্তু এবারের ব্রেন্ডন ফ্রেজার ছিলেন একেবারেই ভিন্ন একজন - নীরব, ভাঙা, ক্লান্ত এক মানুষ।

এই সিনেমার Philip চরিত্রটিকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, সে যেন ব্রেন্ডন ফ্রেজারের বাস্তব জীবনেরই এক ছায়া। একসময় যিনি অভিনয় জগতে জনপ্রিয়তার শিখরে ছিলেন, আজ তার নামই যেন ভুলে যেতে বসেছে মানুষ। জীবনের দায়ে, টিকে থাকার তাগিদে সে অভিনয় করছে। কিন্তু সেটি কোনো মঞ্চে নয়, বরং মানুষের জীবনের ফাঁকা জায়গাগুলোতে। বাবা নেই এমন শিশুর ভাড়া করা বাবা, পরিবারের সামনে একজন নারীর পরিপূর্ণতা লাভে ভাড়াটে স্বামী - এ যেন অভিনয়েরও আরেক রূপ, যেখানে ক্যামেরা নেই, কিন্তু অনুভূতি আছে।

সিনেমাটি দেখতে দেখতে সবচেয়ে যে ভাবনাটি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে, তা হলো- মানুষ কত বিচিত্র উপায়ে মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে। সমাজের প্রতিটি শূন্যস্থান কেউ না কেউ এসে ভরাট করে দেয়। কেউ পেশার খাতিরে, কেউ বাঁচার তাগিদে, কেউ বা নিঃসঙ্গতা থেকে। Rental Family যেন সেই অদ্ভুত অথচ বাস্তব পৃথিবীর দরজাটা ধীরে খুলে দেয়, যেখানে ভালোবাসা ভাড়া নেওয়া যায়, পরিবার সাময়িক হয়, কিন্তু অনুভূতিগুলো অস্থায়ী হলেও মিথ্যে নয়।


Philip চরিত্রের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তটি আসে তখনই, যখন সে নিজের বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া একটি ডিটেকটিভ সিনেমার অফার ফিরিয়ে দেয়। এই শহর, এই দেশ ছেড়ে যেতে হবে- এই শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে সে মনে করে ছোট্ট মেয়েটির কথা, যার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে সে নিজেই আবেগে জড়িয়ে পড়েছে। 


বাস্তবে কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো রক্তের টান নেই - তবু সে মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল, সে আর তাকে ছেড়ে যাবে না। এই দৃশ্যটি নিঃশব্দে বলে দেয়- অনুভূতির প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো জীবনের লক্ষ্যকেও হার মানায়।


সিনেমার আরেকটি গভীরভাবে নাড়া দেওয়া চরিত্র Kikuo Hasegawa। একসময়ের বিখ্যাত অভিনেতা, আজ স্মৃতিভ্রমে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ। তার একটাই ইচ্ছা- শৈশবের বাড়ি, যৌবনের স্মৃতি, পরিবার নিয়ে কাটানো গ্রামের সেই নিবাসকে, সেই দিনগুলো আরেকবার দেখে আসা। কিন্তু বয়স আর রোগের দেয়ালে আটকে যায় সেই আকুতি। নিজের মেয়ের নিষেধ অগ্রাহ্য করে Philip-কে সঙ্গী করে সে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে। এই যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বটুকু ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।


আর Shinji Tada, এই চরিত্রটি যেন সবচেয়ে নগ্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানসিক শান্তির জন্য সে ভাড়া করে নেয় স্ত্রী ও সন্তান। নিজের ভেতরের শূন্যতা ঢাকতে সে মিথ্যের আশ্রয় নেয়, কারণ তার কল্পনার পরিবার বাস্তবে নেই। তবু এই মিথ্যে সম্পর্কের মাঝেও তার বেঁচে থাকার লড়াইটা করুণভাবে সত্য।

Rental Family কোনো উচ্চকণ্ঠ সিনেমা নয়। এখানে নেই নাটকীয় সংলাপ, নেই বড়ো কোনো মোড়। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্য নিঃশব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমরা কি সত্যিই একা? নাকি প্রয়োজন আর অভিনয়ের মাঝামাঝি কোথাও আমাদের অনুভূতিগুলো সত্যি হয়ে ওঠে?


সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে, এই গল্পটা শুধু পর্দার নয়- এটা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। ভাড়ার সম্পর্ক, অভিনীত অনুভূতি, আর তার ভেতর জন্ম নেওয়া অপ্রত্যাশিত মানবিক বন্ধন- সব মিলিয়ে Rental Family এমন একটি সিনেমা, যা দেখে বেরিয়ে এসে মানুষ আর জীবনের দিকে নতুন করে তাকাতে ইচ্ছে করে।

যদি আপনি নীরব, মানবিক আর ভাবনার খোরাক দেওয়া সিনেমা পছন্দ করেন, তাহলে এই সিনেমাটি আপনার দেখার তালিকায় থাকতেই পারে।