হিজিবিজি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হিজিবিজি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬

অন্ধকারের দর্শন

 


বহুকাল আমি নিজেকে একজন ভুল মানুষ ভেবে এসেছি। আমার পৃথিবীটা ছিল কুয়াশায় ঢাকা, যেখানে স্পষ্ট বলতে কিছুই ছিল না। আমার ভেতরে নিজেকে প্রকাশ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু যতবারই আমি মুখ খুলতে চেয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে যেন কেউ একজন আমার কথাগুলো বন্দি করতে ছুটে আসছে। ভয় ছিল আমার ছায়াসঙ্গী। তাই আলো থেকে পালিয়ে বারবার আমি ফিরে এসেছি আমার পরিচিত অন্ধকারে, আর সেই অন্ধকারই হয়ে উঠেছিল আমার একমাত্র পরিচয়। আমি মেনেই নিয়েছিলাম- আমি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত ভুলে ভরা এক মানুষ, যার জন্মই হয়েছে ভুল করার জন্য।

কিন্তু একদিন সবকিছু বদলে গেল, যেদিন আমার ভাবনার সাগর নিজের গতিপথ বদলে গিয়ে পড়ল ছোট্ট একটি বীজের উপর।

মাটির গভীরে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটি বীজ পড়ে থাকে। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, "কেন তুমি এই অন্ধকারে? বাইরে এসো, আলোর পৃথিবী তোমাকে ডাকছে," সে হয়তো কোনো উত্তরই দেবে না। কারণ সে জানে, ঐ অন্ধকার তার শত্রু নয়, বরং তার আশ্রয়। ঐ মাটি, ঐ চাপ, আর ঐ একাকিত্ব.. এগুলো ছাড়া তার শেকড় গজাবেই না। আলোতে মাথা তোলার আগে, ঐ অন্ধকারকে তার আপন করে নিতে হয়, মাটির প্রতিটি কণার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়।

সেই বিকেলে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি তো সেই বীজটার মতোই। আমার ভয়, আমার অস্পষ্টতা, আমার ভুলগুলো… ওগুলো আসলে আমার শত্রু ছিল না, ওগুলোই ছিল আমার মাটি। যতবার আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, ততবার আমি আসলে নিজের শেকড়কে আরও গভীরে চালনা করেছি। 

এই ভাবনাটা আমাকে পৃথিবীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখালো। আমি দেখলাম, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো শিল্পীও তাঁর সেরা কাজগুলো অসম্পূর্ণ রেখে গেছেন, কিন্তু তাতে তাঁর মহত্ত্ব কমেনি। আমি বুঝলাম, পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অমাবস্যার রাতের প্রয়োজন বেশি, কারণ সেই অন্ধকারই আমাদের আকাশের আসল রূপ চেনায়, কোটি কোটি তারার জগৎ চোখের সামনে মেলে ধরে। প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো এই যেমন আমাদের চিরচেনা ক্ষণস্থায়ী সূর্যাস্ত বা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা -কোনোটিই চিরস্থায়ী বা নিখুঁত নয়, কিন্তু তাদের সৌন্দর্য অসীম। 

আর ঠিক তখনই, আমার নিজের পরিচয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি "অন্ধকারের মানুষ" নই। আমি সেই মানুষ, যে অন্ধকারকে চেনে। যে অন্ধকারের অতল গভীরতাকে ভয় পায় না, বরং তাকে আলিঙ্গন করে নিতে শিখেছে। আমার ভুলগুলো আমার ব্যর্থতার ইতিহাস নয়, বরং আমার পথচলার চিহ্ন। আমার ভেতরের দ্বিধাগুলো আমার দুর্বলতা নয়, সেগুলো আমার চিন্তাশীল মনের প্রমাণ। 

সেদিন আমি বুঝতে পারলাম, আমি ভুলে ভরা এক মানুষ নই, বরং আমি অভিজ্ঞতায় ভরা এক জীবন্ত সত্তা।

⠀⠀


⠀⠀

এখন আর আমি আলো খোঁজার জন্য দৌড়াই না। ভয় এলে তাকে তাড়িয়ে দিই না, বরং তার কথা শুনি। ভুল করলে নিজেকে দোষারোপ করি না, বরং হাসি মুখে ভাবি, "বেশ, এখান থেকে নতুন কী শিখলাম?" আমার সেই অন্ধকার ঘরটা এখন আর ভয়ের জায়গা নয়, ওটা আমার শক্তির উৎস -আমার শেকড়ের মাটি। 

আলোর দিকে দৌড়ানোর প্রয়োজনটাই হয়তো ফুরিয়ে গেছে। কারণ যখন একজন মানুষ নিজের অন্ধকারকে আপন করে নিতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের আলো হয়ে ওঠে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

রাজকীয় ছাগল উৎপাদনে আমাদের অবদান

 


মানুষ ঠিক ততটুকুই সম্মানেই সবচেয়ে মানবিক থাকে, যতটুকু তার প্রাপ্য। এর বেশি দিলেই বিপদ। এটি কোনো দার্শনিক অনুমান নয়, এটি জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া একটি অকাট্য সত্য। 

অতিরিক্ত সম্মান মানুষের মস্তিষ্কে এক বিচিত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। প্রথমে সে এই অযাচিত সম্মান পেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এবং তারপর- এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ; সে ধরেই নেয় যে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল!!

এই উপলব্ধির পর থেকে সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে তার মতামত অমোঘ, তার রুচি অতুলনীয়, এবং পৃথিবীর বাকি সবাই মূলত তার জ্ঞানের অপেক্ষায় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, অতিনগণ্য। এরপর থেকে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না; সে আচরণ করে একজন রাজকীয় ছাগলের মতো। যেদিকে খুশি যায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে, যা খুশি তাতে মুখ লাগায়, যা খুশি তাই খায়, আর কেউ সামান্য বাধা দিলে উলটো শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

⠀⠀

একটাই উপায় তার, তা হলো 'সম্মান প্রত্যাহার'।
কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে করলে কাজ হয় না, কারণ মানুষ নিজের সম্মান হারানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সৃজনশীল(!)। প্রতিটি ধাপে সে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। সে ভাবে এবং বলে- “ওরা আসলে আমাকে বোঝে না”, “ওরা হিংসুটে, আমাকে হিংসা করে”, “ওরা আমার কদর বুঝলো না”, “আমি যে ওদের জন্য কী করেছি তা ওরা বুঝলো না”, কিংবা “এই যুগ/লোকগুলো আমার উপযুক্ত নয়”। এমনকি প্রয়োজনে সে ইতিহাসের দুই-একজন মহামানবের সাথে নিজের তুলনাও টেনে বসে, কারণ তারাও নাকি জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাননি। এই জাতীয় দার্শনিক সান্ত্বনা সে নিজেই নিজেকে অবিরাম দিতে থাকে, এবং ছাগলামি নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখে। 

সম্মান পুরোপুরি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থামে না। শূন্যের কোঠায় এসে সে কিছুটা থমকায়, চারদিকে তাকায়, এবং ধীরে ধীরে আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে যায়, এবং দর্শকরাও ততদিনে তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে। 

তাই কাউকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করলে, তাকে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই সম্মান দিন, তার বিন্দু বেশি নয়। 

কারণ অতিরিক্ত সম্মান আসলে সম্মান নয়, এটি একটি ধীরগতির বিষ, একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই অভিশাপ মানুষকে নিজের অজান্তেই, ধীরে ধীরে, অত্যন্ত নিপুণভাবে অন্য একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত করে।

এবং সেই প্রাণীটির নাম ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

⠀⠀

~ বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ ছেঁকে সংগৃহীত

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

জীবনের জটিল সমীকরণঃ সফলতার ভ্রম ও বাস্তবতা

⠀⠀

আমরা সাধারণত চোখের সামনে যা দেখি, তাকেই সত্য ধরে নিই। আজ কার লাভ হলো, কে উন্নতি করল, কে ক্ষমতার চেয়ারে বসল -এসব দিয়েই আমরা সফলতা আর ব্যর্থতার বিচার করি। অথচ জীবন এত সরল নয়। জীবনের হিসাব অনেক গভীর, অনেক বিস্তৃত। এখানে সময়ের সাথে সাথে জীবনের সমীকরণ বদলায়, আরও বদলে যায় সফলতার সংজ্ঞা।

একদিন তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে বাদামের ঝুড়ি হাতে রফিক মিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্র্যাফিক ছেড়ে দেওয়ায় কয়েকটি গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হলো তার সারা দিনের পুঁজি -বাদামের ঝুড়ি। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল তার রুজি-রুটি। অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। 

অন্যদিকে একই রুটে বাদাম বিক্রি করা শফিক মিয়ার সেদিন দারুণ লাভ হলো। রফিক না থাকায় দ্বিগুণ বিক্রি করল সে। হাতে এলো ভালো অঙ্কের টাকা। আপাতদৃষ্টিতে ঐদিনের জন্য শফিক হলো সফল, আর রফিক হলো ব্যর্থ, নিঃস্ব একজন। কিন্তু সন্ধ্যায় সারা দিনের আয় নিয়ে শফিক বসে গেল জুয়ার আসরে। রাত শেষ হতেই উপার্জিত সব টাকা হারিয়ে সেও শূন্যে নেমে এলো। সকালে দেখা গেল- রফিক আর শফিক দুজনকেই আবার শূন্য শুরু করতে হবে। তবে পার্থক্য এক জায়গায়। 

রফিক মিয়া ছিল সৎ, ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। সবাই তাকে বিশ্বাস করত। তাই সে যখন নতুন করে ব্যাবসা শুরু করতে চাইল, তখন মানুষ বিনা দ্বিধায় তাকে বাকীতে মাল দিল। মানুষের বিশ্বাসই হয়ে উঠল তার নতুন মূলধন। অন্যদিকে শফিকের জুয়ার নেশা আর অবিশ্বস্ততা কথা সবাই জানত। তাই কেউ তাকে বাকীতে মাল দিতে চাইল না। বিশ্বাসহীন মানুষের জন্য পৃথিবীর কোনো দরজাই কখনো খোলা থাকে না। 

এবার চলুন আরেকটি গল্প শুনি। গল্পটা সুমন নামের এক অফিসের সহকারী ম্যানেজারের। সারাদিন বসকে তোষামোদ করে সময় কাটাত, আবার আড়ালে তারই বদনাম করে বেড়াত। তবে তার একটা সুপ্ত ও গোপন ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছেটি ছিল- কবে বসের চাকরি যাবে আর সে সেই চেয়ারে বসবে। অনেক দিন পর তার সেই চাওয়া পূরণ হলো। তার বস চাকরি ছেড়ে চলে গেল, আর সুমন পদোন্নতি পেয়ে হলো ম্যানেজার। 

মানুষের চোখে সে সফল। কিন্তু সফলতা আর ইচ্ছে পূরণ তো আর তার চরিত্র বদলাতে পারে না। আগের মতোই চললল তার অফিস পলিটিক্স, ষড়যন্ত্র, স্বজনপ্রীতি আর তোষামোদের রাজনীতি। ফলে বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও যোগ্য কর্মচারীরা একে একে চাকরি ছাড়তে লাগল। শূন্য পদে নিয়োগ পেল অদক্ষ, তেলবাজ ও অনভিজ্ঞ লোকজন। আর এসব কারণে কোম্পানির ক্ষতি বাড়তে থাকল। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সুমন ও তার গড়া পুরো দলকেই ছাঁটাই করলো। 

আরও একটি গল্প শোনা যাক। পরীক্ষায় একজন নকল করে ভালো রেজাল্ট করল, আর অন্যজন সততার সাথে পরিশ্রম করে মাঝারি ফল পেল। সবাই প্রথমজনকে মেধাবী বলল। কিন্তু সময়ের সাথে দেখা গেল- নকলের সাফল্য টেকেনি, আর পরিশ্রমী মানুষটি ধীরে ধীরে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। 

এই গল্পগুলো আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। গল্প গুলো আমাদের শেখায়- সফলতা একদিনের অর্জন নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। সাময়িক লাভ, ক্ষমতা কিংবা বাহবা প্রকৃত সাফল্যের পরিচয় নয়। প্রকৃত সাফল্য গড়ে ওঠে সততা, পরিশ্রম, নৈতিকতা, ধৈর্য ও মানবিকতার ওপর ভর করে।

⠀⠀

⠀⠀

জীবনে দ্রুত সফল হওয়ার চেয়ে সঠিক পথে এগোনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জীবন এক নিরন্তর প্রবহমান ধারা। এই ধারার সামনে টিকে থাকার জন্যে সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও নৈতিকতা -এই চারটি স্তম্ভ শক্ত করে গড়তে হবে। আর এই স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। তাই কাউকে সফল বা ব্যর্থ বলার আগে একটু থামা উচিত। কারণ আমরা দেখি ঢেউয়ের তোড়, কিন্তু জানি না স্রোতের গতি। আর এই অদেখা স্রোতের কাছেই তো শেষ কথা বলার অধিকার থাকে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀