গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার, অক্টোবর ০২, ২০২৬

ট্রেন মিস করার গল্প...

 


রাত এগারোটা পনেরো। রাশেদ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, আর তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছে এইমাত্র সে জানতে পেরেছে যে, পৃথিবীর সব ট্রেন আসলে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দ করে।

পাঁচ মিনিট আগে তার ট্রেনটা চলে গেছে। রাশেদ দৌড়ে এসেছিল ঠিকই, তবে তাঁর দৌড়ের গতি ছিল সরকারি ফাইলের মতো। ট্রেন তাঁর জন্য দাঁড়ায়নি, শুধু শেষ বগির লাল বাতিটা একবার চোখ টিপে বিদায় জানিয়েছে।

মোবাইলের স্ক্রিনে মিতুর পাঁচটা মিসড কল লেখা ভাসছে। ষষ্ঠবারের মতো ফোন বাজতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল "মিতু ❤️"। রাশেদ অনেকক্ষণ সেই হার্ট চিহ্নটার দিকে তাকিয়ে রইলো। নামটা সেভ করার সময় ইমোজিটা সে নিজেই দিয়েছিলো। এখন মনে হচ্ছে ওটা হার্ট না, ওটা বিস্ফোরকের চিহ্ন!

ফোনটা সে পকেটে চালান করে দিলো। বিপদের সময় ফোন ধরার চেয়ে ফোন না ধরাই নিরাপদ। এটা সে বিয়ের তৃতীয় বছরে শিখেছে, তার জন্য অবশ্য দামটা দিতে হয়েছে এক জোড়া কানের দুল দিয়ে।

চারপাশ ফাঁকা। চায়ের দোকানি ঝাঁপ নামানোর তোড়জোড় করছে। বাতাসে চা, ধোঁয়া আর লোহার গন্ধ। আর রাশেদের মাথায় একের পর এক দুশ্চিন্তা। প্রথমেই মনে পড়লো ছিনতাইয়ের কথা, আর সেটা মনে হতেই আপনা-আপনি হাত চলে গেলো মানিব্যাগের দিকে, তারপর মনে হলো মোবাইলটাও সাথেই আছে, এর সাথে জীবনবীমার পলিসির মেয়াদ কবে শেষ সেটাও মনে পড়ে গেলো। ভয় পাওয়া মন মনে হয় এমনই করে।

ঠিক তখনই সে দেখলো লোকটাকে। প্ল্যাটফর্মের ওপাশে এক বুড়ো মতো মানুষ। গায়ে ময়লা চাদর, মাথায় উশখো-খুশকো কাঁচাপাঁকা চুল, পাশে কাপড়ের থলে। লোকটা একদৃষ্টে রাশেদের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ পিটপিট করছে না। সাপ আর ভূতের পরে এভাবে তাকাতে পারে শুধু পাওনাদার।

বুড়ো ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। রাশেদের হাতের ব্যাগ আপনা-আপনি বুকের সঙ্গে সেঁটে গেল। বুড়ো এক পা, দুই পা, তিন পা করে এগিয়ে এল। রাশেদ মনে কলমা পড়া শুরু করলেন, তবে তাড়াহুড়োয় মাঝখানে ঢুকে গেল কুলহু আল্লাহ সূরা।

— বাবা...

— জি?

— কয়টা টেকা দিবেন?

রাশেদের ভয় নামল, কিন্তু নামার সময় মনে হলো ধপ করে এসে বসল অন্য একটা ভয়ের কাঁধে। ছিনতাইকারী হলে অন্তত বোঝা যেত পরিস্থিতিটা কী। কিন্তু ভদ্রভাবে টাকা চাইলে কী করতে হয়, সেটা তো কোনো স্কুলে শেখায়নি। ব্যাটার অন্য কোন মতলব নেই তো!

— ভয় পাইয়েন না বাবা, আমি চোর না।

— আপনি বুঝলেন কী করে আমি ভয় পাচ্ছি?

— আপনে আমারে দেইখ্যা যেইভাবে ব্যাগটারে ধরছেন, মনে হইতাছে ব্যাগের ভিত্তে বৌমার সব সোনাদানা নিয়া আসছেন।

রাশেদ ব্যাগটা একটু ঢিলে করল। ভেতরে আছে একটা টিফিন বক্স আর আধখাওয়া পানির বোতল।

— দশটা টেকা দেন বাবা।

রাশেদ মানিব্যাগ খুলে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিলেন। বুড়ো সেটা না নিয়ে মাথা নাড়লেন।

— না বাবা, বিশ টেকা দেন।

— কিন্তু আপনি না মাত্র বললেন দশ টাকার কথা!

— কইছিলাম। কিন্তু আপনে আমারে দেইখা যেই ভয় পাইছেন তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে আরও দশ টেকা আপনার কাছে আমি প্রাপ্য।

রাশেদ হাঁ করে তাকিয়ে রইলেন। লোকটা রাশেদের এই অবস্থা দেখে হেসে ফেলল। তার হাসিতে আক্রান্ত হয়ে রাসেদের মুখেও হাসি ফুটে উঠলো।

— আপনি ভিক্ষা করেন, নাকি ব্যবসা?

— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই করি।

লোকটার নাম করিম মিয়া। এই স্টেশনই তাঁর ঠিকানা। রাশেদ তাকে বিশ টাকা দিলো। করিম মিয়া নোটটা ভাঁজ করে চাদরের ভেতর চালান করে দিলো। সেই হাতের ক্ষিপ্রতা দেখলে যে কোনো ম্যাজিশিয়ান লজ্জা পেত।

— একটা কথা বাবা, আপনার কি টেরেন মিস হইসে?

— আপনি বুঝলেন কী করে? জ্যোতিষী নাকি?

— না, আপনে পাঁচ মিনিটে এগারোবার ঘড়ি দেখছেন, আমি ঐখান থাইক্যা গুনছি। আর আপনের কপালে লেখা দেখতেছি, "আইজ আমার বউ আমারে মাইরা ফেলবে"।

— এতটাই স্পষ্ট?

— সাইনবোর্ডের মতো ফকফকা।

করিম মিয়া পাশে এসে বসে পড়লো, যেন রাশেদ তাঁর বহুদিনের মক্কেল।

— আপনার ইস্তিরি ফোন করছে?

— পাঁচবার।

— ধরছেন?

— প্রথম দুইবার ধরেছিলাম।

— হেরপর?

— তারপর আর সাহস হয়নি।

— সত্য কথা কইলেই তো হয়।

— এখন সত্যি বললে বিপদ বাড়বে।

— আর মিথ্যা কইলে?

— সেটা পরে সামলানো যাবে।

করিম মিয়া গম্ভীর মুখে মাথা দুলিয়ে বললেন, "সংসার বড় কঠিন জায়গা বাবা। এইখানে সত্যও বিপদ, আবার মিথ্যাও বিপদ। সবচাইতে নিরাপদ হইলো টেরেন মিস না করা।"

— সেটা এখন বলে লাভ কী!

— সেইটাও হক কথা।

তখনই লাউডস্পিকারে ভাঙা গলায় ঘোষণা হলো, "পরবর্তী ট্রেন......" তারপর খড়খড় শব্দ করে সব চুপ।

— এই মাইকটা আমার চেয়েও বুড়া, বললেন করিম মিয়া।

— ট্রেন আসতে এখনও বিশ মিনিটের মতো বাকি।

— তাইলে চলেন চা খাই।

— এত রাতে চা? ঘুম আসবে না তো।

— বাড়ি গিয়া আপনে ঘুমানের সুযোগ পাইবেন বইলা মনে হয়?

রাশেদ এবার শব্দ করে হেসে ফেললেন। অনেকদিন পর এভাবে হাসলেন।

চায়ের দোকানি তখন ঝাঁপ প্রায় নামিয়ে ফেলেছে। করিম মিয়া হাঁক দিলেন, "ঐ ছ্যাড়া দুই কাপ দে, একটা আমারে, একটা ভদ্দরলোকেরে"।

— আমি চা খাব না।

— খান বাবা। আপনের চেহারা দেইখা মনে হইতাছে যে নিজের ভুলের লাইগা আপনে এহনই একটা কমিটি বানাইবেন, হেরপর হেরা আপনের এই ভুল শুধরাইয়া দিবো; এত চিন্তা বাদ দিয়া একটা চা খান আমার লগে।

কিছুক্ষন বাদেই চা চলে আসলো। দারুণ গরম চা, আদার গন্ধ। রাশেদ এক চুমুক দিয়ে অবাক হলো। এত রাতে, এমন জায়গায়, এত ভালো চা!

চা খেতে খেতে করিম মিয়া নিজের গল্প বললেন। একসময় রেলের কুলি ছিলেন। সংসার ছিল, ছেলেমেয়ে হলো, তারপর সবাই যে যার পথে চলে গেল।

— আপনার বাড়ি নেই?

করিম মিয়া রেল লাইনের দিকে তাকিয়ে একটু চুপ করে রইলেন।

— ছিল একসময়, এহন এই ইস্টিশনই আমার বাড়ি।

রাশেদ কী বলবে ভেবে পেলো না। কিন্তু করিম মিয়া নিজেই হেসে উঠলো।

— তয় একটা সুবিধা আছে, এই বাড়ির কোন ভাড়া দেওন লাগে না।

দুজনেই হাসলো। রাশেদের ভেতরের ভার খানিকটা নেমে গেল।

হঠাৎ করিম মিয়া বলল, "এইবার বৌমারে একটা ফোন দেন।"

— এখন?

— হ, এহনই। ফোন দিয়া কইবেন যে আপনে টেরেন মিস করেছেন।

— তারপর?

— হেরপর চুপ থাকবেন।

— যদি জিজ্ঞেস করে, কীভাবে মিস করলাম?

— কইবেন, পক‍্কিতির নিয়ম।

রাশেদ কাঁপা হাতে ফোন করলো। প্রথম রিংয়েই ওপাশ থেকে গম্ভীর গলা, "কোথায়?"

— স্টেশনে।

— ট্রেন?

— মিস করেছি।

ওপাশে নীরবতা। রাশেদ চোখ বন্ধ করে ফেললো। মনে হলো এই নীরবতার মধ্যেই তাঁর ভাগ্য ঝুলছে। তারপর মিতু বলল, "তুমি একটা অদ্ভুত মানুষ"।

— জানি।

— কতক্ষণ লাগবে?

— দশ-পনেরো মিনিট।

— ঠিক আছে, সাবধানে এসো।


ফোন কেটে গেল। রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ওটা এইমাত্র আলাদিনের চেরাগের মতো কাজ করেছে।

— দেখলেন? সত্য কইলেই বউ মারে না।

— আপনি এত জানেন কী করে?

— চল্লিশ বছর সংসার করছি না!

— করেছিলেন? আর এখন?

— ইস্তিরি মারা গেছে।

করিম মিয়া একটু থামলেন। তারপর হালকা গলায় বললেন, "অহন ঐ বেডির বকবকানিডাই মনে পরে"।

রাশেদ আর কিছু বললেন না। দূরে ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল। করিম মিয়া উঠে দাঁড়ালেন।

— আফনের টেরেন।


রাশেদ পকেট থেকে কিছু টাকা বের করতে গেলো, তার আগেই করিম মিয়া হাত তুলে থামিয়ে দিলো।

— রাহেন। আইজ আফনে আমার লগে বইয়া চা খাইছেন, এইডাই অনেক। টেকাটা দিয়া বৌমার লইগা সুন্দর দেইহা ফুল কিন্না লইয়া যাইয়েন।

— ফুল?

— হ, টেরেন মিস করার ক্ষতিপূরণ, সংসারের ক্ষতিপূরণ।

রাশেদ হাসতে হাসতে জিজ্ঞাস করলো, "আপনি আসলে ভিক্ষুক না, উপদেষ্টা?"

— পরিস্থিতি বুইজ্জা দুইটাই।


ট্রেন ছেড়ে দিল। জানালার পাশে বসে রাশেদ দেখলো, করিম মিয়া প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন, যেন খুব আত্নীয় কেউ বিদায় জানাচ্ছে। ট্রেন চলতে চলতে স্টেশনটা একসময় ছোট হতে হতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো।

রাশেদ মোবাইলে মিতুকে লিখলো, "ট্রেন মিস করে এক দারুণ মানুষের দেখা পেলাম। বাড়ি গিয়ে সব বলব। আর শোনো, ফুল নিয়ে আসছি।"

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল: "ফুল? তুমি? কী করেছ সত্যি করে বলো!"

রাশেদ ফোনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। কিছু কিছু ভালো কাজের পরেও সন্দেহ থেকে যায়, সেটাই হয়তো সংসারের নিয়ম।



⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

প্রতিচ্ছায়া

 


সকালগুলো এই শহরে সাধারণত একটা নরম, ভেজা আলস্য নিয়ে শুরু হয়। কুয়াশা আর রোদের মাঝামাঝি একটা অনিশ্চিত সময়, যখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলো সবে চুলা জ্বালায় আর রিকশার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙে গোটা পাড়ার। সেদিন সকালটাও ঠিক তেমনই শুরু হয়েছিল, অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত। জানালার পর্দা ফুঁড়ে যে আলো এসে পড়েছিল ঘরের মেঝেতে, তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু বাড়ির বাইরে পা রাখার পরই বাতাসের গন্ধটা কেমন বদলে গেল। ভেজা কাগজ আর কালির একটা তীব্র, প্রায় অস্বস্তিকর গন্ধ, আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে কড়া লিকারের চায়ের একটা গন্ধ। আশেপাশে তাকাতেই বুঝলাম প্রতিটা দেয়ালে পোস্টার দিয়ে ছেয়ে গেছে।

আমি প্রথমে ভাবলাম এটা আরেকটা রাজনৈতিক প্রচারণা। এই শহরে এমন হয়- রাতারাতি দেয়াল ভরে যায় মুখের ছবিতে, স্লোগানে, প্রতিশ্রুতির ভারে ন্যুব্জ পোস্টারে। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন সাদা কাগজের ওপর কালো হরফে লেখা শব্দটা পড়লাম, তখন বুকের ভেতর একটা অচেনা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নিখোঁজ; শব্দটার নিচে একটা মুখ, আর সেই মুখটা আমারই, যদিও চেনা আয়নায় যে মুখ আমি প্রতিদিন দেখি তার চেয়ে যেন কিছুটা বেশি ক্লান্ত, চোখের নিচে যেন কিছুটা বেশি ছায়া। রাস্তার মানুষজন তখন নিজেদের ব্যস্ততায় হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না, অথচ দেয়াল থেকে আমারই চোখ দুটো আমাকে অনুসরণ করছিল, নিঃশব্দে, নিরন্তর।

পোস্টারের নিচের দিকে একটা ফোন নম্বর ছাপা ছিল, এগারোটা অঙ্ক, যা আমি কখনো নিজের জীবনে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না, অথচ চোখ বোলাতেই কোথাও একটা অচেনা পরিচিতির অনুভূতি খেলে গেল; ঠিক যেমন কোনো ভুলে যাওয়া গানের সুর হঠাৎ কানে বাজলে হয়। কাগজটা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবলাম হয়তো এটা কারও নিষ্ঠুর রসিকতা, কারও ফটোশপের কারিকুরি। কিন্তু ফোনটা পকেট থেকে বের করে সেই নম্বরে ডায়াল করতে করতে আমার আঙুল কাঁপছিল, যেন শরীর নিজেই জানত এই ফোন কলটা কোথাও একটা সীমারেখা পার করে দেবে যা আর কখনো পেছনে ফেরা যাবে না।

তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল, কাঁপা, সন্দিগ্ধ, তবু কোথাও যেন গভীর পরিচিত। আমি কিছু বলার আগেই বুঝলাম গলাটা কার। বছরের পর বছর ধরে যে গলা আমাকে সকালে ডেকে তুলত, রাতে ঘুম পাড়াত, সেই অতিপরিচিত গলা। কিন্তু সেই পরিচিতি স্বস্তি আনল না, বরং একটা অসম্ভবের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল, কারণ যে মানুষটার গলা আমি শুনছিলাম, তাকে আমি নিজের হাতে মাটি দিয়ে এসেছিলাম তিন বছর আগে।

⠀⠀

⠀⠀

সারাদিন আমি অফিসে গেলাম না। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম, দুপুরের আলো জানালা গলে মেঝেতে একটা লম্বাটে চৌকো আকার তৈরি করছিল, সেই আলো ধীরে ধীরে সরে সরে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছিল, আর আমি সেই আলোর সরে যাওয়া দেখছিলাম যেন তাতেই লুকিয়ে আছে কোনো উত্তর। ফোনের কল-লিস্টে নম্বরটা তখনো জ্বলজ্বল করছিল, আমি বারবার সেটার দিকে তাকালাম, যেন তাকিয়ে থাকলেই সংখ্যাগুলো নিজেদের গোপন অর্থ বলে দেবে। শেষে মোবাইলের ব্রাউজারে গিয়ে নিজের নামটাই সার্চ বক্সে টাইপ করলাম, এক ধরনের মরিয়া কৌতূহল থেকে, যেন নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজছি ইন্টারনেটের অচেনা কোণে।

প্রথম কয়েকটা ফলাফল ছিল একেবারে সাধারণ- পুরোনো একটা ফেসবুক প্রোফাইল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই তালিকায় নাম, কোনো একটা চাকরির সাইটে অসম্পূর্ণ বায়োডাটা। কিন্তু তারপর একটা সংবাদ-শিরোনাম চোখে পড়ল, আর সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে এল। প্রতিবেদনটা তিন বছর আগের, তারিখটা আজকের তারিখের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছিল, আর তাতে লেখা ছিল আমারই নাম, আমারই চেহারা, আমার ঠিকানা। একজন তরুণ প্রকৌশলীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের বিবরণ, যার শেষ দেখা মিলেছিল শহরের পুরোনো নদীবন্দরের কাছে, রাতের অন্ধকারে, একা।

আমি প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন পড়লাম, তারপর আবার পড়লাম, যেন বারবার পড়লে শব্দগুলো বদলে যাবে, অর্থ পালটে যাবে। জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছিল, আর সেই আধো-অন্ধকারে আমার নিজের প্রতিবিম্ব কাচের গায়ে ভেসে উঠল- স্বচ্ছ, কাঁপা, যেন একটা ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, রাস্তার দিকে তাকালাম, আর দেখলাম উল্টো দিকের দেয়ালে আরেকটা পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়েছে, যেটা সকালে ছিল না। এবার ছবিতে আমি হাসছি, এমন একটা হাসি যা আমার মনে পড়ে না আমি কখনো হেসেছি বলে, অথচ মুখের প্রতিটি রেখা নিঃসন্দেহে আমারই।

⠀⠀

⠀⠀

রাত নামলে আমি রাফিকে ফোন করলাম, ভেবেছিলাম বন্ধুর গলা শুনলে অন্তত কিছুটা মাটির সংযোগ ফিরে পাব। ওর হাসি দিয়ে কথোপকথন শুরু হলো, স্বাভাবিক, নির্ভার, যেন এই দিনটার কোনো অস্বাভাবিকতাই স্পর্শ করেনি ওকে। কিন্তু যখন আমি পোস্টারের কথা বললাম, সংবাদের কথা বললাম, ওর গলার স্বর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। হালকা রসিকতা থেকে সরে গিয়ে প্রথমে একটু সতর্ক, প্রায় ভীত আর শেষে নীরবতায়। ও জিজ্ঞেস করল- গত তিন বছর আমি কোথায় ছিলাম। প্রশ্নটা এতটাই সহজ ভঙ্গিতে করল যে প্রথমে বুঝতেই পারিনি ওর কণ্ঠে কতটা ভয় জমে আছে।

আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম, গতকালই আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছি, অফিসের করিডোরে হেঁটেছি, চায়ের কাপ হাতে গল্প করেছি। ও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল যে গত তিন বছরে আমি অফিসে পা রাখিনি, আমাদের শেষ কথোপকথন হয়েছিল ঠিক তিন বছর আগে, যেদিন আমি ওকে বলেছিলাম কাউকে অনুসরণ করছি, নদীবন্দরের দিকে যাচ্ছি। ও জানতে চেয়েছিল কাকে অনুসরণ করছি, আর আমি নাকি উত্তরে বলেছিলাম- 'নিজেকেই'।

সেই মুহূর্তে ফোনের ওপাশে রাফির নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না, আর আমার বুকের ভেতর একটা অচেনা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন কেউ ধীরে ধীরে আমার শরীর থেকে উষ্ণতা টেনে নিচ্ছে। রাফি শেষে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছি কিনা। ওর জিজ্ঞাসাটা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক শোনাল যে আমি হেসে ফেলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাসিটা গলার কাছে আটকে গেল। কারণ ততক্ষণে আমার পা নিজে থেকেই বাথরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, যেন শরীরটা মনের চেয়ে আগেই জানত কী অপেক্ষা করছে সেখানে।

⠀⠀

⠀⠀

বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক দেখলাম না- সেই একই মুখ, একই ক্লান্ত চোখ, চুলের একই অবিন্যস্ত রেখা। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা অদ্ভুত বিলম্ব চোখে পড়ল, খুব সূক্ষ্ম, প্রায় ধরা পড়ে না এমন- আমি হাত তুললাম, আর প্রতিবিম্ব যেন এক লহমা পরে হাত তুলল, একটা নিঃশ্বাসের সময়ের ব্যবধান, যা স্বাভাবিক আয়নার হওয়ার কথা নয়। আমি মাথা কাত করলাম, প্রতিবিম্বও করল, কিন্তু সেই বিলম্বটা রয়েই গেল, যেন কাচের ওপাশে কেউ আমাকে নিখুঁতভাবে নকল করার চেষ্টা করছে অথচ ঠিক সময়মতো পারছে না।

আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে, আর তখনই দেখলাম প্রতিবিম্বের ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, যা আমার মুখে ছিল না। সেই হাসি ধীরে ধীরে চওড়া হলো, আর তার চোখে এমন একটা তৃপ্তি ফুটে উঠল যা আমি নিজের মধ্যে কখনো অনুভব করিনি। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের স্পর্শ পায়ের তলায় অনুভব করলাম, আর সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল, একেবারে হঠাৎ, যেন কেউ অন্ধকারের সুইচ টিপে দিয়েছে ঠিক আমার ভয়টা চরমে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিল।

অন্ধকারে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, আর তার মাঝেই মনে হলো, আয়নার ওপাশ থেকে কেউ একজন এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ধৈর্য ধরে, অপেক্ষায়, যেন সময়টা তারই পক্ষে কাজ করছে।

⠀⠀

⠀⠀

পরদিন সকালে থানায় গিয়ে আমি বুঝলাম কাগজের জগতেও আমি আর সেই মানুষ নই যা আমি ভাবতাম। দায়িত্বরত অফিসার আমার পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন, তারপর জানালেন এই আইডি তিন বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে, ঠিক আমার নিখোঁজ হওয়ার নথিভুক্ত তারিখের কিছুদিন পর। আমি ঠিকানা বললাম, যেখানে গত চার বছর ধরে বাস করছি কিংবা আমি বাস করছি বলে আমার ধারণা। অফিসার শান্তভাবে ঠিকানাটা চেক করলেন, কাকে যেন একবার ফোনও করলেন, তারপর আমাকে জানালেন সেই ফ্ল্যাটের মালিকের ভাষ্যমতে জায়গাটা তিন বছর ধরে খালি পড়ে আছে, কোনো ভাড়াটিয়া নেই, কোনো আসবাবও নেই।

কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে হলো পুলিশ স্টেশনের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, যেন প্রতিটি বাক্য আমার চারপাশের বাস্তবতাকে একটু একটু করে সরু করে দিচ্ছে। অফিসার যখন জিজ্ঞেস করলেন আমি সত্যিই সেই মানুষ কিনা যার নাম নথিতে লেখা, আমি উত্তর দিতে পারিনি, কারণ প্রশ্নটা এতদিন যতটা সহজ মনে হতো, এখন ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে। আমি বিব্রত হাসি দিয়ে অফিসারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।

বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে নিজের মুখ দেখলাম, প্রতিটি পোস্টারে আলাদা আলাদা তারিখ, আলাদা আলাদা বিবরণ, যেন তিন বছরের প্রতিটি দিন কেউ যত্ন করে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, অথচ সেই দিনগুলোর একটাও আমার নিজের স্মৃতিতে নেই।

ফ্ল্যাটে ফিরে দরজা খুলতেই বুঝলাম কিছু একটা সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। কোন টেবিল নেই, বিছানা নেই, আমার চায়ের কাপ নেই, কোনো ব্যক্তিগত চিহ্ন নেই। শুধু দেয়ালে একটা আয়না ঝুলছে, যেটা আগে সেখানে ছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম, ওপাশের ঘরটা আমার নিজের ঘরের মতোই সাজানো, টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে চায়ের কাপ। আর সেই টেবিলে বসে আছে আরেকজন। হুবহু আমার মতো দেখতে আরেকজন আমি, মাথা নিচু করে কিছু লিখছি, নিবিষ্ট, নিশ্চিন্ত। সে মাথা তুলল, আমার দিকে তাকাল, তারপর একটা কাগজ তুলে ধরল কাচের ওপাশ থেকে, তাতে লেখা ছিল কয়েকটা শব্দ, যা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের সমস্ত উষ্ণতা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।

⠀⠀

⠀⠀

সেই রাতে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানলাম শহরের বাইরে যাওয়ার প্রধান সড়ক অজানা কারণে বন্ধ, সব বাস বাতিল, যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম, ক্লান্তি আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে, আর তখনই পাশের দেয়ালে চোখ পড়ল সেই পরিচিত পোস্টারে। এবার কাছে গিয়ে দেখলাম শব্দগুলো বদলে গেছে- আগের নিখোঁজ শব্দটার জায়গায় এখন লেখা, "সন্ধান পাওয়া গেছে"। আর তার নিচে ছোট্ট একটা বাক্য যোগ হয়েছে, যা পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ঠিক কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে, অথচ প্রতিবার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থটা যেন হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

আমি বেঞ্চে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, শহরের আলো একে একে নিভে যাওয়া দেখলাম, আর ভাবলাম- যদি সত্যিই কাউকে খুঁজে পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে সে কে? আর যে এখন এই বেঞ্চে বসে এসব ভাবছে, সে নিজে তবে কে?

রাতের শেষ প্রহরে বাসস্ট্যান্ডের আলো টিমটিম করছিল, দূরে নদীবন্দরের দিক থেকে একটা শিস-এর মতো শব্দ ভেসে আসছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম না সেই শব্দ কোনো ট্রেনের, নাকি কারও ডাকার আওয়াজ, নাকি শুধুই বাতাসের খেলা। যা নিশ্চিত ছিল তা কেবল এটুকু- শহর জেগে উঠলে আবার নতুন একটা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে যাবে, নতুন একটা তারিখ নিয়ে, নতুন একটা গল্প নিয়ে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মুখটা আমারই হবে কিনা, তা বলার সাধ্য আমার আর ছিল না।

⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৬

একাকীত্বের সঙ্গী


টেলিপোর্টার আবিষ্কারের পর পৃথিবী থেকে সবার আগে হারিয়ে গিয়েছিল 'দূরত্ব' নামক ধারণাটি। কোথাও পৌঁছানোর ব্যাপারে মানুষ মুক্ত হয়েছিল অপেক্ষার হাত থেকে। প্রথম দফায় যন্ত্রগুলো বসানো হয়েছিল এমন সব স্থানে যেগুলো ছিলো মানুষের চিরচেনা গন্তব্য। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্র, কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দর, ঝলমলে সমুদ্রসৈকত আর পাহাড়ি রিসোর্টের চূড়ায়। এক প্যাডে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে।

দ্বিতীয় দফায় টেলিপোর্টার গুলো হয়ে উঠে আরও উন্নত, আরও দ্রুত এবং আরও সহজ। টেলিপোর্টার গুলো মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দুর্গম সব জায়গার দরজা খুলে দিল। বরফের তলদেশের গবেষণাকেন্দ্র, মেঘছোঁয়া পর্বতচূড়া, সমুদ্রের গভীর পর্যবেক্ষণ কক্ষ, জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এক করুণ সত্য আবিষ্কার করল। সত্যটি হলো- দূরে চলে যাওয়া আর সত্যিকার অর্থে একা থাকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা আছে, তার প্রতিটি কোনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের পায়ের ছাপ পড়তে লাগলো, আর মানুষ পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমে উঠলো, শব্দ গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো কোলাহলে, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে হারাতে থাকলো মানুষের একাকিত্ব।

বেশ অনেক পরে আগমন ঘটলো তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের। তবে এবারের টেলিপোর্টেশনের ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেলো। ততদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছিলো একান্তে সময় কাটানোর মর্ম। তাই টেলিপোর্টার গুলোও তৈরি হয়েছিল সেই ধারণাকে ভিত্তি করে। এবার আর গন্তব্য গুলো নির্দিষ্ট ছিলো না। ছিলো না কোন নাম, কোনো ছবি ছিল না, কোনো পরিচিতিও ছিল না। যাত্রীরা কেবল বেছে নেয়ার সুযোগ পেতো তাদের পছন্দ মতো সময়। আর টেলিপোর্টার কোম্পানি কেবল একটা নিশ্চয়তা দিত- নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে পৃথিবীর আর কোনো জীবিত মানুষ উপস্থিত থাকবে না। বিজ্ঞাপনের একদম নিচে সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকত, “কিছু নীরবতা শুধু একজনের জন্যই তৈরি হয়।”

পাঁচ বছর আগে তার স্ত্রী মেঘলাকে হারানোর পর থেকে রাইয়্যানের কাছে সন্ধ্যার সময়টা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের বেলায় সে আর দশ জনের মতোই একদম স্বাভাবিক একজন মানুষ। অফিসের কাজ সারে, সহকর্মীদের সাথে হাসে, বাজার করে, প্রয়োজনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কও করে। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এলেই বাড়ির দরজা পেরিয়ে এক ধরনের বিস্তৃত শূন্যতা তাকে গিলে ফেলে, মনে হয় দিনের ঐ মানুষটি দরজার বাইরেই আটকে আছে।

শুরুতে সে মেঘলাকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত, তার কথা বলার ভঙ্গি, ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গান গাওয়ার সুর .....সবকিছু। কিন্তু বছর গড়াতে থাকতেই স্মৃতিগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত হতে লাগল, মেঘলার মুখ মনে করতে গেলে কখনো তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ দেখাত, আবার কখনো মনে হতো মুখটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেত সে এই দ্বিতীয় অনুভূতিটাকে, মেঘলাকে হারানোর চেয়েও তাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।

তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের ঐ অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটি রাইয়্যান প্রথম দেখেছিল এমনই এক সন্ধ্যায়; ঠিক সেই সময় যখন ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছিল। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, হয়ত তিন দিনের জন্য পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে অন্তত নিজের স্মৃতিগুলোর সাথে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। সেখানে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবে না, কেউ বলবে না যে- আহা! পাঁচটা বছর কেটে গেছে, এবার তোমার সামনে তাকানো উচিত।

সিদ্ধান্তটা সে খুব দ্রুতই নিয়েছিল, যেন দীর্ঘদিনের জমানো একটা সিদ্ধান্ত অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। যদিও এবারের টেলিপোর্টেশনের টিকিটের দাম ছিলো তার নাগালের বাইরে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো সে এটা করবেই। সেই সিদ্ধান্তেই আট মাসের ইউনিট জমা করে যখন টিকিটটি কিনলো তখন তাকে বেশ দীর্ঘ কয়েকটা ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। তার নিজের সম্পর্কে বেশ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জানাতে হয়েছিল টেলিপোর্টেশন কোম্পানিকে। তার ঠিক দু'দিন পর তার যাত্রার দিন নির্ধারিত হলো।

যাত্রার দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভ্রমণে যাচ্ছে না, বরং এমন এক সিদ্ধান্তের গভীরে ঢুকে পড়ছে- যার শেষটা সে নিজেও জানে না। টার্মিনালটি ছিল আশ্চর্যরকম নীরব, বিশাল সাদা ঘরের মাঝখানে গোলাকার প্যাডটি ছাড়া আর কিছু নেই, দেয়ালজুড়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো কর্মচারী নেই, শুধু মেঝের নিচে নীল আলো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে।

রাইয়্যান প্যাডের ওপর দাঁড়াতেই একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল-
-- “আপনি কি নিশ্চিত?”

প্রশ্নটা শুনে সে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করলো- "কীসের ব্যাপারে?"

কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না, তারপর কণ্ঠটি আবার বলল-‌
-- “আপনি কি একাই যেতে চান?”

রাইয়্যানের হাসিটা মিলিয়ে গেল, সে বলল- “হ্যাঁ।”

আলো জ্বলে উঠল, আর পৃথিবী সরে গেল। চোখ খুলে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ছিল বাতাসের; বাতাসে লবণের গন্ধ, তার সাথে ভেজা কাঠের একটা মৃদু গন্ধ মিশে আছে। সামনে সমুদ্র, দূরে জলরাশি আকাশের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মাঝখানে কোনো দিগন্তরেখা নেই, যেন পৃথিবীটা ওই পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। রাইয়্যান টেলিপোর্টেশন প্যাড থেকে নেমে ধীরে ধীরে বালির ওপর হাঁটল, পায়ের নিচে নরম বালি দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো শব্দ হচ্ছিল না, সে থেমে নিজের পায়ের ছাপের দিকে তাকাল, এরপর পর আবার হাঁটা শুরু করলো।

সামনে একটি ছোট বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কাঠের তৈরি, নিচু ছাদ, সামনে বারান্দা। বাড়িটাকে দেখে রাইয়্যানের মনে হলো, সে যেন আগে কোথাও এই বাড়িটা দেখেছে, হয়ত কোনো ছবিতে, হয়ত কোনো স্বপ্নে, নয়তো এমন কোনো কল্পনায় যেটা সে কখনো নিজেকেই ঠিকমতো বলতে পারেনি। ভেতরে ঢুকে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হলো, সবকিছু অপরিচিত, অথচ খুব অদ্ভুত রকমের পরিচিত। টেবিলের উপর রাখা কফির জারটি ঠিক সেই ব্র্যান্ডের যা সে বাড়িতে ব্যবহার করে; বইয়ের তাকের তৃতীয় সারিতে তার প্রিয় লেখকের সেই বইটি, যেটার শেষ কয়েক পাতা সে কোনোদিন পড়েনি; জানালার পাশে একটি কাঠের চেয়ার, যেটাতে বসে মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে চা খেত।

রাইয়্যান প্রথমে এসবকে প্রযুক্তির পরিশীলিত সৌজন্য বলেই ভেবেছিল, বুকিংয়ের আগে কোম্পানি তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা নীল কাপটি দেখে তার সেই ব্যাখ্যাটা আর যথেষ্ট মনে হলো না। নীল রঙের কাপটির কিনারে সূক্ষ্ম একটি ফাটল, হুবহু সেখানেই যেটা মেঘলার কাপেও ছিলো।

এক সকালে কাপটি হাতে নিয়ে মেঘলা বলেছিল, “দেখেছ? এখনও টিকে আছে।” রাইয়্যান তখন বলেছিল, “একদিন ভেঙে যাবে।” মেঘলা হেসে বলেছিল, “ভেঙে গেলেই কি সবকিছু ফেলে দেয়া যায়? যায় না, বুঝলে।” স্মৃতিটা এত হঠাৎ, এত স্পষ্টভাবে ফিরে এল যে রাইয়্যানের মনে হলো, কেউ যেন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে গেল। সে কাপটির দিকে হাত বাড়িয়েও ছুঁয়ে দেখলো না, কারণ তার মনে হচ্ছিল, একবার ছুঁয়ে দেখলেই হয়ত তাকে মেনে নিতে হবে- এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।

বিকেল নামার পর দ্বীপের রং বদলে গেল, সূর্যের আলো নরম হতে হতে সমুদ্রের বুকের উপর গলিত তামার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আকাশে জমল অস্পষ্ট গোলাপি আভা। রাইয়্যান বারান্দায় বসে ছিল, পাশাপাশি দুটি চেয়ার, সে যে চেয়ারে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটি খালি। কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, খালি চেয়ারটির ওপর একটি ভাঁজ করা কাপড় রাখা, সকালে সেটা সেখানে ছিল না। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, কাপড়টা ছিল হালকা ধূসর রঙের একটি শাল। সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল, পরিচিত কোনো গন্ধ নেই, কোনো নাম নেই, কিছুই নেই যা প্রমাণ করবে এটি মেঘলার। তবু সে খুব যত্ন করে ভাঁজটা ঠিক করে আবার চেয়ারটির উপর রেখে দিল, এমনভাবে, যেন খুব পরিচিত কেউ পরে এসে সেটা গায়ে জড়াবে।

নিজের এই আচরণের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে সে জোরে বলে উঠল, “আমি কী করছি?”

প্রশ্নটা সে জোরে বলেছিল, উত্তর আসেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত লাগছে, যেন বহুদিন ধরে সে কারও সাথে কথা বলেনি।

সন্ধ্যার একটু আগে রাইয়্যান সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বের হলো। এবার সে নিজের পায়ের ছাপগুলো লক্ষ্য করছিল, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দিচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল বালির ওপর একটি ছোট পাথরের বৃত্ত। কেউ যেন খুব যত্ন করে পাথরগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বৃত্তটির মাঝখানে একটি শুকনো শামুকের খোলস, রাইয়্যান সেখানে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, মেঘলা সমুদ্রতীরে শামুক দেখলেই সবসময় একটা শামুকের খোলস কুড়িয়ে নিত, তারপর কিছুক্ষণ হাতের তালুতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার ফেলে দিত। “নেবে না?” রাইয়্যান একবার জিজ্ঞেস করেছিল। “না,” মেঘলা বলেছিল, “ওটার জায়গা ওখানেই।” রাইয়্যানের বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, সে চারদিকে তাকাল, কেউ নেই, সমুদ্র, আকাশ আর তার নিজের ছায়া, তবু পাথরগুলো কেউ সাজিয়েছে। সে কি সকালে এখানে এসেছিল?! অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না।

সেই রাতে রাইয়্যান ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি, বিছানায় শুয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিনের বেলায় যে সমুদ্র প্রায় শব্দহীন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ঢেউয়ের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, জল তীরে এসে ভাঙছে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল, কেউ বাড়ির চারপাশে খুব ধীর পায়ে হাঁটছে। কিন্তু রাইয়্যান জানত, সেখানে কেউ নেই, সে নিজেকেই বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দিল- আমি একাই এসেছি। রাতের কোনো এক সময় তার ঘুম এসে গিয়েছিল, সকালে ঘুম ভাঙার পর সে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী তাকে জাগিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, ঘর নিস্তব্ধ, তারপর তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর, সেখানে দুটো কাপ রাখা। একটিতে আগের রাতের কফির শুকিয়ে যাওয়া দাগ, অন্যটিতে চা, ধোঁয়া নেই, কিন্তু চায়ের রং এখনও গাঢ়।

রাইয়্যান বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, সে জানত, দ্বিতীয় কাপটি সে রাখেনি। তারপরও তার প্রথম ভাবনায় এলো- ভোর সকাল করে মেঘলাও এমন কড়া চা খেত; পরক্ষণেই সে এই চিন্তাটার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছিল, তার অবচেতন মন নিজে থেকেই প্রতিটি ঘটনার সাথে মেঘলাকে জুড়ে দিচ্ছে। নীল রঙা মেঘলার কাপ, ভাজ করা মেঘলার শাল, সমুদ্র তীরে মেঘলার হাতে শামুকের খোলস, আর এখনকার এই কড়া চা - সেটাও মেঘলার। হয়ত এসব কিছুই তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, হয়ত কোম্পানির কোনো অ্যালগরিদম তার স্মৃতির দুর্বল জায়গাগুলো জানে। অথবা... -এই শেষ সম্ভাবনাটাই সে ভাবতে চাইলো না।

দুপুরের দিকে রাইয়্যান বাড়ির ভেতরে আরও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল, বইয়ের তাকের ওপর যে বইটি আগের দিন বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেটি এখন খোলা, পাতার মাঝখানে একটি শুকনো পাতা রাখা। রাইয়্যান বইটি তুলে নিল, পাতাটি কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না, কিন্তু বইয়ের যে পাতায় সেটি রাখা, সেখানে একটি বাক্য দাগ দেওয়া-

“মানুষ কখনো কখনো ফিরে আসে না, তবু তার জন্য জায়গা থেকে যায়।”

রাইয়্যান বইটি বন্ধ করে ফেলল, তার হাত কাঁপছিল না, সে ভয়ও পাচ্ছিল না, বরং তার ভেতরে অন্যরকম একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। যদি সত্যিই কেউ এখানে থাকে? আর যদি কেউ না থাকে? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সে বেশি ভয় পায়, রাইয়্যান বুঝতে পারছিল না। কারণ কেউ থাকলে তাকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে হবে, যা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়, আর কেউ না থাকলে তাকে স্বীকার করতে হবে, সে নিজেই হয়ত এসব ঘটাচ্ছে- কখনো জেগে, কখনো ঘুমের ভেতর এসব সাজিয়ে যাচ্ছে; এবং পরে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, যা হয়ত তার চেয়েও ভয়াবহ।

সেদিন বিকেলে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর কোনো কিছু নিয়ে অনুমান করবে না, সে রান্নাঘরের টেবিল পরিষ্কার করে দিল, দুটি কাপ ধুয়ে উলটো করে রাখল, চেয়ার দুটো পাশাপাশি ঠেলে দিল, বারান্দায় থাকা শালটি ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দিল। তারপর সে বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল, কোথাও কেউ নেই, সে দরজা বন্ধ করল, জানালা আটকাল, মেঝের ওপর এক টুকরো বালি ছড়িয়ে দিল, যাতে কেউ হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে। সবশেষে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, বিকেল ৫টা ৪০। সে সিদ্ধান্ত নিল, সূর্য ডোবার আগে আর কোথাও যাবে না। বারান্দার চেয়ারে বসে থাকবে, কেউ এলে দেখবে, কেউ না এলে অন্তত নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে।

সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, সমুদ্রের ওপর আলো ছোট হয়ে আসছিল, আকাশের রং কমলা থেকে গাঢ় বেগুনিতে বদলে যাচ্ছিল, দ্বীপের বাতাসের নোনা স্বাদের সাথে যেন এক ধরনের চাপা প্রতীক্ষার চাপ তৈরি হতে থাকলো। রাইয়্যান চেয়ারে বসে ছিল, চোখ বাড়ির দরজার দিকে। সময় যাচ্ছিল, কেউ আসেনি, বালির উপর কেন পায়ের ছাপ পড়লো না, কোথাও অস্বাভাবিক কোন শব্দও হলো না।

তারপর হঠাৎ সে খেয়াল করল, বারান্দার অন্য চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই ঠিকই, কিন্তু চেয়ারটি সামান্য দোল খাচ্ছে, যেন কেউ একটু আগে উঠে গেছে চেয়ারটি থেকে। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল না, সে নিজের শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল, "বাতাস", সে মনে মনে বলল, কিন্তু তার মুখে কথা বেরোল না, কারণ বাতাস থেমে ছিল। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল, খুব সাধারণ শব্দ, ড্রয়ারের শব্দ, কেউ যেন রান্নাঘরের ড্রয়ার খুলল। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার বসে পড়ল, সে বুঝতে পারছিল, তার শরীর বাড়ির ভেতরে যেতে চাইছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যদি না যায়, তাহলে বাকি সময়টা সে আর এখানে কাটাতে পারবে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, দরজার কাছে গিয়ে থামল, তারপর ভেতরে ঢুকল, রান্নাঘর ফাঁকা, কিন্তু ড্রয়ারটি খোলা, ভেতরে একটি ছোট নোটবুক রাখা।

রাইয়্যান জানে, নোটবুকটি তার নয়। সে সেটি হাতে নিল, প্রথম কয়েকটি পাতা খালি, তারপর একটি পাতায় লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো করেও লেখা নয়, যেন কেউ শান্তভাবে বসে লিখেছে- "আজ সে আবার চেয়ার দুটো পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।"

রাইয়্যানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এল, সে পরের লাইনটি পড়ল- "আজও সে বলবে, সে একা। আমি এখনও তাকে বলিনি যে সে গতকাল রাতে সমুদ্রের ধারে অনেকক্ষণ আমার সাথে বসে ছিল।"

রাইয়্যান আর পড়তে পারল না, সে নোটবুক বন্ধ করে দিল, মনে করার চেষ্টা করল গত রাতের কথা, বিছানায় শোয়ার আগে সে কী করেছিল? সে কি সত্যিই বাইরে গিয়েছিল? তার মনে পড়ল না। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো নোটবুকটি ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে। তারপর মনে হলো, সেটা করলে হয়ত সে শুধু প্রমাণটাই নষ্ট করবে, প্রশ্নটা নয়। সে নোটবুকটি টেবিলের ওপর রেখে টেলিপোর্টার প্যাডের দিকে হাঁটল, আজ দ্বিতীয় দিন, আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর তার ফেরার অনুমতি।

টেলিপোর্টারের স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল, সেখানে লেখা ছিল-
RETURN AVAILABLE IN 23:17:42

তার নিচে আরেকটি লাইন জ্বলছিল-
PASSENGERS READY: 1

রাইয়্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, একজন, সে নিজেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা ঝিলমিল করে উঠল, তারপর স্ক্রিনে নতুন করে লেখা এল-
PASSENGERS READY: 2

রাইয়্যান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে পেছনে ঘুরে দেখল, দ্বীপে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, বারান্দার দুটি চেয়ার পাশাপাশি, দূর থেকে মনে হলো, একটি চেয়ারে কেউ বসে আছে। রাইয়্যান চোখ কুঁচকে তাকাল, পরের মুহূর্তেই সেখানে শুধু শালটা পড়ে থাকতে দেখল- যেটা সে নিজের হাতে আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল, সংখ্যাটা তখনো দুই। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে বাড়ির দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল।

রাইয়্যান চোখ বন্ধ করল, তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ আছে। একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই শহরে, যেখানে পাঁচ বছর ধরে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে মেঘলা আর নেই। অন্য পথটি কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না, শুধু এটুকু জানে- পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, অথবা দাঁড়িয়ে নেই।

ঠিক তখনই তার হাতের কনসোলটি কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে ফেরার সময় হঠাৎ বদলে গেল-
RETURN AVAILABLE NOW

তার নিচে লেখা উঠল- “দয়া করে যাত্রীর সংখ্যা নিশ্চিত করুন।” রাইয়্যান ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার আঙুল দুটি সংখ্যার মাঝখানে স্থির হয়ে রইল- 1 অথবা 2। পেছন থেকে তখন খুব পরিচিত স্বরে কেউ বলল- "রাইয়্যান, এবার কি আমাকে সত্যিই রেখে যাবে?"

রাইয়্যান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা কোনোদিন জানা যায়নি। পরদিন সকালে তৃতীয় তরঙ্গের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে শুধু একটাই সংকেত পৌঁছেছিল- টেলিপোর্টার প্যাড সক্রিয় হয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, কিন্তু যাত্রীসংখ্যার তথ্য অসম্পূর্ণ।

রাইয়্যানের বুকিং ফাইলের একেবারে শেষ লাইনে, যা পরে কোম্পানির কোনো ইঞ্জিনিয়ার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো তদন্তকারী দল ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানে শুধু একটি ছোট্ট নতুন নোট যোগ হয়েছিল লাল অক্ষরে “RETURN NUMBER ERROR!”

সেই দ্বীপে যদি কেউ কোনোদিন আবার যায়, তবে সে হয়ত দেখতে পাবে, বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো পাশাপাশি রাখা, একটি চেয়ারের উপর একটি হালকা ধূসর শাল ভাঁজ করা, আর টেবিলের উপর দুটো কাপ। একটি খালি, অন্যটিতে অপেক্ষারত কড়া লিকারের ঠান্ডা চা।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀


শনিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৫

তুমি তো আমাকে চেনো…

 


প্রথম ভাগঃ প্রারম্ভিকা

জানোই তো, ঘুম হল এক ধরনের প্রতারণা। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে তুমি চোখটা বন্ধ কর, ধীরে ধীরে তোমার শরীর শিথিল হতে শুরু করে। হৃৎস্পন্দন কমে আসে, কমে আসে শরীরের তাপমাত্রা। তুমি তখন নিজেকে নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে শুরু কর। 

আর ঠিক সেই সময়টাতেই তোমার বুকের উপর এমন কিছু একটা উঠে বসে, যার অস্তিত্বের কথা তোমার জানা নেই!

তবে আমি জানি, কারণ আমি তো সেটা দেখেছি।

আচ্ছা চল, তোমাকে আমার ঘটনাটা বলি, তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে আমি কীসের কথা বলছি।

প্রথম রাতে আমি শুধু একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। শব্দটা মৃদু হলেও তার তীক্ষ্ম একটা অনুভূতি আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল সেটি। অন্ধকারে, ঠিক আমার বিছানার কোণ থেকে শব্দটা হয়েছিল। কেমন একটা ঠান্ডা, গভীর, লম্বা একটা টান। আমি ভেবেছিলাম মনের ধোঁকা হয়তো, এত রাতে একা ঘরে কার নিঃশ্বাসের শব্দ হবে!

দ্বিতীয় রাতেও আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, খুব অস্বস্তি লাগছিল। ওটা তখন আমার বুকের উপর বসে আছে। নড়তে পারছিলাম না, শ্বাসও নিতে পারছিলাম না। শুধু অনুভব করছিলাম সেই ঠান্ডা নিঃশ্বাসের মতই- ঠান্ডা, ভেজা হাতটি গলার চেপে ধরে আছে। চাপটা খুব অদ্ভুত, না শক্ত - না নরম; তবে ততটাই, যতটা থাকলে পরে তোমাকে আতঙ্ক আঁকড়ে ধরে।

দিনের আলোতে এই কথাগুলো নিজের কাছেই হাস্যকর লাগছিল। বিশ্বাস কর, মাকে গিয়ে যে কথা গুলো বলব, আমার তো নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল ছ’বছরের বাচ্চারা রাতে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে যা করে, আমিও তেমন করছি।

তৃতীয় রাতেও আমি সেই ঠান্ডা হাতের অনুভব পেলাম। আমি ঠিক-ঠিক গুনে ফেললাম- সেখানে মোট ছ’টা আঙ্গুল আছে। তিনটা বামে, আর তিনটা ডানে। বরফ শীতল আঙ্গুলগুলো যেন গলার চামড়া ফুড়ে মেরুদন্ড ছুঁয়ে দিতে চাইছে!

তারপর, চতুর্থ রাত, আমি বুঝলাম ও আমাকে ডাকছে। ওকে আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু ওর কণ্ঠটা যেন আমার মস্তিষ্কের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে। বলছে- ‘তুমি তো আমাকে চেনো….’

পরদিন সকালে মা আমাকে ডাকতে এসে দেখলেন, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি। ডাক্তার বলল- ‘হার্ট অ্যাটাক’। সবাই সেটা বিশ্বাসও করে নিল। অথচ, আমি সেখানেই ছিলাম, আয়নাটার সামনে। যেখান থেকে আমি সেই ছায়াটাকে ধীরে ধীরে সরে যেতে দেখছিলাম, আর তার দৃষ্টি ছিল… থাক সে কথা।

⠀⠀⠀

এর ক'দিন বাদেই ওরা সবাই বাড়িটা খালি করে কোথায় যেন চলে যায়। আমি ওদের দেখেছি, ওরা ঘরের আসবাবপত্র বের করছে, সামানা গোছাচ্ছে, ভ্যানে ভরছে। কিন্তু ওরা আমাকে দেখে না। জানালা দিয়ে আমি কেবল ওদের চলে যাওয়াটুকুই দেখলাম। এরপর থেকেই আমি একা, একদম একা।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

দ্বিতীয় ভাগঃ বাড়ির নতুন বাসিন্দা...

শহর ছেড়ে এই গ্রামে এসেছি দিন দশেক হয়েছে। একটা প্রজেক্ট চলছে এখানে, আরও কয়েক মাস চলবে। প্রথম কয়েকদিন তো এখানকার কাজ-কর্মের কোন আগা-মাথা বুঝে পাচ্ছিলাম না। সবই চলছে নিয়ম মাফিক, আবার সবই এলোমেলো। সে সব গোছাতেই চলে গেছে এই কয়েকদিন। হেড অফিস থেকে জানাল, তারা এখানে নতুন কাউকে পোস্টিং দিবে বলে ভাবছে। তবে সেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে একটু কাজগুলো গুছিয়ে দিতে বলল।

শহরের বাইরে আমার তেমন করে কখনো থাকা হয়নি। এখন এই কাজের কারণে না আসলে হয়ত এভাবে এতদিনের জন্যে আসা হতো না। শহরেই জন্ম, বেড়ে উঠা, আর শহরেই জীবনটার ইতি হতো। সারাদিন ভালোই কাটে, কাজের ব্যস্ততায়, সাইট ঘুরে দেখে। কিন্তু বিকেলের পর আর সময় কাটতে চায় না। তার উপর এমন একটা জায়গায় থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে! ছোট একটা একতলা বাড়ি, একদম গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে। বাড়িটা অফিসের, এখানে তারা অন্য একটা প্রজেক্টের জন্য জমি কিনার সময় খুব কম দামে পেয়ে যায়, তাই কিনে নেয়। কারও থাকার উদ্দেশ্য না হলেও এখন এই প্রজেক্টের জন্যে আমার থাকার জায়গা হয়েছে।

ছিমছাম শান্ত পরিবেশ ঘেরা, ঝুপ করে সন্ধ্যা নামার পর নাম না জানা পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। এখানকার ম্যানেজার প্রথমে তার বাসাতেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কারও বাসায় এভাবে থাকাটা পছন্দ হচ্ছিল না, তাই সেটা বাতিল করেছিলাম। এরপর তিনি একপ্রকার জোড় করেই খাবারের ব্যবস্থাটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলেন। এখন টিফিন কেরিয়ারে করে সন্ধ্যার পরপর খাবার চলে আসে তার বাড়ি থেকে। তবে এক ফাঁকে তিনি আমাকে জানালেন, এই বাড়িটার ব্যাপারে কিছু আজেবাজে কথা শোনা যায়। যদিও বিশ্বাস করার মত তেমন কোনো ভিত্তি নেই। তারপরও রাতে বাড়ি থেকে বের হতে বারণ করলেন। আর কোনো সমস্যা হলে যত রাতই হোক, তাকে যেন নির্দ্বিধায় ফোন করে জানাই -সে আশ্বাস আদায় করে নিলেন।

দিনভর দৌড়োদৌড়ির পর শান্ত পরিবেশ আর পেট পুরে খানা পেয়ে এখন ঘুমও চলে আসে দ্রুত। বড় জোড় রাত ১০টা পর্যন্ত জাগে থাকতে পারি, তারপর টুপ করে ঘুম ধরে বসে। অবশ্য আমিও যে খুব জেগে থাকতে চাই, তা না। সকাল সকাল খুব ফ্রেশ একটা ভাব চলে আসে এত লম্বা ঘুম পেয়ে। দিনের ক্লান্তিটা তখন আর তেমন গায়ে লাগে না।

এগারো তম রাতে হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছিল, ঠিক বোঝানোর মত না। কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছে। জানালার ফাঁকা দিয়ে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো এসে বিছানার একপাশে থেমে আছে। মনে হচ্ছে যেন সময়টাও আটকে গেছে। অস্বস্তিটা আমাকে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে, উঠে বসে টেবিল থেকে মোবাইল বা ঘড়িটা পর্যন্ত নিতে ইচ্ছে হলো না। বেশ অনেকটা সময় পর হঠাৎ করেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কেউ রিমোট থেকে প্লে বাটনে চাপ দেয়ার সাথে সাথেই সব আগের মতই চলতে শুরু করেছে। অস্বস্তিটাও কেটে গেল প্রায় সাথে সাথেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আবার ঘুমের সাগরে ডুবে গেলাম।

পরদিন আর এটা নিয়ে তেমন কিছুই মনে থাকলো না। সাইট ঘুরে কাজ দেখতে দেখতে দিন কেটে গেল।

সমস্যাটা হলো আবার রাতে। গতদিনের মতই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ঠিক ভেঙ্গে গেল কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছিলাম না। যেন ঘুমের গভীর কোন স্তরে ডুবে আছি, কোন নড়াচড়া কিংবা সাড়াশব্দ কিচ্ছু নেই। কেবল একটা চাপা অস্বস্তি।

হঠাৎ বুকের উপরে ভারী আর ঠান্ডা একটা চাপ অনুভব করলাম। কারও উপস্থিতি… না, কারও বসে থাকা। শরীর শক্ত হয়ে গেছে, আঙুল পর্যন্ত নড়ছে না। চিৎকার করতে গেলেও শব্দ বের হচ্ছিল না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

তারপর ঠান্ডা, ভেজা একজোড়া হাত গলার দুই পাশে চেপে ধরলো। এমনভাবে চাপ দিচ্ছিল- যেন নিখুঁতভাবে আমার শ্বাস বন্ধ করতে চাইছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। আর কানের ভেতর একটা ফিসফিসানি-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আজকের পূর্বে আমার নিজেকে কখনো ভীতু মনে না হলেও, আজ আমার বুকের ভেতর ভয় ভয় জমে বরফ হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো নিঃশ্বাসও নেওয়ার দরকার পড়ছে না। গলার চাপ কমেনি, বরং বেড়েছে বলা যায়। অথচ শ্বাস টানার কোন আকুতি আর ফুসফুস করছে না। হয়ত অক্সিজেনের অভাবে উল্টোপাল্টা ভাবছি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছি যে মস্তিষ্ক পরিষ্কার চিন্তা করতে পারছে। আর প্রশ্নটা নিজে থেকেই এলো- তবে কি আমি মারা গিয়েছি? নাকি এটা পুরোপুরি কল্পনা? অথবা এই অনুভূতিটাই মৃত্যুর পরের অংশ?

পরের মুহূর্তেই উঠে বসলাম। বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু ঘরের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক। জোরে জোরে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিচ্ছি, বা হাঁপাচ্ছি। বিছানাটা এলোমেলো, চাদর গুটিয়ে গেছে।

নামলাম বিছানা থেকে, হেঁটে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। একটু আগে যে আতঙ্ক ভর করেছিল, তার ছিটে-ফোটাও লাগছে না এখন। উলটো নিজেকে যেন আরও হালকা লাগছে। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিলাম। মাথা কিছুটা পরিষ্কার হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বোকামিতে হেসে ফেলতে গেলাম,কিন্তু হাসি মিলিয়ে গেল পরের সেকেন্ডেই।

গলার দুই পাশে তিনটা করে সমান লালচে দাগ। যেন কারও আঙুলের চাপের ছাপ। আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম, হালকা গরম, কিন্তু কোনো ব্যথা নেই। আমার আতঙ্কিত হওয়ার কথা, কিন্তু তেমন কোন অনুভূতি হচ্ছে না। যেন এমনটা হবে আমি জানতাম!

এরপর আর ভালো ঘুম হলো না। বারবার কেবল ঘুরে ফিরে ঐ ফিস্‌ফিস শব্দটা মাথায় চলে আসছিল। "তুমি তো আমাকে চেনো…"

পরদিন সকালে অফিসে গিয়েই এখানকার ম্যানেজার সাহেবকে জানালাম জরুরি কাজে বাড়ি যাচ্ছি। হাতের কাজগুলো তাকে বুঝিয়ে দিয়েই গাড়িতে উঠলাম। হেড অফিসে কেবল অসুস্থতার ছুটির জন্য একটা মেইল পাঠিয়ে রাখলাম।

আট ঘণ্টার জার্নি দিয়ে ফিরলাম বাসায়। আমার কেবল মনে হচ্ছিল আমাকে যে করেই হোক ঐ জায়গাটা ছেড়ে আসতে হবে। তাই আর সামনে-পেছনে কোন কিছুই চিন্তা না করে সোজা বাসায় এসেছি। অবশ্য বাসায় এসে কাউকে কিছু বলে ভরকে দিতে ইচ্ছা হল না। ছুটি নিয়েছি, জানালাম কেবল। ওরা ভাবল, এভাবে হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকা, আর লম্বা জার্নির কারণে আমাকে এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

ফ্রেশ হয়ে কোনোরকম রাতের খাবার শেষ করেই আমার রুমে গিয়ে ঢুকলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম ঘুম ভাব চলে আসল। অনিচ্ছাতেও গভীর ঘুমে নিপতিত হতে থাকলাম।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

তৃতীয় ভাগঃ অবশেষ…

একটা ঘোরের মন লাগছে। মনে হচ্ছে জেগে আছি, আবার মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। বিছানায় উঠে বসতেই আলমারির আয়নার দিকে চোখ পড়ল। পেছনে বাথরুমের দরজা আধখোলা, আর তার ফাঁক দিয়ে মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে আছে- অস্পষ্ট, ছায়ার মতো।

আমি চোখ মুছলাম, আবার তাকালাম- কই? কেউ তো নেই!

হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
না, আসলে বাতাস নয়, নিশ্বাস নেয়ার আকুতি; থেমে গেলো।

আয়নার ভেতরে আমার পেছনে অন্ধকার জমতে শুরু করলো। প্রথমে মনে হলো ছায়া, কিন্তু তা ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে- লম্বা, কঙ্কালসার হাত… প্রতিটি হাতে তিনটি লম্বা আঙুল।

আমার কাঁধের উপর দিয়ে সেই হাতের ছায়া এগিয়ে এলো। আয়নায় হাত দেখা গেলেও আমার গায়ে কোন কিছুর ছোঁয়া অনুভব করলাম না। আমি স্থির হয়ে রইলাম, চোখের পাপড়িও ফেলতে পারছি না।

তারপর সেই ছায়ার মাথাটা ঝুঁকে এল আমার ঠিক কানের পাশে। কোনো ঠোঁট নড়ছে না, কিন্তু এক বরফশীতল ফিসফিসানি মাথার ভেতর এক স্বরে বলেই চলেছে-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আমি তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম প্রতিফলনে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটা আসলে আমি নই।

প্রতিফলনের চোখ গাঢ় কালো হয়ে গেছে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর গলার দাগগুলো রক্তিম লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। ওটা আমাকে দেখছে… কিন্তু আমি ওটাকে... কি জানি!

⠀⠀⠀

বাথরুমের দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার পুরো ঘরটাকে গিলে নিল।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

বুধবার, অক্টোবর ২৩, ২০১৯

ড্রিম মডুলার


অসম্ভব সুন্দর একটা ঘুম ভেঙ্গে উঠলাম। দারুন কোন সপ্ন দেখছিলাম হয়তো। কিন্তু স্বপ্নে কি দেখছিলাম ছিটেফোটাও মনে পড়ছেনা এই মুহুর্তে। কিন্তু তা নিয়ে কোন আফসোস হচ্ছে না মোটেই। আগামি রাতেও নিশ্চই দারুন কোন স্বপ্ন দেখবো, তাই মনে না পড়া স্বপ্ন নিয়ে বিন্দু মাত্র আফসোস হচ্ছে না।

পাঁচ দশক এর কিছু পূর্বে সপ্ন দেখার কিংবা নিয়ন্ত্রণের এক যুগান্তকারী মেশিন মানুষ আবিস্কার করেছে। শুরুতে অনেকেই এর ব্যবহার নিয়ে নানা প্রশ্ন তুলেছিল, যুক্তি-তর্কে একে মানব সভ্যতার দারুণ ক্ষতির সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেছিলো। কিন্তু সকল প্রশ্ন আর যুক্তি-তর্ককে পেছনে ফেলে মানুষ একে গ্রহন করেছে। আর শুধু গ্রহন করেছে বললে ভুল হবে, কারণ দিনে দিনে তারা এটিকে তাদের জীবনের সাথে ওতপ্রেত ভাবে জড়িয়ে নিয়েছে।

এখন আর কেউ অধরা-অস্পর্শী স্বাভাবিক স্বপ্ন দেখে না। সবাই যার যার ড্রিম মডুলারে পছন্দসই সপ্ন দেখে, কিংবা তাদের প্রোফাইল আর প্রতিদিনকার একটিভিটি মনিটর করে তাদের সমন্বয়ে সেন্ট্রাল ড্রিম ক্লাউডের নিয়ন্ত্রনাধীন প্রিসেটেড সপ্ন দেখে। আর এতে করে সস্তির পাশাপাশি অপরাধের মাত্রাও দারুণভাবে কমে এসেছে। ফলে যারা শুরুতে ড্রিম মড্যুলারের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলো, কিংবা এ নিয়ে যাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিলো তারাও একে একে চুপ করতে শুরু করে। উল্টো শিশু থেকে বুড়ো সকলেই এর ব্যবহারে নিয়মিত হয়ে উঠে।

এখন আর শিশুরা রাতে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে জেগে উঠে না, বরং ঘুমের মাঝেই তারা নানান জিনিষ শেখে, দর্শনীয় আর ঐতিহাসিক স্থান সমূহ ভ্রমন করে, বিজ্ঞানের খুঁটিনাটি বিষয় গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে শেখে। বয়স্ক মানুষেরাও এখন আর নির্ঘুম রাত কাটায় না, ড্রিম মড্যুলারের বদৌলতে তারাও ঘুমে ঘুমে দারুণ সব স্বপ্ন দেখতে দেখতে রাত পার করে দেয়। কর্মব্যস্ত যুবক-যুবতী কিংবা মধ্যবয়স্করা আর সোস্যাল মিডিয়াতে মেতে উঠে না, তাদের একটা বড় অংশই নিজ নিজ চাহিদামত কিংবা নির্ধারিত প্রিসেট অনুসারে ড্রিম মডুলারে ডুবে গিয়ে স্বপ্নে স্বপ্নে সময় পার করে।

আমার অবস্থাও তার ব্যতিক্রম কিছু না। দিনভর কাজ করে যে ইউনিট সংগ্রহ করি, তার বড় একটা অংশ খাবার আর লিভিং রেন্টালে খরচ করে অবশিষ্ট যা থাকে তার কিছুটা খরচ করে ড্রিম মডুলারের ভিন্ন ভিন্ন আপগ্রেড সাব‍্‍সক্রাইব করি। আর তারপর শরীর আর মনের প্রশান্তি লাভের আশায় ড্রিম মডুলার সচল করে ঘুমের অতলে ডুবে যেতে শুরু করি। তারপর ফের সকালে ঠিক নির্দিষ্ট সময় জেগে উঠি। আর এভাবেই আমার দিন গুলো কেটে যাচ্ছে।‌

সেদিন সন্ধ্যায় কাজ শেষে ফিরে কি মনে করে যেন নিউজ আর্কাইভ ব্রাউস করতে শুরু করলাম। অবস্য সেসব জুড়ে কেবল উন্নতি, সম্ভৃদ্ধি আর নানান মাইল ফলক স্পর্শ করার গদবাধা নিউজ দিয়েই ভর্তি। এইসব নিউজের কারনেই এখন আর কেউ নিউজ আর্কাইভ ঘাটে না। বোরিং নিউজ গুলো স্ক্রল করতে করতে বেখেয়ালে একটি লিংকে ক্লিক লেগে যায়। পর পর কয়েকটি উইন্ডো পর্যায়ক্রমে চালু-বন্ধ-চালু হয়ে একটি নিউজ উইন্ডোতে গিয়ে স্থির হয়। নিউজটড অটো-প্লে মুডেই ছিলো, তাই সয়ংক্রিয় নিজেই সংবাদ উপস্থাপন করতে শুরু করলো।

একজন ব্যক্তি বলে যাচ্ছে-
    আপনি যখন এই নিউজটি শুনছেন ঠিক সে সময়ের নিরীক্ষা অনুযায়ী গোটা পৃথিবীতে মানুষের বুদ্ধিমত্তার বিকাশ শূন্যের ঘরে অবস্থান করছে। একজন সাধারন মানুষের মস্তিস্কের একটিভিটি আর একটি ডেটা রেকর্ডেট নিন্ম স্তরের বি-২৫২ টাইপের গৃহস্থলির কাজের রোবটের একটিভিটি এক সমপর্যায়ের। আর এই সমীক্ষাটি কেবল গত ১৫ বছরের মধ্যে যারা জন্মগ্রহণ করেছে তাদের জন্যে নির্ভুল ভাবে প্রমাণিত। আর যদি এই ধারা অব্যহত থাকে তবে আগামি ৭০ থেকে ৯০ বছর পর বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন জীবিত মানুষের সংখ্যা দাড়াবে শূণ্যের কোঠায়। যদিও ভবিষ্যতকে একদম নির্ভুল বলা সম্ভব না, কিন্তু সমীক্ষা অনুসারে ৭০ থেকে ৯০ বছর পর মানুষ আর একটি রেকর্ডেড মিডিয়া প্লেয়ারের মাঝে কোন পার্থক্য থাকবে না। তারা হবে আদি গুহা মানবের আধুনিকে রূপান্তরিত গৃহবাসী বুদ্ধিহীন মানব সন্তান।

    আর এই ঘটনাটির জন্যে যে জিনিষটি অবদান রেখেছে, সেটি হলো- আমাদের অতি প্রিয় 'ড্রিম মডুলার'। ড্রিম মডুলার কেবল আমাদের স্বপ্ন দেখাকে নিয়ন্ত্রনই করছে না, বরং আমাদের স্বপ্ন দেখবার স্বাভাবিক ক্ষমতাকে নষ্ট করে দিয়েছে। আর একই সাথে প্রকৃতিও আমাদের এই অবিবেচিত কার্জক্রমটির প্রতিশোধ তুলে নিয়েছে। সে মানুষের মস্তিস্কের বির্বতনকে রূখে দিয়ে ছুড়ে ফেলেছে একদম বিবর্তনের শুরুর পূর্বের অবস্থানে।

    এই সত্যটি উৎঘাটনের পর যখন তা উপলদ্ধি করতে পারলাম, ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সবাই এখন এই ড্রিম মডুলার নামক দুঃস্বপ্নটাতে বন্দি পড়ে গেছে। তবুও নিজেকে স্বান্তনা দেবার উদ্দেশ্যে ভাবি- হয়তো দুনিয়ার কোন এক কোণে কোন এক গোষ্ঠি এখনো এই দুঃস্বপ্ন হতে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখেছে। গড্ডালিকার এই প্রবাহে আমাদের মত গা ভাসিয়ে দেয় নি। হয়তো তারাই বিবর্তনের ধারাকে অক্ষুন্ন রেখে মানুষের মত মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকবে।

যদিও সেই আশাটি একদম ক্ষীণ।




নিউজ পোর্টালটার নিউজ শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে তা বন্ধ করে দিলাম। তারপর আমার ড্রিম মডুলারটি চালু করে ঘুমের অতলে নিমজ্জিত হতে শুরু করলাম। স্বপ্নের মাঝেই আমার ড্রিম মডুলারটি এমন বিচলিত করার মত স্মৃতিটি ঢেকে দিয়ে সকালে আমাকে একটি ফুরফুরে মেজাজ দিয়ে জাগিয়ে তুলবে।






বৃহস্পতিবার, মে ৩০, ২০১৯

অনুবাদ গল্পঃ রাজা এবং চিত্রশিল্পী


সে অনেক...অনেকদিন আগের কথা। সেই দূর সিমান্ত পেরিয়ে সাগরের নীল ঘেষে ছিল এক রাজ্য। গল্পে গল্পে আমরা যে সুখ-সম্মৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ রাজ্যের কথা বলি, এই রাজ্যটি ছিলো ঠিক তারই এক জলজ্যান্ত উদাহরণ। সেই রাজ্যে গরীব থাকলেও কেউ অনাহরী ছিলো না। ক্ষুধা পেটে নিয়ে কেউ ঘুমাতে যেতো না। অভাবে স্বভাব নষ্ট করে কেউ সেখানে চুরি করতে যেতো না। পরিপূর্ণ সুখের নগরি বলতে আমরা যেমনটা কল্পনা করি, রাজ্যটি ছিল ঠিক সেই রকমের। 

কিন্তু এত সব পূর্নতার মাঝেও সেখানে একটি অপূর্ণতা ঠিকই উপস্থিত ছিলো। সেই রাজ্যের যে রাজা, সে সুখে থাকলেও শারিরিক ভাবে সে ছিলো অপূর্ণ। সেই ছোট্ট কালে একবার দারুণ অসুস্থ হয়ে তাকে হারাতে হয় তার একটি পা আর একটি চোখ। অথচ শারিরিক এই অপূর্ণতা কখনোই তার হৃদয়ে ভালোবাসার কমতি ফেলেনি। যেমনটি তার হৃদয় ছিলো কোমলোতায় পরিপূর্ণ তেমনি তার মগজ ছিলো সুক্ষ্মবুদ্ধিতে ভরপুর। আর তাইতো রাজ্যের সবাই তাদের এই প্রজাবৎসল রাজাকে সত্যিকার অর্থেই হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতো, তার মঙ্গল কামনা করতো। 

তো একদিনের কথা, সেদিন রাজা দরবারের কাজ শেষ করে তার প্রাসাদ ঘুরে ঘুরে দেখছিলো। প্রাসাদের হলঘর ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখতে গিয়ে চোখ পড়লো তার পূর্বপুরুষদের তৈলচিত্রের দিকে। চিত্রে তার সব পূর্বপুরুষ ব্যক্তিত্ব দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। এই হল দিয়ে পার হবার সময় ছবিগুলোতে চোখ পড়লেই গর্বে তার বুক ফুলে উঠে। সে জানে, তার মতই তার অনুজেরা এই হল দিয়ে হেঁটে যাবার সময় গর্বিত হবে। তারা এই তৈলচিত্র দেখেই তাদের পূর্বপুরুষদের বুঝতে শিখবে, স্মৃতিতে জড়িয়ে রাখবে। তাদের ব্যক্তিত্ব আর মহত্বকে নিজেদর মধ্যে ধারণ করবে। 

এইসব ভাবতে ভাবতেই মনে পড়লো, পূর্বপুরুষদের এই সারি সারি ছবির মধ্যে এখনো তার ছবিটি স্থান পায় নি। আর পারবেই বা কিভাবে! তার এই অপুর্ণ শারিরিক অবস্থা এতটা প্রসন্ন হয়নি যে বলিষ্ঠ একটি চরিত্র ঐরকম একটি তৈলচিত্রে ফুটে উঠবে। এই ভেবেই হঠাতই তার মন খারাপ হয়ে উঠলো। তারপরও সে হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নয়। পরবর্তি দিনই রাজসভায় সে এই কথা উঠালো। আর তারপরই নানা রাজ্যের চিত্রকরদের তার রাজদরবারে নিমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হলো। 

দূর দূরান্ত থেকে অনেক নামীদামী চিত্রকর উপস্থিত হলো সেই দরবারে। উপস্থিত সেই মজলিসে রাজা বললেন- 

আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ আমার আমন্ত্রণে সাড়া দেবার জন্যে। আমি খুবই আনন্দিত যে আপনারা এত অল্প সময়ে নিজ নিজ ব্যস্ততা ফেলে আমরার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে আমার দরবারে উপস্থিত হয়েছেন। অবশ্য এভাবে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণও রয়েছে। 

আপনারা সকলেই জানেন আমাদের এই রাজপরিবারের শেকড় এই রাজ্যের গোড়াপত্তন থেকেই রাজ্যকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করে আসছে। আমার সকল পূর্বপুরুষেরা বেশ সফলতার সাথেই তাদের এই রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ আর নিরাপত্তা প্রদাণ করেছে। আর সেই ধারাবাহিকতায় আজকে এই সিংহাসনে আমার অবস্থান। 

পূর্বপুরুষদের মত না হলেও আমি চেষ্টা করেছি আমার সর্বোচ্চোটা দিয়ে তাদের এই সফলতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে। কিন্তু তবুও আমার শারিরিক অপূর্ণতা আমাকে কিছু বিষয় থেকে হয়তো পিছিয়ে রেখেছে। হয়তো আমার এই অপূর্ণতা আমার মাঝেও একটি হীনমন্যতা সৃষ্টি করেছে। আর সেই হীনমন্যতার কারণেই এখন অব্দি আমি আমার পূর্বপুরুষদের পারিবারিক তৈলচিত্রের সাথে নিজের একটি চিত্র এখনো স্থান দিতে পারি নি। 

বন্ধুগন, অনেক দেরিতে হলেও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার পূর্বপুরুষেরা তৈলচিত্রের যে মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের নিজ নিজ বৈশিষ্ট আর বলিষ্ঠতার বার্তা তাদের অনুজদের নিকট পৌঁছানোর জন্যে রেখে গেছেন; সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আমিও আমার একটি চিত্র আমার পূর্বপুরুষদের সাথে রেখে যেতে চাই। যাতে আমার পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের তৈলচিত্র দেখে আমাদের বুঝতে পারে, অনুধাবন করতে পারে, তৈরি করতে পারে আপন বৈশিষ্ট আমাদের আদলে। 

সম্মানিত বন্ধুগন, আপনারা সকলেই আমার শারিরিক অপূর্ণতা লক্ষ করেছেন। আমি চাই না আমার এই শারিরিক অপূর্ণতা সেই চিত্রে স্থান পাক। বরং আমি চাই এই শারিরিক অপূর্ণতা ঢেকে এমন একটি তৈলচিত্র তৈরি হোক, যা দেখে আমার পরবর্তী প্রজন্মের অনুজেরা অনুপ্রেরণা পাবে; যেমনটি আমি আমার পূর্বপুরুষদের চিত্র দেখে পেয়েছি। 

আর এমন একটি অসাধারণ চিত্র অঙ্কনের দায়িত্ব আমি আপনাদের উপর অর্পন করছি। যদি আপনাদের মাঝে কেউ এই অসম্ভবটি সম্ভব করতে পারেন তাকে এই দরবার হতে পুরস্কৃত এবং সম্মানিত করা হবে। 



রাজার এমন আহ্বানে সকল চিত্রশিল্পী চিন্তায় পড়ে গেলো। একজন রাজা, যার একটি চোখ এবং একটি পা নেই; আদৌ কি তার এমন কোন চিত্র অঙ্কন করা সম্ভব যা হবে তার পূর্ববর্তী পুরুষদের মত বলিষ্ঠ আর আকর্ষনীয়! নামী দামী সকল চিত্রকরই অনুধাবন করলেন এমন আকর্ষণীয় কোন চিত্র আসলে তৈরি করা সম্ভব নয়। আর যদি চিত্রে ভুল করে কেউ তার এই অপূর্ণ প্রতিকৃতি ফুটিয়েই তোলে তাতে রাজার আপন ব্যক্তিত্ব পরবর্তী প্রজন্মের নিকট প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে রইবে। আর সেটি দেখে রাজার মনক্ষুন্ন হতে পারে, যার ফলাফল হিসেবে মিলতে পারে কঠিন শাস্তি। তাই একে একে সকল চিত্রশিল্পীই নানান ছুতোয় নিজেদের ব্যর্থতা প্রকাশ করতে লাগলেন।  


কিন্তু আমন্ত্রিত এই চিত্রশিল্পীদের মাঝেই এক অখ্যাত চিত্রকর হাত তুলে রাজার দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা করলেন। রাজা যখন তার দিকে দৃষ্টি দিয়ে কথা বলবার অনুমতি দিলেন তখন সেই চিত্রকর বলল- আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনি যা চাচ্ছেন তা আমি তৈরি করে দিতে পারবো। কিন্তু আমি যেহেতু কোন খ্যাতমান চিত্রকর নই তাই আপনি আদৌ কি আমাকে আপনার তৈলচিত্রটি অঙ্কন করার অনুমতি প্রদাণ করবেন?

চিত্রকরের এমন কথা শুনে রাজা বললো- আমি খুব আনন্দের সাথেই আপনাকে আমার এমন একটি চিত্র অঙ্কনের অনুমতি প্রদাণ করলাম। 

বাকি সব নামী-দামী চিত্রকর এমন প্রস্তাবে হতবাক হয়ে গেলো। তারা ভেবেই পেলো না কিভাবে এমন একটি চিত্র তৈরি হবে যেখানে রাজার অপূর্ণতা ঢেকে তাকে বেশ আকর্ষণীয় ভাবে উপস্থাপন করা যাবে! তাও আবার সেটি আঁকবে এক অখ্যাত চিত্রকর, যার নাম আজকের এই মজলিসে উপস্থিত হয়েও অনেকের অজানা!


রাজার অনুমতি নিয়েই সেই অখ্যাত চিত্রকর তার কাজ শুরু করলেন। রাজদরবারের এক কোনে তাকে তার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি প্রদাণ করা হলো। আর সকল সরঞ্জমাদি হাতে পেয়েই শুরু করলো চিত্রকর তার কাজ। 

ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। সব চিত্রকরের মধ্যে ফিস্‌ফিস শব্দে নানা কথা ঘুরছে দরবার জুড়ে। সবাই আশঙ্কা করছে আজই গর্দান যাবে এই গর্দভ চিত্রকরের। 

দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা, সকলেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে চিত্রকরের তৈরি সেই কাঙ্খিত চিত্রটি দেখবার জন্যে। দিন গরিয়ে সন্ধ্যায় সকলেই ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত। কিন্তু তাদের আগ্রহের সামনে তাদের ক্লান্তি আর ক্ষুধার যেন মৃত্যু ঘটেছে আজ। 


সন্ধ্যার বেশ খানিকটা পর চিত্রকর তার হাতের ব্রাশটি রাখলেন। জানালেন তার কাজ সমাপ্ত হয়েছে। সাথে সাথেই দুইজন প্রহরী এসে চিত্রকরের ক্যানভাসটি রাজদরবারের  দিকে ঘুরিয়ে দিলো। মজলিসে উপস্থিত সকল মন্ত্রী, সকল সভাসদস্য, খ্যাতিমান চিত্রকরেরা এমনকি খোদ রাজা নিজেই সেই চিত্র দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে রইলেন! 

এ কি করে সম্ভব! এমনটাও যে হতে পারে তা কি ভেবে দেখেছিল কেউ! 

রাজা ঠিক যেভাবে তার তৈলচিত্রে তার ব্যক্তিত্ব আর বৈশিষ্টকে ফুটিয়ে তুলতে অনুরোধ করেছিলেন, ঠিক ঐভাবেই তাকে এই তৈলচিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিস্ময়ে কারও মুখে কোন রা'ও ফুটলো না। 

চিত্রকর তার ঐ তৈলচিত্রে রাজাকে একেছেন এমন একটি ভঙ্গিমায় যেখানে রাজা একটি ঘোড়ার উপর বসে আছেন, আর সে তার একটি চোখ বন্ধ করে আরেকটি চোখ দিয়ে তীরের নিশানা ঠিক করছেন। তার ঐ ভঙ্গীমায় তার সেই অপূর্ণ একটি চোখ আর একটি পা সম্পূর্ণরূপে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। আর একই সাথে প্রকাশ পাচ্ছে রাজার বিচক্ষণতা, বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব আর রাজা হিসেবে তার রাজ্যের রক্ষণক্ষমতা! 


তৈলচিত্রটি দেখে রাজা দারুণ খুশি হয়ে উঠলেন। আর একই সাথে ঐ অখ্যাত চিত্রশিল্পীকে এই রাজ্যের প্রধাণ চিত্রশিল্পী হিসেবে ঘোষনা দিলেন। সাথে আরও দিলেন মূল্যবান অনেক পুরস্কার। 





⚍⚌⚎⚌⚍⚌⚎  নীতিনিষ্ঠ মূল্যায়ন  ⚍⚌⚎⚌⚍⚌⚎
আমাদের সকলেরই উচিৎ অন্যের ঘাটতিকে উপেক্ষা করে তাদের ইতিবাচক দিককে গ্রহণ করা, তাকে প্রকাশ করা। আমাদের শেখা উচিৎ কিভাবে নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভাটি সকলের সামনে ইতিবাচক ভাবে উপস্থাপন করা যায়। যদি আমরা নেতিবাচক অবস্থাতেও ইতিবাচক চিন্তা করতে পারি, ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে পারি তাহলে আমরা আরও বেশি দক্ষতার সাথে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আমাদের সকল সমস্যাকে সমাধান করতে সক্ষম হবো। আমাদের ভেতর যেসকল দূর্বলতা ঘাপটি মেরে রয়েছে, সে সকল দূর্বলতা ঢাকতেই আমরা সদা সচেষ্ট থাকি। অথচ যদি ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ আমরা ঘটাতে পারি তখন আমাদের ঐসব দূর্বলতা কাটিয়ে আমরা সকলেই একই কাতারে এসে দাড়াতে পারবো। হতে পারবো নিজ নিজ ক্ষেত্রের শ্রেষ্ঠতম একজন! 








…………………………………………
মূল লেখকঃ অজ্ঞাত
সোর্সঃ "Moral Stories" via pinterest.com

বুধবার, আগস্ট ০২, ২০১৭

গল্পঃ ইগো বিফোর থট্‌স


বছর দশেক আগে ছোট একটা ছোট সফটওয়্যার তৈরির মাধ্যমে পরিচিতিতে আসে প্রতিষ্ঠানটি, তবে তখনও অবশ্য প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে পরিচয় দেবার মত অবস্থা ছিল না তাদের। গজিয়ে উঠা আর ১০ টা আইডিয়াকে সফটওয়্যার তৈরির মতই ছিল তাদেরটি। কিন্তু ভাগ্যগুণে তাদের সফটওয়্যারটি খুব দ্রুত জনপ্রিয়তার মুখ দেখতে পায়। বছর ঘুরতেই প্রতিষ্ঠিত নানা সফটওয়্যার ফার্ম সফটওয়্যারটিকে চড়া দামে কিনতে বিভিন্ন প্রস্তাব পাঠায়। কিন্তু ততদিনে সফটওয়্যারটির প্রতিষ্ঠাতা এন্ড্রু ফক্সও বুঝে যায় সফটওয়্যারটির প্রকৃত মূল্য। তাই আর সেটাকে বিক্রির দিকে খুব বেশি আগ্রহ দেখায় না, বরং আরও ঢেলে সাজাতে শুরু করে সফটওয়্যারটি। কয়েক বছর পরেই স্টক মার্কেটে এর স্টকের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে যায়। বলা হয়, শুরুতে যারা খুব কম টাকায়ও একটা স্টক কিনে রেখেছিলেন, তারাও এখন প্রায় মিলিয়নইয়র।

তবে তারা কেবল একটা সফটওয়্যারের পেছনেই আটকে থাকে নি, ব্যবহারকারীর পছন্দ বুঝে ধীরে ধীরে তার সাথে যুক্ত করেছে আরও নানা ধরনের সফটওয়্যার। কয়েক বছর পর অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়াল যে- দুনিয়ার প্রতিটি শহর থেকে খুঁজলে অন্তত একজন পাওয়া যাবে যিনি এই সফটওয়্যারটি নিয়মিত ব্যবহার করে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে বাকি সকল আইডিয়া সমৃদ্ধ সফটওয়্যার গুলি এর সামনে নস্যি হয়ে গেল। যারা সুযোগ কাজে লাগাতে চেয়েছে তারা মোটামুটি একটা চুক্তির মাধ্যমে তাদের সুবিধাকে এই সফটওয়্যারটির সাথে জুড়ে দিতে লাগলেন। এভাবে চলতে চলতে যখন ১০ বছর পার করে ফেলল, তখন তাদের চাহিদা আকাশচুম্বী!

ধীরে ধীরে আইডিয়া খুঁজে তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে উঠে পড়ে লাগল এন্ড্রু ফক্সের গড়ে তোলা 'ফক্স' প্রতিষ্ঠানটি। সেই ধারাবাহিকতায় প্রথমে আসল বট। বট গুলি মূলত রোবটের মত, তবে এদের কোন ফিজিক্যাল ব্যাপার নেই। মানে এটা পুরোটাই একটা সফটওয়্যার নির্ভর রোবট। নির্দিষ্ট নির্দেশনার ভিত্তিতে এরা বিরামহীন কাজ করে যেতে পারে। বটগুলিও তাদের সফলতার অংশ হয়ে উঠল। আর এরপরই আসল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের আইডিয়াটি।

নির্মাতা, রক্ষণাবেক্ষণ আর সমর্থনের জন্যে তখন ফক্স-এর হাজার খানিকের বেশি এমপ্লয়ি রয়েছে। তবুও আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই ব্যাপারটি প্রধান নির্মাতা এন্ড্রু ফক্স একদম নিজ হাতে শুরু করেন। অনেকেই তখন কানা-ঘুষা শুরু করেছিল যে এটা হতে যাচ্ছে এন্ড্রু ফক্সের দ্বিতীয় সন্তান! অবশ্য কথাটা যে খুব ভুল বলেছে তাও নয়। যে আগ্রহ আর ধৈর্য নিয়ে তিলে তিলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স সফটওয়্যারটি গড়তে শুরু করেছিল এন্ড্রু তা দেখে যে কারোরই মনে হতে বাধ্য সেটা। প্রথম কয়েক মাস তো নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়েই কাজ করে গেছে সে। তারপর মোটামুটি যখন তার মনে হল সফটওয়্যারটির একটি বেসলাইন তৈরি হয়ে গেছে তখন ডার ডেভেলপার টিমকে ডেকে বুঝিয়ে দিলেন কোন লেভেলে কি করতে চাইছেন তিনি।

মোটামুটি বছর খানিক বাদে তাদের এই প্রজেক্টটি একটা অবস্থানে পৌঁছে গেলো। যদিও একে এখনো সম্পূর্ণ বলার কোন অবস্থান তৈরি হয়নি, কিন্তু বলা যায় এটি তখন এন্ড্রুর স্বপ্নের একটা ধাপে পৌঁছে গিয়েছিল। এন্ড্রু খুব আগ্রহ নিয়ে পুরো সময় তার ডেভেলপার টিমের কাজের তদারকি করে গেছেন, নিজেও কাজ করে গেছেন সমান তালে। প্রাথমিক ভাবে তার এই দ্বিতীয় সন্তানের একটি রূপ তারা কিছুদিনের মাঝেই টেস্ট করতে যাচ্ছিল। কিন্তু বাদ সাধল তার সহকারী এবং ডেভেলপার টিমের ম্যানেজার ওয়ালেস রাসেল। যদিও এই প্রজেক্টের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত সে এর সাথেই কাজ করে গেছে, তবুও টেস্ট রিলিজের জন্যে সে বেঁকে বসল। তার কথা- এটি এখনো টেস্ট করার জন্যেও প্রস্তুত নয়। আর পরামর্শ দিল- একে সিমুলেট করে টেস্ট করার জন্যে।

এন্ড্রু'র এতদিনের স্বপ্ন যখন প্রায় সফলতার কাছাকাছি, তখন এমন বক্তব্য শুনে সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নি। একদম রাগের মাথাতেই ওয়ারলেসকে বের করে দিলেন ফক্স থেকে। ওয়ারলেসও একদম বিনা বাক্যে বের হয়ে গেলেন সেখান থেকে। ঘটনার পর থেকে অনেকেই ওয়ালেসের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কিছু একটা শোনার জন্যে উঠে পড়ে লেগে থাকে, কিন্তু ওয়ালেস এই ব্যাপার নিয়ে কোথাও মুখ খোলেন নি। একই সাথে প্রতিষ্ঠিত অনেক ফার্ম থেকেই লোভনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়, এসবকেও এড়িয়ে যান ওয়ালেস। কিছুদিন পর একদমই আলোচনার আড়ালে পড়ে যান তিনি।

কয়েক মাস বাদে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের টেস্ট বিল্ড তৈরি হয়ে যায়। অনেকেই এই ব্যাপারটির জন্যে এখন মুখিয়ে আছে। এন্ড্রুও খুব ঢাক-ঢোল পিটিয়ে তার নতুন প্রজেক্টের টেস্ট রিলিজের খবর সবাইকে জানায়। এমন নয় যে এই একই আইডিয়া নিয়ে আর কেউ তখন কাজ করছিল না, কিন্তু তবুও তার এই আইডিয়াটি অন্য সবার থেকে আলাদা অবস্থান পায় তার পূর্ববর্তী কাজের জন্যে। সবাই ধরেই নিয়েছিল এন্ড্রুর হাত ধরে পৃথিবী-বাসী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দুনিয়াতে প্রবেশ করত যাচ্ছে।

নির্দিষ্ট সময়েই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে দুটো উন্নতমানের বিশেষ রোবটের মাঝে স্থাপন করা হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের একটি বিশেষ রুমেও আবদ্ধ করা হয়। তবে রোবট হলেও দুটো হাত আর মাথা ছাড়া তাদের আর কোন অঙ্গ দেয়া হয়নি। দুটো রোবটকে সামনা-সামনি বসিয়ে দিয়ে চালু করে দেয়া হয় তাদের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্রেইন!

প্রথম আধঘণ্টা সিস্টেম বুট-আপ, রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট, মেমরি সিনক্রোনাইজেশন, প্রাইমারি ডেটা রিয়েলাইজেশন সহ আরও নানা কাজ করতে করতেই কেটে যায়। দেখে মনে হচ্ছিল দুটো অসাড় বস্তু মুখোমুখি বসে আছে। আমন্ত্রিত অতিথি যারা সরাসরি এটা পর্যবেক্ষণ করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাদের মাঝে কয়েকজন টিপ্পনীও কাটতে শুরু করেছিল ততক্ষণে। ঘুরেফিরে এন্ড্রুর কানেও ওসব কথা চলে আসছিল, তবে এন্ড্রু সেসব নিয়ে মোটেই ভাবছিল না। সিস্টেম কন্ট্রোল এন্ড মনিটরিং এর দিকে বেশ মনোযোগ ধরে রাখছিল সে। সে মনে প্রাণে বিশ্বাস রাখে তার কাজের উপর। সে জানে, সময় নিয়ে হলেও তার আইডিয়াটি এখন বাস্তবতার আয়নায় প্রতিফলিত হবে।

আর হলও তাই, আধ ঘণ্টা পরই রোবট দুটো প্রায় একই সাথে ফটো সেলের আলো জ্বালিয়ে কৃত্রিম চোখ দুটো মেলে চাইতে শুরু করল। প্রায় অবিকল একজন আরেকজনকে দেখে কিছুটা অবাক হওয়ার ভানও ফুটিয়ে তুলল তাদের কৃত্রিম চেহারা দুটোতে। বেশ অনেকটা সময় নিজেকে আর নিজের সামনে বসে থাকা অবিকল তার মতই দেখতে আরেকটি রোবটকে উভয়ে পর্যবেক্ষণ করে কাঁটাল।

ওভাবে কিছু সময় কাটাবার পর তারা তাদের হাত দুটোর কার্যক্ষমতা দেখতে শুরু করল। একটা বাচ্চাকে হুট করে বড় মানুষের শরীরে ঢুকিয়ে দিলে যেভাবে সে নিজেকে আবিষ্কার করে অবাক হয়, ঠিক ঐরকমই একটা অবাক চাহনি নিয়ে নিজেকে নিজে তারা আবিষ্কার করছিল। আঙ্গুল গুলো নেড়ে, হাতের কব্জি এদিক সেদিক বাঁকিয়ে, মুঠো করে আবার ছেড়ে দিতে দিতে হাত নাড়াচাড়া করতে লাগল। উল্টে পাল্টে বারবার নিজেদের হাত গুলো দেখছিল তারা। এরপর একজন হাত দিয়ে নিজের কৃত্রিম চেহারাটকে ছুঁয়ে দেখতে শুরু করল, একজনের দেখা দেখি আরেকজনও একই কাজ করতে শুরু করল। চোখ, মুখ, ঠোট, গাল, মাথা সব একে একে হাত বুলিয়ে, আঙ্গুলে ছুঁয়ে বুঝে নিতে শুরু করল।

সবচেয়ে মজার ব্যাপারটি ঘটল যখন তারা তাদের স্পিকিং সিস্টেমটিকে ব্যবহার করতে শুরু করল। সাধারণত প্রোগ্রাম গুলিতে একটা সাধারণ ভাষা ইন্সটল করে দেয়া হয়। কিন্তু এটি সাধারণ কোন প্রোগ্রাম নয়, এটি একটি বিশুদ্ধ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির একটি পদক্ষেপ। বলতেই হবে, এন্ড্রু এখানেই দারুণ একটা মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছে। সে তার সিস্টেম মডেলিং এর সময় প্রাথমিক কোন ভাষা সরাসরি ব্যবহারের নির্দেশনা দেয়নি। যদিও সিস্টেম লাইব্রেরিকে ইংরেজি ভাষাটা ব্যবহারের জন্যে আলাদা কিছু অনুমতি দিয়ে রেখেছিল। তবে সেটা সরাসরি নিজে নিজে ব্যবহারের জন্যে একদম শুরুতেই দেয়া হয়নি। ব্যাপারটা অনেকটা বাচ্চাদের মত, ওরা যেমন একদম শুরু থেকেই কোন শব্দের ব্যবহার করতে পারে না, ঠিক তেমনি এই বিশেষ আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্ট রোবট দুটিও। ওদেরও নির্দিষ্ট করে দেয়া কোন ভাষা ছিল না। ওদেরকেও নিজে নিজে এটা রপ্ত করতে হবে। আর কেবল এরপরই তারা ঐ ভাষায় নিজের পরিধি অনুসারে কথায় ব্যবহার করতে পারবে।

যখন আমন্ত্রিত পর্যবেক্ষকরা এটা বুঝতে পারল তখন তাদের অবাক হওয়ার মাত্রাটা একদম চুড়ায় গিয়ে পৌঁছেছিল। কেউ কেউ এটাকে একটা মূর্খতা বলতে শুরু করল, আর কেউ কেউ সত্যিই এই আইডিয়াটা দেখে চমৎকৃত হলেন। তবে ঐদিনের মত আর ওখানে বসে থাকার কোন মানে ছিল না। প্রায় ৩ ঘণ্টার একটা শো শেষ করে সবাই ফক্সের প্রেজেন্টেশন রুম ত্যাগ করল। তবে ত্যাগ করলেও পর্যবেক্ষণ থেমে গেলো না। এই আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্ট রোবট দুটোর কার্যক্রম সরাসরি দেখবার জন্যে ইতোমধ্যে ফক্স একটি প্রাইভেট লিংক লাইন তৈরি করে নিয়েছিল। আমন্ত্রিত অতিথিদের সবাইকে সেই লিংক লাইনে যুক্ত করে নেয়া হয়েছিল আগে থেকেই। এখন যতক্ষণ এই এ.আই রোবট দুটোর কার্যক্রম চলবে ততক্ষণ যে কোন সময়ই যে কোন স্থান থেকে অতিথিরা এর কার্যক্রম দেখে যেতে পারবে।

প্রায় ৭ দিন পার হবার পর ধীরে ধীরে এ.আই. রোবট দুটো কথা চালাবার মত বেশ অনেকগুলি শব্দ রপ্ত করতে শিখে গিয়েছিল। আস্তে আস্তে তাদের লাইব্রেরি পারমিশন গুলো ব্যবহার করে লাইব্রেরি হতে তাদের মেমরিতে ডেটা ট্রান্সফার করতে শুরু করেছে ততদিনে। প্রায় সকল এনালাইসিসের ফলাফল পজিটিভ দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে দেখে পুরো টিম যারপরনাই খুশি। তাদের আনন্দটা ছিল দেখবার মত। আর এন্ড্রু! সে যেন  কাঁচ ঘেরা পর্দার এপাশে বসে নিজ দু'সন্তানকে কাচের ওপাশে দেখছিল। ঠোটের কোনের হাসি যেন তার পিছুই ছাড়ছিল না!

১৫ দির পার হবার পর বেশ কিছু বাগ জমা পড়ে, কিছু আপগ্রেডিং এর আইডিয়াও এক একজনের মাথায় আসতে থাকে। এর মাঝে এ.আই. রোবট দুটোকে তাদের ফক্সের প্রাইভেট সার্ভারের এক্সেস দেয়া হয়। সেখানে শেখার জন্যে ইতিহাস, ভাষা, ভূগোল, অর্থনীতি, বিজ্ঞান এমনকি গল্পের বইও দেয়া হয়। দেয়া হয় বিশাল এক মিউজিকের কালেকশন। আরও দেয়া হয় চলচ্চিত্র, গুরুত্বপূর্ণ স্থিরচিত্রের বিশাল এক সংগ্রহ। তারা এসবের প্রায় প্রতিটিকেই ছুঁয়ে দেখেছে। এ. আই. হিসেবে তাদের একটি দ্রুত কাজ করার প্রসেসর থাকায় মানুষের তুলনায় বেশ অনেক দ্রুতই তারা অনেক বিষয় আয়ত্ত করতে শিখেছিল। অবশ্য এটা অনুমেয় ছিল।

কিন্তু যেটা অবাক করেছে তা হল তাদের মিউজিকের পছন্দ! এ.আই. রোবট দুটোর আলাদা আলাদা মিউজিক পছন্দ ছিল। একটি রোবট খুব উচ্চতালের গান বার বার শুনতে লাগল। একই ধরণের গানগুলিকে আলাদা করে সেগুলিকে শুনতে লাগল। আর অন্যটি ঠিক তার বিপরীত কাজ করতে শুরু করল। সে তুলনামূলক হালকা তালের গানগুলিকে বেঁছে নিলো। বেছে বেছে একটা প্লে-লিস্ট তৈরি করে ঐ গান গুলিই বারবার করে শুনল সে। সে যখন গান শুনত, তখন অবিকল মানুষের মত করে চোখ বন্ধ করে সুর গুলিকে শুনত। যেন সুর গুলো তার চিন্তা-ভাবনা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

তবে এর থেকেও বড় অবাক হবার বিষয়টি এখনো তাদের জন্যে অপেক্ষা করছিল। ব্যাপারটি ধরা পড়ল প্রায় মাস খানিক পর। যারা রোবট দুটোকে নিরীক্ষণ করছিল তারা প্রথমে ব্যাপারটাকে ধরতেই পারে নি। আর ব্যাপারটি সত্যিই খুব সাধারণ ছিল। এত সাধারণ যে সেটাকে এমনিতে কেউ আমলেই নিতো না। কিন্তু এনালাইসিস করে ধীরে ধীরে পর্যবেক্ষকদের কাছে ব্যাপারটা ধরা পড়ে।

বাচ্চারা যেমন কথা বলবার সময় একটি শব্দের বদলে অন্য আরেকটি সুবিধাজনক শব্দ ব্যবহার করে, চাই সেটা আদৌ কোন শব্দ হোক কিংবা না হোক। ঠিক প্রায় একই রকম করে রোবট দুটোও ক্রমাগত ভুল করে যাচ্ছিল। আর সময়ের সাথে যেন ভুলের পরিমাণও ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছিল। শেষের দিকে তো এমন অদ্ভুত শব্দ প্রয়োগেই তারা প্রায় কম্যুনিকেট করতে শুরু করল নিজেদের মাঝে। প্রথমে এনালিস্টরা ওটা তাদের শব্দের সীমাবদ্ধতা হিসেবেই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘসময় এনালাইসিস করার পর নিরীক্ষকেরা বুঝতে পারল এটি আসলে ভুল নয়! এটি একটি নতুন ডেভেলপ করা ভাষা! যা কোন মানব সভ্যতার অংশ নয়‍!!

ওদিকে লাইভ টেলিকাষ্টেও সেটা পৌঁছে গিয়েছিল সকল আমন্ত্রিত অতিথিদের কাছে। তারাও একটা সময় এ.আই. রোবট দুটোর এমন অদ্ভুত আচরণ দেখে অবাক হতে শুরু করেছিল। আর তাদের এনালাইসিস টিম গুলোও এটা নিয়ে নিজেদের মতামত তখন নানা মিডিয়াতে প্রকাশ করতে শুরু করেছিল। আর এই অবস্থাটাই বেশ বেসামাল করে দেয় ফক্স কোম্পানিটিকে।

এন্ড্রুর বুঝতে অসুবিধা হল না কি ঘটছে সুরক্ষিত কাঁচের দেয়ালের ওপাশে। এ.আই. রোবট দুটো নিজেদের জন্যে আলাদা ভাষা তৈরি করে নিয়েছে নিজেদের সুরক্ষার জন্যে। আর ভাষাটা এমনভাবেই তৈরি করেছে যে ওটা এখন পর্যন্ত ডিকোড করা সম্ভব হয়নি। অবস্থাটা আবিষ্কারের পর প্রায় ৩ দিন পার হয়ে গেছে। ফক্সের স্পেশাল ডিকোডার টিম এটি নিয়ে এখনো আশার আশ্বাস দিতে পারে নি। তারা এখনো বুঝতেই পারছে না ঠিক কোথা থেকে পিক করতে হবে।

মিডিয়ার চাপ, টেক দুনিয়ার বিশেষজ্ঞদের মতামত আর জাতীয় পর্যায়ের সিকিউরিটির নির্দেশনায় অবশেষে ৪৮ দিনের মাথায় রোবট দুটোকে বিকল করতে হয়। এন্ড্রু বেশ ভালো করেই বুঝেছিল এরচেয়ে বেশি সময় অপেক্ষা করাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। শুধুমাত্র লিমিটেড রিসোর্স ব্যবহার করেই এ.আই. রোবট দুটো যা করতে সক্ষম হয়েছে তার বিপরীতে যদি পুরো ইন্টারনেটটা তাদের হাতে পেয়ে বসে তাহলে আর তাদের অগ্রগতির কথা কল্পনা করাও অসম্ভব। এতদূর এসে ওয়ালেস রাসেলের কথা তার মনে পড়ল। বুঝল কত বড় ভুল সে করে গেছে প্রিয় বন্ধু আর সহকর্মী ওয়ালেসের কথাটা না শুনে। শুধুমাত্র রাগ আর জেদের বসে সে পুরো ব্যাপারটিকে বুঝে নিতে অসমর্থ হয়েছিল। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে এখন পুরো ফক্স কোম্পানিকে। যারা আশা করে ছিল এই এন্ড্রু ফক্সের হাত ধরেই পৃথিবী আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের দুনিয়াতে পদার্পণ করবে, তারাই এখন বলে বেড়াচ্ছে এন্ড্রু দুটো মারণাস্ত্র তৈরি করেছে দুনিয়ার জন্যে! তাদের বিশ্বাস আর আস্থা এখন পুরোপুরি উবে গেছে ফক্সের উপর থেকে।

অবিচারের প্রতিফলন বুঝি এভাবেই দৃশ্যমান হয়। ওয়ালেস রাসেলের প্রতি অবিচার আজ বিশ্ববাসীর কাছে বিশ্বাস হারা করেছে এন্ড্রু ফক্সকে!








বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৭, ২০১৭

অনুবাদ গল্পঃ হারানো ওয়ালেট


দিনটি আর দশটি দিনের মতই সাধারণ একটি দিন ছিল। বেশ ঠাণ্ডা পড়ছিল ঐ দিনগুলোতে। সেদিন যখন বাসায় ফিরবার পথ ধরে হেটে যাচ্ছিলাম তখন বেখেয়ালেই কিছু একটা পা দিয়ে মারিয়ে গেলাম। নিচু হয়ে দেখলাম একটা ওয়ালেট পড়ে আছে সেখানে। কেউ সম্ভবত তার ওয়ালেটটি এ পথে হাটতে গিয়েই হারিয়েছে। উবু হয়ে ওয়ালেটটি তুললাম রাস্তা থেকে। কার ওয়ালেট তা জানার জন্যে ভেতরে ঠিকানা খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু মাত্র তিনটি ডলার আর এক কোণে থাকা এক দুমড়ানো একটা ভাজ করা কাগজ ছাড়া তাতে আর কিছুই দেখতে পেলাম না। মনে মনে আশা করলাম কাগজটিতে হয়তো তার পরিচয় পাওয়া যাবে। 

ওয়ালেটের কোণ থেকে ঐ দুমড়ানো কাগজটি সাবধানে বের করে নিয়ে আসলাম। দেখলাম প্রায় বিবর্ণ একটি চিঠির খাম সেটা। আর এমন ভাবে ওয়ালেটের কোণে রাখা ছিল খামটি, যেন বহুবছর ধরেই তার ঠিকানা ঐ কোণটি। খামটির অবস্থা প্রায় যাচ্ছেতাই রকমের ছিল, শুধুমাত্র ফিরতি ঠিকানাটি বাদে আর কিছুই খামটি গা থেকে উদ্ধার করা সম্ভব হল না। তবে আশার কথা হচ্ছে, খামটির ভেতর একটি চিঠির অস্তিত্বও অনুভব করতে পারছিলাম। শুধুমাত্র ওয়ালেটটির মালিকের খোঁজের আশায় আমি চিঠিটি খাম থেকে বের করে নিলাম। কিন্তু চিঠিটির উপরে থাকা তারিখটি দেখে আমার চোখ প্রায় কপালে উঠার যোগাড়। সেখানে তারিখ দেয়া আছে ১৯২৪ সালের একটি দিনের। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে লেখা চিঠি এটি!

দেখে বুঝলাম কোন এক মেয়েলি হাতের গুটি-গুটি অক্ষরে লিখা রয়েছে চিঠিটি। কাগজটি ছিল অমসৃণ নীল বর্ণের, যার বাম দিকের এক কোনায় চমৎকার একটি ফুল আকা। চিঠিটি পড়ার পর বুঝলাম এটি প্রিয় মানুষের কাছে লেখা এক পত্র, যেখানে লেখিকা হান্যা তার প্রিয় মানুষ মাইকেলের কাছে নিজের অপারগতা প্রকাশ করেছে। একই সাথে হান্যা যে তাকে মন থেকে প্রচণ্ড পরিমাণে ভালোবাসে তাও লিখা আছে চিঠিটিতে। শুধুমাত্র তাদের বয়সের পার্থক্য আর হান্যার মায়ের শক্ত বাঁধার কারণে সে তার প্রিয়পাত্রের সাথে যোগাযোগ রাখতে পারছে না বলেই এই অপারগতার প্রকাশ। হান্যা আরও লিখেছে, সে আজীবনই মাইকেলকে ভালোবেসে যাবে।

সন্দেহ নেই এটি হৃদয়বিদারক কিন্তু চমৎকার একটি চিঠি। কিন্তু শুধুমাত্র মাইকেলের নামটি ছাড়া চিঠি থেকে ওয়ালেটটির মালিক সম্পর্কে কোন ধারণাই পাওয়া গেল না। যেহেতু হান্যার একটি ফিরতি ঠিকানা ছিল, তাই আশা করলাম অপারেটরের সহায়তা নিয়ে এই ঠিকানার একটা কূল কিনারা করা সম্ভব হবে। ঠিকানাটির বিপরীতে যদি কোন ফোন নম্বর রেজিস্টার করা থাকে তাহলে কাজটি আমার জন্যে বেশ সহজ হয়ে যাবে।

চিঠিটি পকেটে ভরে ওয়ালেটটি হাতে নিয়েই দ্রুত বাড়ির দিকে রওনা হলাম। একটু দ্রুত করলে হয়তো সন্ধ্যার আগে আগেই ওয়ালেটটি তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারবো। বাসায় পৌঁছেই দ্রুত জামা পাল্টে অপারেটরকে ফোন দিলাম। বললাম- "অপারেটর, একটি অযাচিত অনুরোধ করতে যাচ্ছি আমি।" অপারেটর আমার কথাটি শুনে একটু সময় নিয়ে বলল, "বলুন"। সম্মতি পেয়ে আমি বললাম, "আসলে আমি একটি ওয়ালেট খুঁজে পেয়েছি রাস্তায়, আর ওয়ালেটটির মালিকের খোঁজ করতে চাচ্ছিলাম। আপনি কি আমাকে একটি ঠিকানার বিপরীতে কোন ফোন নম্বর রেজিস্টার করা আছে নাকি তা বলতে পারবেন? ঠিকানাটি আমি ঐ ওয়ালেটের ভেতর একটি চিঠি থেকে পেয়েছি।"

ওপাশ থেকে অপারেটর বলল- "আসলে এমন ব্যাপারে সরাসরি আমার সুপিরিয়রের সাথে কথা বললেই আপনার জন্যে ভালো হবে।" এরপর একটু থেমে যোগ করল- "আমি আপনার সমস্যাটির কথা বুঝতে পেরেছি। আর ঠিকানাটি চেক করেও দেখলাম এখানে একটি ফোন নম্বর রেজিস্টার্ড আছে। কিন্তু গ্রাহক নিরাপত্তার খাতিরে আমি আপনাকে ঐ নম্বরটি দিতে পারছি না। কিন্তু আপনার উদ্দেশ্যের প্রতি সম্মান করে আমি আপনার হয়ে সেখানে কথা বলতে পারি। আপনার ঘটনাটিও আমি সবিস্তরে তাদের জানাবো। এরপর যদি তারা যোগাযোগ করতে আগ্রহী হয় তাহলে আপনার সাথে তাদের যোগাযোগ করিয়ে দেবো।" 

সন্দেহ নেই, এটি একটি চমৎকার প্রস্তাব। আমি অপারেটরের কথায় রাজি হয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রাখলাম। তবে আমাকে খুব বেশি সময় ফিরতি ফোনের জন্যে অপেক্ষা করতে হয় নি। অল্প কিছুক্ষণ পরেই আবার অপারেটর আমাকে ফোন করল। বলল- "আপনার ঐ ঠিকানায় থাকা নম্বরটিতে আমি ফোনে কথা বলেছি। আপনার ঘটনা শুনে একজন ভদ্রমহিলা আপনার সাথে যোগাযোগ করতে সম্মত হয়েছেন।" এরপর অপারেটর আমাকে একটি নাম্বার দিয়ে ফোন রাখলেন।

অপারেটর থেকে পাওয়া নম্বরটিতে রিং করতেই ওপাশ থেকে একজন মহিলা ফোনটি রিসিভ করল। আমি খুব বিনীত ভাবে তাকে জিজ্ঞাস করলাম তিনি হান্যাকে চিনেন কি না। হান্যার নামটি শুনে মহিলা খুব অবাক স্বরে বললেন- "ওহ! আমার স্বামী এই বাড়িটি যে পরিবারের কাছ থেকে কিনেছিলেন তাদের একটি মেয়ে ছিল হান্যা নামে। কিন্তু সে তো প্রায় ৩০ বছর আগেকার কথা!" 

আমি আবার মহিলাটিকে জিজ্ঞাস করলাম- "আপনি কি জানেন ঐ পরিবারটি এখন কোথায় আছে?"

"ওভাবে তো জানা নেই, তবে শুনেছিলাম বেশ কয়েক বছর আগে এখানকার এক নার্সিং হোমে হান্যার মা'কে ভর্তি করাতে হয়েছিল", জবাবে বললেন মহিলা। "আশা করি ঐ নার্সিং হোমে খোঁজ নিলে তুমি হান্যার খোঁজ বের করতে পারবে।"

তিনি আমাকে ঐ নার্সিং হোমের নাম বললেন। তাকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন রাখলাম আমি। এরপর ফোন ডিরেক্টরি ঘেঁটে ঐ নার্সিং হোমের ফোন নম্বরটি বের করে ফোন লাগালাম সেখানে। রিসিপশন থেকে আমার ফোনটি রিসিভ করল। রিসিপসনিষ্টকে হান্যার মা'য়ের বর্ণনা দিয়ে জানতে চাইলাম তার সম্বন্ধে। রিসিপশন একটু সময় নিয়ে পুরানো আর্কাইভ ঘেঁটে জানাল- বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা সেটি, আর একই সাথে সে দুঃখও প্রকাশ করলেন। জানালেন এখানে আনার কিছুদিন পরই মহিলাটি মারা যায়। তবে তাদের কাছে একটি ফোন নম্বর আছে ঐ মহিলার এক স্বজনের। আরও জানালেন তাদের কাছে থাকা ঐ ফোন নম্বরটি সম্ভবত তার মেয়ের।

রিসিপশনিস্টের কাছ থেকে নম্বরটি নিয়ে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন রাখলাম। আবার ফোন লাগালাম নতুন নম্বরটিতে। সেখানেও এক মহিলা আমার ফোনটি রিসিভ করলেন। তার কাছে হান্যার খোঁজ করলে তিনি জানালেন, হান্যা নিজেও এখন একটি নার্সিং হোমে রয়েছে। 

এতদূর এসে পুরো ব্যাপারটিকেই এখন আমার বোকামি মনে হচ্ছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, কেন এই ছোট একটা ব্যাপার নিয়ে আমি এভাবে মেতে আছি?! এমন নয় যে ওয়ালেটটিতে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে কিংবা অনেক টাকা আছে ওয়ালেটটিতে। মাত্র তিনটা ডলার, আর আছে ৬০ বছর পুরনো একটি চিঠি। হয়তো ওয়ালেটের মালিকের কাছেও চিঠিটি এখন মূল্যহীন। আর আমি যেভাবে ব্যাপারটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করছি তা কি এখন যথেষ্ট হাস্যকর হয়ে উঠে নি?

কিন্তু এত ভাবনার পরেও আমি আবার নার্সিং হোমে ফোন করলাম, যেখানে এখন হান্যা অবস্থান করছে। এবারেও যথারীতি রিসিপশন থেকে ফোন রিসিভ হল। তাকে হান্যার সম্বন্ধে জিজ্ঞাস করলে তিনি জানালেন- "হ্যাঁ, আমাদের এখানে হান্যা অবস্থান করছে।"

ফোন ধরে রেখেই ঘড়ির দিকে তাকালাম। সময় যেন এর মাঝে উড়ে চলে গেছে। রাতের ১০টা বাজতে আর কিছু সময় বাকি। কারও সাথে দেখা করবার জন্যে এটা মোটেই ভালো সময় নয়। তারপরও আমি রিসিপশনে থাকা ভদ্রলোকটিকে জিজ্ঞাস করলাম আমি আজ হান্যার সাথে দেখা করতে পারবো কি না। লোকটি একটু ভেবে বললেন- "যদিও ব্যাপারটির অনুমতি নেই, তারপরও আপনি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে হান্যা যদি এর মাঝেই ঘুমিয়ে পড়ে তাহলে আর আপনাকে আমি কোন সহায়তা করতে পারবো না।"

অনিশ্চিত সুযোগ পেয়েও আমার বেশ আনন্দ লাগছিল এই ভেবে যে, অবশেষে আমি হান্যাকে খুঁজে বের করতে সক্ষম হয়েছি। আমি খুব দ্রুত নার্সিং হোমটিতে পৌঁছলাম। তখন সময় ১০টা পার হয়ে একটু বেশি। রিসিপশনে পৌছলে রিসিপশনিস্টের সাথে দেখা হল। পরিচয় দিতেই লোকটি আমাকে চিনতে পারলেন, একটু আগে তার সাথেই কথা হয়েছিল আমার। জানালেন হান্যা 'ডে রুমটিতে' এখনো টিভি দেখায় ব্যস্ত। তিনি নিজেই আমাকে হান্যার সাথে দেখা করাতে ডে রুমটিতে নিয়ে গেলেন এবং হান্যার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

রুপালি চুলের মায়াভর্তি চেহারার এক বৃদ্ধা বসে ছিলেন সেখানে। উষ্ণ হাসি উপহার দিয়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞাস করলেন এভাবে হন্ত-দন্ত হয়ে এত রাতে কি প্রয়োজনে এসেছি আমি। হান্যাকে আমি একদম শুরু থেকে সব বিস্তারিত বললাম। কিভাবে ওয়ালেটটি পেয়েছি, তারপর ওটা থেকে চিঠিটি পেয়ে কিভাবে হান্যার খোঁজ বের করেছি তার সবই তাকে জানালাম। এরপর পকেট থেকে চিঠিটি বের করে তার হাতে দিলাম। অবিশ্বাসী চোখে কাঁপা-কাঁপা হাতে তিনি চিঠির ভাজ খুললেন। চিঠির কোনায় থাকা ঐ ফুলটি দেখেই তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। তারপর ধীর-কণ্ঠে বললেন- "তুমি কি জানো? এই চিঠিটিই ছিল মাইকেলের সাথে আমার শেষ যোগাযোগ!"

এর বেশ কিছু সময়ের জন্যে আরেকদিকে ফিরে চুপচাপ বসে রইলেন। হঠাত এসে তার ক্ষত-স্মৃতি মনে করিয়ে দেবার জন্যে নিজেকে খুব বড় দোষী মনে হচ্ছিল। কিছুক্ষণ পর হান্যা আমার দিকে ফিরে বললেন- "আমি তাকে প্রচণ্ড ভালবাসতাম। কিন্তু তখন সবে মাত্র আবার বয়স ১৪, আর এসব জানতে পেরে মা খুব চটেছিলেন আমার উপর। বলেছিলেন আমি নাকি এসবের জন্যে তখনও বেশ ছোট। কিন্তু মাইকেল! তার মত হ্যান্ডসাম ছেলে এ জীবনে খুব কমই দেখেছি আমি। অবিকল যেন সেন কনারি ছিল সে!"

তার কথার প্রতিধ্বনি তুলেই যেন বললাম- "সেন কনারি! অভিনেতা?"

'হ্যাঁ', বললেন হান্যা."মাইকেল ছিল চমৎকার ব্যক্তিত্বের একজন। তুমি যদি তার খোঁজ বের করতে পারো তবে তাকে জানাবে, আমি এখনো প্রায়ই তাকে নিয়ে ভাবি। আর..."। বলে থামলেন তিনি; দেখে বোঝাই যাচ্ছিল কথাটা বলতে বলতে তার দারুণ সংকোচ হচ্ছে। ঠোট কামড়ে যেন নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি। বললেন- "...আর বলো, তাকে এখনো আমি ভালোবাসি, ঠিক যেমনটি আগে বাসতাম"। বলতে বলতেই চোখ থেকে তার অশ্রুফোটা গাল গড়িয়ে পড়তে শুরু করল। কিন্তু ঠোটের কোনে হাসির রেখা টেনে বললেন- "আমি কখনো বিয়ের কথা ভাবতে পারি নি, জানো? সম্ভবত মনের গহীনে যে মাইকেল লুকিয়ে ছিল, তার সমকক্ষ আর কাউকে ভাবতে পারিনি বলেই..."

বুঝলাম, হান্যাকে তো বের করতে পারলাম ঠিকই, কিন্তু তার মনের উঠানে উঠিয়ে দিয়ে গেলাম একরাশ বেদনা মিশ্রিত ঝড়ো বাতাস। মাইকেলের খোঁজ আর পাওয়া হল না। এতকিছু করেই বা কি করতে পারলাম তবে? 

হান্যাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম তার কাছ থেকে। সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসলাম নিচে। নার্সিং হোম থেকে বের হবার সময় দারোয়ান আমাকে জিজ্ঞাস করল- "যার সাথে দেখা করতে এসেছিলেন তার দেখা মিলল তবে?"

হেসে বললাম- "হ্যাঁ, মিলেছে।" এও জানালাম কেন দেখা করতে এসেছিলাম আমি। লাভের মাঝে একটা লাভ বলতে আমি এখন মাইকেলের শেষ নামটুকুও জানি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এর বেশি এগিয়ে যাওয়াটা আমার জন্যে আর সমীচীন হবে না। কথা বলতে বলতে কুড়িয়ে পাওয়া ওয়ালেটটাও পকেট থেকে বের করে এনেছিলাম। 

দারোয়ান যখন আমার হাতের দিকে নজর দিল তখন আমার হাতে ধরা ওয়ালেটটি দেখে বলল- "এই দাড়াও! এটাই কি সেই কুড়িয়ে পাওয়া ওয়ালেট, যার মালিককে তুমি খুঁজছ?" একটু অবাক হলেও বললাম- "হ্যাঁ, এটিই সেই ওয়ালেট।" জবাবে দারোয়ান বলল- "আমি নিশ্চিত করেই জানি এটা মি. গোল্ডস্টাইনের ওয়ালেট! আমি এটাকে যে কোন অবস্থাতেই দেখে চিনতে পারবো। দেখো ঐ যে, এর ভেতর দিকে লাল সুতোর কাজটা, ওটা কেবল মি. গোল্ডস্টাইনের ওয়ালেটেই আমি দেখেছিলাম। আর সেও ক'দিন পরপর এই ওয়ালেটটা এখানে সেখানে হারিয়ে ফেলে। এই তো, এ সপ্তাতেই তো তিনবার করে হারাল ওটা! কিন্তু তার ভাগ্য ভালো বলতে হবে, প্রতিবারই তার হাতেই ফিরে এসেছে ওয়ালেটটি।"

এবারে অবাক হবার পালা আমার। বিস্ময় নিয়েই জিজ্ঞাস করলাম- "কে এই মি. গোল্ডস্টাইন?" 

দারোয়ান বলল- এই নার্সিং হোমেরই আট তলায় থাকেন তিনি। বেশ অনেক বছর ধরেই এখানে তিনি, মোটামুটি এখানে সবাই তাকে চেনে। আজ বিকেলেই তিনি একটু বাইরে বের হয়েছিলেন। এখন বুঝেছি আপনি কিভাবে পেলেন এই ওয়ালেটটি।

আনন্দের অতিসায্যে কোনরকম গার্ডকে ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আবার ছুটলাম সিড়িমুখে। লিফটের জন্যে অপেক্ষা করার তর সইছিল না। সিঁড়ি ভেঙ্গে যেন উড়ে উঠলাম আট তলায়। মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম যেন আজ একটু দেরিতে ঘুমুতে যায় মি. গোল্ডস্টাইন। আট তলায় এক নার্সের দেখা পাওয়া মাত্রই তাকে জিজ্ঞাস করলাম- "মি. গোল্ডস্টাইনকে কোথায় পাওয়া যাবে?" অবাক হলেও নার্স বলল- "গোল্ডস্টাইন স্যার তো প্রায়ই রাত জেগে লাইব্রেরিতে পড়ালেখা করে সময় কাটান। সম্ভবত এখনো সেখানেই আছেন তিনি।"

এরপর নার্স আমাকে তার সাথে করে লাইব্রেরির দিকে নিয়ে চললেন। এর মাঝেই তাকে আমি সংক্ষিপ্ত করে বললাম কেন আমি মি. গোল্ডস্টাইনের খোঁজ করছি। লাইব্রেরিতে পৌঁছে দেখলাম প্রায় সবগুলো লাইটই বন্ধ, শুধু এক কোনায় একজন ঠোটে হাসি নিয়ে কোলে রাখা একটি বইয়ের ভিতর ডুবে আছেন। সন্দেহ রইলো না, ইনিই মি. গোল্ডস্টাইন। নার্স একটু এগিয়ে গিয়ে মি. গোল্ডস্টাইনের কাছে কোমল স্বরে জানতে চাইলেন- "স্যার, আপনি কি আজও আপনার ওয়ালেটটি হারিয়েছেন?" 

নার্সের প্রশ্ন শুনে মি. গোল্ডস্টাইন তার পেছনের পকেটে হাতড়াতে শুরু করলেন, তারপর লাজুক হেসে বললেন- "ওহ! আবারও হারিয়েছি ওটা!"

"এই ভদ্রলোক একটি ওয়ালেট খুঁজে পেয়েছেন, আর আমাদের মনে হচ্ছে এটিই আপনার ওয়ালেট" -বললেন নার্স।

আমি এগিয়ে গিয়ে মি. গোল্ডস্টাইনের হাতে ওয়ালেটটি দিলাম। ওয়ালেটটি হাতে পেয়েই তৃপ্তির হাসি চলে আসল তার ঠোটে। বললেন- "হ্যাঁ, এটিই সেই ওয়ালেট! সম্ভবত আজ বিকেলে যখন বাইরে বের হয়েছিলাম তখন এটি কোনভাবে আমার পকেট গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল।" তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন- "ইয়ং ম্যান, এর জন্যে তুমি পুরস্কার পাবে!"

"না স্যার, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ" দ্রুত বললাম তাকে। "কিন্তু, আপনাকে খুঁজে বের করতে গিয়ে আপনার ওয়ালেটটির ভিতরে আমাকে দেখতে হয়েছে। আর সেখানে থাকা আপনার চিঠিটিও পড়তে হয়েছিল আমাকে।"

একথা শুনে তার মুখের হাসি হুট করেই গায়েব হয়ে গেলো, সেখানে ভর করল বিষাদ। বিড়বিড় করে জিজ্ঞাস করলেন- "তুমি পড়েছ ঐ চিঠিটা!"

"শুধু তাই না", দুষ্ট একটা হাসি এনে বললাম "আমি এও জানি এখন হান্যা কোথায় আছে।"

হঠাৎই যেন তিনি ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন। "হান্যা! তুমি জানো সে কোথায় আছে? কেমন আছে সে? সে কি এখনো আগের মত সেই অনিন্দ্য সুন্দরী রয়েছে? প্লিজ, প্লিজ বল আমাকে...", মরিয়া হয়ে জানতে চাইলেন তিনি। 

"সে ভালো আছে.... ঠিক যেমনটি আপনি কল্পনা করছেন, ঠিক তেমনি সুন্দর আছে সে", মৃদু স্বরে বললাম তাকে।

প্রত্যাশা পূর্ণের হাসি মুখে মি. গোল্ডস্টাইন জানতে চাইলেন- "তুমি কি আমায় বলতে পারবে সে কোথায় আছে? আমি তার সাথে একটাবারের জন্যে একটু কথা বলতে চাই"। বলতে বলতেই তিনি হুট করে আমার হাতটি চেপে ধরলেন, বললেন- "তুমি কি জানো? তাকে আমি প্রচণ্ড পরিমাণে ভালবাসতাম, কিন্তু তার এই চিঠিটা যখন হাতে এসে পৌছায় তখন মনে হল আমার জীবনটাই শেষ হয়ে গেছে। আমি আর কাউকে তার মত করে গ্রহণ করতে পারি নি, হয়তো তার প্রতি আমার ভালোবাসাটাই কখনো কাউকে আর আপন করে ভাবতে দেয়নি আমায়।"

"মি. গোল্ডস্টাইন," বললাম আমি, "আপনি কি আমার সাথে একটু আসতে পারবেন?"

আমরা লিফটে চড়ে উঠলাম, লিফট আট তলা থেকে তিন তলাতে নেমে আসল। হলওয়ের প্রায় পুরোটাই তখন অন্ধকার, হালকা আলোর কয়েকটি লাইট তখন জ্বলছে সেখানে। হান্যাকে আমরা পেলাম সেই ডে রুমটিতেই। অসাড় ভঙ্গিতে তিনি তখনও টিভি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। 

আমাদের সাথে থাকা নার্স তখন হান্যার দিকে এগিয়ে গেলো, মৃদু স্বরে বলল- "হান্যা", তারপর দরজার সামনে দাড়িয়ে থাকা মাইকেলের দিকে আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল, "তুমি কি ঐ লোকটিকে চিনতে পারছ?"

হান্যা তার গলায় ঝুলে থাকা গ্লাসটি একটু পরিষ্কার করে চোখে পড়ল, তারপর একমুহুর্ত সময় নিয়ে তাকাল মাইকেলের দিকে, কিন্তু একটি কথাও বলল না। একটু সময় পর একদম শোনা যায় না এমন ক্ষীণস্বরে মাইকেল বলল, "হান্যা, আমি মাইকেল, আমার কথা কি তোমার মনে আছে?"

হান্যা ফুঁপিয়ে উঠল, "মাইকেল! আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না! মাইকেল! এটা কি সত্যিই তুমি? সত্যিই কি তুমি আমার মাইকেল?"। এভাবেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সে উঠে এগিয়ে যেতে থাকল সামনের দিকে। এত যুগ পরেও যেন একজন আরেকজনকে চোখের সামনে পেয়েও বিশ্বাস করতে পারছিলো না। নার্স আর আমি তাদের ওভাবে রেখেই ডে রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। বলতে লজ্জা নেই, আমাদের উভয়ের চোখই তখন ভিজে ছিল এক অপার্থিব আনন্দে। হলওয়েতে এসে নার্স আস্তে করে বলল, "দেখলে! কিভাবে সৃষ্টিকর্তার আশ্চর্য বলয় আমাদের জড়িয়ে রাখে? যদি কিছু একটা তোমার হবার থাকে, তবে তা হবেই; হাজার প্রতীক্ষার পর হলেও তোমার পাওনা তোমায় সে মিটিয়েই দেবে!"


এরপর প্রায় তিন হপ্তা বাদে এক ব্যস্ত দুপুরে অফিসে আমার জন্যে একটি কল আসল ঐ নার্সিং হোম থেকে। সেদিনের সেই রিসিপসনিষ্ট আমাকে বলল- "তুমি কি সামনের রবিবার একটু সময় করে আমাদের এখানে আসতে পারবে? ঐ দিন মাইকেল আর হান্যা তাদের ঐ দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে!" এমন প্রস্তাবের বিপরীতে না বলার কোন ইচ্ছেই আমার ছিল না, সময় নষ্ট না করে সাথে সাথে নিমন্ত্রণটি গ্রহণ করে নিলাম।


আমার জীবনে যে অল্প ক'টা চমৎকার দিনের কথা আমি বলতে পারব, তার মধ্যে ঐ রবিবারটি ছিল অন্যতম। নার্সিং হোমটিতে পৌঁছে আমার মনেই হয়নি আমি কোন নার্সিং হোমে এসেছি। তখন সেখানে সবদিকেই একটা উৎসব উৎসব আমেজ। হলঘর জুড়ে বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, কিন্তু যে কেউ তাদের দিকে তাকালেই বুঝতে পারবে কতটা আনন্দ নিয়ে তারা এই সময়টাকে উপভোগ করছেন।

হান্যা হালকা কিন্তু উজ্জ্বল রঙ এর একটি বিয়ের ড্রেস পড়েছিল সেদিন, আর আমি বাজি ধরে বলতে পারি এরচেয়ে সুন্দর তাকে কখনোই লাগেনি। মাইকেল পড়েছিল একটি গাড় নীল সুট আর লম্বা একটি হ্যাট, তাকে দেখতে সত্যিই সেদিন দারুন হ্যান্ডসাম লাগছিল। তারা তাদের বিয়েতে আমাকে তাদের 'বেস্ট ম্যান' বানিয়েছিলেন।

নার্সিং হোম থেকে শুধুমাত্র তাদের জন্যে একটি আলাদা রুমের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেদিন আমি দেখেছিলাম ৭৬ বছরের এক কণে আর ৭৯ বছরের এক বরকে টিনেজারদের মত উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে। 

বয়সটা আসলেই তাদের জন্যে কোন বিষয় ছিল না সব শেষে!






………………………………………………………
গল্পঃ হারানো ওয়ালেট
লেখকঃ অজ্ঞাত
সোর্সঃ "Stories of life" via pinterest.com