রহস্য গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রহস্য গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

প্রতিচ্ছায়া

 


সকালগুলো এই শহরে সাধারণত একটা নরম, ভেজা আলস্য নিয়ে শুরু হয়। কুয়াশা আর রোদের মাঝামাঝি একটা অনিশ্চিত সময়, যখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলো সবে চুলা জ্বালায় আর রিকশার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙে গোটা পাড়ার। সেদিন সকালটাও ঠিক তেমনই শুরু হয়েছিল, অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত। জানালার পর্দা ফুঁড়ে যে আলো এসে পড়েছিল ঘরের মেঝেতে, তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু বাড়ির বাইরে পা রাখার পরই বাতাসের গন্ধটা কেমন বদলে গেল। ভেজা কাগজ আর কালির একটা তীব্র, প্রায় অস্বস্তিকর গন্ধ, আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে কড়া লিকারের চায়ের একটা গন্ধ। আশেপাশে তাকাতেই বুঝলাম প্রতিটা দেয়ালে পোস্টার দিয়ে ছেয়ে গেছে।

আমি প্রথমে ভাবলাম এটা আরেকটা রাজনৈতিক প্রচারণা। এই শহরে এমন হয়- রাতারাতি দেয়াল ভরে যায় মুখের ছবিতে, স্লোগানে, প্রতিশ্রুতির ভারে ন্যুব্জ পোস্টারে। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন সাদা কাগজের ওপর কালো হরফে লেখা শব্দটা পড়লাম, তখন বুকের ভেতর একটা অচেনা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নিখোঁজ; শব্দটার নিচে একটা মুখ, আর সেই মুখটা আমারই, যদিও চেনা আয়নায় যে মুখ আমি প্রতিদিন দেখি তার চেয়ে যেন কিছুটা বেশি ক্লান্ত, চোখের নিচে যেন কিছুটা বেশি ছায়া। রাস্তার মানুষজন তখন নিজেদের ব্যস্ততায় হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না, অথচ দেয়াল থেকে আমারই চোখ দুটো আমাকে অনুসরণ করছিল, নিঃশব্দে, নিরন্তর।

পোস্টারের নিচের দিকে একটা ফোন নম্বর ছাপা ছিল, এগারোটা অঙ্ক, যা আমি কখনো নিজের জীবনে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না, অথচ চোখ বোলাতেই কোথাও একটা অচেনা পরিচিতির অনুভূতি খেলে গেল; ঠিক যেমন কোনো ভুলে যাওয়া গানের সুর হঠাৎ কানে বাজলে হয়। কাগজটা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবলাম হয়তো এটা কারও নিষ্ঠুর রসিকতা, কারও ফটোশপের কারিকুরি। কিন্তু ফোনটা পকেট থেকে বের করে সেই নম্বরে ডায়াল করতে করতে আমার আঙুল কাঁপছিল, যেন শরীর নিজেই জানত এই ফোন কলটা কোথাও একটা সীমারেখা পার করে দেবে যা আর কখনো পেছনে ফেরা যাবে না।

তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল, কাঁপা, সন্দিগ্ধ, তবু কোথাও যেন গভীর পরিচিত। আমি কিছু বলার আগেই বুঝলাম গলাটা কার। বছরের পর বছর ধরে যে গলা আমাকে সকালে ডেকে তুলত, রাতে ঘুম পাড়াত, সেই অতিপরিচিত গলা। কিন্তু সেই পরিচিতি স্বস্তি আনল না, বরং একটা অসম্ভবের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল, কারণ যে মানুষটার গলা আমি শুনছিলাম, তাকে আমি নিজের হাতে মাটি দিয়ে এসেছিলাম তিন বছর আগে।

⠀⠀

⠀⠀

সারাদিন আমি অফিসে গেলাম না। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম, দুপুরের আলো জানালা গলে মেঝেতে একটা লম্বাটে চৌকো আকার তৈরি করছিল, সেই আলো ধীরে ধীরে সরে সরে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছিল, আর আমি সেই আলোর সরে যাওয়া দেখছিলাম যেন তাতেই লুকিয়ে আছে কোনো উত্তর। ফোনের কল-লিস্টে নম্বরটা তখনো জ্বলজ্বল করছিল, আমি বারবার সেটার দিকে তাকালাম, যেন তাকিয়ে থাকলেই সংখ্যাগুলো নিজেদের গোপন অর্থ বলে দেবে। শেষে মোবাইলের ব্রাউজারে গিয়ে নিজের নামটাই সার্চ বক্সে টাইপ করলাম, এক ধরনের মরিয়া কৌতূহল থেকে, যেন নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজছি ইন্টারনেটের অচেনা কোণে।

প্রথম কয়েকটা ফলাফল ছিল একেবারে সাধারণ- পুরোনো একটা ফেসবুক প্রোফাইল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই তালিকায় নাম, কোনো একটা চাকরির সাইটে অসম্পূর্ণ বায়োডাটা। কিন্তু তারপর একটা সংবাদ-শিরোনাম চোখে পড়ল, আর সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে এল। প্রতিবেদনটা তিন বছর আগের, তারিখটা আজকের তারিখের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছিল, আর তাতে লেখা ছিল আমারই নাম, আমারই চেহারা, আমার ঠিকানা। একজন তরুণ প্রকৌশলীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের বিবরণ, যার শেষ দেখা মিলেছিল শহরের পুরোনো নদীবন্দরের কাছে, রাতের অন্ধকারে, একা।

আমি প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন পড়লাম, তারপর আবার পড়লাম, যেন বারবার পড়লে শব্দগুলো বদলে যাবে, অর্থ পালটে যাবে। জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছিল, আর সেই আধো-অন্ধকারে আমার নিজের প্রতিবিম্ব কাচের গায়ে ভেসে উঠল- স্বচ্ছ, কাঁপা, যেন একটা ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, রাস্তার দিকে তাকালাম, আর দেখলাম উল্টো দিকের দেয়ালে আরেকটা পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়েছে, যেটা সকালে ছিল না। এবার ছবিতে আমি হাসছি, এমন একটা হাসি যা আমার মনে পড়ে না আমি কখনো হেসেছি বলে, অথচ মুখের প্রতিটি রেখা নিঃসন্দেহে আমারই।

⠀⠀

⠀⠀

রাত নামলে আমি রাফিকে ফোন করলাম, ভেবেছিলাম বন্ধুর গলা শুনলে অন্তত কিছুটা মাটির সংযোগ ফিরে পাব। ওর হাসি দিয়ে কথোপকথন শুরু হলো, স্বাভাবিক, নির্ভার, যেন এই দিনটার কোনো অস্বাভাবিকতাই স্পর্শ করেনি ওকে। কিন্তু যখন আমি পোস্টারের কথা বললাম, সংবাদের কথা বললাম, ওর গলার স্বর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। হালকা রসিকতা থেকে সরে গিয়ে প্রথমে একটু সতর্ক, প্রায় ভীত আর শেষে নীরবতায়। ও জিজ্ঞেস করল- গত তিন বছর আমি কোথায় ছিলাম। প্রশ্নটা এতটাই সহজ ভঙ্গিতে করল যে প্রথমে বুঝতেই পারিনি ওর কণ্ঠে কতটা ভয় জমে আছে।

আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম, গতকালই আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছি, অফিসের করিডোরে হেঁটেছি, চায়ের কাপ হাতে গল্প করেছি। ও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল যে গত তিন বছরে আমি অফিসে পা রাখিনি, আমাদের শেষ কথোপকথন হয়েছিল ঠিক তিন বছর আগে, যেদিন আমি ওকে বলেছিলাম কাউকে অনুসরণ করছি, নদীবন্দরের দিকে যাচ্ছি। ও জানতে চেয়েছিল কাকে অনুসরণ করছি, আর আমি নাকি উত্তরে বলেছিলাম- 'নিজেকেই'।

সেই মুহূর্তে ফোনের ওপাশে রাফির নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না, আর আমার বুকের ভেতর একটা অচেনা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন কেউ ধীরে ধীরে আমার শরীর থেকে উষ্ণতা টেনে নিচ্ছে। রাফি শেষে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছি কিনা। ওর জিজ্ঞাসাটা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক শোনাল যে আমি হেসে ফেলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাসিটা গলার কাছে আটকে গেল। কারণ ততক্ষণে আমার পা নিজে থেকেই বাথরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, যেন শরীরটা মনের চেয়ে আগেই জানত কী অপেক্ষা করছে সেখানে।

⠀⠀

⠀⠀

বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক দেখলাম না- সেই একই মুখ, একই ক্লান্ত চোখ, চুলের একই অবিন্যস্ত রেখা। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা অদ্ভুত বিলম্ব চোখে পড়ল, খুব সূক্ষ্ম, প্রায় ধরা পড়ে না এমন- আমি হাত তুললাম, আর প্রতিবিম্ব যেন এক লহমা পরে হাত তুলল, একটা নিঃশ্বাসের সময়ের ব্যবধান, যা স্বাভাবিক আয়নার হওয়ার কথা নয়। আমি মাথা কাত করলাম, প্রতিবিম্বও করল, কিন্তু সেই বিলম্বটা রয়েই গেল, যেন কাচের ওপাশে কেউ আমাকে নিখুঁতভাবে নকল করার চেষ্টা করছে অথচ ঠিক সময়মতো পারছে না।

আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে, আর তখনই দেখলাম প্রতিবিম্বের ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, যা আমার মুখে ছিল না। সেই হাসি ধীরে ধীরে চওড়া হলো, আর তার চোখে এমন একটা তৃপ্তি ফুটে উঠল যা আমি নিজের মধ্যে কখনো অনুভব করিনি। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের স্পর্শ পায়ের তলায় অনুভব করলাম, আর সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল, একেবারে হঠাৎ, যেন কেউ অন্ধকারের সুইচ টিপে দিয়েছে ঠিক আমার ভয়টা চরমে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিল।

অন্ধকারে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, আর তার মাঝেই মনে হলো, আয়নার ওপাশ থেকে কেউ একজন এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ধৈর্য ধরে, অপেক্ষায়, যেন সময়টা তারই পক্ষে কাজ করছে।

⠀⠀

⠀⠀

পরদিন সকালে থানায় গিয়ে আমি বুঝলাম কাগজের জগতেও আমি আর সেই মানুষ নই যা আমি ভাবতাম। দায়িত্বরত অফিসার আমার পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন, তারপর জানালেন এই আইডি তিন বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে, ঠিক আমার নিখোঁজ হওয়ার নথিভুক্ত তারিখের কিছুদিন পর। আমি ঠিকানা বললাম, যেখানে গত চার বছর ধরে বাস করছি কিংবা আমি বাস করছি বলে আমার ধারণা। অফিসার শান্তভাবে ঠিকানাটা চেক করলেন, কাকে যেন একবার ফোনও করলেন, তারপর আমাকে জানালেন সেই ফ্ল্যাটের মালিকের ভাষ্যমতে জায়গাটা তিন বছর ধরে খালি পড়ে আছে, কোনো ভাড়াটিয়া নেই, কোনো আসবাবও নেই।

কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে হলো পুলিশ স্টেশনের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, যেন প্রতিটি বাক্য আমার চারপাশের বাস্তবতাকে একটু একটু করে সরু করে দিচ্ছে। অফিসার যখন জিজ্ঞেস করলেন আমি সত্যিই সেই মানুষ কিনা যার নাম নথিতে লেখা, আমি উত্তর দিতে পারিনি, কারণ প্রশ্নটা এতদিন যতটা সহজ মনে হতো, এখন ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে। আমি বিব্রত হাসি দিয়ে অফিসারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।

বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে নিজের মুখ দেখলাম, প্রতিটি পোস্টারে আলাদা আলাদা তারিখ, আলাদা আলাদা বিবরণ, যেন তিন বছরের প্রতিটি দিন কেউ যত্ন করে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, অথচ সেই দিনগুলোর একটাও আমার নিজের স্মৃতিতে নেই।

ফ্ল্যাটে ফিরে দরজা খুলতেই বুঝলাম কিছু একটা সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। কোন টেবিল নেই, বিছানা নেই, আমার চায়ের কাপ নেই, কোনো ব্যক্তিগত চিহ্ন নেই। শুধু দেয়ালে একটা আয়না ঝুলছে, যেটা আগে সেখানে ছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম, ওপাশের ঘরটা আমার নিজের ঘরের মতোই সাজানো, টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে চায়ের কাপ। আর সেই টেবিলে বসে আছে আরেকজন। হুবহু আমার মতো দেখতে আরেকজন আমি, মাথা নিচু করে কিছু লিখছি, নিবিষ্ট, নিশ্চিন্ত। সে মাথা তুলল, আমার দিকে তাকাল, তারপর একটা কাগজ তুলে ধরল কাচের ওপাশ থেকে, তাতে লেখা ছিল কয়েকটা শব্দ, যা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের সমস্ত উষ্ণতা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।

⠀⠀

⠀⠀

সেই রাতে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানলাম শহরের বাইরে যাওয়ার প্রধান সড়ক অজানা কারণে বন্ধ, সব বাস বাতিল, যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম, ক্লান্তি আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে, আর তখনই পাশের দেয়ালে চোখ পড়ল সেই পরিচিত পোস্টারে। এবার কাছে গিয়ে দেখলাম শব্দগুলো বদলে গেছে- আগের নিখোঁজ শব্দটার জায়গায় এখন লেখা, "সন্ধান পাওয়া গেছে"। আর তার নিচে ছোট্ট একটা বাক্য যোগ হয়েছে, যা পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ঠিক কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে, অথচ প্রতিবার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থটা যেন হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

আমি বেঞ্চে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, শহরের আলো একে একে নিভে যাওয়া দেখলাম, আর ভাবলাম- যদি সত্যিই কাউকে খুঁজে পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে সে কে? আর যে এখন এই বেঞ্চে বসে এসব ভাবছে, সে নিজে তবে কে?

রাতের শেষ প্রহরে বাসস্ট্যান্ডের আলো টিমটিম করছিল, দূরে নদীবন্দরের দিক থেকে একটা শিস-এর মতো শব্দ ভেসে আসছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম না সেই শব্দ কোনো ট্রেনের, নাকি কারও ডাকার আওয়াজ, নাকি শুধুই বাতাসের খেলা। যা নিশ্চিত ছিল তা কেবল এটুকু- শহর জেগে উঠলে আবার নতুন একটা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে যাবে, নতুন একটা তারিখ নিয়ে, নতুন একটা গল্প নিয়ে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মুখটা আমারই হবে কিনা, তা বলার সাধ্য আমার আর ছিল না।

⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


শনিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৫

তুমি তো আমাকে চেনো…

 


প্রথম ভাগঃ প্রারম্ভিকা

জানোই তো, ঘুম হল এক ধরনের প্রতারণা। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে তুমি চোখটা বন্ধ কর, ধীরে ধীরে তোমার শরীর শিথিল হতে শুরু করে। হৃৎস্পন্দন কমে আসে, কমে আসে শরীরের তাপমাত্রা। তুমি তখন নিজেকে নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে শুরু কর। 

আর ঠিক সেই সময়টাতেই তোমার বুকের উপর এমন কিছু একটা উঠে বসে, যার অস্তিত্বের কথা তোমার জানা নেই!

তবে আমি জানি, কারণ আমি তো সেটা দেখেছি।

আচ্ছা চল, তোমাকে আমার ঘটনাটা বলি, তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে আমি কীসের কথা বলছি।

প্রথম রাতে আমি শুধু একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। শব্দটা মৃদু হলেও তার তীক্ষ্ম একটা অনুভূতি আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল সেটি। অন্ধকারে, ঠিক আমার বিছানার কোণ থেকে শব্দটা হয়েছিল। কেমন একটা ঠান্ডা, গভীর, লম্বা একটা টান। আমি ভেবেছিলাম মনের ধোঁকা হয়তো, এত রাতে একা ঘরে কার নিঃশ্বাসের শব্দ হবে!

দ্বিতীয় রাতেও আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, খুব অস্বস্তি লাগছিল। ওটা তখন আমার বুকের উপর বসে আছে। নড়তে পারছিলাম না, শ্বাসও নিতে পারছিলাম না। শুধু অনুভব করছিলাম সেই ঠান্ডা নিঃশ্বাসের মতই- ঠান্ডা, ভেজা হাতটি গলার চেপে ধরে আছে। চাপটা খুব অদ্ভুত, না শক্ত - না নরম; তবে ততটাই, যতটা থাকলে পরে তোমাকে আতঙ্ক আঁকড়ে ধরে।

দিনের আলোতে এই কথাগুলো নিজের কাছেই হাস্যকর লাগছিল। বিশ্বাস কর, মাকে গিয়ে যে কথা গুলো বলব, আমার তো নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল ছ’বছরের বাচ্চারা রাতে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে যা করে, আমিও তেমন করছি।

তৃতীয় রাতেও আমি সেই ঠান্ডা হাতের অনুভব পেলাম। আমি ঠিক-ঠিক গুনে ফেললাম- সেখানে মোট ছ’টা আঙ্গুল আছে। তিনটা বামে, আর তিনটা ডানে। বরফ শীতল আঙ্গুলগুলো যেন গলার চামড়া ফুড়ে মেরুদন্ড ছুঁয়ে দিতে চাইছে!

তারপর, চতুর্থ রাত, আমি বুঝলাম ও আমাকে ডাকছে। ওকে আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু ওর কণ্ঠটা যেন আমার মস্তিষ্কের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে। বলছে- ‘তুমি তো আমাকে চেনো….’

পরদিন সকালে মা আমাকে ডাকতে এসে দেখলেন, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি। ডাক্তার বলল- ‘হার্ট অ্যাটাক’। সবাই সেটা বিশ্বাসও করে নিল। অথচ, আমি সেখানেই ছিলাম, আয়নাটার সামনে। যেখান থেকে আমি সেই ছায়াটাকে ধীরে ধীরে সরে যেতে দেখছিলাম, আর তার দৃষ্টি ছিল… থাক সে কথা।

⠀⠀⠀

এর ক'দিন বাদেই ওরা সবাই বাড়িটা খালি করে কোথায় যেন চলে যায়। আমি ওদের দেখেছি, ওরা ঘরের আসবাবপত্র বের করছে, সামানা গোছাচ্ছে, ভ্যানে ভরছে। কিন্তু ওরা আমাকে দেখে না। জানালা দিয়ে আমি কেবল ওদের চলে যাওয়াটুকুই দেখলাম। এরপর থেকেই আমি একা, একদম একা।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

দ্বিতীয় ভাগঃ বাড়ির নতুন বাসিন্দা...

শহর ছেড়ে এই গ্রামে এসেছি দিন দশেক হয়েছে। একটা প্রজেক্ট চলছে এখানে, আরও কয়েক মাস চলবে। প্রথম কয়েকদিন তো এখানকার কাজ-কর্মের কোন আগা-মাথা বুঝে পাচ্ছিলাম না। সবই চলছে নিয়ম মাফিক, আবার সবই এলোমেলো। সে সব গোছাতেই চলে গেছে এই কয়েকদিন। হেড অফিস থেকে জানাল, তারা এখানে নতুন কাউকে পোস্টিং দিবে বলে ভাবছে। তবে সেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে একটু কাজগুলো গুছিয়ে দিতে বলল।

শহরের বাইরে আমার তেমন করে কখনো থাকা হয়নি। এখন এই কাজের কারণে না আসলে হয়ত এভাবে এতদিনের জন্যে আসা হতো না। শহরেই জন্ম, বেড়ে উঠা, আর শহরেই জীবনটার ইতি হতো। সারাদিন ভালোই কাটে, কাজের ব্যস্ততায়, সাইট ঘুরে দেখে। কিন্তু বিকেলের পর আর সময় কাটতে চায় না। তার উপর এমন একটা জায়গায় থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে! ছোট একটা একতলা বাড়ি, একদম গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে। বাড়িটা অফিসের, এখানে তারা অন্য একটা প্রজেক্টের জন্য জমি কিনার সময় খুব কম দামে পেয়ে যায়, তাই কিনে নেয়। কারও থাকার উদ্দেশ্য না হলেও এখন এই প্রজেক্টের জন্যে আমার থাকার জায়গা হয়েছে।

ছিমছাম শান্ত পরিবেশ ঘেরা, ঝুপ করে সন্ধ্যা নামার পর নাম না জানা পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। এখানকার ম্যানেজার প্রথমে তার বাসাতেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কারও বাসায় এভাবে থাকাটা পছন্দ হচ্ছিল না, তাই সেটা বাতিল করেছিলাম। এরপর তিনি একপ্রকার জোড় করেই খাবারের ব্যবস্থাটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলেন। এখন টিফিন কেরিয়ারে করে সন্ধ্যার পরপর খাবার চলে আসে তার বাড়ি থেকে। তবে এক ফাঁকে তিনি আমাকে জানালেন, এই বাড়িটার ব্যাপারে কিছু আজেবাজে কথা শোনা যায়। যদিও বিশ্বাস করার মত তেমন কোনো ভিত্তি নেই। তারপরও রাতে বাড়ি থেকে বের হতে বারণ করলেন। আর কোনো সমস্যা হলে যত রাতই হোক, তাকে যেন নির্দ্বিধায় ফোন করে জানাই -সে আশ্বাস আদায় করে নিলেন।

দিনভর দৌড়োদৌড়ির পর শান্ত পরিবেশ আর পেট পুরে খানা পেয়ে এখন ঘুমও চলে আসে দ্রুত। বড় জোড় রাত ১০টা পর্যন্ত জাগে থাকতে পারি, তারপর টুপ করে ঘুম ধরে বসে। অবশ্য আমিও যে খুব জেগে থাকতে চাই, তা না। সকাল সকাল খুব ফ্রেশ একটা ভাব চলে আসে এত লম্বা ঘুম পেয়ে। দিনের ক্লান্তিটা তখন আর তেমন গায়ে লাগে না।

এগারো তম রাতে হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছিল, ঠিক বোঝানোর মত না। কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছে। জানালার ফাঁকা দিয়ে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো এসে বিছানার একপাশে থেমে আছে। মনে হচ্ছে যেন সময়টাও আটকে গেছে। অস্বস্তিটা আমাকে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে, উঠে বসে টেবিল থেকে মোবাইল বা ঘড়িটা পর্যন্ত নিতে ইচ্ছে হলো না। বেশ অনেকটা সময় পর হঠাৎ করেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কেউ রিমোট থেকে প্লে বাটনে চাপ দেয়ার সাথে সাথেই সব আগের মতই চলতে শুরু করেছে। অস্বস্তিটাও কেটে গেল প্রায় সাথে সাথেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আবার ঘুমের সাগরে ডুবে গেলাম।

পরদিন আর এটা নিয়ে তেমন কিছুই মনে থাকলো না। সাইট ঘুরে কাজ দেখতে দেখতে দিন কেটে গেল।

সমস্যাটা হলো আবার রাতে। গতদিনের মতই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ঠিক ভেঙ্গে গেল কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছিলাম না। যেন ঘুমের গভীর কোন স্তরে ডুবে আছি, কোন নড়াচড়া কিংবা সাড়াশব্দ কিচ্ছু নেই। কেবল একটা চাপা অস্বস্তি।

হঠাৎ বুকের উপরে ভারী আর ঠান্ডা একটা চাপ অনুভব করলাম। কারও উপস্থিতি… না, কারও বসে থাকা। শরীর শক্ত হয়ে গেছে, আঙুল পর্যন্ত নড়ছে না। চিৎকার করতে গেলেও শব্দ বের হচ্ছিল না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

তারপর ঠান্ডা, ভেজা একজোড়া হাত গলার দুই পাশে চেপে ধরলো। এমনভাবে চাপ দিচ্ছিল- যেন নিখুঁতভাবে আমার শ্বাস বন্ধ করতে চাইছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। আর কানের ভেতর একটা ফিসফিসানি-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আজকের পূর্বে আমার নিজেকে কখনো ভীতু মনে না হলেও, আজ আমার বুকের ভেতর ভয় ভয় জমে বরফ হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো নিঃশ্বাসও নেওয়ার দরকার পড়ছে না। গলার চাপ কমেনি, বরং বেড়েছে বলা যায়। অথচ শ্বাস টানার কোন আকুতি আর ফুসফুস করছে না। হয়ত অক্সিজেনের অভাবে উল্টোপাল্টা ভাবছি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছি যে মস্তিষ্ক পরিষ্কার চিন্তা করতে পারছে। আর প্রশ্নটা নিজে থেকেই এলো- তবে কি আমি মারা গিয়েছি? নাকি এটা পুরোপুরি কল্পনা? অথবা এই অনুভূতিটাই মৃত্যুর পরের অংশ?

পরের মুহূর্তেই উঠে বসলাম। বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু ঘরের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক। জোরে জোরে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিচ্ছি, বা হাঁপাচ্ছি। বিছানাটা এলোমেলো, চাদর গুটিয়ে গেছে।

নামলাম বিছানা থেকে, হেঁটে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। একটু আগে যে আতঙ্ক ভর করেছিল, তার ছিটে-ফোটাও লাগছে না এখন। উলটো নিজেকে যেন আরও হালকা লাগছে। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিলাম। মাথা কিছুটা পরিষ্কার হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বোকামিতে হেসে ফেলতে গেলাম,কিন্তু হাসি মিলিয়ে গেল পরের সেকেন্ডেই।

গলার দুই পাশে তিনটা করে সমান লালচে দাগ। যেন কারও আঙুলের চাপের ছাপ। আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম, হালকা গরম, কিন্তু কোনো ব্যথা নেই। আমার আতঙ্কিত হওয়ার কথা, কিন্তু তেমন কোন অনুভূতি হচ্ছে না। যেন এমনটা হবে আমি জানতাম!

এরপর আর ভালো ঘুম হলো না। বারবার কেবল ঘুরে ফিরে ঐ ফিস্‌ফিস শব্দটা মাথায় চলে আসছিল। "তুমি তো আমাকে চেনো…"

পরদিন সকালে অফিসে গিয়েই এখানকার ম্যানেজার সাহেবকে জানালাম জরুরি কাজে বাড়ি যাচ্ছি। হাতের কাজগুলো তাকে বুঝিয়ে দিয়েই গাড়িতে উঠলাম। হেড অফিসে কেবল অসুস্থতার ছুটির জন্য একটা মেইল পাঠিয়ে রাখলাম।

আট ঘণ্টার জার্নি দিয়ে ফিরলাম বাসায়। আমার কেবল মনে হচ্ছিল আমাকে যে করেই হোক ঐ জায়গাটা ছেড়ে আসতে হবে। তাই আর সামনে-পেছনে কোন কিছুই চিন্তা না করে সোজা বাসায় এসেছি। অবশ্য বাসায় এসে কাউকে কিছু বলে ভরকে দিতে ইচ্ছা হল না। ছুটি নিয়েছি, জানালাম কেবল। ওরা ভাবল, এভাবে হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকা, আর লম্বা জার্নির কারণে আমাকে এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

ফ্রেশ হয়ে কোনোরকম রাতের খাবার শেষ করেই আমার রুমে গিয়ে ঢুকলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম ঘুম ভাব চলে আসল। অনিচ্ছাতেও গভীর ঘুমে নিপতিত হতে থাকলাম।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

তৃতীয় ভাগঃ অবশেষ…

একটা ঘোরের মন লাগছে। মনে হচ্ছে জেগে আছি, আবার মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। বিছানায় উঠে বসতেই আলমারির আয়নার দিকে চোখ পড়ল। পেছনে বাথরুমের দরজা আধখোলা, আর তার ফাঁক দিয়ে মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে আছে- অস্পষ্ট, ছায়ার মতো।

আমি চোখ মুছলাম, আবার তাকালাম- কই? কেউ তো নেই!

হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
না, আসলে বাতাস নয়, নিশ্বাস নেয়ার আকুতি; থেমে গেলো।

আয়নার ভেতরে আমার পেছনে অন্ধকার জমতে শুরু করলো। প্রথমে মনে হলো ছায়া, কিন্তু তা ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে- লম্বা, কঙ্কালসার হাত… প্রতিটি হাতে তিনটি লম্বা আঙুল।

আমার কাঁধের উপর দিয়ে সেই হাতের ছায়া এগিয়ে এলো। আয়নায় হাত দেখা গেলেও আমার গায়ে কোন কিছুর ছোঁয়া অনুভব করলাম না। আমি স্থির হয়ে রইলাম, চোখের পাপড়িও ফেলতে পারছি না।

তারপর সেই ছায়ার মাথাটা ঝুঁকে এল আমার ঠিক কানের পাশে। কোনো ঠোঁট নড়ছে না, কিন্তু এক বরফশীতল ফিসফিসানি মাথার ভেতর এক স্বরে বলেই চলেছে-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আমি তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম প্রতিফলনে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটা আসলে আমি নই।

প্রতিফলনের চোখ গাঢ় কালো হয়ে গেছে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর গলার দাগগুলো রক্তিম লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। ওটা আমাকে দেখছে… কিন্তু আমি ওটাকে... কি জানি!

⠀⠀⠀

বাথরুমের দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার পুরো ঘরটাকে গিলে নিল।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀