সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

রাজকীয় ছাগল উৎপাদনে আমাদের অবদান

 


মানুষ ঠিক ততটুকুই সম্মানেই সবচেয়ে মানবিক থাকে, যতটুকু তার প্রাপ্য। এর বেশি দিলেই বিপদ। এটি কোনো দার্শনিক অনুমান নয়, এটি জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া একটি অকাট্য সত্য। 

অতিরিক্ত সম্মান মানুষের মস্তিষ্কে এক বিচিত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। প্রথমে সে এই অযাচিত সম্মান পেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এবং তারপর- এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ; সে ধরেই নেয় যে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল!!

এই উপলব্ধির পর থেকে সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে তার মতামত অমোঘ, তার রুচি অতুলনীয়, এবং পৃথিবীর বাকি সবাই মূলত তার জ্ঞানের অপেক্ষায় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, অতিনগণ্য। এরপর থেকে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না; সে আচরণ করে একজন রাজকীয় ছাগলের মতো। যেদিকে খুশি যায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে, যা খুশি তাতে মুখ লাগায়, যা খুশি তাই খায়, আর কেউ সামান্য বাধা দিলে উলটো শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

⠀⠀

একটাই উপায় তার, তা হলো 'সম্মান প্রত্যাহার'।
কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে করলে কাজ হয় না, কারণ মানুষ নিজের সম্মান হারানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সৃজনশীল(!)। প্রতিটি ধাপে সে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। সে ভাবে এবং বলে- “ওরা আসলে আমাকে বোঝে না”, “ওরা হিংসুটে, আমাকে হিংসা করে”, “ওরা আমার কদর বুঝলো না”, “আমি যে ওদের জন্য কী করেছি তা ওরা বুঝলো না”, কিংবা “এই যুগ/লোকগুলো আমার উপযুক্ত নয়”। এমনকি প্রয়োজনে সে ইতিহাসের দুই-একজন মহামানবের সাথে নিজের তুলনাও টেনে বসে, কারণ তারাও নাকি জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাননি। এই জাতীয় দার্শনিক সান্ত্বনা সে নিজেই নিজেকে অবিরাম দিতে থাকে, এবং ছাগলামি নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখে। 

সম্মান পুরোপুরি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থামে না। শূন্যের কোঠায় এসে সে কিছুটা থমকায়, চারদিকে তাকায়, এবং ধীরে ধীরে আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে যায়, এবং দর্শকরাও ততদিনে তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে। 

তাই কাউকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করলে, তাকে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই সম্মান দিন, তার বিন্দু বেশি নয়। 

কারণ অতিরিক্ত সম্মান আসলে সম্মান নয়, এটি একটি ধীরগতির বিষ, একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই অভিশাপ মানুষকে নিজের অজান্তেই, ধীরে ধীরে, অত্যন্ত নিপুণভাবে অন্য একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত করে।

এবং সেই প্রাণীটির নাম ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

⠀⠀

~ বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ ছেঁকে সংগৃহীত

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

জীবনের জটিল সমীকরণঃ সফলতার ভ্রম ও বাস্তবতা

⠀⠀

আমরা সাধারণত চোখের সামনে যা দেখি, তাকেই সত্য ধরে নিই। আজ কার লাভ হলো, কে উন্নতি করল, কে ক্ষমতার চেয়ারে বসল -এসব দিয়েই আমরা সফলতা আর ব্যর্থতার বিচার করি। অথচ জীবন এত সরল নয়। জীবনের হিসাব অনেক গভীর, অনেক বিস্তৃত। এখানে সময়ের সাথে সাথে জীবনের সমীকরণ বদলায়, আরও বদলে যায় সফলতার সংজ্ঞা।

একদিন তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে বাদামের ঝুড়ি হাতে রফিক মিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্র্যাফিক ছেড়ে দেওয়ায় কয়েকটি গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হলো তার সারা দিনের পুঁজি -বাদামের ঝুড়ি। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল তার রুজি-রুটি। অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। 

অন্যদিকে একই রুটে বাদাম বিক্রি করা শফিক মিয়ার সেদিন দারুণ লাভ হলো। রফিক না থাকায় দ্বিগুণ বিক্রি করল সে। হাতে এলো ভালো অঙ্কের টাকা। আপাতদৃষ্টিতে ঐদিনের জন্য শফিক হলো সফল, আর রফিক হলো ব্যর্থ, নিঃস্ব একজন। কিন্তু সন্ধ্যায় সারা দিনের আয় নিয়ে শফিক বসে গেল জুয়ার আসরে। রাত শেষ হতেই উপার্জিত সব টাকা হারিয়ে সেও শূন্যে নেমে এলো। সকালে দেখা গেল- রফিক আর শফিক দুজনকেই আবার শূন্য শুরু করতে হবে। তবে পার্থক্য এক জায়গায়। 

রফিক মিয়া ছিল সৎ, ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। সবাই তাকে বিশ্বাস করত। তাই সে যখন নতুন করে ব্যাবসা শুরু করতে চাইল, তখন মানুষ বিনা দ্বিধায় তাকে বাকীতে মাল দিল। মানুষের বিশ্বাসই হয়ে উঠল তার নতুন মূলধন। অন্যদিকে শফিকের জুয়ার নেশা আর অবিশ্বস্ততা কথা সবাই জানত। তাই কেউ তাকে বাকীতে মাল দিতে চাইল না। বিশ্বাসহীন মানুষের জন্য পৃথিবীর কোনো দরজাই কখনো খোলা থাকে না। 

এবার চলুন আরেকটি গল্প শুনি। গল্পটা সুমন নামের এক অফিসের সহকারী ম্যানেজারের। সারাদিন বসকে তোষামোদ করে সময় কাটাত, আবার আড়ালে তারই বদনাম করে বেড়াত। তবে তার একটা সুপ্ত ও গোপন ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছেটি ছিল- কবে বসের চাকরি যাবে আর সে সেই চেয়ারে বসবে। অনেক দিন পর তার সেই চাওয়া পূরণ হলো। তার বস চাকরি ছেড়ে চলে গেল, আর সুমন পদোন্নতি পেয়ে হলো ম্যানেজার। 

মানুষের চোখে সে সফল। কিন্তু সফলতা আর ইচ্ছে পূরণ তো আর তার চরিত্র বদলাতে পারে না। আগের মতোই চললল তার অফিস পলিটিক্স, ষড়যন্ত্র, স্বজনপ্রীতি আর তোষামোদের রাজনীতি। ফলে বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও যোগ্য কর্মচারীরা একে একে চাকরি ছাড়তে লাগল। শূন্য পদে নিয়োগ পেল অদক্ষ, তেলবাজ ও অনভিজ্ঞ লোকজন। আর এসব কারণে কোম্পানির ক্ষতি বাড়তে থাকল। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সুমন ও তার গড়া পুরো দলকেই ছাঁটাই করলো। 

আরও একটি গল্প শোনা যাক। পরীক্ষায় একজন নকল করে ভালো রেজাল্ট করল, আর অন্যজন সততার সাথে পরিশ্রম করে মাঝারি ফল পেল। সবাই প্রথমজনকে মেধাবী বলল। কিন্তু সময়ের সাথে দেখা গেল- নকলের সাফল্য টেকেনি, আর পরিশ্রমী মানুষটি ধীরে ধীরে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। 

এই গল্পগুলো আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। গল্প গুলো আমাদের শেখায়- সফলতা একদিনের অর্জন নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। সাময়িক লাভ, ক্ষমতা কিংবা বাহবা প্রকৃত সাফল্যের পরিচয় নয়। প্রকৃত সাফল্য গড়ে ওঠে সততা, পরিশ্রম, নৈতিকতা, ধৈর্য ও মানবিকতার ওপর ভর করে।

⠀⠀

⠀⠀

জীবনে দ্রুত সফল হওয়ার চেয়ে সঠিক পথে এগোনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জীবন এক নিরন্তর প্রবহমান ধারা। এই ধারার সামনে টিকে থাকার জন্যে সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও নৈতিকতা -এই চারটি স্তম্ভ শক্ত করে গড়তে হবে। আর এই স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। তাই কাউকে সফল বা ব্যর্থ বলার আগে একটু থামা উচিত। কারণ আমরা দেখি ঢেউয়ের তোড়, কিন্তু জানি না স্রোতের গতি। আর এই অদেখা স্রোতের কাছেই তো শেষ কথা বলার অধিকার থাকে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀



শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৬

ডায়েরির পাতা: মনের জ্যোৎস্না ও জ্বর



মৌসুমী ভৌমিকের গানটা আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল- "কেন শুধু শুধু ছুটে চলা, একে একে কথা বলা, নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে.."। গানটা কেমন যেন আজকের দিনগুলোর মুখপাত্র হয়ে উঠেছে। শব্দগুলো শুধু সুর নয়, এখন আমার নিঃশ্বাসের অনুষঙ্গ।

দিনগুলি এখন হিসাবের বাইরে, বিচ্ছিন্ন পাথরের মতো যার যার মত ছড়িয়ে পড়ে আছে। গতকালের সকাল আর আজকের বিকালের মধ্যে কোনো সীমানা খুঁজে পাই না। দুই দিনকে আলাদা করার জন্য নতুন কোনো শব্দ নেই অভিধানে। প্রতিদিন একই জানালা, একই আলোছায়া, একই ঘড়ির কাঁটার দৌড়। বিরক্তির ভাঁজ কপালে জমে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়- এইটুকুই বা কম কী? সময় তো আরো ভাঙচুর করতে পারত, তবু কিছুটা শৃঙ্খলা এখনো টিকে আছে।

গত কয়েকদিন ধরে শরীর বিদ্রোহ করে চলেছে। একদিন তো জ্বর এসে সময়ের হিসাবই লোপাট করে দিল। চোখ মেললাম- সকাল, আবার মেললাম- দুপুর, আরেকবার- দেখলাম সন্ধ্যা ইতোমধ্যে বিদায় জানাচ্ছে। জ্বর যদিও সেরে গেছে, কিন্তু ছেড়ে গেছে গলা-ব্যথা আর তার নিষ্ঠুর সঙ্গী মাথা-ব্যথাকে। সঙ্গে সঙ্গ দেয়ার জন্যে রয়ে গেছে মৃদু কাশি- অতি পরিচিত শত্রু। কাশির স্মৃতি আমার জন্য সাবান পানিতে ভেজা চামড়ার মতো, পুরোনো এক অসুখের ছায়া মনে ভর করে। কখনো কখনো শরীর মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতি শুধু মনের নয়, দেহের কোষেও লেখা থাকে। 

আগে যা ভালো লাগত, এখন তা ধূসর মনে হয়। বইপত্র, গান, মুভি -সব যেন পানিতে ভেজা ধূসর কাগজের মতো নিষ্প্রাণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- শিশুদের দেখলে আগে যে হৃদয় গলে যেত, এখন সেখানে কোনো না কোনো জায়গায় একটি বিরক্তি দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ওদের কোলাহল থেকে দূরে থাকি, নিঃশব্দে থাকি। এই পরিবর্তনটাই বেশি ভয়ংকর -আগে যা জীবনকে স্পর্শ করত, আজ তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। 

ছুটি!
শব্দটা এখন প্রার্থনার সমার্থক। কিন্তু, এ ছুটি কেবল দৈনন্দিন রুটিন থেকে নয়, এ ছুটি এই অভ্যন্তরীণ নীরবতা থেকে, এই আবেগহীন প্রবাহ থেকে। কখনো কখনো জীবন থেকেই ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে জাগে, একটা দীর্ঘ, শান্ত নিদ্রার মতো। কিন্তু জীবনের প্রতি এক গভীর অনুক্ত মায়া, এখনো রয়ে গেছে। যেমন- একটা পুরোনো বাড়ি, যার দরজা-জানালা ভাঙছে, কিন্তু যার প্রতিটি ধূলিকণায় স্মৃতি লেগে আছে। তাই মায়াটাও এখনো রয়ে গেছে। 

জীবন কালের এই বয়সে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে, জীবন একইসাথে 'বোঝা' ও 'বরাদ্দ'। অনেকটা পাহাড়ের মাঝপথে উঠে পেছনে ফিরে তাকানোর মতো। নিচের পথটুকু পেরিয়েছি, কিন্তু শীর্ষ ছোঁয়া এখনও বহুদূর। আর শরীরে জমা হয়েছে ক্লান্তি। তবুও এগোতে হচ্ছে, কারণ নিচে নামার পথটা অসম্ভব দুর্গম। 

আজকের এই এলোমেলো ভাবনা গুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম; হয়তো এই শূন্যতা পূর্ণতারই আরেক রূপ। সময় হয়তো হৃদয়কে শূন্য করে তুলছে পরবর্তী কোনো গভীর অনুভবের জন্য জায়গা তৈরি করতে। জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর যেমন একটু বেশি সংবেদনশীল হয়, তেমনই হয়তো এই আত্মিক স্তব্ধতার পর কিছু দেখা বা বোঝার সূক্ষ্ম ক্ষমতা ফিরে আসবে। 

আজ শুধু এই কথাগুলোই লিখে রাখি, যেন এই মুহূর্তের ভার্চুয়াল সাক্ষী থাকে এই শব্দগুলো। হয়তো কোনো এক ভবিষ্যৎ দিনে ফিরে দেখব, এই শব্দগুলো পড়ব, আর তখন বোঝার চেষ্টা করব- যে ব্যক্তি এগুলো লিখেছিল, সে আসলে হারিয়ে যাচ্ছিল নাকি নতুন কোনো উপকূলের খোঁজ পেয়েছিল। 

জানালার বাইরে এখন রাত। দূরে কোনো বাড়ির জানালায় একটি বাতি জ্বলে আছে, এক টুকরো মানবিক উষ্ণতা। হয়তো জীবন আসলে এটাই- একটা অন্ধকারে জ্বলা বাতি খোঁজা, যে বাতি হয়তো অন্যের বারান্দায়, কিন্তু তার আলো আমাদের জানালাতেও পড়ে। আজকের মতো এটুকুই যথেষ্ট। আজ শুধু থাকব, আর শ্বাস নেব। এই অস্থির হৃদয় নিয়েই, এই অসুস্থ শরীর নিয়েই, এই স্তব্ধ সময় ধরেই। 

হয়তো, নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থই হলো- এই ভাঙাচোরা মুহূর্তগুলোকেও আস্তে আস্তে, একটু একটু করে, স্পর্শ করে যাওয়া...

বুধবার, জানুয়ারি ২৮, ২০২৬

মানুষ, প্রয়োজন আর অনুভূতির অদ্ভুত হিসাবঃ Rental Family


কিছু সিনেমা আমরা গল্পের টানে দেখি, কিছু দেখি অভিনেতার জন্য। Rental Family (2025) আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দলে পড়লেও, সিনেমা শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর সময় বুঝলাম- এটা শুধু একজন অভিনেতার কামব্যাক নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন, শূন্যতা আর অনুভূতির এক গভীর পাঠ।


ব্রেন্ডন ফ্রেজার - এই নামটা আমার কাছে মানেই সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যুব পথে এগিয়ে যাওয়া বয়সের রোমাঞ্চ। The Mummy, Journey to the Center of the Earth - এই সিনেমাগুলোয় তার উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী, আলোয় ভরা। বহুদিন পর তার চেহারাটি পোস্টারে চোখে পড়তেই যেন পুরোনো স্মৃতি গুলো ঝলমল করে উঠলো, আর সেই টানেই বসে পড়েছিলাম "ভাড়া পরিবার" বা 'Rental Family' দেখতে। কিন্তু এবারের ব্রেন্ডন ফ্রেজার ছিলেন একেবারেই ভিন্ন একজন - নীরব, ভাঙা, ক্লান্ত এক মানুষ।

এই সিনেমার Philip চরিত্রটিকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, সে যেন ব্রেন্ডন ফ্রেজারের বাস্তব জীবনেরই এক ছায়া। একসময় যিনি অভিনয় জগতে জনপ্রিয়তার শিখরে ছিলেন, আজ তার নামই যেন ভুলে যেতে বসেছে মানুষ। জীবনের দায়ে, টিকে থাকার তাগিদে সে অভিনয় করছে। কিন্তু সেটি কোনো মঞ্চে নয়, বরং মানুষের জীবনের ফাঁকা জায়গাগুলোতে। বাবা নেই এমন শিশুর ভাড়া করা বাবা, পরিবারের সামনে একজন নারীর পরিপূর্ণতা লাভে ভাড়াটে স্বামী - এ যেন অভিনয়েরও আরেক রূপ, যেখানে ক্যামেরা নেই, কিন্তু অনুভূতি আছে।

সিনেমাটি দেখতে দেখতে সবচেয়ে যে ভাবনাটি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে, তা হলো- মানুষ কত বিচিত্র উপায়ে মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে। সমাজের প্রতিটি শূন্যস্থান কেউ না কেউ এসে ভরাট করে দেয়। কেউ পেশার খাতিরে, কেউ বাঁচার তাগিদে, কেউ বা নিঃসঙ্গতা থেকে। Rental Family যেন সেই অদ্ভুত অথচ বাস্তব পৃথিবীর দরজাটা ধীরে খুলে দেয়, যেখানে ভালোবাসা ভাড়া নেওয়া যায়, পরিবার সাময়িক হয়, কিন্তু অনুভূতিগুলো অস্থায়ী হলেও মিথ্যে নয়।


Philip চরিত্রের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তটি আসে তখনই, যখন সে নিজের বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া একটি ডিটেকটিভ সিনেমার অফার ফিরিয়ে দেয়। এই শহর, এই দেশ ছেড়ে যেতে হবে- এই শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে সে মনে করে ছোট্ট মেয়েটির কথা, যার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে সে নিজেই আবেগে জড়িয়ে পড়েছে। 


বাস্তবে কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো রক্তের টান নেই - তবু সে মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল, সে আর তাকে ছেড়ে যাবে না। এই দৃশ্যটি নিঃশব্দে বলে দেয়- অনুভূতির প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো জীবনের লক্ষ্যকেও হার মানায়।


সিনেমার আরেকটি গভীরভাবে নাড়া দেওয়া চরিত্র Kikuo Hasegawa। একসময়ের বিখ্যাত অভিনেতা, আজ স্মৃতিভ্রমে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ। তার একটাই ইচ্ছা- শৈশবের বাড়ি, যৌবনের স্মৃতি, পরিবার নিয়ে কাটানো গ্রামের সেই নিবাসকে, সেই দিনগুলো আরেকবার দেখে আসা। কিন্তু বয়স আর রোগের দেয়ালে আটকে যায় সেই আকুতি। নিজের মেয়ের নিষেধ অগ্রাহ্য করে Philip-কে সঙ্গী করে সে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে। এই যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বটুকু ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।


আর Shinji Tada, এই চরিত্রটি যেন সবচেয়ে নগ্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানসিক শান্তির জন্য সে ভাড়া করে নেয় স্ত্রী ও সন্তান। নিজের ভেতরের শূন্যতা ঢাকতে সে মিথ্যের আশ্রয় নেয়, কারণ তার কল্পনার পরিবার বাস্তবে নেই। তবু এই মিথ্যে সম্পর্কের মাঝেও তার বেঁচে থাকার লড়াইটা করুণভাবে সত্য।

Rental Family কোনো উচ্চকণ্ঠ সিনেমা নয়। এখানে নেই নাটকীয় সংলাপ, নেই বড়ো কোনো মোড়। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্য নিঃশব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমরা কি সত্যিই একা? নাকি প্রয়োজন আর অভিনয়ের মাঝামাঝি কোথাও আমাদের অনুভূতিগুলো সত্যি হয়ে ওঠে?


সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে, এই গল্পটা শুধু পর্দার নয়- এটা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। ভাড়ার সম্পর্ক, অভিনীত অনুভূতি, আর তার ভেতর জন্ম নেওয়া অপ্রত্যাশিত মানবিক বন্ধন- সব মিলিয়ে Rental Family এমন একটি সিনেমা, যা দেখে বেরিয়ে এসে মানুষ আর জীবনের দিকে নতুন করে তাকাতে ইচ্ছে করে।

যদি আপনি নীরব, মানবিক আর ভাবনার খোরাক দেওয়া সিনেমা পছন্দ করেন, তাহলে এই সিনেমাটি আপনার দেখার তালিকায় থাকতেই পারে।

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

শব্দ আছে, কণ্ঠ নেই..


এই ছবিটা আমাদের রাজনীতির নীরব আত্মকথা
এখানে নেতা বলেন আর জনতা মুগ্ধ হয়
শব্দগুলো আলো জ্বালায়, আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র আঁকে
মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে তালি পড়ে

রবিবার, আগস্ট ৩১, ২০২৫

Debian 13 Trixie ইন্সটলের পর করণীয়: Cinnamon ডেস্কটপের জন্য ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাইড

 


Debian, রক-সলিড ডিস্ট্রিবিউশন হিসেবে যার খ্যাতি বিশ্বজোড়া, সম্প্রতি মুক্তি দিয়েছে তাদের নতুন সংস্করণ Debian 13 “Trixie”। এই রিলিজে যুক্ত হয়েছে নতুন হার্ডওয়্যার সাপোর্ট, প্রায় ৭০ হাজার নতুন ও আপডেটেড প্যাকেজ, নিরাপত্তায় আরও উন্নয়ন, এবং প্রথমবারের মতো 64-bit RISC-V আর্কিটেকচার সাপোর্ট। পাশাপাশি ডেক্সটপ এনভায়রনমেন্টগুলোর নতুন সংস্করণ— GNOME 48, KDE Plasma 6.3, LXDE 13, LXQt 2.1.0 এবং Xfce 4.20—ব্যবহারকারীদের জন্য আরও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো non-free-firmware রিপোজিটরি এখন ডিফল্টভাবে সক্রিয় থাকে, ফলে Wi-Fi, Bluetooth ও গ্রাফিক্স কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রাইভার ইন্সটল আরও সহজ হয়েছে।

এইবার আমি আমার ডেক্সটপ এনভায়রনমেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছি Cinnamon। এর সহজবোধ্য ইন্টারফেস, আধুনিক ফিচার, হালকা রিসোর্স ব্যবহার এবং কাস্টমাইজেশনের স্বাধীনতা এটিকে সত্যিই ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে Windows ব্যবহার করেছেন, তাদের জন্য Cinnamon হতে পারে একদম পরিচিত-স্বাচ্ছন্দ্যময় ডেস্কটপ পরিবেশ।

এই পোস্টে আমি দেখাবো Debian 13 Cinnamon ইন্সটলের পর করণীয় ধাপে ধাপে কাজগুলো, যা করলে সিস্টেম হবে আরও সম্পূর্ণ, কার্যকরী ও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী।

Debian 13 Trixie কে Cinnamon ডেক্সটপ সহ ইন্সটলের পর ডেক্সটপ এর Menu হতে Terminal টি চালু করে নিন। এরপর নিচের ধাপে থাকা কমান্ড গুলো ব্যবহার করুন।


◈ সিস্টেম আপডেট করা

ইন্সটলেশনের পর প্রথমেই সিস্টেম আপডেট করা জরুরি, যাতে সর্বশেষ নিরাপত্তা আপডেট ও সফটওয়্যার পাওয়া যায়।

sudo apt update && sudo apt install -y netselect-apt && sudo netselect-apt && sudo apt full-upgrade -y
sudo apt autoremove --purge -y

এই কমান্ড দুটো সিস্টেমকে আপডেট করবে এবং অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজ মুছে ফেলবে।


◈ Non-Free Firmware সক্রিয় করা

নতুন Debian রিলিজে non-free-firmware রিপোজিটরি সহজে সক্রিয় করা যায়, যা বিভিন্ন প্রাইভেট হার্ডওয়্যার ড্রাইভারের জন্য জরুরি।

sudo sed -i 's/main$/main contrib non-free-firmware/' /etc/apt/sources.list
sudo sed -i 's/main contrib$/main contrib non-free-firmware/' /etc/apt/sources.list
sudo apt update


◈ Firmware ইন্সটল করা

এটি Intel/AMD এর মাইক্রোকোডসহ প্রয়োজনীয় ফার্মওয়্যার ইন্সটল করবে, যা সিস্টেমের স্থায়িত্ব ও হার্ডওয়্যার কম্প্যাটিবিলিটি বাড়াবে।

sudo apt install -y firmware-linux firmware-linux-nonfree firmware-misc-nonfree dkms linux-headers-$(uname -r) intel-microcode amd64-microcode mesa-utils


◈ প্রয়োজনীয় টুলস ও সফটওয়্যার ইন্সটল করা

এই ধাপে সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু টুল ও সফটওয়্যার ইন্সটল করা হবে।

sudo apt install -y curl wget git build-essential gnome-software synaptic gdebi gparted gnome-disk-utility libfuse2


◈ অফিস, মাল্টিমিডিয়া ও গ্রাফিক্স অ্যাপ সহ আরও কিছু প্রয়োজনীয় এ্যাপ ইন্সটল করা

sudo apt install -y libreoffice libreoffice-impress libreoffice-writer libreoffice-calc celluloid rhythmbox gimp gimp-data gimp-data-extras inkscape bleachbit gedit gedit-plugins gedit-plugins-common nala p7zip p7zip-full unzip


◈ মাল্টিমিডিয়া কোডেক ও প্লেয়ার ইন্সটল করা

Deb-Multimedia রিপো যোগ করে VLC, FFmpeg, Audacious, HandBrake ও kodi ইন্সটল করা হয়, যাতে সব ধরনের অডিও-ভিডিও ফরম্যাট চালানো যায়।

sudo wget -qO /tmp/dmo-keyring.deb https://www.deb-multimedia.org/pool/main/d/deb-multimedia-keyring/deb-multimedia-keyring_2024.9.1_all.deb && sudo dpkg -i /tmp/dmo-keyring.deb && echo "Types: deb\nURIs: https://www.deb-multimedia.org\nSuites: trixie\nComponents: main non-free\nSigned-By: /usr/share/keyrings/deb-multimedia-keyring.pgp\nEnabled: yes" | sudo tee /etc/apt/sources.list.d/dmo.sources >/dev/null

sudo apt update && sudo apt install -y vlc ffmpeg libavcodec-extra libdvdcss2 gstreamer1.0-plugins-bad gstreamer1.0-plugins-ugly audacious audacious-plugins handbrake-gtk kodi


◈ LocalSend (ক্রস-প্লাটফর্ম ফাইল শেয়ার অ্যাপ) ইন্সটল করা

wget -O localsend.deb https://github.com/localsend/localsend/releases/download/v1.17.0/LocalSend-1.17.0-linux-x86-64.deb;dpkg -i localsend.deb
rm -rf localsend*.deb


◈ লগইন স্ক্রিন কাস্টমাইজ/টুইক করা

sudo grep -q '^greeter-hide-users=' /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_debian.conf && sudo sed -i 's/^greeter-hide-users=.*/greeter-hide-users=false/' /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_debian.conf || echo "greeter-hide-users=false" | sudo tee -a /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_debian.conf


◈ Cinnamon এর জন্য থিম ইন্সটল

wget http://packages.linuxmint.com/pool/main/m/mint-themes/mint-themes_1.8.3_all.deb
wget http://packages.linuxmint.com/pool/main/m/mint-x-icons/mint-x-icons_1.5.3_all.deb
sudo apt install -y mint-y-icons
sudo dpkg -i *.deb
rm -rf mint-*.deb


◈ তারিখ ও সময় সেটিংস পরিবর্তন করা

নেটওয়ার্ক থেকে বাংলাদেশের জন্যে সময় ও তারিখ ঠিক করা ও ১২-ঘন্টার ঘড়িকে ডিফল্ট করা

timedatectl set-timezone Asia/Dhaka
timedatectl set-ntp true
gsettings set org.cinnamon.desktop.interface clock-show-date true
gsettings set org.cinnamon.desktop.interface clock-use-24h false


◈ বাংলা ফন্ট সাপোর্ট

এই ধাপে প্রয়োজনীয় বাংলা ফন্ট গুলো ইন্সটল করা হবে, আর বাংলা লেখাকে সুন্দর দেখানোর জন্য সিস্টেমে বাংলা ফন্ট সেট করা হবে

sudo apt install -y fonts-noto fonts-noto-color-emoji fonts-noto-extra fonts-noto-unhinted
sudo cd /tmp;wget --no-check-certificate https://github.com/r-not/unibnfonts/archive/master.tar.gz -O ubf.tar.gz;sudo tar -xvf ubf.tar.gz -C /usr/share/fonts/;rm ubf.tar.gz
cd /tmp;wget --no-check-certificate https://raw.githubusercontent.com/r-not/MyLinuxConfFiles/refs/heads/master/Common-Configs/bn-font-set.sh -O bn-font
set.sh;sh ./bn-font-set.sh


◈ ব্রাউজার ইন্সটলেশন

Debian এর সাথে ডিফল্ট ভাবে Firefix-ESR সংস্করণ দেয়া থাকে। আমরা এখানে এই সংস্করণটি বাদ দিয়ে ফায়ারফক্সের রেগুলার সংস্করণ ইন্সটল করব। একই সাথে Cromium ব্রাউজার ও Brave ব্রাউজারটি ইন্সটল করব।

sudo apt remove --purge -y firefox-esr*
sudo install -d -m 0755 /etc/apt/keyrings
wget -q https://packages.mozilla.org/apt/repo-signing-key.gpg -O- | sudo tee /etc/apt/keyrings/packages.mozilla.org.asc > /dev/null
gpg -n -q --import --import-options import-show /etc/apt/keyrings/packages.mozilla.org.asc | awk '/pub/{getline; gsub(/^ +| +$/,""); if($0 == "35BAA0B33E9EB396F59CA838C0BA5CE6DC6315A3") print "\nThe key fingerprint matches ("$0").\n"; else print "\nVerification failed: the fingerprint ("$0") does not match the expected one.\n"}'
FILE="/etc/apt/sources.list.d/mozilla.list"
LINE='deb [signed-by=/etc/apt/keyrings/packages.mozilla.org.asc] https://packages.mozilla.org/apt mozilla main'
sudo touch "$FILE"
grep -qxF "$LINE" "$FILE" || echo "$LINE" | sudo tee -a "$FILE" > /dev/null
echo '
Package: *
Pin: origin packages.mozilla.org
Pin-Priority: 1000
' | sudo tee /etc/apt/preferences.d/mozilla
sudo apt update && sudo apt install -y firefox firefox-l10n-bn chromium
curl -fsS https://dl.brave.com/install.sh | sh


◈ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট টুল ইন্সটল করা

ল্যাপটপে যারা ব্যাটারি পার্ফোমেন্স নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন তারা এই কমান্ড দুটো ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এই ধাপে বহুল পরিচিত পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট টুল tlp ইন্সটল করে তা সক্রিয় করে দেয়া হবে।

sudo apt install -y tlp tlp-rdw
sudo systemctl enable tlp


◈ সিস্টেম ব্যাকআপ/রেসকিউ টুল (Timeshift) ইন্সটল করা

এই ব্যাকআপ টুলটি দারুণ কার্যকর। যারা ইতোমধ্যে ব্যবহার করেছে তারা এর কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা রাখে। সহজ করে বললে, এটি দিয়ে একটি ব্যাকআপ রাখা থাকলে আপার সিস্টেম ক্রাশ করা অবস্থা থেকে পুনরায় ফাংশনাল অবস্থায় ফেরত যেতে পারবেন নিমিষেই।

sudo apt install -y timeshift


◈ Flatpak সাপোর্ট চালু করা

নিচের কমান্ড দুটো ব্যবহার করে লিনাক্স জগতের জনপ্রিয় প্যাকেজ ফরম্যাট Flatpak এর সাপোর্ট সক্রিয় করা হবে। সাথে ইন্সটল হবে ফ্লাটপ্যাক এ্যাপ খোজার জন্যে এ্যাপস্টোর

sudo apt install -y flatpak gnome-software-plugin-flatpak
flatpak remote-add --if-not-exists flathub https://flathub.org/repo/flathub.flatpakrepo‌


◈ ফায়ারওয়াল

সবশেষে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জোড়দার করতে ইন্সটল ও সক্রিয় করে নিন Firewall প্রোগ্রাম

apt install -y ufw gufw
sudo ufw status | grep -q "Status: active" || { sudo ufw --force enable && sudo systemctl enable --now ufw; }

 

 

এবার সিস্টেমটিকে একবার রিস্টার্ট করুন সকল পরিবর্তন গুলো সক্রিয় করার জন্য। তারপর আপনার পছন্দসই একটি থিম বেছে নিন Menu > Themes হতে।


◈ চলুন সহজে করি!!

যারা এত লম্বা ধাপ গুলো দেখে বিরক্ত হচ্ছেন, অথবা ঝামেলা মনে হচ্ছে তাদের জন্যে কাজটি সহজ করার জন্যে একটি স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে। আপনি চাইলে এই সম্পূর্ণ কাজটি শুধুমাত্র নিচের কমান্ডটি ব্যবহার করে করতে পারেন।

wget https://shorturl.at/gZxeE -O deb13PIS.sh;sh ./deb13PIS.sh


Debian 13 Cinnamon Post Install Guide with Essential Tweaks
 

আপাতত এখানেই শেষ করছি। লেখায় অথবা কমান্ড গুলোতে ভুল থাকা স্বাভাবিক। আমার নজরে পড়লে সংশোধন করে দেয়ার চেষ্টা করব। পাশাপাশি কমান্ডগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে আপনার কোথায় সমস্যা হয়েছে তা জানালে তা সমাধান করা অথবা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন গুলো করে নেয়া সহজ হবে। এই পুরো ব্যাপারটি সাজানো হয়েছে একজন (আমার নিজের) ব্যবহারকারীর প্রয়োজন ও পছন্দের উপর ভিত্তি করে। কিছু অংশ অথবা হয়ত পুরো প্রকৃয়াটিই হয়ত আপনার জন্য অপ্রাসঙ্গিক। তাই অনুরোধ থাকবে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় অংশটি ব্যবহার করে দেখবার জন্য।


লিনাক্সের গ্যালাক্সিতে ডেবিয়ানকে নিয়ে আপনার জার্নি হয়ে উঠুক আনন্দময়।


সোমবার, আগস্ট ২৫, ২০২৫

ডায়েরিঃ আগস্ট ২৫, ২০২৫ঈ ॥ ১০১ দিন

পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে চলছে। সূর্য ওঠছে, আবার নিয়ম মেনে অস্ত যাচ্ছে; রাত নামছে, ফের ভোর আসছে; মানুষ আসছে-যাচ্ছে, বাঁচছে-মরছে; সবকিছু আগের মতোই চলছে। কিন্তু আমার কাছে পৃথিবীর রূপ আর আগের মতো নেই। পৃথিবীটাকে আমি আর আগের চোখে দেখতে পারি না। কারণ এই পৃথিবীতে জীবনধারণের ধরণ বদলে গেছে। সম্পর্কের ধরন পাল্টে গেছে, বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে গেছে, আর ভরসার জায়গাগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে।


আমি ভেবেছিলাম- কষ্ট গুলো ধীরে ধীরে মুছে যায়, সময়ের সাথে সাথে ক্ষতস্থান শুকিয়ে আসে। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে অন্য শিক্ষা দিয়েছে। কষ্ট আসলে কখনোই মুছে যায় না, ম্লান হয়ে বিবর্ণও হয় না; বরং সময় তাকে আরও প্রকট ভাবে দৃশ্যমান করে তোলে। যত দিন যায়, কষ্ট তত গভীরভাবে হৃদয়ে গেঁথে বসে। ক্ষণিকের আঘাত সময়ের প্রবাহে গাঢ় ক্ষতচিহ্নে পরিণত হয়, আর সেই দাগ চিরস্থায়ী হয়ে যায়।


মানুষের প্রতি বিশ্বাস, ভরসা আর সম্মান- যা একসময় আমার কাছে অবিচল সত্য মনে হয়েছিল; এখন ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষকে সহজভাবে বিশ্বাস করা ছিল মস্ত ভুলের একটি। আমি যাদের কাছে আদর্শ খুঁজি, যাদের চোখে সাধুতা দেখি, তাদের ভেতরে আসলে এমন কিছু নেই। সবাই প্রয়োজনের খাতিরে সাধু হয়, আর প্রয়োজন ফুরোলেই সাধু ভং ধরা মুখোশটা খুলে কুটিলতায় ভরা প্রকৃত মুখটি প্রকাশ পায়। মানুষের এই দ্বিমুখী চরিত্র এত কাছ থেকে না দেখলে হয়ত কখনো বিশ্বাস করতাম না।


এই অল্প কয়েকদিনে জীবনের আরেকটি কঠিন সত্যও উপলব্ধি করেছি। যে সকল মানুষের হৃদয়ের ভেতর কুটিলতা ভর করেছে, যার হৃদয় কালশিটে ময়লা পড়ে পচে গেছে, যার চিন্তাধারায় কুটিলতা আর অনিষ্ট ছাড়া ভিন্ন কিছু কাজ করে না; তার সাথে আপনি যতই ভালো ব্যবহার করেন না কেন, যতই ধৈর্য ধারে সহ্য করে সমস্যার সমাধান খুঁজতে চান না কেন, কোনো লাভ নেই। তাদের স্বভাব পাল্টায় না, পাল্টাবার নয়। এদের মোহর লাগানো হৃদয়ের কথাই ওপরওয়ালা আমাদের বলেছেন, বিধাতার হুকুম ছাড়া এই মোহর আর কখনোই পরিষ্কার হবে না। বরং এই কুটিলতায় পূর্ণ নরকের কীট গুলো খুঁজে খুঁজে আপনার দুর্বলতা খুঁজে বের করে আপনাকে আরও গভীর সমস্যায় ফেলে দেবে।


আমার শূন্য হয়ে পড়া পৃথিবীটার বয়স আজ ১০১ দিন। ঠিক ১০০ দিন পূর্বে আমার আম্মা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আপন শান্ত পরিবেশ খুঁজে নিয়েছেন। দিন হিসেবে ১০০ দিন খুব নগণ্য হলেও এই ১০০ দিনের পৃথিবী আমাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে, যেখানে নেই মায়ের মমতা, নেই সেই নির্ভরতার ছায়া। আছে কেবল ভান করা মায়া, সমাজের সামনে যাত্রা-নাটক প্রদর্শন করার মতো ভদ্রতা, আর স্বার্থের ফাঁদে জড়িয়ে থাকা সম্পর্ক। এই ১০০ দিনেই ‘পরিচিত’ আর ‘কাছের’ নামধারী সম্পর্ক গুলো চোখের পলকেই গিরগিটির মত রঙ বদলে নিয়েছে।


আমি কখনো ভাবিনি আম্মা আমাদের এত দ্রুত ছেড়ে চলে যাবেন। আমি ভেবেছিলাম আম্মা অন্তত আরও বিশটি বছর আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তাঁর ছায়াশীতল মমতা আমাদের আগলে রাখবে, আমাদের আঁচল ভরসার আকাশ হয়ে থাকবে মাথার উপরে। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু থেমে গেল। যে মানুষটিকে ভরসার স্তম্ভ ভেবেছিলাম, তিনি হঠাৎ করেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। আর তার অনুপস্থিতি আমার হৃদয়ে এক বিশাল অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দিল।


আজ মনে হয়, ছোটবেলা থেকে যে মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়েছিলাম, সেগুলো আসলে বাস্তব জীবনে অকার্যকর। সততা, নীতিকথা, সত্য-বচন- এসব আঁকড়ে ধরে আমি শুধু পিছিয়েই পড়েছি। আর চারপাশের মানুষগুলো নিজেদের স্বার্থের জন্য কোনোকিছু করতে দ্বিধা করেনি। এই ১০০ দিনে আমি দেখেছি রক্তের সম্পর্কও কেমন করে বিশ্বাসঘাতক হয়ে যায়। যাদের একসময় নিজের বলতে শিখেছিলাম, যাদের আপন ভেবে স্বস্তি আর মনের তৃপ্তি বুঝে নিতাম; তারাই স্বার্থ হাসিলে বেইমান হয়ে উঠেছে। মানুষ যে এতটা স্বার্থপর হতে পারে, এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, এত বড় মাপের নিমকহারাম হতে পারে; এমন করে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতাম না।


সব আক্ষেপ, সব হতাশা, সব কষ্ট আর সব বেদনার শেষে আমার একমাত্র প্রার্থনা- মহান আল্লাহ যেন আমার আম্মাকে পরিপূর্ণ শান্তি দান করেন। তিনি যেন হাসরের ময়দানে আম্মাকে হাউজে কাউসারের শীতল পানীয় দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করান। আর জান্নাতুল ফেরদৌসকে আম্মার জন্যে স্থায়ী আবাস হিসেবে ঘোষণা করে দেন।


আমার জীবন আজ শূন্যতায় ভরা। কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতরও আমি মায়ের শান্তির জন্য হৃদয়ের অন্তঃস্থল হতে দোয়া করি। কারণ আমার সমস্ত বিশ্বাস, ভরসা আর আশ্রয় এক মানুষেই ছিল- আমার আম্মা। আর আজ তিনি নেই… ১০১ দিন।

সোমবার, আগস্ট ১৮, ২০২৫

একদিন ঠিক হারাবো গিয়ে বনে…

 

⠀⠀⠀⠀

প্রায়ই আমার এই শহরের ভিড় থেকে পালাতে ইচ্ছা করে। 

এই যে অলিগলি রাস্তা জুড়ে হাজর মানুষের হাঁটা-চলা, যান্ত্রিক জীবনের অনবরত শব্দ; এসবের মাঝে নিজেকে আমার দারুণ বন্দী মনে হয়। যদিও খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার জন্যই এই শহর জীবন, কিন্তু সে তো আমাকে মুক্ত ভাবে শ্বাস নিতে দেয় না। কংক্রিটের এই জঙ্গলে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন মনে হয়, আমি ভুলে যাচ্ছি মুক্ত জীবনের স্বাদ।

হয়ত এই কারণেই মনে মনে ইচ্ছে হয় কোন এক হাঁটা-পা এর রাস্তা ধরে অচেনা কোন গহিন বনে হারাতে। আঁকাবাঁকা পথ, পাতায় ঢাকা, রঙে রঙে মোড়া পথ, কোলাহল বিহীন সেই পথে হেঁটে বেড়াতে। সেই বন আর বনের পথটি হবে একান্তই আমার নিজের।

শহরে বুকে কখনো যে গন্ধ মিলে না, সেই গন্ধে ভরে থাকবে আমার সেই বুনো পথ। মাটির কাঁচা গন্ধ, ঝড়া পাতার অচেনা সুরভি, আর হয়ত কোন অদৃশ্য ফুলের মৃদু সুবাস। সেখানে শ্বাস নিতে গিয়ে মনে হবে- আমি বেঁচে আছি, সত্যিই বেঁচে আছি। শহরের ধোঁয়া, গ্যাস, বর্জ্য কিংবা কৃত্রিম সুবাস এই সবই সেখানে থাকবে কেবলই এক দুঃস্বপ্ন হয়ে।

বনের গভীর নিস্তব্ধতাকে আগলে নেবো নিজের অস্তিত্বের সাথে। সেখানে থাকবে না এলোমেলো ব্যস্ত পদচারণা, থাকবে না কুৎসিত হর্ন, থাকবে না ট্র্যাফিক জ্যাম, থাকবে না পিচের গরম। থাকবে কেবল পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, থাকবে শুকনো পাতার উপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া অচেনা কোন প্রাণীর পদচারণা, থাকবে বাতাসের ফিস‍্‍‍ফিসানি আর থাকবে অন্তর জুড়ানো গাছের ছায়া। এই সবই প্রকৃতির আপন স্পর্শ, এগুলোই পৃথিবীর আসল ভাষা; যা আমরা ভুলে গেছি এই কোলাহলে মত্ত হয়ে। 

ফ্লুরোসেন্টের আলোর নিচে বসে এখন আমি এক অন্ধকার পৃথিবী দেখি। এই আলো হৃদয়ের গহিন কোণকে আলোকিত করতে পারে না। অথচ আমার সেই অরণ্যে খেলা করে বিস্ময়ের আলো নিয়ে। পাতার ফাঁক গলে যখন সূর্যের আলো যখন মাটির গায়ে পড়ে, মনে হয় যেন ছোট ছোট আলোর কণা মিছিল করছে সেখানে। আবার মাঝে মাঝে আলোর রশ্মি গুলো এমন এক বিভ্রম তৈরি করে, যেন মনে হয় সেখানে রয়েছে এক আলোর ঝলমলে দেয়াল। দেয়ালের ওপারে রয়েছে অন্য এক জগৎ, যেখানে নেই কোন দায়িত্ব, নেই কোন দৌড়ঝাঁপ, নেই কোন একঘেয়েমি। শুধু শান্তি- নির্মল, অনাবিল শান্তির বাস সেখানে।

এই যে শহরজুড়ে গায়ের সাথে গা ঘেঁষে তৈরি হয়েছে আকাশছোঁয়া দালানের জঞ্জাল। একের পর এক বিল্ডিং, যার জানালা দিয়ে নিচে তাকালে কেবল দেখা মেলে ছুটে চলা শহর, ধুলো, কালো ধোঁয়া আর মেকি জীবনের দৌড়ঝাঁপ। এখানকার প্রতিটি দালান, প্রতিটি ফ্ল্যাট, প্রতিটি খোপ-খোপ রুম যেন এক একটি কারাগার। জীবনের মায়ায় অন্ধ হওয়ার দোষে সবাইকে সেই কারাগার যাপনের আদেশ দেয়া হয়েছে এখানে। অথচ আমার বনে প্রতিটি গাছই জানালা, প্রতিটি পথ মুক্তির, আর বহমান বাতাসে বাজে জীবনের সুর।

আমার ভেতরের আমিটা বারবার বলে উঠে- “বারবার হারিয়ে যাও তোমার আরণ্যের গভীর থেকে গভীরে; ক্লান্তি ঘিরে ফেলার আগ পর্যন্ত হেঁটে বেড়াও আঁকাবাঁকা পথটি ধরে।” হয়ত কোনো একদিন সত্যিই সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবো। খুঁজে বের করবো আমার সেই প্রিয় বনটিকে অজানা কোন প্রান্তে। যেখানে আমার সাথে থাকবে কেবল ‘আমি’। গাছ, পাখি, পো‌ঁকা আর মাটি -সবাই মিলে ঘুচিয়ে দিবে আমার হৃদয়ের অসীম নিঃসঙ্গতা। 

⠀⠀⠀⠀

তখন আর আমি এই শহুরে মানুষ থাকবো না; আমি হবো বনের সন্তান… 

⠀⠀⠀⠀

⠀⠀⠀⠀

⠀⠀⠀⠀

ছবি-সূত্রঃ u/myriyevskyy

শনিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৫

তুমি তো আমাকে চেনো…

 


প্রথম ভাগঃ প্রারম্ভিকা

জানোই তো, ঘুম হল এক ধরনের প্রতারণা। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে তুমি চোখটা বন্ধ কর, ধীরে ধীরে তোমার শরীর শিথিল হতে শুরু করে। হৃৎস্পন্দন কমে আসে, কমে আসে শরীরের তাপমাত্রা। তুমি তখন নিজেকে নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে শুরু কর। 

আর ঠিক সেই সময়টাতেই তোমার বুকের উপর এমন কিছু একটা উঠে বসে, যার অস্তিত্বের কথা তোমার জানা নেই!

তবে আমি জানি, কারণ আমি তো সেটা দেখেছি।

আচ্ছা চল, তোমাকে আমার ঘটনাটা বলি, তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে আমি কীসের কথা বলছি।

প্রথম রাতে আমি শুধু একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। শব্দটা মৃদু হলেও তার তীক্ষ্ম একটা অনুভূতি আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল সেটি। অন্ধকারে, ঠিক আমার বিছানার কোণ থেকে শব্দটা হয়েছিল। কেমন একটা ঠান্ডা, গভীর, লম্বা একটা টান। আমি ভেবেছিলাম মনের ধোঁকা হয়তো, এত রাতে একা ঘরে কার নিঃশ্বাসের শব্দ হবে!

দ্বিতীয় রাতেও আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, খুব অস্বস্তি লাগছিল। ওটা তখন আমার বুকের উপর বসে আছে। নড়তে পারছিলাম না, শ্বাসও নিতে পারছিলাম না। শুধু অনুভব করছিলাম সেই ঠান্ডা নিঃশ্বাসের মতই- ঠান্ডা, ভেজা হাতটি গলার চেপে ধরে আছে। চাপটা খুব অদ্ভুত, না শক্ত - না নরম; তবে ততটাই, যতটা থাকলে পরে তোমাকে আতঙ্ক আঁকড়ে ধরে।

দিনের আলোতে এই কথাগুলো নিজের কাছেই হাস্যকর লাগছিল। বিশ্বাস কর, মাকে গিয়ে যে কথা গুলো বলব, আমার তো নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল ছ’বছরের বাচ্চারা রাতে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে যা করে, আমিও তেমন করছি।

তৃতীয় রাতেও আমি সেই ঠান্ডা হাতের অনুভব পেলাম। আমি ঠিক-ঠিক গুনে ফেললাম- সেখানে মোট ছ’টা আঙ্গুল আছে। তিনটা বামে, আর তিনটা ডানে। বরফ শীতল আঙ্গুলগুলো যেন গলার চামড়া ফুড়ে মেরুদন্ড ছুঁয়ে দিতে চাইছে!

তারপর, চতুর্থ রাত, আমি বুঝলাম ও আমাকে ডাকছে। ওকে আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু ওর কণ্ঠটা যেন আমার মস্তিষ্কের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে। বলছে- ‘তুমি তো আমাকে চেনো….’

পরদিন সকালে মা আমাকে ডাকতে এসে দেখলেন, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি। ডাক্তার বলল- ‘হার্ট অ্যাটাক’। সবাই সেটা বিশ্বাসও করে নিল। অথচ, আমি সেখানেই ছিলাম, আয়নাটার সামনে। যেখান থেকে আমি সেই ছায়াটাকে ধীরে ধীরে সরে যেতে দেখছিলাম, আর তার দৃষ্টি ছিল… থাক সে কথা।

⠀⠀⠀

এর ক'দিন বাদেই ওরা সবাই বাড়িটা খালি করে কোথায় যেন চলে যায়। আমি ওদের দেখেছি, ওরা ঘরের আসবাবপত্র বের করছে, সামানা গোছাচ্ছে, ভ্যানে ভরছে। কিন্তু ওরা আমাকে দেখে না। জানালা দিয়ে আমি কেবল ওদের চলে যাওয়াটুকুই দেখলাম। এরপর থেকেই আমি একা, একদম একা।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

দ্বিতীয় ভাগঃ বাড়ির নতুন বাসিন্দা...

শহর ছেড়ে এই গ্রামে এসেছি দিন দশেক হয়েছে। একটা প্রজেক্ট চলছে এখানে, আরও কয়েক মাস চলবে। প্রথম কয়েকদিন তো এখানকার কাজ-কর্মের কোন আগা-মাথা বুঝে পাচ্ছিলাম না। সবই চলছে নিয়ম মাফিক, আবার সবই এলোমেলো। সে সব গোছাতেই চলে গেছে এই কয়েকদিন। হেড অফিস থেকে জানাল, তারা এখানে নতুন কাউকে পোস্টিং দিবে বলে ভাবছে। তবে সেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে একটু কাজগুলো গুছিয়ে দিতে বলল।

শহরের বাইরে আমার তেমন করে কখনো থাকা হয়নি। এখন এই কাজের কারণে না আসলে হয়ত এভাবে এতদিনের জন্যে আসা হতো না। শহরেই জন্ম, বেড়ে উঠা, আর শহরেই জীবনটার ইতি হতো। সারাদিন ভালোই কাটে, কাজের ব্যস্ততায়, সাইট ঘুরে দেখে। কিন্তু বিকেলের পর আর সময় কাটতে চায় না। তার উপর এমন একটা জায়গায় থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে! ছোট একটা একতলা বাড়ি, একদম গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে। বাড়িটা অফিসের, এখানে তারা অন্য একটা প্রজেক্টের জন্য জমি কিনার সময় খুব কম দামে পেয়ে যায়, তাই কিনে নেয়। কারও থাকার উদ্দেশ্য না হলেও এখন এই প্রজেক্টের জন্যে আমার থাকার জায়গা হয়েছে।

ছিমছাম শান্ত পরিবেশ ঘেরা, ঝুপ করে সন্ধ্যা নামার পর নাম না জানা পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। এখানকার ম্যানেজার প্রথমে তার বাসাতেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কারও বাসায় এভাবে থাকাটা পছন্দ হচ্ছিল না, তাই সেটা বাতিল করেছিলাম। এরপর তিনি একপ্রকার জোড় করেই খাবারের ব্যবস্থাটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলেন। এখন টিফিন কেরিয়ারে করে সন্ধ্যার পরপর খাবার চলে আসে তার বাড়ি থেকে। তবে এক ফাঁকে তিনি আমাকে জানালেন, এই বাড়িটার ব্যাপারে কিছু আজেবাজে কথা শোনা যায়। যদিও বিশ্বাস করার মত তেমন কোনো ভিত্তি নেই। তারপরও রাতে বাড়ি থেকে বের হতে বারণ করলেন। আর কোনো সমস্যা হলে যত রাতই হোক, তাকে যেন নির্দ্বিধায় ফোন করে জানাই -সে আশ্বাস আদায় করে নিলেন।

দিনভর দৌড়োদৌড়ির পর শান্ত পরিবেশ আর পেট পুরে খানা পেয়ে এখন ঘুমও চলে আসে দ্রুত। বড় জোড় রাত ১০টা পর্যন্ত জাগে থাকতে পারি, তারপর টুপ করে ঘুম ধরে বসে। অবশ্য আমিও যে খুব জেগে থাকতে চাই, তা না। সকাল সকাল খুব ফ্রেশ একটা ভাব চলে আসে এত লম্বা ঘুম পেয়ে। দিনের ক্লান্তিটা তখন আর তেমন গায়ে লাগে না।

এগারো তম রাতে হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছিল, ঠিক বোঝানোর মত না। কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছে। জানালার ফাঁকা দিয়ে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো এসে বিছানার একপাশে থেমে আছে। মনে হচ্ছে যেন সময়টাও আটকে গেছে। অস্বস্তিটা আমাকে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে, উঠে বসে টেবিল থেকে মোবাইল বা ঘড়িটা পর্যন্ত নিতে ইচ্ছে হলো না। বেশ অনেকটা সময় পর হঠাৎ করেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কেউ রিমোট থেকে প্লে বাটনে চাপ দেয়ার সাথে সাথেই সব আগের মতই চলতে শুরু করেছে। অস্বস্তিটাও কেটে গেল প্রায় সাথে সাথেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আবার ঘুমের সাগরে ডুবে গেলাম।

পরদিন আর এটা নিয়ে তেমন কিছুই মনে থাকলো না। সাইট ঘুরে কাজ দেখতে দেখতে দিন কেটে গেল।

সমস্যাটা হলো আবার রাতে। গতদিনের মতই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ঠিক ভেঙ্গে গেল কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছিলাম না। যেন ঘুমের গভীর কোন স্তরে ডুবে আছি, কোন নড়াচড়া কিংবা সাড়াশব্দ কিচ্ছু নেই। কেবল একটা চাপা অস্বস্তি।

হঠাৎ বুকের উপরে ভারী আর ঠান্ডা একটা চাপ অনুভব করলাম। কারও উপস্থিতি… না, কারও বসে থাকা। শরীর শক্ত হয়ে গেছে, আঙুল পর্যন্ত নড়ছে না। চিৎকার করতে গেলেও শব্দ বের হচ্ছিল না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

তারপর ঠান্ডা, ভেজা একজোড়া হাত গলার দুই পাশে চেপে ধরলো। এমনভাবে চাপ দিচ্ছিল- যেন নিখুঁতভাবে আমার শ্বাস বন্ধ করতে চাইছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। আর কানের ভেতর একটা ফিসফিসানি-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আজকের পূর্বে আমার নিজেকে কখনো ভীতু মনে না হলেও, আজ আমার বুকের ভেতর ভয় ভয় জমে বরফ হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো নিঃশ্বাসও নেওয়ার দরকার পড়ছে না। গলার চাপ কমেনি, বরং বেড়েছে বলা যায়। অথচ শ্বাস টানার কোন আকুতি আর ফুসফুস করছে না। হয়ত অক্সিজেনের অভাবে উল্টোপাল্টা ভাবছি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছি যে মস্তিষ্ক পরিষ্কার চিন্তা করতে পারছে। আর প্রশ্নটা নিজে থেকেই এলো- তবে কি আমি মারা গিয়েছি? নাকি এটা পুরোপুরি কল্পনা? অথবা এই অনুভূতিটাই মৃত্যুর পরের অংশ?

পরের মুহূর্তেই উঠে বসলাম। বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু ঘরের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক। জোরে জোরে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিচ্ছি, বা হাঁপাচ্ছি। বিছানাটা এলোমেলো, চাদর গুটিয়ে গেছে।

নামলাম বিছানা থেকে, হেঁটে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। একটু আগে যে আতঙ্ক ভর করেছিল, তার ছিটে-ফোটাও লাগছে না এখন। উলটো নিজেকে যেন আরও হালকা লাগছে। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিলাম। মাথা কিছুটা পরিষ্কার হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বোকামিতে হেসে ফেলতে গেলাম,কিন্তু হাসি মিলিয়ে গেল পরের সেকেন্ডেই।

গলার দুই পাশে তিনটা করে সমান লালচে দাগ। যেন কারও আঙুলের চাপের ছাপ। আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম, হালকা গরম, কিন্তু কোনো ব্যথা নেই। আমার আতঙ্কিত হওয়ার কথা, কিন্তু তেমন কোন অনুভূতি হচ্ছে না। যেন এমনটা হবে আমি জানতাম!

এরপর আর ভালো ঘুম হলো না। বারবার কেবল ঘুরে ফিরে ঐ ফিস্‌ফিস শব্দটা মাথায় চলে আসছিল। "তুমি তো আমাকে চেনো…"

পরদিন সকালে অফিসে গিয়েই এখানকার ম্যানেজার সাহেবকে জানালাম জরুরি কাজে বাড়ি যাচ্ছি। হাতের কাজগুলো তাকে বুঝিয়ে দিয়েই গাড়িতে উঠলাম। হেড অফিসে কেবল অসুস্থতার ছুটির জন্য একটা মেইল পাঠিয়ে রাখলাম।

আট ঘণ্টার জার্নি দিয়ে ফিরলাম বাসায়। আমার কেবল মনে হচ্ছিল আমাকে যে করেই হোক ঐ জায়গাটা ছেড়ে আসতে হবে। তাই আর সামনে-পেছনে কোন কিছুই চিন্তা না করে সোজা বাসায় এসেছি। অবশ্য বাসায় এসে কাউকে কিছু বলে ভরকে দিতে ইচ্ছা হল না। ছুটি নিয়েছি, জানালাম কেবল। ওরা ভাবল, এভাবে হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকা, আর লম্বা জার্নির কারণে আমাকে এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

ফ্রেশ হয়ে কোনোরকম রাতের খাবার শেষ করেই আমার রুমে গিয়ে ঢুকলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম ঘুম ভাব চলে আসল। অনিচ্ছাতেও গভীর ঘুমে নিপতিত হতে থাকলাম।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

তৃতীয় ভাগঃ অবশেষ…

একটা ঘোরের মন লাগছে। মনে হচ্ছে জেগে আছি, আবার মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। বিছানায় উঠে বসতেই আলমারির আয়নার দিকে চোখ পড়ল। পেছনে বাথরুমের দরজা আধখোলা, আর তার ফাঁক দিয়ে মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে আছে- অস্পষ্ট, ছায়ার মতো।

আমি চোখ মুছলাম, আবার তাকালাম- কই? কেউ তো নেই!

হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
না, আসলে বাতাস নয়, নিশ্বাস নেয়ার আকুতি; থেমে গেলো।

আয়নার ভেতরে আমার পেছনে অন্ধকার জমতে শুরু করলো। প্রথমে মনে হলো ছায়া, কিন্তু তা ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে- লম্বা, কঙ্কালসার হাত… প্রতিটি হাতে তিনটি লম্বা আঙুল।

আমার কাঁধের উপর দিয়ে সেই হাতের ছায়া এগিয়ে এলো। আয়নায় হাত দেখা গেলেও আমার গায়ে কোন কিছুর ছোঁয়া অনুভব করলাম না। আমি স্থির হয়ে রইলাম, চোখের পাপড়িও ফেলতে পারছি না।

তারপর সেই ছায়ার মাথাটা ঝুঁকে এল আমার ঠিক কানের পাশে। কোনো ঠোঁট নড়ছে না, কিন্তু এক বরফশীতল ফিসফিসানি মাথার ভেতর এক স্বরে বলেই চলেছে-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আমি তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম প্রতিফলনে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটা আসলে আমি নই।

প্রতিফলনের চোখ গাঢ় কালো হয়ে গেছে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর গলার দাগগুলো রক্তিম লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। ওটা আমাকে দেখছে… কিন্তু আমি ওটাকে... কি জানি!

⠀⠀⠀

বাথরুমের দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার পুরো ঘরটাকে গিলে নিল।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

বুধবার, আগস্ট ১৩, ২০২৫

বিকেলের রঙে হারানো দিনগুলো

 

⠀⠀⠀


মনিটরের পর্দায় এই ছবিটা দেখে মনে হল যেন কেউ আমার ভেতরের স্মৃতির দরজাটা আস্তে করে খুলে দিচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই শৈশবের বিকেলগুলো- যখন গরমের দুপুর গুলিতে ভাতঘুম দিয়ে বিকেলের আগে আগে উঠতাম। তারপর বিকেল নামলে পরে যেতাম মাঠের দিকে। চারপাশে শুধু বিস্তীর্ণ সবুজ, দূর-সুদূরে অল্প কয়টিা বাড়ি আর ওপরে অনন্ত নীল আকাশ। মনে হতো, যদি কোনোভাবে ওই আকাশে উঠার সিঁড়িটা খুঁজে পেতাম! ভাবতাম নিশ্চই আকাশের একটা গোপন রাস্তা আছে, যা কেবল আমার চোখে ধরা পড়ে না!

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

প্রণয়িনী, তোমায় ঘিরে আমার ভাবনা...

প্রণয়িনী,

এই যে এত বিশাল মহাবিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, এর মাঝ থেকে যদি কোন কেন্দ্র তৈরী হয় কেবলই আমার জন্যে; তবে সেই কেন্দ্র হচ্ছ তুমি। এই মহাবিশ্বের যে কোণেই আমাকে ছেড়ে দেয়া হোক না কেন, ফের তোমার পানে ফিরে আসবার তাগিদে ছুটে চলবো গ্রহ থেকে গ্রহান্তর। আর সেই যাত্রার বিরতি হবে শুধুমাত্র তোমার মনের আঙ্গিনায়। 

আমি জানি, এই সবই অতিরঞ্জন মনের কল্পনা। বাস্তবতার চাকা যখন তপ্ত মরুর পথ ধরে চলতে শুরু করে, তখন এই আবেগ অনেকটাই উবে যায় স্বেদ-বাষ্পে। কিন্তু তবুও যখন কোন মরুদ্যানের ছায়াতলে শীতল হয় মন, তখন সে শুধু তোমাকেই কল্পনা করে; তোমার কথাই ভাবে। রোদের তাপে তপ্ত এ শরীর যেমনি শীতল পানি পানের সময় তার বয়ে চলা অনুভব করতে পারে; একই ভাবে এই অতৃপ্ত লোভী হৃদয় তোমার কিছুমাত্র স্পর্শ পেলে পুরো অনুভূতি জুড়ে তোমার আনাগোনা অনুভব করে।

ভালোবাসা নামের অনুভূতিটা যবে থেকে বুঝতে শিখেছি, সেই তখন থেকেই আমি বুঝি, 'ভালোবাসা'র মানে হচ্ছো 'তুমি'। বিশাল এক সময় সমুদ্র পার করে যখন তোমার হাতটি ধরেছিলাম, তখনই বুঝেছিলাম 'ভালোবাসা'র বীজটির অঙ্কুরোদগম শুরু হয়ে গেছে। তারপর ঠিক বুঝে উঠবার আগেই সেটি বীজ থেকে চারা, আর চারা থেকে মহীরুহে রূপ নিয়েছে। তবুও নিজেকে ঢাল বানিয়ে আমি কিছু কাল সেই মহীরুহ ঢেকে রাখবার চেষ্টা করে গিয়েছিলাম। কিন্তু হৃদয় আঙ্গিনায় তোমার আনাগোনায় যে হিম বাতাস বয়ে চলতো, তাতেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়েছিল আমার ঢাল। ভাঙ্গা ঢাল পেরিয়ে সেই মহীরুহ ধীরে ধীরে আমাকেই ঢেকে দিয়েছে তার মায়া মেশানো ভালোবাসার ছায়ায়। আমি দেখেছি, মহীরুহের প্রতিটি পাতায় তোমার নাম, তোমার স্পর্শ, তোমার উপস্থিতি। এরপর আমি আর কোনদিন সেই মহীরুহের ছায়াতল থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করি নি। হয়তো ক্ষনিকের জন্যে অভিমানে মহীরুহ পেরিয়ে সামনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রেখেছিলাম। কিন্তু তোমাকে ঘীরে ছায়ার মায়া আবারও আমাকে সেই মহীরুহের দিকেই ফিরিয়ে নিয়েছে। 

কেউ একজন বলেছিল, ভালোবাসা দিনে দিনে ভাগ হয়। আজ যাকে ভালোবাসো, যাকে ছাড়া ভালোবাসা শব্দটাই অচল মনে হয়, চিন্তায় চেতনায় শুধুমাত্র যার অনুভূতিই আজ তুমি অনুভব কর; কাল সেখানে অন্য কেউ আসবে, তোমার সমস্ত অনুভূতি সে চুরি করে মনোযোগ আকর্ষনী মুকুটটা মাথায় দিয়ে তোমার হৃদয় সিংহাসনটা দখল করে নিবে। সে মুহুর্তে কথাটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করলেও, আজ আমি জানি; কথাটা মোটেই মিথ্যে নয়। শূন্য থেকে তিলে তিলে নিজের মধ্যে ধারণ করে, সুদীর্ঘ ক্লিষ্ট পথটি পাড়ি দিয়ে যে উপহারটি তুমি আমার জন্যে নিয়ে এসেছ; সেটি এসেই আমার হৃদয় সিংহাসনটি দখল করেছে, কেড়ে নিয়ে মাথায় দিয়েছে হৃদয় আকর্ষনী মুকুটখানি। হ্যাঁ, আমি সেই উপহারটিও ভালোবাসি। নিজের চেয়ে অধিক নয়, বরং নিজের সমান ভালোবাসি। কিন্তু যার নামে পুরো রাজ্য গড়ে উঠেছে। যে রাজ্যের প্রতিটি নিশানায়, প্রতিটি পতাকায় কেবল তোমার নাম লেখা। সেখানে কেউ মুকুট মাথায় দিলেই ভালোবাসার পূর্ণ দাবিদার হয়ে উঠে না। বরং তার জন্যে ভালোবাসার নতুন হালখাতা তৈরি হয়, তৈরি হয় উপরাজ্য। তোমার জন্যে যে হৃদয় ব্যাকুল করা ভালোবাসা, সেটি ঠিক আগের মতই আছে। অধিকন্তু দিনকে দিন তা ফুলে ফেপে হৃদয় আঙ্গিনা ভরিয়ে তুলছে।

দিনকে দিন কত শত রূপে যে আমি তোমাকে আবিস্কার করেছি, তা কেবল আমিই জানি। আলসে তোমাকে আবিস্কার করেছি,  যে সারাটি দিন বিছানায় নিজেকে বন্দী করে নেয়। আবার কর্মঠ কর্মী রূপেও তোমাকে দেখেছি, যে ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত নিজেকে বিলিয়ে দেয়। বিরক্ত তোমাকে দেখেছি, যে সবকিছু ছুড়ে ফেলে ভেঙ্গে ফেলতে চায়। আবার মায়াময় তোমাকেই আবিস্কার করেছি, যে সবকিছু আগলে নিয়ে মুঠিতে জমায়। দেখেছি মায়াময় জননী রূপে, দেখেছি সেবিকায়, দেখেছি সুনাম প্রতিষ্ঠায়। দেখেছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তেজস্বী তোমার প্রতিবাদী রূপ, আবার তার বিপরীতে দেখেছি কারো কোন ছোট অন্যায় নিজের ভালোবাসার চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে। বিশ্বাস কর, তোমার তোমার এই প্রতিটি রূপকেই আমি আমার মত করে ভালোবেসেছি।

তোমাকে হারাবার যে ভয় শুরু থেকে ছিলো; জানো কি, আমি আজও সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারি নি। আজও মনে হয় কোন এক দমকা হাওয়াতে আমি তোমায় হারিয়ে ফেলব। প্রায়ই মনে হয়, নিঝুম রাতটি শেষ করে যে ভোরটি নতুন দিন নিয়ে আসবে; সেই দিনটিতে তুমি হারিয়ে যাবে। যে বাগান ভর ফুলেল ঘ্রাণে আমি বিমোহিত হয়ে থাকি, সেই বাগান শুদ্ধ তুমি হারিয়ে যাবে। পড়ে থাকবে কেবল উদ্যান, আর পড়ে থাকব কেবল এই একলা আমি। আমি এই ভয়টা কোন ভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারি না। তবুও ভোর হলে যখন তোমাকে দেখতে পাই, তবুও দমকা হাওয়ার তোড় কমলে যখন শক্ত মুঠিতে তোমাকে পাই, তবুও চোখ বুজে ফুলেল ঘ্রানে ফুসফুস পূর্ণ করে যখন চোখ মেলে দেখি তুমি এখনো রয়েছ দৃষ্টির সীমানায়। কেবল তখনই মনকে সান্তনা দেই এই বলে, "আজ নয়, আজ আর হারাবে না তুমি"।

আমার এই অর্থহীন আবেগী শব্দের স্রোত তোমাকে কতটুকু স্পর্শ করবে, তা আমি জানি না। জানি না বাক্যের এই মালা আদৌ তোমার মনকে গলাতে পারবে কি না। তবে আমি জানি, এইসব বর্ণের বাইরেও যে ভালোবাসা আছে তা আমার হৃদয়ে অনন্তকাল ধরেই থাকবে। সময়ের গর্ভে আমি বিলিন হবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তোমাকে নিয়ে এইসব অনুভূতি আমি ধারন করে যাবো। আর আমি বিশ্বাস রাখি, এই নশ্বর জগত পার করে যে অনন্ত জগতে গিয়ে পৌছবো, সেখানেও আমি তোমারই অপেক্ষা করবো, তোমাকেই চাইবো। প্রার্থনা থাকবে সমস্ত ইচ্ছে পূরণকারী সেই মহান স্বত্তা যেন আমার এই চাওয়াকে পূর্ণতা দেন। এই জগতের সকল ভালোবাসার অপূর্ণতা তিনি যেন ঐ জগতে পরিপূর্ণরূপে পূরন করে দেন। 



ইতি
তুমিহীন অপূর্ণ যুবক

ছবিঃ kellerdoll ( মূল ), ractapopulous ( মূল ), ঘষামাজা ( !?! )

বৃহস্পতিবার, মার্চ ১৭, ২০২২

উবুন্তুর নতুন লোগো আর আমার ভাবনা

উবুন্তুর জন্যে নতুন লোগো তৈরি ও পাবলিশ করেছে ক্যানোনিকাল। উবুন্তুর ব্লগ পোস্ট আর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল দুটোতেই নতুন লোগোটি প্রকাশ করা হয়েছে। 


উবুন্টুর সাথে পরিচয় হয় ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের কোন এক দিনে। যদিও সরাসরি উবুন্তু হিসেবে তার সাথে পরিচয় হয় নি, কিন্তু তখনই প্রথম আমি উবুন্তুর সাক্ষাত পাই। সেই সময়টাতে তিন রঙের তিনটি মানুষ হাত ধরে বৃত্ত হয়ে আছে এই ব্যাপারটি বুঝতে পেরে বেশ অনেকটা অবিভূত হয়েছিলাম। বিশ্ব জুড়ে হাজার রঙের মানুষ 'ভাতৃত্ববোধ' এর বন্ধনে একত্রিত হয়েছে একটি আইডিয়াকে উদ্দেশ্য করে —এই ব্যাপারটি যেন সেই লোগোটিতে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিলো। 

Image courtesy: OMG! Ubuntu

তারপর উবুন্ত নতুন রূপে লোগোটা নিয়ে আসলো। এবারে একটি বৃত্তে সেই তিনজন আছে ঠিকই, কিন্তু তারা সবাই একটি নির্দিষ্ট একটি রঙের অধিকারী। গোল বৃত্তটিকে যদি ধরনীর সাথে তুলনা করি তাহলে এই তিনটি সাদা আকৃতিকে মানুষের সিম্বল বুঝে নিলাম, আরও বুঝলাম তারা একই পরিচয়ে পরিচিত শুধুমাত্র মানুষ বা Human Being। তাদের মাঝে নেই কোন ভেদাভে; নেই বর্ণ, নেই গোত্র, নেই ভৌগলিক বেরিয়ার কিংবা নেই কোন মতের বিরোধ। তারা সকলে একই লক্ষে, একই উদ্দেশ্য পূরণে হাতে হাত রেখে কাজ করে যাচ্ছে। অন্তত আমি এমনটিই বুঝে নিয়েছিলাম।

গতকাল নতুন করে যে লোগোটি প্রকাশিত হলো তাতে দেখা যাচ্ছে তিনটি মানুষ সদৃশ্য আকৃতির হাতে হাত ধরে থাকার ব্যাপারটির মাঝে নেই কোন ফাঁকা স্থান। বরং সেই ফাঁকা স্থানটি অবস্থান নিয়েছে মানুষ সদৃশ্য আকৃতিটির ঠিক মস্তক বরাবরে!

নতুন লোগোটি দেখেই প্রথমে আমার যেই কথাটি মনে হয়েছে সেটি হলো- আরে! এটা দেখি এন্ড্রয়েড ফোনে ব্যবহৃত SHAREit এ্যাপের লোগো!



আরও কিছু পরিবর্তন রয়েছে মূল লোগোটিতে। পূর্বের লোগো গুলিতে ubuntu লেখাটি সবসময় লোয়ার কেস লেটারে বা ছোট হাতের অক্ষরে লেখা হতো। লোগোটির নতুন সংস্করনে ubuntu লেখাটির U বর্ণটি আপার কেস বা বড় হাতের বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। এই ব্যপারটিও দারুণ ভাবে লক্ষণীয় একটা ব্যাপার। লোয়ার ক্লাস লেটার হিসেবে সকল বর্ণ ছিলো বলে ধরে নিতাম উবুন্তুর কাছে সবাই সমান। আর এইবারে U বর্ণটি আপার কেস হওয়ায় মনে হচ্ছে এটি যেন এর ডিমান্ডিং একটা পজিশন বোঝাতে, সবার থেকে নিজেকে আলাদা করতে, সবার মাঝে নিজের অবস্থানের উচ্চতার ভিন্নতা বোঝাতেই এমন করা হয়েছে।

এর বাইরে উবুন্তুর লোগোটি এইবার গোলাকার বৃত্ত ছেড়ে আয়তাকার ফ্রেমে যুক্ত হয়েছে। সেটিও ঠিক মাঝ বরাবর না হয়ে একটা নির্দিষ্ট অংশের দিকে মূল আকৃতিটি অবস্থান নিয়েছে।

সবশেষে উবুন্তুর মূল ফিলোসফি হিসেবে যে কথাটি আমার দারুণ পছন্দের ছিলো- "I am because we are", এই ব্যাপারটি দারুণ ভাবে অনুপস্থিত মনে হয়েছে। হয়তো ক্যানোনিকাল সামনের দিনে উবুন্তুর নতুন লোগোটির পজিটিভ দিক গুলি আমাদের সামনে তুলে ধরবে। হয়তো তখন নতুন করে উবুন্তুর নতুন এই লোগোটির অর্থ আমার বোধগম্য হবে। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে প্রথম দেখায় উবুন্তুর লোগোটি দেখে আমার নিজের যা মনে হয়েছে, তা-ই এখানে তুলে ধরলাম।




বুধবার, ডিসেম্বর ০১, ২০২১

শীত ও বিয়ে! শীতকালীন বিয়ে এবং হিজিবিজি

 


শীত এবং বিয়ে, সম্ভবত এই টপিকটা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বছরের পর বছর সবচেয়ে বেশি ট্রল হয়ে আসছে। অবশ্য শুধুমাত্র ট্রলকারীদের এককভাবে দোষারোপ কারও উচিৎ হবে না। শীতের এই সময়টাতে সত্যি-সত্যিই বিয়ের ধুম পড়ে যায় দেশজুড়ে। এমনও হয় যে এই মৌসুমটাতে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করতে গিয়ে সম্ভাব্য তারিখ গুলোতে মেকআপ আর্টিস্ট বা পার্লার, ক্যামেরাম্যান, বাবুর্চি এমনকি কম্যুনিটি সেন্টারটি গ্রহনসাধ্য হবে কি না কিংবা অন্য কোন আত্নীয়দের একই দিনে ঠিক করে রাখা কোন অনুষ্ঠান আছে কি না -- এই সবকিছুর উপর নির্ভর করতে হয়! এমনও হয় যে কম্যুনিটি সেন্টারে একই দিনে একই ফ্লোরে দুটি অনুষ্ঠান বুক করতে হয়, সেক্ষেত্রে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একজনের জন্য বরাদ্দ হলে সন্ধ্যা থেকে রাত বরাদ্দ পায় অন্যজন। এক অনুষ্ঠানের অতিথিরা কম্যুনিটি সেন্টার ত্যাগ করবার আগেই অন্য অনুষ্ঠানের অতিথিরা এসে অপেক্ষা শুরু করে। আবার একই দিনে দু'জন আত্নীয়ের অনুষ্ঠান পড়ে গেলে মেহমান কোনটি রেখে কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবে তা মনস্থির করতে দ্বিধা-দন্দে পড়ে যায়। 

সে যেমনই হোক, "শীত এবং বিয়ে"-র এই মেলবন্ধন কিন্তু অযৌক্তিক নয়। বরং হিসেব করলে দেখা যাবে এর পেছনে যৌক্তিক কারণটাই মূখ্য বিষয়। আজ সেইসব বিষয় নিয়েই একটু বলা যাক। 


মেহমানদের উপস্থিতি

যে কোন অনুষ্ঠানের জন্যেই মেহমানদের উপস্থিতি বিশেষরকম গুরুত্ব বহন করে। দেখা যায় যে আমাদের দেশের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শীতের এই সময়টাতে একটু ঢিলেঢালা ভাব থাকে। বার্ষিক ছুটি, পরীক্ষার ছুটি, মিড বা সেমিষ্টার ফাইনাল এক্সাম শেষ হয়ে নতুন সেশন শুরু হয় এই সময়টাতে, তাই ইচ্ছে হলেই ২/৪ দিনের জন্যে কোন অনুষ্ঠানে সে সময়টাতে উপস্থিত হওয়া যায়। তাছাড়া বেশিরভাগ প্রবাসীদের এই সময়টাতে দেশে আসবার সুযোগ ঘটে, তাই পরিবার নিয়ে এমন একটা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এবং প্রায় বাকি সকল আত্নীয়দের সাথে দেখা করবার দারুণ একটা সুযোগ পায় তারা। সেই সুবাদে বিয়ের অনুষ্ঠানে মেহমানদের উপস্থিতি বছরের অন্য যে কোন সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ভাবে বেশি থাকে। 

মুখরোচক খাবার

আপনি স্বীকার করুন চাই না করুন, বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ হয় খাবার! বছরের অন্য সময়ে বিয়ের আয়োজন করলে খাবারের গুণগত মান ও স্বাদ ঠিক রাখতে যতটা কাঠখর পোড়াতে হয় তা শীতের মৌসুমে অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। অতিরিক্ত বা একটু লম্বা সময় নিয়ে অতিথিদের আপ্যায়ন করতে এই সময়টাতে ঝাক্কিঝামেলা অনেক কম পোহাতে হয়। শুধু মূল অনুষ্ঠান নয়, বরং এই সময়টাতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মেহমানদের জন্যে নানা পদের সুস্বাদু খাবার রান্না হয়ে থাকে। অন্য দিকে শীতের এই মৌসুমে প্রচুর সবজি পাওয়ার কারণে নানান আইটেমের খাবার পরিবেশন সহজ ও খরচ সহায়কও হয়ে থাকে। গ্রামের দিকে দেখা যায় হলুদ অনুষ্ঠান কিংবা মূল অনুষ্ঠানের সকলের দিকে মেহমানদের খিচুরি দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। আর সেই খিচুরিতেও ব্যবহার হয় নানান ধরনের মৌসুমী সবজি। অন্যদিকে শীতের এই সময়টাতেই চলে পিঠা উৎসব। বিয়ের এই আনুষ্ঠানিকতায় বিশেষ অতিথি এবং উভয় পক্ষ একে অপরকে বাহারি রকম আঞ্চলিক পিঠা উপহার হিসেবে দিয়ে থাকে। আর সত্যি বলতে কিনে খাওয়া পিঠার চেয়ে এইসব পিঠার স্বাদ হাজারগুণ ভালো হয়। ছোটবেলায় দেখতাম বিয়ের আগে বেয়াই বাড়িতে পিঠা উপহার দেয়ার জন্যে বিয়ের অনুষ্ঠান শুরু হবার দিন পনের আগে থেকেই চাল ভাঙ্গানো কিংবা চাচী-ফুপুরা সবাই মিলে নকশী পিঠা তৈরী করছে মহোৎসবে। 

আবহাওয়া ও পরিবেশ 

আবহাওয়া বিয়ের আনুষ্ঠানিতকায় কত বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে তা যে নিজে এমন বিরূপ অবস্থায় না পড়েছে সে অনুধাবনও করতে পারবে না। সুন্দর সাজগোজ করে বিয়েতে উপস্থিত হলেন, এর মাঝে শুরু হলো বৃষ্টি কিংবা দারুন তাপদাহ। অবস্থাটা ভাবুন একবার। সুন্দর পরিহীত পোষাকটা তখন সাপটে থাকবে আপনার সাথে; চুপচুপে ঐ পোষাকে থাকলে যতই দারুন আপ্যায়ন কিংবা খাবার হোক না কেন, কোনটাই আপনাকে স্বস্তি দিতে পারবে না। তাছাড়া শেরওয়ানি কিংবা সুট আর দামী দামী ভারী সব বিয়ের শাড়ি কিংবা লেহেঙ্গাতে বর-কনে‌'র যে কি অবস্থা হয়, তা একমাত্র তারাই বলতে পারবে। এর সাথে যুক্ত হয় ক্যামেরার অসহনীয় উজ্জ্বল ও তপ্ত লাইট; ঐ সময়টা মনে হয় প্রখর রৌদ্রে কেউ জোর করে গাড়ি থেকে উত্তপ্ত পিচের রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছে। 

এছাড়া এই সময়টাতে মেহমানদের ম্যানেজ করাও কিছুটা সহজ হয়। অন্য সময়টাতে একত্রে অনেক মানুষ জমায়েত হলে দেখা যায় কয়েকটি ফ্যান কিংবা এসিও সেখানে পর্যাপ্ত ভাবে তাপমাত্রা ঠিক রাখতে পারে না। সেদিক থেকে শীতের এই সময়টা অনেকটাই সুবিধা প্রদান করে। এমনও হয় যে হোষ্টের বাড়ির বিছানা সরিয়ে সেখানে ঢালাও ভাবে ফ্লোরে বিছানা পাতা হয়। আর আমন্ত্রিত অতিথিরাও আনন্দ চিত্তে সেই বিছানা দখল করে নিচ্ছে। যদিও লেপ কিংবা কম্বল ভাগে পাওনা নিয়ে অনেকেই অনেক অভিযোগ তোলেন। কিন্তু এই একত্রে ঢালাও বিছানায় সবাই মিয়ে শুয়ে শুয়েও রাতভর গল্প করবার একটা দারুন সুযোগ পেয়ে বসে। আর অনেকের কাছে এই সুযোগটাও একটা গোল্ডেন মেমরি হয়ে রয়।

কনের সাজ

পাড়া-প্রতিবেশী আর বেশ কিছু আত্নীয়-স্বজন যে বিয়ের দিনে কনের সাজ‌'টা কেমন হলো তা নিয়ে জাজ করে তা আশা করি আপনাদের আর নতুন করে বলতে হবে না। কিন্তু এই সাজ বা মেকআপ ধরে রাখা কিন্তু সহজ কোন বিষয় না। এমনকি শীতের এই সময়টাতেও মেকআপ নিয়ে স্টেজে বসলে দেখা যায় পাশ কনের এই মেকআপ ঠিক রাখতে একজন হেল্পিং হ্যান্ড প্রয়োজন পড়ছে। গরমে তো সেই ঘটনাটা হয় আরও ভয়াবহ। 

বাহারি রকম ফুল

শীতে নানান সবজীর মত দেখা মেলে বাহারি রকম ফুলের। বছরের অন্য সময়টাতে প্রয়োজন মত ফুল পাওয়া না গেলেও এই মৌসুমটাতে প্রচুর ফুল পাওয়া যায়। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় এটি মেজর কোন ইস্যু না হলেও এটি একটি একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার বিয়ের আনুষ্ঠানিক সাজসজ্জার ব্যাপারে। 

পরিশ্রম ও ক্লান্তি

একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে এত এত কাজ থাকে যে সময়মত একটু বিশ্রামেরও ফুরসত মেলে না। আগে দাদী-নানীরা বলতো 'বিয়ে করা আর ঘর করা সমান খাটনি'; মানে একটা ঘর বা বাড়ি বানাতে যে ইফোর্ট দিতে হয় বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ঠিকঠাক চালিয়ে যেতেও সেই একই ইফোর্টের প্রয়োজন পড়ে। এখানে মূল অনুষ্ঠানের মাস খানিক আগে থেকেই শুরু হয় ছোটাছুটি। আর তা শেষও হয় বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের অন্তত ৫‌/৭ দিন পরে। আর এই সময়টাতে টানা চলতে থাকে একটা না একটা কাজ। বাড়ির মহিলারা সেই ভোর থেকে ভোররাত পর্যন্ত ঘরের মেহমান সামলাবার কাজ করে, আর পুরুষরা আনুষ্ঠানিকতার বাকি সব দেখভাল করতে করতেই সময় পার করে। বছরের অন্য সময়টাতে অনেকেই এত লম্বা সময় সমানতালে কাজ করতে পারে না, কিংবা অনেকেই কাজের মাঝেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে তুলনায় শীতের এই ঠাণ্ডা সহজেই এই পরিশ্রমের ক্লান্তিকে কমিয়ে নিয়ে আসে, আর ক্লান্তিও দূর করে নিমিষে। 



'শীত এবং বিয়ে' নিয়ে মানুষ যতই হাসাহাসি করুক, ট্রল করুক, কৌতুক বলুক দিন শেষে উপরোল্লিখিত বিষয় গুলো আপনি মোটেই অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। যে বা যারা ট্রল করছে, হাসাহাসি করছে তাদেরও যদি জিজ্ঞাস করা হয় তার স্মৃতিতে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিয়ের অনুষ্ঠান কোনটি, তাহলে দেখা যাবে সেটিও কোন এক শীতে অনুষ্ঠিত বিয়ের অনুষ্ঠান। অথবা জিজ্ঞাস করলে তাদের মধ্যে অবিবাহিত বড় একটা সংখ্যাই হয়তো শীতেই বিয়ে করতে চাইবে। 

সে যাই হোক, 'বিয়ে' এবং বিয়ের 'অনুষ্ঠান'টি হোক সকলের জন্যে আনন্দদায়ক উপভোগ্য একটি ঘটনা সমৃদ্ধ স্মৃতি। বিয়ে হোক নতুন ও পুরাতন সকল আত্নার আপন আত্নীয়দের মিলনমেলা। এই প্রত্যাশা ব্যাক্ত করে আজকে এখানে ইতি টানলাম। 

শনিবার, জুলাই ১৮, ২০২০

ডেবিয়ান ১০ এক্সএফসিই ইন্সটলের পর করণীয়


    ডেবিয়ানকে বলা হয়ে থাকে লিনাক্সের সবচেয়ে স্ট্যাবল ডিস্ট্রো। সফটওয়্যার কালেকশনে একটু পুরাতন হলেও আপডেটের পরপর ক্রাশ করা, কিংবা প্যাকেজ আপগ্রেডের পর সিস্টেমে ঝামেলা তৈরি হওয়ায় ঘটনা তুলনামূলক ভাবে সবচেয়ে কম ঘটে থাকে এই সলিড রক ডেবিয়ান ডিস্ট্রোতে। ডেবিয়ানের স্ট্যাবিলিটিকে কাজে লাগিয়ে এর থেকেই তৈরি হয়েছে আরও অনেক অনেক ডিস্ট্রো। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ডিস্ট্রো হচ্ছে - Ubuntu, MX Linux, Linux Mint Debian Edition বা LMDE, Endless OS, antiX প্রভৃতি।

তো যাই হোক, ধরে নিলাম আপনি আপনার পিসিতে ডেবিয়ান এর সর্বশেষ ভার্সন Debian 10 (Buster) টি XFCE ডেক্সটপ এনভায়রনমেন্ট বা DE সহ ইন্সটল করে নিয়েছেন। এখন তারপর কি করা যায়?

এরপর কিছু কাজ করে নিলে আপনার ডেবিয়ান এক্সপেরিয়েন্স হবে আরও দারুন। চলুন দেখে নেয়া যাক সেই কাজের স্টেপ গুলো।

১) user কে sudoers ফাইলে যুক্ত করাঃ

    সিস্টেমের পরিবর্তন সহ সফটওয়্যার বা প্যাকেজ ইন্সটলেশন করার জন্যে সকল পাওয়ার ডিফল্ট ভাবে দেয়া থাকে root ইজজারের কাছে। সেক্ষেত্রে সাধারণ ইউজার এই ধরণের কাজ গুলো করতে পারে না। কিন্তু এখন কাজের জন্যে root ইউজারের পাওয়ারটুকু আমরা আমাদের সাধারণ ইউজারকে প্রদাণ করবো। এতে সে সিস্টেমের এডমিনিসট্রিটিভ পাওয়ার পাবে। এটি করার জন্যে Terminal চালু করে প্রথমে এই কমান্ড টি লিখে এন্টার দিন-

 $ sudo nano /etc/sudoers

এখন আপনার root ইউজারের পাসওয়ার্ডটি দিয়ে এন্টার চাপুন।

এতে টার্মিনালের nano টেক্সট এডিটরে sudoers ফাইলটি সচল হবে। এই ফাইলটি থেকে ‘root  ALL=(ALL:ALL) ALL’ লেখাটি খুজে বের করুন। তারপর লাইনটির শেষে এন্টার কী-প্রেস করে নতুন লাইনে লিখুন ‘{username}  ALL=(ALL:ALL) ALL’। এখানকার {username} অংশটি আপনার সিস্টেমের বর্তমান ইউজারের ইউজারনেম দিয়ে পরিবর্তন করে নিন। যেমন oliver  ALL=(ALL:ALL) ALL


এখন কিবোর্ড থেকে প্রথমে Ctrl+O একত্রে চেপে এন্টার দিয়ে পরিবর্তন গুলো ফাইলে সেভ করুন। তারপর Ctrl+X চেপে nano এডিটরটি বন্ধ করুন।


২) লোকাল মিরর এবং non-free রিপোজিটরি এড করাঃ

    লোকাল মিরর ব্যবহার করলে প্রয়োজনীয় প্যাকেজগুলো খুব দ্রুত ডাওনলোড করা যায়। বাংলাদেশে ডেবিয়ানের ২টি নির্ভরযোগ্য রিপোজিটরি মিরর রয়েছে। এগুলো হলো-

  • http://mirror.amberit.com.bd/debian/
  • http://mirror.xeonbd.com/debian/
এদের মধ্য থেকে AmberIT বেশ প‌ুরাতন। আমি এখন পর্যন্ত এই মিররটিই ব্যবহার করছি। পাশাপাশি XeonBD’র মিররটিও ভালো।

এছাড়া প্রয়োজনীয় কিছু non-free সফটওয়্যার বা প্যাকেজ (যেমন কিছু মিডিয়া কোডেক, ফন্ট, ফ্লাশ সাপোর্ট প্রভৃতি) ব্যবহার করার জন্যে ‘contrib’ এবং ‘non-free’ রিপোজিটরিতে যুক্ত করতে হবে। এটি করার জন্যে টার্মিনালে গিয়ে লিখুন-

 $ sudo nano /etc/apt/sources.list

এরপর nano এডিটরে ছবির মত পরিবর্তন করে নিন-



সম্পূর্ণ source.list ফাইলটি এখান থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন।

এখন কিবোর্ড থেকে প্রথমে Ctrl+O একত্রে চেপে এন্টার দিয়ে পরিবর্তন গুলো ফাইলে সেভ করুন। তারপর Ctrl+X চেপে nano এডিটরটি বন্ধ করুন।


৩) সিস্টেম আপডেট করাঃ

    পূর্বের পরিবর্তন গুলো ঠিকঠাক হয়ে থাকলে এখন আমাদের প্যাকেজ লিস্ট নতুন করে সিনক্রোনাইজ করতে হবে। এবং প্রয়োজনীয় আপডেটেট প্যাকেজ গুলো ইন্সটল করে নিতে হবে। এর জন্যে টার্মিনাল চালু করে নিচের কমান্ডটি লিখে এন্টার চাপুন-

 $ sudo apt update && sudo apt upgrade -y

এরপর আপনার পাসওয়ার্ড টাইপ করে আবার এন্টার চাপুন। ইন্টারনেট কানেকশন সচল থাকলে কিছুক্ষন সময় নিয়ে সিস্টেমটি আপডেট চেক করবে। এরপর কোন আপডেট পেলে তা নিজে নিজেই ইন্সটল করে নিবে। কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।


৪) build-essential প্যাকেজ ইন্সটল করাঃ

    বেশ কিছু প্যাকেজ কম্পাইল কিংবা সিস্টেমের অভ্যন্তরীন কিছু কাজের প্রয়োজনে কয়েকটি প্যাকেজ ইন্সটল করা খুবই প্রয়োজন। তেমন কিছু প্যাকেজ ইন্সটল করতে টার্মিনালে নিচের কোড গুলো লিখে এন্টার প্রেস করুন-

 $ sudo apt install -y build-essential dkms linux-headers-$(uname -r) firmware-linux firmware-linux-nonfree

এরপর আপনার পাসওয়ার্ড টাইপ করে আবার এন্টার চাপুন। এরপর প্যাকেজগুলো ইন্সটল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।


৫) microcode প্যাকেজ ইন্সটল করাঃ

    আপনার সিস্টেমের ধরন অনুযায়ী microcode প্যাকেজ ইন্সটল করুন। যে কম্পানির প্রসেসর দিয়ে আপনার সিস্টেমটি তৈরি হয়েছে তার উপর ভিত্তি করে আলাদা আলাদা মাইক্রোকোড রয়েছে।

আপনার সিস্টেমটি Intel এর হয়ে থাকলে টার্মিনাল চালু করে তাতে লিখুন-
 $ sudo apt install intel-microcode

কিংবা আপনার সিস্টেমটি AMD-র হয়ে থাকলে টার্মিনাল চালু করে তাতে লিখুন-
 $ sudo apt install amd64-microcode

এরপর আপনার পাসওয়ার্ড টাইপ করে আবার এন্টার চাপুন। এরপর প্যাকেজগুলো ইন্সটল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।


৬) Synaptic প্যাকেজ ম্যানেজার ইন্সটলঃ

 ডেবিয়ানের জন্যে একটি জনপ্রিয় গ্রাফিকাল প্যাকেজ ম্যানেজার হচ্ছে Synaptic। এখানে  synaptic এর সাথে আরও দুইটি প্যাকেজ ইন্সটল করা হবে। apt-xapian-index প্যাকেজটি প্যাকেজ ইনডেক্সের ডাটাবেসে সংরক্ষন করে এবং প্রয়োজনে দ্রুততর সময়ে কোন প্যাকেজ খুঁজে বের করতে সহায়তা করে। policykit-1-gnome প্যাকেজটি বিভিন্ন প্যাকেজের পলিসির কনফিগ গুলোর কাঠামো তৈরি করার কাজটি করে থাকে।


প্যাকেজ গুলো ইন্সটল করতে টার্মিনাল চালু করে তাতে লিখুন-
 $ sudo apt install -y synaptic apt-xapian-index policykit-1-gnome

এরপর আপনার পাসওয়ার্ড টাইপ করে আবার এন্টার চাপুন। এরপর প্যাকেজগুলো ইন্সটল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।


৭) ফায়ারওয়াল ইন্সটল ও তা সচল করাঃ

    লিনাক্সের জন্যে চমৎকার একটি ফায়ারওয়াল প্রোগ্রাম হলো Uncomplicated Firewall বা ufw। এটি ইন্টারনেট এবং আপনার হার্ডওয়্যারের মধ্যকার একটি সুরক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করে। ufw ইন্সটল করার জন্যে টার্মিনাল চালু করে তাতে লিখুন-

 $ sudo apt install -y ufw

এরপর আপনার পাসওয়ার্ড দিয়ে প্যাকেজ ইন্সটল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

প্যাকেজ ইন্সটল হয়ে গেলে ফায়ারওয়াল সচল করার জন্যে টার্মিনালে লিখুন-

 $ sudo ufw enable

মুহুর্তের মধ্যেই ফায়ারওয়ালটি সচল হয়ে যাবে। এখন ফায়ারওয়ালটি সচল অবস্থা পরীক্ষা করার জন্যে টার্মিনালে  লিখুন-

 $ sudo ufw status verbose

কমান্ড টাইপ করে এন্টার প্রেস করলে এমন আউটপুট দেখা যাবে-


এখানে লক্ষ্য করুন Status: active রয়েছে। এর মানে ফায়ারওয়ালটি সচল রয়েছে। যদি ফায়ারওয়াল সচল না থাকতো তাহলে এখানে Status: inactive লেখা আউটপুট আসতো।


৮) বুট টাইমকে তরান্বিত করাঃ

     প্রতিবার সিস্টেম চালু করার সময় Grub লোডারে ৫ সেকেন্ড করে অপেক্ষা করতে হয়। অবশ্য আপনি যদি ডুয়েল বুটে উইন্ডোজ এবং লিনাক্স ২টি অপারেটিং সিস্টেমই চালিয়ে থাকেন তাহলে এই অপেক্ষাটা অনেকের কাছেই প্রয়োজনীয়। তবুও ৫ সেকেন্ড করে অপেক্ষাটা কারও কারও কাছে একটু বেশি মনে হতে পারে। আমরা এখন এই ৫ সেকেন্ডের অপেক্ষাটা ২ সেকেন্ডে কমিয়ে নিয়ে আসবো। তো চলুন করে ফেলা যাক।

প্রথমে টার্মিনালে চালু করে তাতে টাইপ করে এন্টার চাপুন-

 $ sudo nano /etc/default/grub

পাসওয়ার্ড দিয়ে এন্টার দিলেই grub কনফিগারেশন ফাইলটি nano এডিটরে চালু হয়ে যাবে। এখন কনফিগ ফাইলটি থেকে GRUB_TIMEOUT=5 লাইনটি খুজে বের করুন। এখন 5 এর স্থানে 2 লিখুন, অথবা আপনার সুবিধামত সময় নির্ধারণ করুন। মনে রাখবেন, এখানে সময়টা সেকেন্ডের হিসেবে লিখতে হবে। পরিবর্তনের পর কনফিগ ফাইলটি দেখতে এমন হবে-


এখন কিবোর্ড থেকে প্রথমে Ctrl+O একত্রে চেপে এন্টার দিয়ে পরিবর্তন গুলো ফাইলে সেভ করুন। তারপর Ctrl+X চেপে nano এডিটরটি বন্ধ করুন। এরপর টার্মিনালে নিচের কমান্ডটি লিখে এন্টার প্রেস করুন-

 $ sudo update-grub

grub আপডেট কমপ্লিট হলে টার্মিনাল বন্ধ করে সিস্টেম রিস্টার্ট দিয়ে পরিবর্তনটুকু চেক করে আসুন।


৯) lightDM কে একটু টুইকঃ

    lightDM ডিসপ্লে ম্যানেজারটি xfce ডেক্সটপ এনভায়রনমেন্টের ডিফল্ট লগইন ম্যানেজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কিন্তু ডেবিয়ানে লগইন স্ক্রিনে এসে প্রতিবার username এবং password দিয়ে তারপর লগইন করতে হয়। এখন আমরা চাচ্ছি লগইন স্ক্রিনে username আগে থেকেই সয়ংক্রিয় লেখা থাকবে, আমরা শুধু পাসওয়ার্ডটা টাইপ করে লগইন করবো। চলুন করে ফেলা যাক কাজটুকু।
টার্মিনাল চালু করে প্রথমে এই কমান্ডটি লিখে এন্টার প্রেস করুন-

 $ sudo nano /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_my.conf

তারপর আপনার পাসওয়ার্ড চাইলে পুনরায় সেটি দিয়ে আবার এন্টার চাপুন। কনফিগ ফাইলটি চালু হবে। প্রাথমিক অবস্থায় ফাইলটিতে কোন কিছু লেখা নাও থাকতে পারে। আপনি এখানে নিচে দেয়া কনফিগ কমান্ড লিখুন-

[SeatDefaults]
greeter-hide-users=false


এখন কিবোর্ড থেকে প্রথমে Ctrl+O একত্রে চেপে এন্টার দিয়ে পরিবর্তন গুলো ফাইলে সেভ করুন। তারপর Ctrl+X চেপে nano এডিটরটি বন্ধ করুন। এরপর লগ-আউট হয়ে নতুন করে লগইন করুন। তারপর থেকে লগইনের সময় আপনাকে আর আপনার username-টি লিখতে হবে না, সেটি পূর্বে থেকেই লগইন ম্যানেজারে লিখা থাকবে।


১০) Restricted-extras প্যাকেজ সমূহ ইন্সটল করাঃ

    অডিও কিংবা ভিডিও প্লে করার জন্যে আমাদের কিছু কোডেক প্রয়োজন। কিন্তু কোডেক গুলো মুক্ত লইসেন্সের আলতাভুক্ত না হবার কারণে এদের সরাসরি ডেবিয়ান ডিস্ট্রোতে সরবরাহ করা হয় না, আপনাকে মেনুয়াললি সেসব ইন্সটল করে নিতে হবে।

Restricted-extras প্যাকেজ ইন্সটল করবার জন্যে প্রথমে টার্মিনালে গিয়ে লিখুন-

 $ sudo apt install -y ttf-mscorefonts-installer rar unrar libavcodec-extra gstreamer1.0-libav gstreamer1.0-plugins-ugly gstreamer1.0-vaapi

তারপর আপনার পাসওয়ার্ড চাইলে পুনরায় সেটি দিয়ে আবার এন্টার চাপুন। ইন্সটল শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।


১১) বাংলা ফন্ট সমূহ ইন্সটল এবং সিস্টেমওয়াইড বাংলা ফন্ট কনফিগ করাঃ

    ইউনিকোড ভিত্তিক বাংলা ফন্ট সমূহ আপনার সিস্টেমে ইন্সটল করার জন্যে নিচের কমান্ডটি আপনার টার্মিনালে লিখে এন্টার চাপুন-

 $ sudo cd /tmp;wget --no-check-certificate https://github.com/r-not/unibnfonts/archive/master.tar.gz -O ubf.tar.gz;sudo tar -xvf ubf.tar.gz -C /usr/share/fonts/;rm ubf.tar.gz

এরপর আপনার পাসওয়ার্ডটি দিয়ে পুনরায় এন্টার চাপুন। সয়ংক্রিয়ভাবে ইউনিকোড বাংলা ফন্ট গুলো ইন্সটল হয়ে যাবে।

এখন সিস্টেমওয়াইড ঝকঝকে বাংলা দেখার জন্যে নিচের পদ্ধতিটি ফলো করুন-

  • প্রথমে আপনার হোম ডিরেক্টরির .config ফোল্ডারে প্রবেশ করুন। এরপর fontconfig ডাইরেক্টরিটি খুজে বের করুন। যদি পূর্বে থেকে fontconfig ডাইরেক্টরিটি না থেকে থাকে তাহলে সেটি তৈরি করে নিন। fontconfig ডাইরেক্টরিটি তৈরি করতে টার্মিনালে ধারাবাহিক ভাবে নিচের কমান্ডগুলো লিখুন-
         $ cd .config
         $ mkdir fontconfig
         $ cd fontconfig


  • এরপর fontconfig ডিরেক্টরিতে fonts.conf নামে একটি ফাইল তৈরি করুন। fonts.conf তৈরি করতে লিখুন-
 
        $ touch fonts.conf

  • এরপর nano এডিটরে ফাইলটি চালু করুন। nano এডিটর দিয়ে ফাইলটি চালু করার জন্যে টার্মিনালে লিখুন-
            $ nano fonts.conf

  • পূর্বে থেকে কনফিগ ফাইলে কিছু লিখা থাকলে ডাওন এ্যারো-কী চেপে ফাইলটির একদম শেষে চলে আসুন। তারপর নিচে উল্লেখিত কোড কিংবা এই লিংক থেকে প্রাপ্ত কোড গুলি fonts.conf ফাইলের একদম শেষে গিয়ে পেস্ট করে দিন।
<?xml version="1.0"?>
<!DOCTYPE fontconfig SYSTEM "fonts.dtd">
<fontconfig>
    <match target="font">
        <edit mode="assign" name="hinting" >
            <bool>true</bool>
        </edit>
        <edit mode="assign" name="autohint" >
            <bool>true</bool>
        </edit>
        <edit mode="assign" name="hintstyle" >
            <const>hintslight</const>
        </edit>
        <edit mode="assign" name="rgba" >
            <const>rgb</const>
        </edit>
        <edit mode="assign" name="antialias" >
            <bool>true</bool>
        </edit>
        <edit mode="assign" name="lcdfilter">
            <const>lcddefault</const>
        </edit>
    </match>

<!-- Set preferred serif, sans serif, and monospace fonts. →
    <alias>
        <family>serif</family>
        <prefer>
            <family>Kalpurush</family>
        </prefer>
    </alias>
    <alias>
        <family>sans-serif</family>
        <prefer>
            <family>Kalpurush</family>
        </prefer>
    </alias>
    <alias>
        <family>sans</family>
        <prefer>
            <family>Kalpurush</family>
        </prefer>
    </alias>
    <alias>
        <family>monospace</family>
        <prefer>
            <family>Kalpurush</family>
        </prefer>
    </alias>
    <alias>
        <family>mono</family>
        <prefer>
            <family>Kalpurush</family>
        </prefer>
    </alias>

</fontconfig>
 


fonts.conf

এখন কিবোর্ড থেকে প্রথমে Ctrl+O একত্রে চেপে এন্টার দিয়ে পরিবর্তন গুলো ফাইলে সেভ করুন। তারপর Ctrl+X চেপে nano এডিটরটি বন্ধ করুন। এরপর লগ-আউট হয়ে নতুন করে লগইন করুন।
আপনি চাইলে  fonts.conf ফাইলটি এখান থেকে সংগ্রহ করে নিতে পারেন।


১২) প্রয়োজনীয় কিছু প্যাকেজ ইন্সটল করাঃ

    এখন আমরা নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু প্যাকেজ ইন্সটল করবো। সিস্টেম ব্লোটিং এর চিন্তা করলে কিংবা মিনিলাম সিস্টেমে একদম আপনার পছন্দসই প্যাকেজ ইন্সটল করার কথা ভাবলে করলে এই ধাপটি আপনি ইচ্ছা হলে স্কিপ করতে পারেন। কিন্তু যারা প্রয়োজনীয় সফটও্যার গুলো সিস্টেমে ইন্সটল করে রাখতে চান তারা ধাপটি ফলো করুন।

প্রথমে টার্মিনাল চালু করে নিচের কমান্ডটি কপি-পেস্ট করে এন্টার চাপুন-

 $ sudo apt install -y xfce4-taskmanager xfce4-power-manager xfce4-terminal xfce4-xkb-plugin xfce4-screenshooter xfce4-clipman xfce4-panel-dev thunar-archive-plugin mousepad ristretto network-manager-gnome network-manager xserver-xorg-input-synaptics rsync debian-keyring gnome-disk-utility gparted p7zip-full p7zip unzip xarchiver build-essential libreoffice libreoffice-impress libreoffice-writer libreoffice-calc mythes-en-us hunspell hunspell-en-us aspell aspell-en fonts-noto-mono fonts-dejavu-extra ttf-dejavu fonts-liberation ttf-bitstream-vera fonts-dejavu fonts-droid-fallback ttf-dejavu-extra fonts-freefont-ttf ttf-mscorefonts-installer ttf-dejavu-core fonts-opensymbol vlc audacious mplayer mpv pavucontrol qpdfview bleachbit menulibre gimp gimp-data gimp-data-extras gimp-gmic gimp-gutenprint gimp-plugin-registry gimp-ufraw flameshot arc-theme faenza-icon-theme

 
 
 
আপাতত এখানেই ইতি টানছি। লেখায় কিছু ভুল থাকা স্বাভাবিক। নজরে পড়লে সংশোধনের চেষ্টা থাকবে। তাছাড়া আমিও মোটামুটি লিনাক্সে নতুন ইউজারদের একজন। তথ্যগত ভুল চোখে পড়লে কেউ যদি তা দয়া করে অবহিত করেন, তাহলে সেটিও সুধরে নেবার চেষ্টা করবো।

Debian XFCE desktop


ডেবিয়ান লিনাক্সের সাথে আপনার পথচলা হোক আনন্দময়।

বুধবার, জুলাই ১৫, ২০২০

ফিরে যায় আলোর মশাল



শয়তানের দোসর হয়ে ওরা এসেছিলো সর্স্তপণে
মুঠি মুঠি শাপ-সন্দেশ বিলিয়েছিলো সমাগমে
কেউ হাত বাড়িয়ে নিয়েছিলো, তো কেউ লুকিয়ে
আর বাকিরা নিয়েছিলো অজান্তে, অনিচ্ছায় আর অসতর্কে

অতঃপর সবাই মিলে সন্দেশের মিঠাই চেটেপুটে খেয়েছিলো।

যতক্ষণে ঐ সন্দেশ তাদের পেটে পাক ধরিয়েছিলো
ততক্ষণে ওরা বিনিময়ের বিপণি খুলে বসেছিলো
হাজার হাজার বিনিময় ছিলো সেখানে,
রূপ, যৌবন, বিত্ত কিংবা বৈভব --কোনটারই কমতি ছিলো না

ওরা জনে জনে, আর গুনে গুণে এইসবই বিনিময় করে যাচ্ছিলো।

এরমাঝেই এক সাধু ধ্যান ভেঙ্গে ফিরেছিলো
উচ্ছাসে, উশৃঙ্খলে, আর অহংকারে অন্ধ অমানুষ সে দেখেছিলো
পড়ে থেকে গলে যাওয়া ভাববাদীর লাশ সে পেয়েছিলো
মোড়ে মোড়ে ডেকে যাওয়া খাদিমের আহ্বান সে শুনেছিলো

সাবধানে, নিঃশব্দে আর নিস্তব্দে সাধু ঐ লোকালয় ছেড়েছিলো।

এরা সব অন্তর পচে যাওয়া অর্ধমৃত নরকের পোকা
এরা সব ধর্ম-পিতার অন্তর খুবলে খাওয়া লোভী কীড়া
এরা সব পয়গম্বরকে নিজ পায়ে পিষে মারা পাপী
এরা সব মুন্ড ছাড়া লাফিয়ে চলা বোকচন্দর জাতী

আর এদের কৃতকর্মে ত্যাক্ত হয়েই আলোর মশাল সেবারে আলো না ছড়িয়েই ফিরেছিলো।