বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬

প্রতিচ্ছায়া

 


সকালগুলো এই শহরে সাধারণত একটা নরম, ভেজা আলস্য নিয়ে শুরু হয়। কুয়াশা আর রোদের মাঝামাঝি একটা অনিশ্চিত সময়, যখন রাস্তার ধারের চায়ের দোকানগুলো সবে চুলা জ্বালায় আর রিকশার টুংটাং শব্দে ঘুম ভাঙে গোটা পাড়ার। সেদিন সকালটাও ঠিক তেমনই শুরু হয়েছিল, অন্তত প্রথম কয়েক মিনিট পর্যন্ত। জানালার পর্দা ফুঁড়ে যে আলো এসে পড়েছিল ঘরের মেঝেতে, তাতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। কিন্তু বাড়ির বাইরে পা রাখার পরই বাতাসের গন্ধটা কেমন বদলে গেল। ভেজা কাগজ আর কালির একটা তীব্র, প্রায় অস্বস্তিকর গন্ধ, আর তার সাথে যুক্ত হয়েছে কড়া লিকারের চায়ের একটা গন্ধ। আশেপাশে তাকাতেই বুঝলাম প্রতিটা দেয়ালে পোস্টার দিয়ে ছেয়ে গেছে।

আমি প্রথমে ভাবলাম এটা আরেকটা রাজনৈতিক প্রচারণা। এই শহরে এমন হয়- রাতারাতি দেয়াল ভরে যায় মুখের ছবিতে, স্লোগানে, প্রতিশ্রুতির ভারে ন্যুব্জ পোস্টারে। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন সাদা কাগজের ওপর কালো হরফে লেখা শব্দটা পড়লাম, তখন বুকের ভেতর একটা অচেনা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। নিখোঁজ; শব্দটার নিচে একটা মুখ, আর সেই মুখটা আমারই, যদিও চেনা আয়নায় যে মুখ আমি প্রতিদিন দেখি তার চেয়ে যেন কিছুটা বেশি ক্লান্ত, চোখের নিচে যেন কিছুটা বেশি ছায়া। রাস্তার মানুষজন তখন নিজেদের ব্যস্ততায় হেঁটে যাচ্ছিল, কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছিল না, অথচ দেয়াল থেকে আমারই চোখ দুটো আমাকে অনুসরণ করছিল, নিঃশব্দে, নিরন্তর।

পোস্টারের নিচের দিকে একটা ফোন নম্বর ছাপা ছিল, এগারোটা অঙ্ক, যা আমি কখনো নিজের জীবনে দেখেছি বলে মনে করতে পারলাম না, অথচ চোখ বোলাতেই কোথাও একটা অচেনা পরিচিতির অনুভূতি খেলে গেল; ঠিক যেমন কোনো ভুলে যাওয়া গানের সুর হঠাৎ কানে বাজলে হয়। কাগজটা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, ভাবলাম হয়তো এটা কারও নিষ্ঠুর রসিকতা, কারও ফটোশপের কারিকুরি। কিন্তু ফোনটা পকেট থেকে বের করে সেই নম্বরে ডায়াল করতে করতে আমার আঙুল কাঁপছিল, যেন শরীর নিজেই জানত এই ফোন কলটা কোথাও একটা সীমারেখা পার করে দেবে যা আর কখনো পেছনে ফেরা যাবে না।

তিনবার রিং হওয়ার পর ওপাশে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল, কাঁপা, সন্দিগ্ধ, তবু কোথাও যেন গভীর পরিচিত। আমি কিছু বলার আগেই বুঝলাম গলাটা কার। বছরের পর বছর ধরে যে গলা আমাকে সকালে ডেকে তুলত, রাতে ঘুম পাড়াত, সেই অতিপরিচিত গলা। কিন্তু সেই পরিচিতি স্বস্তি আনল না, বরং একটা অসম্ভবের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল, কারণ যে মানুষটার গলা আমি শুনছিলাম, তাকে আমি নিজের হাতে মাটি দিয়ে এসেছিলাম তিন বছর আগে।

⠀⠀

⠀⠀

সারাদিন আমি অফিসে গেলাম না। ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ করে বসে রইলাম, দুপুরের আলো জানালা গলে মেঝেতে একটা লম্বাটে চৌকো আকার তৈরি করছিল, সেই আলো ধীরে ধীরে সরে সরে বিকেলের দিকে হেলে পড়ছিল, আর আমি সেই আলোর সরে যাওয়া দেখছিলাম যেন তাতেই লুকিয়ে আছে কোনো উত্তর। ফোনের কল-লিস্টে নম্বরটা তখনো জ্বলজ্বল করছিল, আমি বারবার সেটার দিকে তাকালাম, যেন তাকিয়ে থাকলেই সংখ্যাগুলো নিজেদের গোপন অর্থ বলে দেবে। শেষে মোবাইলের ব্রাউজারে গিয়ে নিজের নামটাই সার্চ বক্সে টাইপ করলাম, এক ধরনের মরিয়া কৌতূহল থেকে, যেন নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খুঁজছি ইন্টারনেটের অচেনা কোণে।

প্রথম কয়েকটা ফলাফল ছিল একেবারে সাধারণ- পুরোনো একটা ফেসবুক প্রোফাইল, বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই তালিকায় নাম, কোনো একটা চাকরির সাইটে অসম্পূর্ণ বায়োডাটা। কিন্তু তারপর একটা সংবাদ-শিরোনাম চোখে পড়ল, আর সেই মুহূর্তে ঘরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘন হয়ে এল। প্রতিবেদনটা তিন বছর আগের, তারিখটা আজকের তারিখের সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যাচ্ছিল, আর তাতে লেখা ছিল আমারই নাম, আমারই চেহারা, আমার ঠিকানা। একজন তরুণ প্রকৌশলীর রহস্যজনক অন্তর্ধানের বিবরণ, যার শেষ দেখা মিলেছিল শহরের পুরোনো নদীবন্দরের কাছে, রাতের অন্ধকারে, একা।

আমি প্রতিবেদনের প্রতিটি লাইন পড়লাম, তারপর আবার পড়লাম, যেন বারবার পড়লে শব্দগুলো বদলে যাবে, অর্থ পালটে যাবে। জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছিল, আর সেই আধো-অন্ধকারে আমার নিজের প্রতিবিম্ব কাচের গায়ে ভেসে উঠল- স্বচ্ছ, কাঁপা, যেন একটা ভুলে যাওয়া স্মৃতির মতো। আমি উঠে দাঁড়ালাম, রাস্তার দিকে তাকালাম, আর দেখলাম উল্টো দিকের দেয়ালে আরেকটা পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়েছে, যেটা সকালে ছিল না। এবার ছবিতে আমি হাসছি, এমন একটা হাসি যা আমার মনে পড়ে না আমি কখনো হেসেছি বলে, অথচ মুখের প্রতিটি রেখা নিঃসন্দেহে আমারই।

⠀⠀

⠀⠀

রাত নামলে আমি রাফিকে ফোন করলাম, ভেবেছিলাম বন্ধুর গলা শুনলে অন্তত কিছুটা মাটির সংযোগ ফিরে পাব। ওর হাসি দিয়ে কথোপকথন শুরু হলো, স্বাভাবিক, নির্ভার, যেন এই দিনটার কোনো অস্বাভাবিকতাই স্পর্শ করেনি ওকে। কিন্তু যখন আমি পোস্টারের কথা বললাম, সংবাদের কথা বললাম, ওর গলার স্বর ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। হালকা রসিকতা থেকে সরে গিয়ে প্রথমে একটু সতর্ক, প্রায় ভীত আর শেষে নীরবতায়। ও জিজ্ঞেস করল- গত তিন বছর আমি কোথায় ছিলাম। প্রশ্নটা এতটাই সহজ ভঙ্গিতে করল যে প্রথমে বুঝতেই পারিনি ওর কণ্ঠে কতটা ভয় জমে আছে।

আমি ওকে মনে করিয়ে দিলাম, গতকালই আমরা একসঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়েছি, অফিসের করিডোরে হেঁটেছি, চায়ের কাপ হাতে গল্প করেছি। ও দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে বলল যে গত তিন বছরে আমি অফিসে পা রাখিনি, আমাদের শেষ কথোপকথন হয়েছিল ঠিক তিন বছর আগে, যেদিন আমি ওকে বলেছিলাম কাউকে অনুসরণ করছি, নদীবন্দরের দিকে যাচ্ছি। ও জানতে চেয়েছিল কাকে অনুসরণ করছি, আর আমি নাকি উত্তরে বলেছিলাম- 'নিজেকেই'।

সেই মুহূর্তে ফোনের ওপাশে রাফির নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা যাচ্ছিল না, আর আমার বুকের ভেতর একটা অচেনা শীতলতা ছড়িয়ে পড়ছিল, যেন কেউ ধীরে ধীরে আমার শরীর থেকে উষ্ণতা টেনে নিচ্ছে। রাফি শেষে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছি কিনা। ওর জিজ্ঞাসাটা এতটাই অপ্রাসঙ্গিক শোনাল যে আমি হেসে ফেলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু হাসিটা গলার কাছে আটকে গেল। কারণ ততক্ষণে আমার পা নিজে থেকেই বাথরুমের দিকে হাঁটতে শুরু করেছে, যেন শরীরটা মনের চেয়ে আগেই জানত কী অপেক্ষা করছে সেখানে।

⠀⠀

⠀⠀

বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক দেখলাম না- সেই একই মুখ, একই ক্লান্ত চোখ, চুলের একই অবিন্যস্ত রেখা। কিন্তু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর একটা অদ্ভুত বিলম্ব চোখে পড়ল, খুব সূক্ষ্ম, প্রায় ধরা পড়ে না এমন- আমি হাত তুললাম, আর প্রতিবিম্ব যেন এক লহমা পরে হাত তুলল, একটা নিঃশ্বাসের সময়ের ব্যবধান, যা স্বাভাবিক আয়নার হওয়ার কথা নয়। আমি মাথা কাত করলাম, প্রতিবিম্বও করল, কিন্তু সেই বিলম্বটা রয়েই গেল, যেন কাচের ওপাশে কেউ আমাকে নিখুঁতভাবে নকল করার চেষ্টা করছে অথচ ঠিক সময়মতো পারছে না।

আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, নিঃশ্বাস বন্ধ রেখে, আর তখনই দেখলাম প্রতিবিম্বের ঠোঁটে একটা হাসি ফুটে উঠল, যা আমার মুখে ছিল না। সেই হাসি ধীরে ধীরে চওড়া হলো, আর তার চোখে এমন একটা তৃপ্তি ফুটে উঠল যা আমি নিজের মধ্যে কখনো অনুভব করিনি। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, বাথরুমের ঠান্ডা টাইলসের স্পর্শ পায়ের তলায় অনুভব করলাম, আর সেই মুহূর্তে আলো নিভে গেল, একেবারে হঠাৎ, যেন কেউ অন্ধকারের সুইচ টিপে দিয়েছে ঠিক আমার ভয়টা চরমে পৌঁছানোর অপেক্ষায় ছিল।

অন্ধকারে আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, নিজের হৃৎস্পন্দনের শব্দ ছাড়া আর কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না, আর তার মাঝেই মনে হলো, আয়নার ওপাশ থেকে কেউ একজন এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে, ধৈর্য ধরে, অপেক্ষায়, যেন সময়টা তারই পক্ষে কাজ করছে।

⠀⠀

⠀⠀

পরদিন সকালে থানায় গিয়ে আমি বুঝলাম কাগজের জগতেও আমি আর সেই মানুষ নই যা আমি ভাবতাম। দায়িত্বরত অফিসার আমার পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ পরীক্ষা করলেন, তারপর জানালেন এই আইডি তিন বছর আগেই বাতিল হয়ে গেছে, ঠিক আমার নিখোঁজ হওয়ার নথিভুক্ত তারিখের কিছুদিন পর। আমি ঠিকানা বললাম, যেখানে গত চার বছর ধরে বাস করছি কিংবা আমি বাস করছি বলে আমার ধারণা। অফিসার শান্তভাবে ঠিকানাটা চেক করলেন, কাকে যেন একবার ফোনও করলেন, তারপর আমাকে জানালেন সেই ফ্ল্যাটের মালিকের ভাষ্যমতে জায়গাটা তিন বছর ধরে খালি পড়ে আছে, কোনো ভাড়াটিয়া নেই, কোনো আসবাবও নেই।

কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে হলো পুলিশ স্টেশনের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, যেন প্রতিটি বাক্য আমার চারপাশের বাস্তবতাকে একটু একটু করে সরু করে দিচ্ছে। অফিসার যখন জিজ্ঞেস করলেন আমি সত্যিই সেই মানুষ কিনা যার নাম নথিতে লেখা, আমি উত্তর দিতে পারিনি, কারণ প্রশ্নটা এতদিন যতটা সহজ মনে হতো, এখন ঠিক ততটাই জটিল হয়ে উঠেছে। আমি বিব্রত হাসি দিয়ে অফিসারের রুম থেকে বের হয়ে আসলাম।

বাড়ি ফেরার পথে আমি প্রতিটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে নিজের মুখ দেখলাম, প্রতিটি পোস্টারে আলাদা আলাদা তারিখ, আলাদা আলাদা বিবরণ, যেন তিন বছরের প্রতিটি দিন কেউ যত্ন করে লিপিবদ্ধ করে রেখেছে, অথচ সেই দিনগুলোর একটাও আমার নিজের স্মৃতিতে নেই।

ফ্ল্যাটে ফিরে দরজা খুলতেই বুঝলাম কিছু একটা সম্পূর্ণভাবে বদলে গেছে। কোন টেবিল নেই, বিছানা নেই, আমার চায়ের কাপ নেই, কোনো ব্যক্তিগত চিহ্ন নেই। শুধু দেয়ালে একটা আয়না ঝুলছে, যেটা আগে সেখানে ছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখলাম, ওপাশের ঘরটা আমার নিজের ঘরের মতোই সাজানো, টেবিলে ল্যাপটপ, পাশে চায়ের কাপ। আর সেই টেবিলে বসে আছে আরেকজন। হুবহু আমার মতো দেখতে আরেকজন আমি, মাথা নিচু করে কিছু লিখছি, নিবিষ্ট, নিশ্চিন্ত। সে মাথা তুলল, আমার দিকে তাকাল, তারপর একটা কাগজ তুলে ধরল কাচের ওপাশ থেকে, তাতে লেখা ছিল কয়েকটা শব্দ, যা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের সমস্ত উষ্ণতা যেন এক নিমেষে হারিয়ে গেল।

⠀⠀

⠀⠀

সেই রাতে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানলাম শহরের বাইরে যাওয়ার প্রধান সড়ক অজানা কারণে বন্ধ, সব বাস বাতিল, যাত্রীরা বিভ্রান্ত হয়ে এদিক-ওদিক ঘুরছে। আমি একটা বেঞ্চে বসে পড়লাম, ক্লান্তি আর ভয়ের মিশ্র একটা অনুভূতি নিয়ে, আর তখনই পাশের দেয়ালে চোখ পড়ল সেই পরিচিত পোস্টারে। এবার কাছে গিয়ে দেখলাম শব্দগুলো বদলে গেছে- আগের নিখোঁজ শব্দটার জায়গায় এখন লেখা, "সন্ধান পাওয়া গেছে"। আর তার নিচে ছোট্ট একটা বাক্য যোগ হয়েছে, যা পড়ে বোঝার চেষ্টা করলাম ঠিক কী বোঝাতে চাওয়া হয়েছে, অথচ প্রতিবার পড়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থটা যেন হাত ফসকে বেরিয়ে যাচ্ছিল।

আমি বেঞ্চে বসে রইলাম অনেকক্ষণ, শহরের আলো একে একে নিভে যাওয়া দেখলাম, আর ভাবলাম- যদি সত্যিই কাউকে খুঁজে পাওয়া গিয়ে থাকে, তাহলে সে কে? আর যে এখন এই বেঞ্চে বসে এসব ভাবছে, সে নিজে তবে কে?

রাতের শেষ প্রহরে বাসস্ট্যান্ডের আলো টিমটিম করছিল, দূরে নদীবন্দরের দিক থেকে একটা শিস-এর মতো শব্দ ভেসে আসছিল, আর আমি বুঝতে পারলাম না সেই শব্দ কোনো ট্রেনের, নাকি কারও ডাকার আওয়াজ, নাকি শুধুই বাতাসের খেলা। যা নিশ্চিত ছিল তা কেবল এটুকু- শহর জেগে উঠলে আবার নতুন একটা পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে যাবে, নতুন একটা তারিখ নিয়ে, নতুন একটা গল্প নিয়ে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রে থাকা মুখটা আমারই হবে কিনা, তা বলার সাধ্য আমার আর ছিল না।

⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬

মৃত পায়রার জয়

 


একটা হাত উঠে আছে আকাশের দিকে। কালো, শক্ত, বিজয়ের ভঙ্গিতে দুটো আঙুল ছুঁয়ে গেছে শূন্যতাকে। সেই আঙুলের বাঁধনে গোঁজা একটা সাদা পায়রা। দূর থেকে দেখলে বুকটা একবার নেচে ওঠে- আহা, শান্তি এসেছে বুঝি! যুদ্ধ থেমেছে, রক্ত থেমেছে, কেউ একজন হাতে তুলে নিয়েছে শান্তির চিহ্ন।

কিন্তু কাছে গেলে বুক ধক করে ওঠে।

পায়রাটার চোখ নেই, তার জায়গায় একটা নিষ্ঠুর ক্রস। ডানা দুটো নেতিয়ে পড়ে আছে, যেন এইমাত্র আকাশ থেকে খসে পড়ল। আঙুলে বাঁধা সাদা সুতোটা এখনো কাঁপছে বাতাসে। কোনো একদিন এই সুতো বেঁধেছিল আশাকে, আজ সে বেঁধে রেখেছে একটা লাশ।

এই একটা ছবিতেই যেন লেখা আছে আমাদের সময়ের সবচেয়ে করুণ সত্য।

যুদ্ধ আসে ঝড়ের মতো। যা কিছু গড়ে উঠেছিল বছরের পর বছর ধরে- একটা বাড়ি, একটা সংসার, একটা শৈশবের হাসি; এক লহমায় তা মিশে যায় ধুলোয়। মা তার সন্তানকে খুঁজে পায় না, সন্তান তার মায়ের কবরটুকুও চিনতে পারে না। যে উঠোনে বসে দাদু গল্প শোনাতেন, সেই উঠোনে আজ শুধু ভাঙা ইটের স্তূপ আর নীরবতা, সীমাহীন নীরবতা।

আর এই সব হারানোর পর, যখন কামানের গর্জন থামে, তখন কেউ একজন এসে বলে- আমরা জিতেছি!

জিতেছি? কী জিতেছি??

গাজার ধুলোমাখা রাস্তায় যে বাবা তার মেয়ের ছোট্ট জুতোজোড়া বুকে চেপে ধরে বসে থাকেন, ইউক্রেনের বরফঢাকা মাঠে যে স্ত্রী তার স্বামীর ফিরে আসার অপেক্ষায় জানালার পাশে বসে থাকেন প্রতিটা সন্ধ্যা, সুদানের ধ্বংসস্তূপে যে শিশু তার খেলার সাথীকে আর কোনোদিন ডাকতে পারবে না; তাদের কাছে "জয়" শব্দটা কি আদৌ কোনো অর্থ বহন করে? নাকি এই শব্দটাই এখন সবচেয়ে নিষ্ঠুর এক উপহাস, যা মানুষের কান্নার ওপর দিয়ে হেঁটে যায়?

মানুষ বহুকাল ধরে পায়রাকে বেছে নিয়েছে শান্তির প্রতীক হিসেবে, কারণ পায়রা উড়ে যায়- সীমানা মানে না, কাঁটাতার মানে না, কেবল আকাশের দিকে ছুটে যায় মুক্তির নেশায়। কিন্তু যখন সেই পায়রাকে মৃত অবস্থায় হাতে তুলে ধরে বলা হয়- "এই দেখো, শান্তি এসেছে"; তখন সেটা আর প্রতীক থাকে না, হয়ে ওঠে একটা উপহাস।

কারণ মৃত পায়রা উড়তে পারে না। সে কোনো বার্তা বয়ে নিয়ে যায় না, কারও কাছে পৌঁছায় না। সে শুধু পড়ে থাকে, নিথর, নিঃশ্বাসহীন- ঠিক যেমন যুদ্ধ-পরবর্তী প্রতিটা "শান্তিচুক্তি" পড়ে থাকে কাগজের পাতায়, অথচ মানুষের বুকের ভেতরে দগদগে ক্ষতটা রয়েই যায়।

একটা যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হলে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে হাত মেলানো হয়। কিন্তু যে মা তার সন্তানকে হারিয়েছেন, তার কাছে সেই হাসি কি পৌঁছায়? যে শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, সেই ইটপাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকা স্বপ্নগুলো কি আর কোনোদিন জেগে ওঠে? 

শান্তি যদি সত্যিই আসত, তবে তা আসত কান্না মুছে দিয়ে, ঘর ফিরিয়ে দিয়ে, হারানো মানুষগুলোকে বুকে টেনে নেবার মাধ্যমে। কিন্তু যুদ্ধ শুধু নিতে জানে, বিমিময়ে সে কিছুই ফেরত দিতে জানে না। এমনকি শেষে যে শান্তির কথা বলা হয়, সেই শান্তিটুকুও সে দিতে পারে না। সে শুধু একটা মৃতদেহ ধরিয়ে দেয়, আর বলে- এই নাও, এটাই তোমার প্রাপ্তি।

লক্ষ্য করে দেখুন, ছবির হাতটা কালো, শক্ত, যেন লোহার তৈরি। অথচ প্রতিটা হাতই একদিন কোমল ছিল। এই হাতই হয়ত একদিন সন্তানের কপালে চুমু এঁকে দিত, প্রিয়জনের হাত ধরে হাঁটত সন্ধ্যার আলোয়। যুদ্ধ প্রথম সুযোগেই সেই কোমলতাকে কেড়ে নিয়েছে। মানুষকে বাধ্য করেছে কঠিন হতে, নির্মম হতে, বেঁচে থাকার জন্য নিজের ভেতরের ভালোবাসাটুকু চাপা দিতে। 

তারপর একদিন, সেই বদলে যাওয়া হাতেই তুলে ধরা হয় বিজয়ের চিহ্ন। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না- এই হাত কতটা হারিয়েছে নিজেকে ফিরে পাওয়ার আগে? কতটা ভালোবাসা পুড়ে ছাই হয়েছে এই একটা মুহূর্তের জন্য, যেখানে মানুষ দাঁড়িয়ে বলছে- দেখো, আমি জিতেছি!

যুদ্ধ কোনোদিন শান্তি দেয় না। যুদ্ধ শুধু জানে কীভাবে কেড়ে নিতে হয় মানুষ, ঘর, শৈশব, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। আর যখন সব কেড়ে নেওয়া শেষ হয়, তখন সে সান্ত্বনা হিসেবে হাতে ধরিয়ে দেয় একটা প্রতীক, একটা মিথ্যে জয়ের স্মারক- যা আসলে ফাঁপা, যার ভেতরে কোনো প্রাণ নেই। 

সেই মৃত পায়রাটার দিকে যতবার তাকাই, ততবার মনে হয়- এটাই তো যুদ্ধের আসল চেহারা। সে বিজয়ের নামে দাঁড় করিয়ে দেয় একটা শূন্যতা। সে হাতে তুলে দেয় শান্তির খোলস, কিন্তু আত্মাটা রেখে দেয় নিজের কাছে, চিরদিনের জন্য। 

আর তাই, যতদিন না আমরা বুঝব যে যুদ্ধ কখনো জয়ী করে না, শুধু হারায়- ততদিন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে কোনো না কোনো হাত এভাবেই তুলে ধরবে একটা মৃত পায়রা, আর তাকেই ভুল করে ডাকবে শান্তি বলে।


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀


⠀⠀

শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২৬

একাকীত্বের সঙ্গী


টেলিপোর্টার আবিষ্কারের পর পৃথিবী থেকে সবার আগে হারিয়ে গিয়েছিল 'দূরত্ব' নামক ধারণাটি। কোথাও পৌঁছানোর ব্যাপারে মানুষ মুক্ত হয়েছিল অপেক্ষার হাত থেকে। প্রথম দফায় যন্ত্রগুলো বসানো হয়েছিল এমন সব স্থানে যেগুলো ছিলো মানুষের চিরচেনা গন্তব্য। ব্যস্ত শহরের কেন্দ্র, কোলাহলপূর্ণ বিমানবন্দর, ঝলমলে সমুদ্রসৈকত আর পাহাড়ি রিসোর্টের চূড়ায়। এক প্যাডে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে মানুষ পৌঁছে যাচ্ছিল পৃথিবীর আরেক প্রান্তে।

দ্বিতীয় দফায় টেলিপোর্টার গুলো হয়ে উঠে আরও উন্নত, আরও দ্রুত এবং আরও সহজ। টেলিপোর্টার গুলো মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দুর্গম সব জায়গার দরজা খুলে দিল। বরফের তলদেশের গবেষণাকেন্দ্র, মেঘছোঁয়া পর্বতচূড়া, সমুদ্রের গভীর পর্যবেক্ষণ কক্ষ, জনমানবহীন প্রবালদ্বীপ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষ এক করুণ সত্য আবিষ্কার করল। সত্যটি হলো- দূরে চলে যাওয়া আর সত্যিকার অর্থে একা থাকা এক জিনিস নয়। পৃথিবীর যত সুন্দর জায়গা আছে, তার প্রতিটি কোনায় শেষ পর্যন্ত মানুষের পায়ের ছাপ পড়তে লাগলো, আর মানুষ পৌঁছানোর সাথে সাথেই সেখানে ভিড় জমে উঠলো, শব্দ গুলো ধীরে ধীরে পরিণত হলো কোলাহলে, ফ্ল্যাশলাইটের ঝলকানিতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাথে হারাতে থাকলো মানুষের একাকিত্ব।

বেশ অনেক পরে আগমন ঘটলো তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের। তবে এবারের টেলিপোর্টেশনের ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেলো। ততদিনে মানুষ বুঝে গিয়েছিলো একান্তে সময় কাটানোর মর্ম। তাই টেলিপোর্টার গুলোও তৈরি হয়েছিল সেই ধারণাকে ভিত্তি করে। এবার আর গন্তব্য গুলো নির্দিষ্ট ছিলো না। ছিলো না কোন নাম, কোনো ছবি ছিল না, কোনো পরিচিতিও ছিল না। যাত্রীরা কেবল বেছে নেয়ার সুযোগ পেতো তাদের পছন্দ মতো সময়। আর টেলিপোর্টার কোম্পানি কেবল একটা নিশ্চয়তা দিত- নির্ধারিত সময়ে সেই স্থানে পৃথিবীর আর কোনো জীবিত মানুষ উপস্থিত থাকবে না। বিজ্ঞাপনের একদম নিচে সূক্ষ্ম অক্ষরে লেখা থাকত, “কিছু নীরবতা শুধু একজনের জন্যই তৈরি হয়।”

পাঁচ বছর আগে তার স্ত্রী মেঘলাকে হারানোর পর থেকে রাইয়্যানের কাছে সন্ধ্যার সময়টা এক অদ্ভুত যন্ত্রণার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দিনের বেলায় সে আর দশ জনের মতোই একদম স্বাভাবিক একজন মানুষ। অফিসের কাজ সারে, সহকর্মীদের সাথে হাসে, বাজার করে, প্রয়োজনে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে তর্কও করে। কিন্তু সন্ধ্যা নেমে এলেই বাড়ির দরজা পেরিয়ে এক ধরনের বিস্তৃত শূন্যতা তাকে গিলে ফেলে, মনে হয় দিনের ঐ মানুষটি দরজার বাইরেই আটকে আছে।

শুরুতে সে মেঘলাকে খুব স্পষ্টভাবে মনে করতে পারত, তার কথা বলার ভঙ্গি, ঘুমানোর আগে বই পড়ার অভ্যাস, রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গান গাওয়ার সুর .....সবকিছু। কিন্তু বছর গড়াতে থাকতেই স্মৃতিগুলো অদ্ভুতভাবে বিকৃত হতে লাগল, মেঘলার মুখ মনে করতে গেলে কখনো তাকে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ দেখাত, আবার কখনো মনে হতো মুখটা ঘন কুয়াশায় ঢেকে ঝাপসা হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ভয় পেত সে এই দ্বিতীয় অনুভূতিটাকে, মেঘলাকে হারানোর চেয়েও তাকে ভুলে যাওয়ার আশঙ্কাটা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত।

তৃতীয় প্রজন্মের টেলিপোর্টারের ঐ অদ্ভুত বিজ্ঞাপনটি রাইয়্যান প্রথম দেখেছিল এমনই এক সন্ধ্যায়; ঠিক সেই সময় যখন ঘরের নিস্তব্ধতা তাকে চারপাশ থেকে চেপে ধরছিল। বিজ্ঞাপনটা পড়ার পর তার মনে হয়েছিল, হয়ত তিন দিনের জন্য পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সে অন্তত নিজের স্মৃতিগুলোর সাথে নিরিবিলিতে সময় কাটানোর একটা সুযোগ হবে। সেখানে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেবে না, কেউ বলবে না যে- আহা! পাঁচটা বছর কেটে গেছে, এবার তোমার সামনে তাকানো উচিত।

সিদ্ধান্তটা সে খুব দ্রুতই নিয়েছিল, যেন দীর্ঘদিনের জমানো একটা সিদ্ধান্ত অবশেষে বাস্তব রূপ পেতে চলেছে। যদিও এবারের টেলিপোর্টেশনের টিকিটের দাম ছিলো তার নাগালের বাইরে। তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো সে এটা করবেই। সেই সিদ্ধান্তেই আট মাসের ইউনিট জমা করে যখন টিকিটটি কিনলো তখন তাকে বেশ দীর্ঘ কয়েকটা ফরম পূরণ করতে হয়েছিল। তার নিজের সম্পর্কে বেশ খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে জানাতে হয়েছিল টেলিপোর্টেশন কোম্পানিকে। তার ঠিক দু'দিন পর তার যাত্রার দিন নির্ধারিত হলো।

যাত্রার দিন টার্মিনালে দাঁড়িয়ে তার মনে হচ্ছিল, সে কোনো ভ্রমণে যাচ্ছে না, বরং এমন এক সিদ্ধান্তের গভীরে ঢুকে পড়ছে- যার শেষটা সে নিজেও জানে না। টার্মিনালটি ছিল আশ্চর্যরকম নীরব, বিশাল সাদা ঘরের মাঝখানে গোলাকার প্যাডটি ছাড়া আর কিছু নেই, দেয়ালজুড়ে কোনো বিজ্ঞাপন নেই, কোনো কর্মচারী নেই, শুধু মেঝের নিচে নীল আলো ধীরে ধীরে জ্বলছে আর নিভছে।

রাইয়্যান প্যাডের ওপর দাঁড়াতেই একটি যান্ত্রিক কণ্ঠ ভেসে এল-
-- “আপনি কি নিশ্চিত?”

প্রশ্নটা শুনে সে সামান্য হাসল, জিজ্ঞেস করলো- "কীসের ব্যাপারে?"

কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর এল না, তারপর কণ্ঠটি আবার বলল-‌
-- “আপনি কি একাই যেতে চান?”

রাইয়্যানের হাসিটা মিলিয়ে গেল, সে বলল- “হ্যাঁ।”

আলো জ্বলে উঠল, আর পৃথিবী সরে গেল। চোখ খুলে প্রথম যে অনুভূতিটা হলো, সেটা ছিল বাতাসের; বাতাসে লবণের গন্ধ, তার সাথে ভেজা কাঠের একটা মৃদু গন্ধ মিশে আছে। সামনে সমুদ্র, দূরে জলরাশি আকাশের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মাঝখানে কোনো দিগন্তরেখা নেই, যেন পৃথিবীটা ওই পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়ে গেছে। রাইয়্যান টেলিপোর্টেশন প্যাড থেকে নেমে ধীরে ধীরে বালির ওপর হাঁটল, পায়ের নিচে নরম বালি দেবে যাচ্ছিল, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কোনো শব্দ হচ্ছিল না, সে থেমে নিজের পায়ের ছাপের দিকে তাকাল, এরপর পর আবার হাঁটা শুরু করলো।

সামনে একটি ছোট বাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, কাঠের তৈরি, নিচু ছাদ, সামনে বারান্দা। বাড়িটাকে দেখে রাইয়্যানের মনে হলো, সে যেন আগে কোথাও এই বাড়িটা দেখেছে, হয়ত কোনো ছবিতে, হয়ত কোনো স্বপ্নে, নয়তো এমন কোনো কল্পনায় যেটা সে কখনো নিজেকেই ঠিকমতো বলতে পারেনি। ভেতরে ঢুকে সেই অনুভূতিটা আরও তীব্র হলো, সবকিছু অপরিচিত, অথচ খুব অদ্ভুত রকমের পরিচিত। টেবিলের উপর রাখা কফির জারটি ঠিক সেই ব্র্যান্ডের যা সে বাড়িতে ব্যবহার করে; বইয়ের তাকের তৃতীয় সারিতে তার প্রিয় লেখকের সেই বইটি, যেটার শেষ কয়েক পাতা সে কোনোদিন পড়েনি; জানালার পাশে একটি কাঠের চেয়ার, যেটাতে বসে মেঘলা প্রতিদিন বিকেলে চা খেত।

রাইয়্যান প্রথমে এসবকে প্রযুক্তির পরিশীলিত সৌজন্য বলেই ভেবেছিল, বুকিংয়ের আগে কোম্পানি তার জীবনযাত্রা সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করেছে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রান্নাঘরের তাকের ওপর রাখা নীল কাপটি দেখে তার সেই ব্যাখ্যাটা আর যথেষ্ট মনে হলো না। নীল রঙের কাপটির কিনারে সূক্ষ্ম একটি ফাটল, হুবহু সেখানেই যেটা মেঘলার কাপেও ছিলো।

এক সকালে কাপটি হাতে নিয়ে মেঘলা বলেছিল, “দেখেছ? এখনও টিকে আছে।” রাইয়্যান তখন বলেছিল, “একদিন ভেঙে যাবে।” মেঘলা হেসে বলেছিল, “ভেঙে গেলেই কি সবকিছু ফেলে দেয়া যায়? যায় না, বুঝলে।” স্মৃতিটা এত হঠাৎ, এত স্পষ্টভাবে ফিরে এল যে রাইয়্যানের মনে হলো, কেউ যেন তার কানের কাছে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলে গেল। সে কাপটির দিকে হাত বাড়িয়েও ছুঁয়ে দেখলো না, কারণ তার মনে হচ্ছিল, একবার ছুঁয়ে দেখলেই হয়ত তাকে মেনে নিতে হবে- এটা মোটেই কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।

বিকেল নামার পর দ্বীপের রং বদলে গেল, সূর্যের আলো নরম হতে হতে সমুদ্রের বুকের উপর গলিত তামার মতো ছড়িয়ে পড়ল, আকাশে জমল অস্পষ্ট গোলাপি আভা। রাইয়্যান বারান্দায় বসে ছিল, পাশাপাশি দুটি চেয়ার, সে যে চেয়ারে বসেছিল, তার পাশের চেয়ারটি খালি। কিছুক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল, খালি চেয়ারটির ওপর একটি ভাঁজ করা কাপড় রাখা, সকালে সেটা সেখানে ছিল না। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, কাপড়টা ছিল হালকা ধূসর রঙের একটি শাল। সে হাত দিয়ে স্পর্শ করল, পরিচিত কোনো গন্ধ নেই, কোনো নাম নেই, কিছুই নেই যা প্রমাণ করবে এটি মেঘলার। তবু সে খুব যত্ন করে ভাঁজটা ঠিক করে আবার চেয়ারটির উপর রেখে দিল, এমনভাবে, যেন খুব পরিচিত কেউ পরে এসে সেটা গায়ে জড়াবে।

নিজের এই আচরণের উপর নিজেই বিরক্ত হয়ে সে জোরে বলে উঠল, “আমি কী করছি?”

প্রশ্নটা সে জোরে বলেছিল, উত্তর আসেনি। কিন্তু সে লক্ষ্য করল, তার নিজের কণ্ঠস্বর শুনতে অদ্ভুত লাগছে, যেন বহুদিন ধরে সে কারও সাথে কথা বলেনি।

সন্ধ্যার একটু আগে রাইয়্যান সমুদ্রের ধারে হাঁটতে বের হলো। এবার সে নিজের পায়ের ছাপগুলো লক্ষ্য করছিল, ঢেউ এসে ধীরে ধীরে সেগুলো মুছে দিচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা দূরে চলে গেল, হঠাৎ তার চোখে পড়ল বালির ওপর একটি ছোট পাথরের বৃত্ত। কেউ যেন খুব যত্ন করে পাথরগুলো সাজিয়ে রেখেছে। বৃত্তটির মাঝখানে একটি শুকনো শামুকের খোলস, রাইয়্যান সেখানে বসে পড়ল। তার মনে পড়ল, মেঘলা সমুদ্রতীরে শামুক দেখলেই সবসময় একটা শামুকের খোলস কুড়িয়ে নিত, তারপর কিছুক্ষণ হাতের তালুতে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আবার ফেলে দিত। “নেবে না?” রাইয়্যান একবার জিজ্ঞেস করেছিল। “না,” মেঘলা বলেছিল, “ওটার জায়গা ওখানেই।” রাইয়্যানের বুকের ভেতর হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল, সে চারদিকে তাকাল, কেউ নেই, সমুদ্র, আকাশ আর তার নিজের ছায়া, তবু পাথরগুলো কেউ সাজিয়েছে। সে কি সকালে এখানে এসেছিল?! অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারল না।

সেই রাতে রাইয়্যান ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি, বিছানায় শুয়ে সমুদ্রের শব্দ শুনছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো দিনের বেলায় যে সমুদ্র প্রায় শব্দহীন ছিল, রাত বাড়ার সাথে সাথে তার ঢেউয়ের আওয়াজ যেন ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। কখনো মনে হচ্ছিল, জল তীরে এসে ভাঙছে, আবার কখনো মনে হচ্ছিল, কেউ বাড়ির চারপাশে খুব ধীর পায়ে হাঁটছে। কিন্তু রাইয়্যান জানত, সেখানে কেউ নেই, সে নিজেকেই বারবার সেই কথাটা মনে করিয়ে দিল- আমি একাই এসেছি। রাতের কোনো এক সময় তার ঘুম এসে গিয়েছিল, সকালে ঘুম ভাঙার পর সে প্রথমে বুঝতে পারেনি কী তাকে জাগিয়েছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আলো ঢুকছে, ঘর নিস্তব্ধ, তারপর তার চোখ পড়ল টেবিলের ওপর, সেখানে দুটো কাপ রাখা। একটিতে আগের রাতের কফির শুকিয়ে যাওয়া দাগ, অন্যটিতে চা, ধোঁয়া নেই, কিন্তু চায়ের রং এখনও গাঢ়।

রাইয়্যান বিছানা থেকে উঠে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল, সে জানত, দ্বিতীয় কাপটি সে রাখেনি। তারপরও তার প্রথম ভাবনায় এলো- ভোর সকাল করে মেঘলাও এমন কড়া চা খেত; পরক্ষণেই সে এই চিন্তাটার জন্য নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারছিল, তার অবচেতন মন নিজে থেকেই প্রতিটি ঘটনার সাথে মেঘলাকে জুড়ে দিচ্ছে। নীল রঙা মেঘলার কাপ, ভাজ করা মেঘলার শাল, সমুদ্র তীরে মেঘলার হাতে শামুকের খোলস, আর এখনকার এই কড়া চা - সেটাও মেঘলার। হয়ত এসব কিছুই তাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, হয়ত কোম্পানির কোনো অ্যালগরিদম তার স্মৃতির দুর্বল জায়গাগুলো জানে। অথবা... -এই শেষ সম্ভাবনাটাই সে ভাবতে চাইলো না।

দুপুরের দিকে রাইয়্যান বাড়ির ভেতরে আরও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখতে পেল, বইয়ের তাকের ওপর যে বইটি আগের দিন বন্ধ অবস্থায় ছিল, সেটি এখন খোলা, পাতার মাঝখানে একটি শুকনো পাতা রাখা। রাইয়্যান বইটি তুলে নিল, পাতাটি কোথা থেকে এসেছে, সে জানে না, কিন্তু বইয়ের যে পাতায় সেটি রাখা, সেখানে একটি বাক্য দাগ দেওয়া-

“মানুষ কখনো কখনো ফিরে আসে না, তবু তার জন্য জায়গা থেকে যায়।”

রাইয়্যান বইটি বন্ধ করে ফেলল, তার হাত কাঁপছিল না, সে ভয়ও পাচ্ছিল না, বরং তার ভেতরে অন্যরকম একটা অস্থিরতা তৈরি হচ্ছিল। যদি সত্যিই কেউ এখানে থাকে? আর যদি কেউ না থাকে? এই দুই সম্ভাবনার মধ্যে কোনটা সে বেশি ভয় পায়, রাইয়্যান বুঝতে পারছিল না। কারণ কেউ থাকলে তাকে এমন কিছু বিশ্বাস করতে হবে, যা বিশ্বাস করা সম্ভব নয়, আর কেউ না থাকলে তাকে স্বীকার করতে হবে, সে নিজেই হয়ত এসব ঘটাচ্ছে- কখনো জেগে, কখনো ঘুমের ভেতর এসব সাজিয়ে যাচ্ছে; এবং পরে কিছুই মনে রাখতে পারছে না, যা হয়ত তার চেয়েও ভয়াবহ।

সেদিন বিকেলে সে সিদ্ধান্ত নিল, আর কোনো কিছু নিয়ে অনুমান করবে না, সে রান্নাঘরের টেবিল পরিষ্কার করে দিল, দুটি কাপ ধুয়ে উলটো করে রাখল, চেয়ার দুটো পাশাপাশি ঠেলে দিল, বারান্দায় থাকা শালটি ভাঁজ করে আলমারির ভেতর রেখে দিল। তারপর সে বাড়ির প্রতিটি ঘর ঘুরে দেখল, কোথাও কেউ নেই, সে দরজা বন্ধ করল, জানালা আটকাল, মেঝের ওপর এক টুকরো বালি ছড়িয়ে দিল, যাতে কেউ হাঁটলে পায়ের ছাপ পড়ে। সবশেষে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, বিকেল ৫টা ৪০। সে সিদ্ধান্ত নিল, সূর্য ডোবার আগে আর কোথাও যাবে না। বারান্দার চেয়ারে বসে থাকবে, কেউ এলে দেখবে, কেউ না এলে অন্তত নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে।

সূর্য ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছিল, সমুদ্রের ওপর আলো ছোট হয়ে আসছিল, আকাশের রং কমলা থেকে গাঢ় বেগুনিতে বদলে যাচ্ছিল, দ্বীপের বাতাসের নোনা স্বাদের সাথে যেন এক ধরনের চাপা প্রতীক্ষার চাপ তৈরি হতে থাকলো। রাইয়্যান চেয়ারে বসে ছিল, চোখ বাড়ির দরজার দিকে। সময় যাচ্ছিল, কেউ আসেনি, বালির উপর কেন পায়ের ছাপ পড়লো না, কোথাও অস্বাভাবিক কোন শব্দও হলো না।

তারপর হঠাৎ সে খেয়াল করল, বারান্দার অন্য চেয়ারটিতে কেউ বসে নেই ঠিকই, কিন্তু চেয়ারটি সামান্য দোল খাচ্ছে, যেন কেউ একটু আগে উঠে গেছে চেয়ারটি থেকে। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল না, সে নিজের শ্বাসের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করল, "বাতাস", সে মনে মনে বলল, কিন্তু তার মুখে কথা বেরোল না, কারণ বাতাস থেমে ছিল। কিছুক্ষণ পর বাড়ির ভেতর থেকে একটি শব্দ এল, খুব সাধারণ শব্দ, ড্রয়ারের শব্দ, কেউ যেন রান্নাঘরের ড্রয়ার খুলল। রাইয়্যান উঠে দাঁড়াল, তারপর আবার বসে পড়ল, সে বুঝতে পারছিল, তার শরীর বাড়ির ভেতরে যেতে চাইছে না, কিন্তু তার মনে হচ্ছিল, যদি না যায়, তাহলে বাকি সময়টা সে আর এখানে কাটাতে পারবে না। অনেকক্ষণ পরে সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, দরজার কাছে গিয়ে থামল, তারপর ভেতরে ঢুকল, রান্নাঘর ফাঁকা, কিন্তু ড্রয়ারটি খোলা, ভেতরে একটি ছোট নোটবুক রাখা।

রাইয়্যান জানে, নোটবুকটি তার নয়। সে সেটি হাতে নিল, প্রথম কয়েকটি পাতা খালি, তারপর একটি পাতায় লেখা দেখতে পেল। লেখাগুলো কাঁপা কাঁপা নয়, তাড়াহুড়ো করেও লেখা নয়, যেন কেউ শান্তভাবে বসে লিখেছে- "আজ সে আবার চেয়ার দুটো পাশাপাশি রেখে দিয়েছে।"

রাইয়্যানের বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে এল, সে পরের লাইনটি পড়ল- "আজও সে বলবে, সে একা। আমি এখনও তাকে বলিনি যে সে গতকাল রাতে সমুদ্রের ধারে অনেকক্ষণ আমার সাথে বসে ছিল।"

রাইয়্যান আর পড়তে পারল না, সে নোটবুক বন্ধ করে দিল, মনে করার চেষ্টা করল গত রাতের কথা, বিছানায় শোয়ার আগে সে কী করেছিল? সে কি সত্যিই বাইরে গিয়েছিল? তার মনে পড়ল না। এক মুহূর্তের জন্য তার ইচ্ছে হলো নোটবুকটি ছিঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে। তারপর মনে হলো, সেটা করলে হয়ত সে শুধু প্রমাণটাই নষ্ট করবে, প্রশ্নটা নয়। সে নোটবুকটি টেবিলের ওপর রেখে টেলিপোর্টার প্যাডের দিকে হাঁটল, আজ দ্বিতীয় দিন, আরও চব্বিশ ঘণ্টা পর তার ফেরার অনুমতি।

টেলিপোর্টারের স্ক্রিনের সামনে দাঁড়াল, সেখানে লেখা ছিল-
RETURN AVAILABLE IN 23:17:42

তার নিচে আরেকটি লাইন জ্বলছিল-
PASSENGERS READY: 1

রাইয়্যান স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, একজন, সে নিজেই, কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর সংখ্যাটা ঝিলমিল করে উঠল, তারপর স্ক্রিনে নতুন করে লেখা এল-
PASSENGERS READY: 2

রাইয়্যান স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে পেছনে ঘুরে দেখল, দ্বীপে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে, বাড়ির জানালায় আলো জ্বলছে, বারান্দার দুটি চেয়ার পাশাপাশি, দূর থেকে মনে হলো, একটি চেয়ারে কেউ বসে আছে। রাইয়্যান চোখ কুঁচকে তাকাল, পরের মুহূর্তেই সেখানে শুধু শালটা পড়ে থাকতে দেখল- যেটা সে নিজের হাতে আলমারিতে ঢুকিয়ে রেখেছিল। সে আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাল, সংখ্যাটা তখনো দুই। আর ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে বাড়ির দরজা খোলার একটা মৃদু শব্দ ভেসে এল।

রাইয়্যান চোখ বন্ধ করল, তার মনে হলো, এই মুহূর্তে তার সামনে দুটো পথ আছে। একটি পথ তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই শহরে, যেখানে পাঁচ বছর ধরে সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে মেঘলা আর নেই। অন্য পথটি কোথায় নিয়ে যাবে, সে জানে না, শুধু এটুকু জানে- পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে, অথবা দাঁড়িয়ে নেই।

ঠিক তখনই তার হাতের কনসোলটি কেঁপে উঠল, স্ক্রিনে ফেরার সময় হঠাৎ বদলে গেল-
RETURN AVAILABLE NOW

তার নিচে লেখা উঠল- “দয়া করে যাত্রীর সংখ্যা নিশ্চিত করুন।” রাইয়্যান ধীরে ধীরে চোখ খুলল, তার আঙুল দুটি সংখ্যার মাঝখানে স্থির হয়ে রইল- 1 অথবা 2। পেছন থেকে তখন খুব পরিচিত স্বরে কেউ বলল- "রাইয়্যান, এবার কি আমাকে সত্যিই রেখে যাবে?"

রাইয়্যান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল কি না, সেটা কোনোদিন জানা যায়নি। পরদিন সকালে তৃতীয় তরঙ্গের নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রে শুধু একটাই সংকেত পৌঁছেছিল- টেলিপোর্টার প্যাড সক্রিয় হয়েছে, প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, কিন্তু যাত্রীসংখ্যার তথ্য অসম্পূর্ণ।

রাইয়্যানের বুকিং ফাইলের একেবারে শেষ লাইনে, যা পরে কোম্পানির কোনো ইঞ্জিনিয়ার, কোনো অ্যালগরিদম, কোনো তদন্তকারী দল ব্যাখ্যা করতে পারেনি, সেখানে শুধু একটি ছোট্ট নতুন নোট যোগ হয়েছিল লাল অক্ষরে “RETURN NUMBER ERROR!”

সেই দ্বীপে যদি কেউ কোনোদিন আবার যায়, তবে সে হয়ত দেখতে পাবে, বারান্দার দুটো চেয়ার এখনো পাশাপাশি রাখা, একটি চেয়ারের উপর একটি হালকা ধূসর শাল ভাঁজ করা, আর টেবিলের উপর দুটো কাপ। একটি খালি, অন্যটিতে অপেক্ষারত কড়া লিকারের ঠান্ডা চা।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀


মঙ্গলবার, মে ২৬, ২০২৬

শূন্য সোফার রুম এবং হারানো এক আলোকবর্তিকা


জানালার কাচে তখনো বৃষ্টির শেষ ফোঁটাগুলো আলতো করে টোকা দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেও প্রকৃতির বুকে যে উন্মাতাল তাণ্ডব চলল, তাকে একরকম রূপকথা বলেই ভ্রম হয়। দমকা ঝড়ো বাতাস, মেঘের গুরুগুরু গগনবিদারী গর্জন, আর সাথে বুক কাঁপানো দুই-একটি বজ্রপাত -সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিল এই আধঘণ্টায়।

তারপর হঠাৎ করেই শান্ত। আকাশ তার রাগ ঝেড়ে এখন হালকা, শান্ত। ঘরের কোণে জমে উঠেছে একটা শিরশিরে ঠান্ডা হাওয়া, যা গায়ে লাগলেই কেমন যেন একটা আলসেমি জড়িয়ে ধরে। মন বলে, এই চমৎকার ঠান্ডা আবহে কম্বলটা গায়ে টেনে দিয়ে একটা লম্বা, নিটোল ঘুম দেওয়া যাক। কিন্তু চোখ বুজলেই কি আর ঘুম আসে? কিছু কিছু আবহাওয়া আসলে ঘুমের চেয়ে বেশি জাগিয়ে তোলে ভেতরের মানুষকে, খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে স্মৃতির ধুলোবালি ঝেড়ে ফেলে তাকে তুলে ধরে মনের দৃষ্টিতে।

যেমন আজ এই বৃষ্টির শেষলগ্নে এসে বুকটা কেমন যেন হুঁ হুঁ করে উঠল। খুব মনে পড়ছে আম্মাকে।

আসলে ‘ইদানীং মনে পড়ছে’ বলাটা ভুল হবে। আম্মা চলে যাওয়ার পর থেকে জীবনের এমন কোনো মুহূর্ত নেই, যেখানে তার ছায়া আমি খুঁজে না। এখন প্রতিটা ছোটোখাটো কাজেই আম্মা অবধারিতভাবে চলে আসেন। কোনো একটা কাজ করতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবি, ‘আচ্ছা, আম্মা থাকলে তো কাজটা এভাবে করতেন না, তিনি হয়তো অন্য কোনো সহজ উপায়ে করে দিতেন!’ কিংবা কোনো জিনিস অগোছালো দেখলে কানের কাছে যেন মায়ের সেই চিরচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে ওঠে, ‘এটা এখানে রাখছিস কেন? ঐখানে রাখ।’ অথবা কোনো কাজে আটকে গেলে মনে হয়, আম্মা থাকলে ঠিকই এই সমস্যার কোনো সমাধান বলে দিতেন। এই রকম হাজারো হাবিজাবি, টুকরো টুকরো ভাবনা এখন আমার একাকিত্বের সঙ্গী।

তবে আজকের এই ঝড়-বৃষ্টির রাতটা যেন আম্মার স্মৃতিকে বড্ড বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। আম্মাকে আমাদের চেনা-পরিচিত সবাই খুব সাহসী এক নারী হিসেবেই জানত। যে কোনো বড়ো বিপদ বা কঠিন পরিস্থিতি তিনি এত ঠান্ডা মাথায় সামাল দিতেন যে, অবাক হতে হতো। দেখে মনে হতো, তার কোনো উদ্বেগ নেই, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। যেন এক অদ্ভুত জাদুবলে সবটা ঠিক হয়ে যাচ্ছে, কিংবা অদৃশ্য কেউ একজন এসে তার হয়ে সব গুছিয়ে দিয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু আমার কেন যেন মনে হতো, এই পাহাড়সম সাহসী মানুষটারও একটা দুর্বল জায়গা ছিল। ঝড়-বৃষ্টির সময় আম্মাকে আমার বড্ড ভীতু মনে হতো। যদিও তিনি মুখে কখনো ভয়ের কথা স্বীকার করতেন না, চোখে-মুখেও ভয়ের কোনো রেখা ফুটতে দিতেন না, তাও একজন সন্তানের চোখ তো! মায়ের ভেতরের চাপা অস্থিরতাটুকু আমি ঠিকই টের পেতাম।

সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে আজও ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফোটে, আবার পরক্ষণেই চোখটা ভিজে আসে। বজ্রপাত শুরু হওয়া মাত্রই নিয়ম করে এলাকার বিদ্যুৎ চলে যেত। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হওয়ার আগেই আম্মা তড়িঘড়ি করে এসে বসতেন আমাদের ড্রয়িংরুমে, যেটাকে আমরা বলতাম ‘সোফার রুম’। সোফার রুমে বসেই উচ্চকণ্ঠে বাড়ির সবাইকে ডাকতেন, ‘কই রে তোরা, সব এখানে আয়!’

আম্মার ডাক শোনামাত্রই আমরা যে যেখানে থাকতাম সবাই মিলে টর্চ, চার্জার লাইট কিংবা মোবাইলের ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে সেই সোফার রুমে গিয়ে জড়ো হতাম। মুহূর্তের মধ্যেই সেই অন্ধকার ঘরটা আলো আর মানুষের কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠতো। এরপর শুরু হতো এক তুমুল আড্ডা। বাচ্চারা আলো-আধারেই নিজেদের মতো খেলা শুরু করে দিতো, চিৎকার করত, ঝগড়া করতো আবার খুনসুটিতে মেতে উঠত।

আম্মা কখনো কখনো সোফায় কিংবা মেঝেতে বসতেন। বাকিরা যে যার সুবিধা মতো জায়গা করে বসতো। তারপর আম্মা ধীরে ধীরে বলতে শুরু করতেন। কত গল্প বলতেন, কত মানুষকে নিয়ে বলতেন, কত-কত সময়কে নিয়ে বলতেন। কী ছিলো না তার সেই টুকরো টুকরো কথায়! আমি সাধারণত সেসব আড্ডায় খুব একটা কথা বলতাম না, নিজের মতো এক কোণে বসে আম্মার গল্প শুনতাম, বাচ্চাদের আনন্দ দেখতাম, মোবাইল স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবন্ধ করে রাখতাম, আর মাঝে মাঝে চোখ তুলে আম্মাকে একটু দেখতাম। অন্ধকারের মাঝেও আম্মার হাসিমুখটা দেখতে বড্ড ভালো লাগত।

আম্মা শুধু আমাদের নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন এমন না, বরং ঝড়ের মাঝেই মোবাইলে কাছের-দূরের আত্মীয়, পরিচিত সব মানুষকে ফোন করে খোঁজ-খবর নিতেন। কে কেমন আছে, কার বাড়ির চাল উড়ে গেল কি না, কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হলো কি না -এমন সব খোঁজ-খবর নেয়া চলতো। পুরো ঘরটা তখন এক অদ্ভুত ওমে, ভালোবাসার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকত। বাইরের ঝড়-বৃষ্টির হুংকার তখন আর আমাদের ছুঁতে পারত না।

আজ আম্মা নেই, দেখতে দেখতে একটা বছর পার হয়ে গেল। প্রকৃতিতে আজও ঝড় আসে, বৃষ্টি নামে, আকাশ ভেঙে বজ্রপাত হয়। বিদ্যুৎ চলে গেলে চারদিক আগের মতোই অন্ধকার হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের আর সেই সোফার রুমে একত্রে বসা হয় না। সত্যি বলতে, এখন আর ওভাবে বসতে ইচ্ছেও করে না। যে মানুষটাকে কেন্দ্র করে আমাদের সেই অন্ধকারের উৎসব জমে উঠত, সেই মানুষটাই যখন নেই, তখন সোফার রুমের ওই শূন্যতাটুকু বড্ড বেশি কামড়ে ধরে। সবার হৃদয়ে আলো জ্বালানোর মানুষটাই আজ অন্ধকার ঘরে একাকী নিদ্রা যাপন করছে।

মাঝে মাঝে এই রকম দমকা হাওয়া আর বৃষ্টির রাতে বুকের ভেতরটা বড্ড বেশি হাহাকার করে ওঠে। তীব্র ইচ্ছে জাগে, সব ফেলে এই ঝড়-বৃষ্টির মাঝেই ছুটে যাই আম্মার কবরের পাশে। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি, যেভাবে একসময় সোফার রুমে এক কোণে বসতাম। আম্মার মাটির বিছানার পাশে বসে বলি, ‘আম্মা, ডরাইয়েন না। এই বৃষ্টি একটু পরেই থাইমা যাইবো।’

কিন্তু সময় আর নিষ্ঠুর বাস্তবতার বেড়াজালে আটকে সেই ইচ্ছেটা আর পূরণ হয় না। জানালা দিয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসটা গায়ে লাগে, আর আমি একা ঘরের বিছানায় শুয়ে স্মৃতির কম্বল মুড়ি দিয়ে আম্মাকে খুঁজি।

আম্মা ভালো থাকুক তার এই দীর্ঘ নিদ্রায়। পৃথিবীর কোনো ঝড়, কোনো মেঘের গর্জন কিংবা কোনো বজ্রপাত আর কখনোই যেন তাকে বিচলিত না করতে পারে। অনন্তকাল পরম শান্তিতে তিনি ঘুমিয়ে থাকুক নিশ্চিন্তে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀


শুক্রবার, এপ্রিল ২৪, ২০২৬

আমরা আসলে কিছুই বুঝি না


লাভ বুঝি না লোকসান বুঝি না
ভালো বুঝি না মন্দ বুঝি না
কিংবা তাদের মিসেল বুঝি না
হাসি বুঝি না কান্না বুঝি না
কাছের মানুষ হারাবার আগে
তাদের চোখের ভাষাটা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা


গ্রাম ভেঙে শহর করার আগে
গ্রাম্য জীবনের সরলতা বুঝি না
নদী ভরাট জমি করার আগে
নিরালা বাতাসের শীতলতা বুঝি না
মাটির ঘর পাঁকা করার আগে
আপন নিবাসের ঠিকানা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা


ধুলো মাখা পথে পিচ ঢালার আগে
খালি পায়ে হাঁটার সুখটা বুঝি না
ল্যাম্পপোস্টের আলো জ্বালাবার আগে
আঁধারে বসার শান্তি বুঝি না
জোনাকি দল হারাবার আগে
অন্ধকারের ভাষাটা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা


উজ্জ্বল এলইডিতে হারাবার আগে
কুপির বাতির নাচন বুঝি না
স্ক্রিনের আড্ডায় হারাবার আগে
উঠোনে গল্পের আসর বুঝি না
গোছানো ফ্ল্যাটে হারাবার আগে
মুক্তপ্রাঙ্গণের বিস্তার বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


হাঁসে ভরা বিল হারানোর আগে
মন জুড়ানো বিকাল বুঝি না
ধান ক্ষেতের দোল হারানোর আগে
সবুজের মোহ মাত্রা বুঝি না
বরই-পেয়ারা গাছ হারানোর আগে
লংকা-লবণের স্বাদ বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


ডাঙ্গুলির শৈশব হারানোর আগে
মায়ের বকুনির মমতা বুঝি না
কৈশোরের দুরন্ত হারান‌োর আগে
নিস্বার্থের বন্ধুর মায়াটা বুঝি না
সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি হারানোর আগে
মুক্তো আকাশের বিশালতা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


যান্ত্রিক চাকায় শান্তি হারাবার আগে
ধীর জীবনের ছন্দ বুঝি না
নগর বিনিদ্রায় হারাবার আগে
নিশি গ্রামের নিদ বুঝি না
শ্রুতিকটু অ্যালার্মে ভোর হারাবার আগে
পাখির ডাকে ঘুম ভাঙা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা 


শহুরে ভিড়ে হারাবার আগে
চেনা মুখের মায়া বুঝি না
জেব্রাক্রসিং এ হারাবার আগে
আঁকা বাঁকা পথের জাদু বুঝি না
শহুরে জঞ্জালে হারাবার আগে
সরল গ্রামের বিপুলতা বুঝি না
আমরা আসলে কিছুই বুঝিনা...

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

শনিবার, এপ্রিল ১১, ২০২৬

অন্ধকারের দর্শন

 


বহুকাল আমি নিজেকে একজন ভুল মানুষ ভেবে এসেছি। আমার পৃথিবীটা ছিল কুয়াশায় ঢাকা, যেখানে স্পষ্ট বলতে কিছুই ছিল না। আমার ভেতরে নিজেকে প্রকাশ করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল, কিন্তু যতবারই আমি মুখ খুলতে চেয়েছি, ততবারই মনে হয়েছে যেন কেউ একজন আমার কথাগুলো বন্দি করতে ছুটে আসছে। ভয় ছিল আমার ছায়াসঙ্গী। তাই আলো থেকে পালিয়ে বারবার আমি ফিরে এসেছি আমার পরিচিত অন্ধকারে, আর সেই অন্ধকারই হয়ে উঠেছিল আমার একমাত্র পরিচয়। আমি মেনেই নিয়েছিলাম- আমি আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত ভুলে ভরা এক মানুষ, যার জন্মই হয়েছে ভুল করার জন্য।

কিন্তু একদিন সবকিছু বদলে গেল, যেদিন আমার ভাবনার সাগর নিজের গতিপথ বদলে গিয়ে পড়ল ছোট্ট একটি বীজের উপর।

মাটির গভীরে, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে একটি বীজ পড়ে থাকে। তাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, "কেন তুমি এই অন্ধকারে? বাইরে এসো, আলোর পৃথিবী তোমাকে ডাকছে," সে হয়তো কোনো উত্তরই দেবে না। কারণ সে জানে, ঐ অন্ধকার তার শত্রু নয়, বরং তার আশ্রয়। ঐ মাটি, ঐ চাপ, আর ঐ একাকিত্ব.. এগুলো ছাড়া তার শেকড় গজাবেই না। আলোতে মাথা তোলার আগে, ঐ অন্ধকারকে তার আপন করে নিতে হয়, মাটির প্রতিটি কণার সাথে বন্ধুত্ব পাতাতে হয়।

সেই বিকেলে আমার হঠাৎ মনে হলো, আমি তো সেই বীজটার মতোই। আমার ভয়, আমার অস্পষ্টতা, আমার ভুলগুলো… ওগুলো আসলে আমার শত্রু ছিল না, ওগুলোই ছিল আমার মাটি। যতবার আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি, ততবার আমি আসলে নিজের শেকড়কে আরও গভীরে চালনা করেছি। 

এই ভাবনাটা আমাকে পৃথিবীর দিকে নতুন করে তাকাতে শেখালো। আমি দেখলাম, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মতো শিল্পীও তাঁর সেরা কাজগুলো অসম্পূর্ণ রেখে গেছেন, কিন্তু তাতে তাঁর মহত্ত্ব কমেনি। আমি বুঝলাম, পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও অমাবস্যার রাতের প্রয়োজন বেশি, কারণ সেই অন্ধকারই আমাদের আকাশের আসল রূপ চেনায়, কোটি কোটি তারার জগৎ চোখের সামনে মেলে ধরে। প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো এই যেমন আমাদের চিরচেনা ক্ষণস্থায়ী সূর্যাস্ত বা পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনা -কোনোটিই চিরস্থায়ী বা নিখুঁত নয়, কিন্তু তাদের সৌন্দর্য অসীম। 

আর ঠিক তখনই, আমার নিজের পরিচয়টা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল। আমি "অন্ধকারের মানুষ" নই। আমি সেই মানুষ, যে অন্ধকারকে চেনে। যে অন্ধকারের অতল গভীরতাকে ভয় পায় না, বরং তাকে আলিঙ্গন করে নিতে শিখেছে। আমার ভুলগুলো আমার ব্যর্থতার ইতিহাস নয়, বরং আমার পথচলার চিহ্ন। আমার ভেতরের দ্বিধাগুলো আমার দুর্বলতা নয়, সেগুলো আমার চিন্তাশীল মনের প্রমাণ। 

সেদিন আমি বুঝতে পারলাম, আমি ভুলে ভরা এক মানুষ নই, বরং আমি অভিজ্ঞতায় ভরা এক জীবন্ত সত্তা।

⠀⠀


⠀⠀

এখন আর আমি আলো খোঁজার জন্য দৌড়াই না। ভয় এলে তাকে তাড়িয়ে দিই না, বরং তার কথা শুনি। ভুল করলে নিজেকে দোষারোপ করি না, বরং হাসি মুখে ভাবি, "বেশ, এখান থেকে নতুন কী শিখলাম?" আমার সেই অন্ধকার ঘরটা এখন আর ভয়ের জায়গা নয়, ওটা আমার শক্তির উৎস -আমার শেকড়ের মাটি। 

আলোর দিকে দৌড়ানোর প্রয়োজনটাই হয়তো ফুরিয়ে গেছে। কারণ যখন একজন মানুষ নিজের অন্ধকারকে আপন করে নিতে পারে, তখন সে নিজেই নিজের আলো হয়ে ওঠে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

রাজকীয় ছাগল উৎপাদনে আমাদের অবদান

 


মানুষ ঠিক ততটুকুই সম্মানেই সবচেয়ে মানবিক থাকে, যতটুকু তার প্রাপ্য। এর বেশি দিলেই বিপদ। এটি কোনো দার্শনিক অনুমান নয়, এটি জীবনের ঘটনাপ্রবাহকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে পাওয়া একটি অকাট্য সত্য। 

অতিরিক্ত সম্মান মানুষের মস্তিষ্কে এক বিচিত্র রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটায়। প্রথমে সে এই অযাচিত সম্মান পেয়ে একটু অবাক হয়, তারপর তাতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে, এবং তারপর- এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক ধাপ; সে ধরেই নেয় যে এটাই তার ন্যায্য প্রাপ্য ছিল!!

এই উপলব্ধির পর থেকে সে হঠাৎ আবিষ্কার করে যে তার মতামত অমোঘ, তার রুচি অতুলনীয়, এবং পৃথিবীর বাকি সবাই মূলত তার জ্ঞানের অপেক্ষায় ক্ষুদ্র, তুচ্ছ, অতিনগণ্য। এরপর থেকে সে আর মানুষের মতো আচরণ করে না; সে আচরণ করে একজন রাজকীয় ছাগলের মতো। যেদিকে খুশি যায়, যা খুশি বলে, যা খুশি করে, যা খুশি তাতে মুখ লাগায়, যা খুশি তাই খায়, আর কেউ সামান্য বাধা দিলে উলটো শিং নাড়িয়ে তেড়ে আসে।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো, এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?

⠀⠀

একটাই উপায় তার, তা হলো 'সম্মান প্রত্যাহার'।
কিন্তু সেটি ধীরে ধীরে করলে কাজ হয় না, কারণ মানুষ নিজের সম্মান হারানোর ব্যাপারে অত্যন্ত সৃজনশীল(!)। প্রতিটি ধাপে সে নতুন ব্যাখ্যা দাঁড় করায়। সে ভাবে এবং বলে- “ওরা আসলে আমাকে বোঝে না”, “ওরা হিংসুটে, আমাকে হিংসা করে”, “ওরা আমার কদর বুঝলো না”, “আমি যে ওদের জন্য কী করেছি তা ওরা বুঝলো না”, কিংবা “এই যুগ/লোকগুলো আমার উপযুক্ত নয়”। এমনকি প্রয়োজনে সে ইতিহাসের দুই-একজন মহামানবের সাথে নিজের তুলনাও টেনে বসে, কারণ তারাও নাকি জীবদ্দশায় স্বীকৃতি পাননি। এই জাতীয় দার্শনিক সান্ত্বনা সে নিজেই নিজেকে অবিরাম দিতে থাকে, এবং ছাগলামি নির্বিঘ্নে অব্যাহত রাখে। 

সম্মান পুরোপুরি শূন্য না হওয়া পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া থামে না। শূন্যের কোঠায় এসে সে কিছুটা থমকায়, চারদিকে তাকায়, এবং ধীরে ধীরে আবার মানুষ হওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তখন অবশ্য অনেক দেরি হয়ে যায়, এবং দর্শকরাও ততদিনে তাকে ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে। 

তাই কাউকে সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা করলে, তাকে যতটুকু প্রাপ্য ঠিক ততটুকুই সম্মান দিন, তার বিন্দু বেশি নয়। 

কারণ অতিরিক্ত সম্মান আসলে সম্মান নয়, এটি একটি ধীরগতির বিষ, একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিশাপ। এই অভিশাপ মানুষকে নিজের অজান্তেই, ধীরে ধীরে, অত্যন্ত নিপুণভাবে অন্য একটি প্রাণীতে রূপান্তরিত করে।

এবং সেই প্রাণীটির নাম ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।

⠀⠀

~ বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ ছেঁকে সংগৃহীত

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

জীবনের জটিল সমীকরণঃ সফলতার ভ্রম ও বাস্তবতা

⠀⠀

আমরা সাধারণত চোখের সামনে যা দেখি, তাকেই সত্য ধরে নিই। আজ কার লাভ হলো, কে উন্নতি করল, কে ক্ষমতার চেয়ারে বসল -এসব দিয়েই আমরা সফলতা আর ব্যর্থতার বিচার করি। অথচ জীবন এত সরল নয়। জীবনের হিসাব অনেক গভীর, অনেক বিস্তৃত। এখানে সময়ের সাথে সাথে জীবনের সমীকরণ বদলায়, আরও বদলে যায় সফলতার সংজ্ঞা।

একদিন তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে বাদামের ঝুড়ি হাতে রফিক মিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্র্যাফিক ছেড়ে দেওয়ায় কয়েকটি গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হলো তার সারা দিনের পুঁজি -বাদামের ঝুড়ি। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল তার রুজি-রুটি। অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। 

অন্যদিকে একই রুটে বাদাম বিক্রি করা শফিক মিয়ার সেদিন দারুণ লাভ হলো। রফিক না থাকায় দ্বিগুণ বিক্রি করল সে। হাতে এলো ভালো অঙ্কের টাকা। আপাতদৃষ্টিতে ঐদিনের জন্য শফিক হলো সফল, আর রফিক হলো ব্যর্থ, নিঃস্ব একজন। কিন্তু সন্ধ্যায় সারা দিনের আয় নিয়ে শফিক বসে গেল জুয়ার আসরে। রাত শেষ হতেই উপার্জিত সব টাকা হারিয়ে সেও শূন্যে নেমে এলো। সকালে দেখা গেল- রফিক আর শফিক দুজনকেই আবার শূন্য শুরু করতে হবে। তবে পার্থক্য এক জায়গায়। 

রফিক মিয়া ছিল সৎ, ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। সবাই তাকে বিশ্বাস করত। তাই সে যখন নতুন করে ব্যাবসা শুরু করতে চাইল, তখন মানুষ বিনা দ্বিধায় তাকে বাকীতে মাল দিল। মানুষের বিশ্বাসই হয়ে উঠল তার নতুন মূলধন। অন্যদিকে শফিকের জুয়ার নেশা আর অবিশ্বস্ততা কথা সবাই জানত। তাই কেউ তাকে বাকীতে মাল দিতে চাইল না। বিশ্বাসহীন মানুষের জন্য পৃথিবীর কোনো দরজাই কখনো খোলা থাকে না। 

এবার চলুন আরেকটি গল্প শুনি। গল্পটা সুমন নামের এক অফিসের সহকারী ম্যানেজারের। সারাদিন বসকে তোষামোদ করে সময় কাটাত, আবার আড়ালে তারই বদনাম করে বেড়াত। তবে তার একটা সুপ্ত ও গোপন ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছেটি ছিল- কবে বসের চাকরি যাবে আর সে সেই চেয়ারে বসবে। অনেক দিন পর তার সেই চাওয়া পূরণ হলো। তার বস চাকরি ছেড়ে চলে গেল, আর সুমন পদোন্নতি পেয়ে হলো ম্যানেজার। 

মানুষের চোখে সে সফল। কিন্তু সফলতা আর ইচ্ছে পূরণ তো আর তার চরিত্র বদলাতে পারে না। আগের মতোই চললল তার অফিস পলিটিক্স, ষড়যন্ত্র, স্বজনপ্রীতি আর তোষামোদের রাজনীতি। ফলে বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও যোগ্য কর্মচারীরা একে একে চাকরি ছাড়তে লাগল। শূন্য পদে নিয়োগ পেল অদক্ষ, তেলবাজ ও অনভিজ্ঞ লোকজন। আর এসব কারণে কোম্পানির ক্ষতি বাড়তে থাকল। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সুমন ও তার গড়া পুরো দলকেই ছাঁটাই করলো। 

আরও একটি গল্প শোনা যাক। পরীক্ষায় একজন নকল করে ভালো রেজাল্ট করল, আর অন্যজন সততার সাথে পরিশ্রম করে মাঝারি ফল পেল। সবাই প্রথমজনকে মেধাবী বলল। কিন্তু সময়ের সাথে দেখা গেল- নকলের সাফল্য টেকেনি, আর পরিশ্রমী মানুষটি ধীরে ধীরে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। 

এই গল্পগুলো আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। গল্প গুলো আমাদের শেখায়- সফলতা একদিনের অর্জন নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। সাময়িক লাভ, ক্ষমতা কিংবা বাহবা প্রকৃত সাফল্যের পরিচয় নয়। প্রকৃত সাফল্য গড়ে ওঠে সততা, পরিশ্রম, নৈতিকতা, ধৈর্য ও মানবিকতার ওপর ভর করে।

⠀⠀

⠀⠀

জীবনে দ্রুত সফল হওয়ার চেয়ে সঠিক পথে এগোনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জীবন এক নিরন্তর প্রবহমান ধারা। এই ধারার সামনে টিকে থাকার জন্যে সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও নৈতিকতা -এই চারটি স্তম্ভ শক্ত করে গড়তে হবে। আর এই স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। তাই কাউকে সফল বা ব্যর্থ বলার আগে একটু থামা উচিত। কারণ আমরা দেখি ঢেউয়ের তোড়, কিন্তু জানি না স্রোতের গতি। আর এই অদেখা স্রোতের কাছেই তো শেষ কথা বলার অধিকার থাকে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀



শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৬

ডায়েরির পাতা: মনের জ্যোৎস্না ও জ্বর



মৌসুমী ভৌমিকের গানটা আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল- "কেন শুধু শুধু ছুটে চলা, একে একে কথা বলা, নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে.."। গানটা কেমন যেন আজকের দিনগুলোর মুখপাত্র হয়ে উঠেছে। শব্দগুলো শুধু সুর নয়, এখন আমার নিঃশ্বাসের অনুষঙ্গ।

দিনগুলি এখন হিসাবের বাইরে, বিচ্ছিন্ন পাথরের মতো যার যার মত ছড়িয়ে পড়ে আছে। গতকালের সকাল আর আজকের বিকালের মধ্যে কোনো সীমানা খুঁজে পাই না। দুই দিনকে আলাদা করার জন্য নতুন কোনো শব্দ নেই অভিধানে। প্রতিদিন একই জানালা, একই আলোছায়া, একই ঘড়ির কাঁটার দৌড়। বিরক্তির ভাঁজ কপালে জমে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়- এইটুকুই বা কম কী? সময় তো আরো ভাঙচুর করতে পারত, তবু কিছুটা শৃঙ্খলা এখনো টিকে আছে।

গত কয়েকদিন ধরে শরীর বিদ্রোহ করে চলেছে। একদিন তো জ্বর এসে সময়ের হিসাবই লোপাট করে দিল। চোখ মেললাম- সকাল, আবার মেললাম- দুপুর, আরেকবার- দেখলাম সন্ধ্যা ইতোমধ্যে বিদায় জানাচ্ছে। জ্বর যদিও সেরে গেছে, কিন্তু ছেড়ে গেছে গলা-ব্যথা আর তার নিষ্ঠুর সঙ্গী মাথা-ব্যথাকে। সঙ্গে সঙ্গ দেয়ার জন্যে রয়ে গেছে মৃদু কাশি- অতি পরিচিত শত্রু। কাশির স্মৃতি আমার জন্য সাবান পানিতে ভেজা চামড়ার মতো, পুরোনো এক অসুখের ছায়া মনে ভর করে। কখনো কখনো শরীর মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতি শুধু মনের নয়, দেহের কোষেও লেখা থাকে। 

আগে যা ভালো লাগত, এখন তা ধূসর মনে হয়। বইপত্র, গান, মুভি -সব যেন পানিতে ভেজা ধূসর কাগজের মতো নিষ্প্রাণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- শিশুদের দেখলে আগে যে হৃদয় গলে যেত, এখন সেখানে কোনো না কোনো জায়গায় একটি বিরক্তি দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ওদের কোলাহল থেকে দূরে থাকি, নিঃশব্দে থাকি। এই পরিবর্তনটাই বেশি ভয়ংকর -আগে যা জীবনকে স্পর্শ করত, আজ তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। 

ছুটি!
শব্দটা এখন প্রার্থনার সমার্থক। কিন্তু, এ ছুটি কেবল দৈনন্দিন রুটিন থেকে নয়, এ ছুটি এই অভ্যন্তরীণ নীরবতা থেকে, এই আবেগহীন প্রবাহ থেকে। কখনো কখনো জীবন থেকেই ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে জাগে, একটা দীর্ঘ, শান্ত নিদ্রার মতো। কিন্তু জীবনের প্রতি এক গভীর অনুক্ত মায়া, এখনো রয়ে গেছে। যেমন- একটা পুরোনো বাড়ি, যার দরজা-জানালা ভাঙছে, কিন্তু যার প্রতিটি ধূলিকণায় স্মৃতি লেগে আছে। তাই মায়াটাও এখনো রয়ে গেছে। 

জীবন কালের এই বয়সে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে, জীবন একইসাথে 'বোঝা' ও 'বরাদ্দ'। অনেকটা পাহাড়ের মাঝপথে উঠে পেছনে ফিরে তাকানোর মতো। নিচের পথটুকু পেরিয়েছি, কিন্তু শীর্ষ ছোঁয়া এখনও বহুদূর। আর শরীরে জমা হয়েছে ক্লান্তি। তবুও এগোতে হচ্ছে, কারণ নিচে নামার পথটা অসম্ভব দুর্গম। 

আজকের এই এলোমেলো ভাবনা গুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম; হয়তো এই শূন্যতা পূর্ণতারই আরেক রূপ। সময় হয়তো হৃদয়কে শূন্য করে তুলছে পরবর্তী কোনো গভীর অনুভবের জন্য জায়গা তৈরি করতে। জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর যেমন একটু বেশি সংবেদনশীল হয়, তেমনই হয়তো এই আত্মিক স্তব্ধতার পর কিছু দেখা বা বোঝার সূক্ষ্ম ক্ষমতা ফিরে আসবে। 

আজ শুধু এই কথাগুলোই লিখে রাখি, যেন এই মুহূর্তের ভার্চুয়াল সাক্ষী থাকে এই শব্দগুলো। হয়তো কোনো এক ভবিষ্যৎ দিনে ফিরে দেখব, এই শব্দগুলো পড়ব, আর তখন বোঝার চেষ্টা করব- যে ব্যক্তি এগুলো লিখেছিল, সে আসলে হারিয়ে যাচ্ছিল নাকি নতুন কোনো উপকূলের খোঁজ পেয়েছিল। 

জানালার বাইরে এখন রাত। দূরে কোনো বাড়ির জানালায় একটি বাতি জ্বলে আছে, এক টুকরো মানবিক উষ্ণতা। হয়তো জীবন আসলে এটাই- একটা অন্ধকারে জ্বলা বাতি খোঁজা, যে বাতি হয়তো অন্যের বারান্দায়, কিন্তু তার আলো আমাদের জানালাতেও পড়ে। আজকের মতো এটুকুই যথেষ্ট। আজ শুধু থাকব, আর শ্বাস নেব। এই অস্থির হৃদয় নিয়েই, এই অসুস্থ শরীর নিয়েই, এই স্তব্ধ সময় ধরেই। 

হয়তো, নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থই হলো- এই ভাঙাচোরা মুহূর্তগুলোকেও আস্তে আস্তে, একটু একটু করে, স্পর্শ করে যাওয়া...

বুধবার, জানুয়ারি ২৮, ২০২৬

মানুষ, প্রয়োজন আর অনুভূতির অদ্ভুত হিসাবঃ Rental Family


কিছু সিনেমা আমরা গল্পের টানে দেখি, কিছু দেখি অভিনেতার জন্য। Rental Family (2025) আমার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় দলে পড়লেও, সিনেমা শেষ করে উঠে দাঁড়ানোর সময় বুঝলাম- এটা শুধু একজন অভিনেতার কামব্যাক নয়, বরং মানুষের প্রয়োজন, শূন্যতা আর অনুভূতির এক গভীর পাঠ।


ব্রেন্ডন ফ্রেজার - এই নামটা আমার কাছে মানেই সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যুব পথে এগিয়ে যাওয়া বয়সের রোমাঞ্চ। The Mummy, Journey to the Center of the Earth - এই সিনেমাগুলোয় তার উপস্থিতি ছিল প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী, আলোয় ভরা। বহুদিন পর তার চেহারাটি পোস্টারে চোখে পড়তেই যেন পুরোনো স্মৃতি গুলো ঝলমল করে উঠলো, আর সেই টানেই বসে পড়েছিলাম "ভাড়া পরিবার" বা 'Rental Family' দেখতে। কিন্তু এবারের ব্রেন্ডন ফ্রেজার ছিলেন একেবারেই ভিন্ন একজন - নীরব, ভাঙা, ক্লান্ত এক মানুষ।

এই সিনেমার Philip চরিত্রটিকে দেখে বারবার মনে হয়েছে, সে যেন ব্রেন্ডন ফ্রেজারের বাস্তব জীবনেরই এক ছায়া। একসময় যিনি অভিনয় জগতে জনপ্রিয়তার শিখরে ছিলেন, আজ তার নামই যেন ভুলে যেতে বসেছে মানুষ। জীবনের দায়ে, টিকে থাকার তাগিদে সে অভিনয় করছে। কিন্তু সেটি কোনো মঞ্চে নয়, বরং মানুষের জীবনের ফাঁকা জায়গাগুলোতে। বাবা নেই এমন শিশুর ভাড়া করা বাবা, পরিবারের সামনে একজন নারীর পরিপূর্ণতা লাভে ভাড়াটে স্বামী - এ যেন অভিনয়েরও আরেক রূপ, যেখানে ক্যামেরা নেই, কিন্তু অনুভূতি আছে।

সিনেমাটি দেখতে দেখতে সবচেয়ে যে ভাবনাটি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছে, তা হলো- মানুষ কত বিচিত্র উপায়ে মানুষের প্রয়োজন পূরণ করে। সমাজের প্রতিটি শূন্যস্থান কেউ না কেউ এসে ভরাট করে দেয়। কেউ পেশার খাতিরে, কেউ বাঁচার তাগিদে, কেউ বা নিঃসঙ্গতা থেকে। Rental Family যেন সেই অদ্ভুত অথচ বাস্তব পৃথিবীর দরজাটা ধীরে খুলে দেয়, যেখানে ভালোবাসা ভাড়া নেওয়া যায়, পরিবার সাময়িক হয়, কিন্তু অনুভূতিগুলো অস্থায়ী হলেও মিথ্যে নয়।


Philip চরিত্রের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তটি আসে তখনই, যখন সে নিজের বহু কাঠখড় পুড়িয়ে পাওয়া একটি ডিটেকটিভ সিনেমার অফার ফিরিয়ে দেয়। এই শহর, এই দেশ ছেড়ে যেতে হবে- এই শর্তের সামনে দাঁড়িয়ে সে মনে করে ছোট্ট মেয়েটির কথা, যার বাবার ভূমিকায় অভিনয় করতে করতে সে নিজেই আবেগে জড়িয়ে পড়েছে। 


বাস্তবে কোনো সম্পর্ক নেই, কোনো রক্তের টান নেই - তবু সে মেয়েটিকে কথা দিয়েছিল, সে আর তাকে ছেড়ে যাবে না। এই দৃশ্যটি নিঃশব্দে বলে দেয়- অনুভূতির প্রতিশ্রুতি কখনো কখনো জীবনের লক্ষ্যকেও হার মানায়।


সিনেমার আরেকটি গভীরভাবে নাড়া দেওয়া চরিত্র Kikuo Hasegawa। একসময়ের বিখ্যাত অভিনেতা, আজ স্মৃতিভ্রমে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ। তার একটাই ইচ্ছা- শৈশবের বাড়ি, যৌবনের স্মৃতি, পরিবার নিয়ে কাটানো গ্রামের সেই নিবাসকে, সেই দিনগুলো আরেকবার দেখে আসা। কিন্তু বয়স আর রোগের দেয়ালে আটকে যায় সেই আকুতি। নিজের মেয়ের নিষেধ অগ্রাহ্য করে Philip-কে সঙ্গী করে সে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে। এই যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, বরং জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বটুকু ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা।


আর Shinji Tada, এই চরিত্রটি যেন সবচেয়ে নগ্ন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। মানসিক শান্তির জন্য সে ভাড়া করে নেয় স্ত্রী ও সন্তান। নিজের ভেতরের শূন্যতা ঢাকতে সে মিথ্যের আশ্রয় নেয়, কারণ তার কল্পনার পরিবার বাস্তবে নেই। তবু এই মিথ্যে সম্পর্কের মাঝেও তার বেঁচে থাকার লড়াইটা করুণভাবে সত্য।

Rental Family কোনো উচ্চকণ্ঠ সিনেমা নয়। এখানে নেই নাটকীয় সংলাপ, নেই বড়ো কোনো মোড়। কিন্তু প্রতিটি দৃশ্য নিঃশব্দে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- আমরা কি সত্যিই একা? নাকি প্রয়োজন আর অভিনয়ের মাঝামাঝি কোথাও আমাদের অনুভূতিগুলো সত্যি হয়ে ওঠে?


সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর মনে হয়েছে, এই গল্পটা শুধু পর্দার নয়- এটা আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। ভাড়ার সম্পর্ক, অভিনীত অনুভূতি, আর তার ভেতর জন্ম নেওয়া অপ্রত্যাশিত মানবিক বন্ধন- সব মিলিয়ে Rental Family এমন একটি সিনেমা, যা দেখে বেরিয়ে এসে মানুষ আর জীবনের দিকে নতুন করে তাকাতে ইচ্ছে করে।

যদি আপনি নীরব, মানবিক আর ভাবনার খোরাক দেওয়া সিনেমা পছন্দ করেন, তাহলে এই সিনেমাটি আপনার দেখার তালিকায় থাকতেই পারে।

মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

শব্দ আছে, কণ্ঠ নেই..


এই ছবিটা আমাদের রাজনীতির নীরব আত্মকথা
এখানে নেতা বলেন আর জনতা মুগ্ধ হয়
শব্দগুলো আলো জ্বালায়, আকাঙ্ক্ষার মানচিত্র আঁকে
মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে তালি পড়ে

রবিবার, আগস্ট ৩১, ২০২৫

Debian 13 Trixie ইন্সটলের পর করণীয়: Cinnamon ডেস্কটপের জন্য ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ গাইড

 


Debian, রক-সলিড ডিস্ট্রিবিউশন হিসেবে যার খ্যাতি বিশ্বজোড়া, সম্প্রতি মুক্তি দিয়েছে তাদের নতুন সংস্করণ Debian 13 “Trixie”। এই রিলিজে যুক্ত হয়েছে নতুন হার্ডওয়্যার সাপোর্ট, প্রায় ৭০ হাজার নতুন ও আপডেটেড প্যাকেজ, নিরাপত্তায় আরও উন্নয়ন, এবং প্রথমবারের মতো 64-bit RISC-V আর্কিটেকচার সাপোর্ট। পাশাপাশি ডেক্সটপ এনভায়রনমেন্টগুলোর নতুন সংস্করণ— GNOME 48, KDE Plasma 6.3, LXDE 13, LXQt 2.1.0 এবং Xfce 4.20—ব্যবহারকারীদের জন্য আরও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে।

সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো non-free-firmware রিপোজিটরি এখন ডিফল্টভাবে সক্রিয় থাকে, ফলে Wi-Fi, Bluetooth ও গ্রাফিক্স কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রাইভার ইন্সটল আরও সহজ হয়েছে।

এইবার আমি আমার ডেক্সটপ এনভায়রনমেন্ট হিসেবে বেছে নিয়েছি Cinnamon। এর সহজবোধ্য ইন্টারফেস, আধুনিক ফিচার, হালকা রিসোর্স ব্যবহার এবং কাস্টমাইজেশনের স্বাধীনতা এটিকে সত্যিই ব্যবহারযোগ্য করে তুলেছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে Windows ব্যবহার করেছেন, তাদের জন্য Cinnamon হতে পারে একদম পরিচিত-স্বাচ্ছন্দ্যময় ডেস্কটপ পরিবেশ।

এই পোস্টে আমি দেখাবো Debian 13 Cinnamon ইন্সটলের পর করণীয় ধাপে ধাপে কাজগুলো, যা করলে সিস্টেম হবে আরও সম্পূর্ণ, কার্যকরী ও দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী।

Debian 13 Trixie কে Cinnamon ডেক্সটপ সহ ইন্সটলের পর ডেক্সটপ এর Menu হতে Terminal টি চালু করে নিন। এরপর নিচের ধাপে থাকা কমান্ড গুলো ব্যবহার করুন।


◈ সিস্টেম আপডেট করা

ইন্সটলেশনের পর প্রথমেই সিস্টেম আপডেট করা জরুরি, যাতে সর্বশেষ নিরাপত্তা আপডেট ও সফটওয়্যার পাওয়া যায়।

sudo apt update && sudo apt install -y netselect-apt && sudo netselect-apt && sudo apt full-upgrade -y
sudo apt autoremove --purge -y

এই কমান্ড দুটো সিস্টেমকে আপডেট করবে এবং অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজ মুছে ফেলবে।


◈ Non-Free Firmware সক্রিয় করা

নতুন Debian রিলিজে non-free-firmware রিপোজিটরি সহজে সক্রিয় করা যায়, যা বিভিন্ন প্রাইভেট হার্ডওয়্যার ড্রাইভারের জন্য জরুরি।

sudo sed -i 's/main$/main contrib non-free-firmware/' /etc/apt/sources.list
sudo sed -i 's/main contrib$/main contrib non-free-firmware/' /etc/apt/sources.list
sudo apt update


◈ Firmware ইন্সটল করা

এটি Intel/AMD এর মাইক্রোকোডসহ প্রয়োজনীয় ফার্মওয়্যার ইন্সটল করবে, যা সিস্টেমের স্থায়িত্ব ও হার্ডওয়্যার কম্প্যাটিবিলিটি বাড়াবে।

sudo apt install -y firmware-linux firmware-linux-nonfree firmware-misc-nonfree dkms linux-headers-$(uname -r) intel-microcode amd64-microcode mesa-utils


◈ প্রয়োজনীয় টুলস ও সফটওয়্যার ইন্সটল করা

এই ধাপে সিস্টেমের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু টুল ও সফটওয়্যার ইন্সটল করা হবে।

sudo apt install -y curl wget git build-essential gnome-software synaptic gdebi gparted gnome-disk-utility libfuse2


◈ অফিস, মাল্টিমিডিয়া ও গ্রাফিক্স অ্যাপ সহ আরও কিছু প্রয়োজনীয় এ্যাপ ইন্সটল করা

sudo apt install -y libreoffice libreoffice-impress libreoffice-writer libreoffice-calc celluloid rhythmbox gimp gimp-data gimp-data-extras inkscape bleachbit gedit gedit-plugins gedit-plugins-common nala p7zip p7zip-full unzip


◈ মাল্টিমিডিয়া কোডেক ও প্লেয়ার ইন্সটল করা

Deb-Multimedia রিপো যোগ করে VLC, FFmpeg, Audacious, HandBrake ও kodi ইন্সটল করা হয়, যাতে সব ধরনের অডিও-ভিডিও ফরম্যাট চালানো যায়।

sudo wget -qO /tmp/dmo-keyring.deb https://www.deb-multimedia.org/pool/main/d/deb-multimedia-keyring/deb-multimedia-keyring_2024.9.1_all.deb && sudo dpkg -i /tmp/dmo-keyring.deb && echo "Types: deb\nURIs: https://www.deb-multimedia.org\nSuites: trixie\nComponents: main non-free\nSigned-By: /usr/share/keyrings/deb-multimedia-keyring.pgp\nEnabled: yes" | sudo tee /etc/apt/sources.list.d/dmo.sources >/dev/null

sudo apt update && sudo apt install -y vlc ffmpeg libavcodec-extra libdvdcss2 gstreamer1.0-plugins-bad gstreamer1.0-plugins-ugly audacious audacious-plugins handbrake-gtk kodi


◈ LocalSend (ক্রস-প্লাটফর্ম ফাইল শেয়ার অ্যাপ) ইন্সটল করা

wget -O localsend.deb https://github.com/localsend/localsend/releases/download/v1.17.0/LocalSend-1.17.0-linux-x86-64.deb;dpkg -i localsend.deb
rm -rf localsend*.deb


◈ লগইন স্ক্রিন কাস্টমাইজ/টুইক করা

sudo grep -q '^greeter-hide-users=' /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_debian.conf && sudo sed -i 's/^greeter-hide-users=.*/greeter-hide-users=false/' /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_debian.conf || echo "greeter-hide-users=false" | sudo tee -a /usr/share/lightdm/lightdm.conf.d/01_debian.conf


◈ Cinnamon এর জন্য থিম ইন্সটল

wget http://packages.linuxmint.com/pool/main/m/mint-themes/mint-themes_1.8.3_all.deb
wget http://packages.linuxmint.com/pool/main/m/mint-x-icons/mint-x-icons_1.5.3_all.deb
sudo apt install -y mint-y-icons
sudo dpkg -i *.deb
rm -rf mint-*.deb


◈ তারিখ ও সময় সেটিংস পরিবর্তন করা

নেটওয়ার্ক থেকে বাংলাদেশের জন্যে সময় ও তারিখ ঠিক করা ও ১২-ঘন্টার ঘড়িকে ডিফল্ট করা

timedatectl set-timezone Asia/Dhaka
timedatectl set-ntp true
gsettings set org.cinnamon.desktop.interface clock-show-date true
gsettings set org.cinnamon.desktop.interface clock-use-24h false


◈ বাংলা ফন্ট সাপোর্ট

এই ধাপে প্রয়োজনীয় বাংলা ফন্ট গুলো ইন্সটল করা হবে, আর বাংলা লেখাকে সুন্দর দেখানোর জন্য সিস্টেমে বাংলা ফন্ট সেট করা হবে

sudo apt install -y fonts-noto fonts-noto-color-emoji fonts-noto-extra fonts-noto-unhinted
sudo cd /tmp;wget --no-check-certificate https://github.com/r-not/unibnfonts/archive/master.tar.gz -O ubf.tar.gz;sudo tar -xvf ubf.tar.gz -C /usr/share/fonts/;rm ubf.tar.gz
cd /tmp;wget --no-check-certificate https://raw.githubusercontent.com/r-not/MyLinuxConfFiles/refs/heads/master/Common-Configs/bn-font-set.sh -O bn-font
set.sh;sh ./bn-font-set.sh


◈ ব্রাউজার ইন্সটলেশন

Debian এর সাথে ডিফল্ট ভাবে Firefix-ESR সংস্করণ দেয়া থাকে। আমরা এখানে এই সংস্করণটি বাদ দিয়ে ফায়ারফক্সের রেগুলার সংস্করণ ইন্সটল করব। একই সাথে Cromium ব্রাউজার ও Brave ব্রাউজারটি ইন্সটল করব।

sudo apt remove --purge -y firefox-esr*
sudo install -d -m 0755 /etc/apt/keyrings
wget -q https://packages.mozilla.org/apt/repo-signing-key.gpg -O- | sudo tee /etc/apt/keyrings/packages.mozilla.org.asc > /dev/null
gpg -n -q --import --import-options import-show /etc/apt/keyrings/packages.mozilla.org.asc | awk '/pub/{getline; gsub(/^ +| +$/,""); if($0 == "35BAA0B33E9EB396F59CA838C0BA5CE6DC6315A3") print "\nThe key fingerprint matches ("$0").\n"; else print "\nVerification failed: the fingerprint ("$0") does not match the expected one.\n"}'
FILE="/etc/apt/sources.list.d/mozilla.list"
LINE='deb [signed-by=/etc/apt/keyrings/packages.mozilla.org.asc] https://packages.mozilla.org/apt mozilla main'
sudo touch "$FILE"
grep -qxF "$LINE" "$FILE" || echo "$LINE" | sudo tee -a "$FILE" > /dev/null
echo '
Package: *
Pin: origin packages.mozilla.org
Pin-Priority: 1000
' | sudo tee /etc/apt/preferences.d/mozilla
sudo apt update && sudo apt install -y firefox firefox-l10n-bn chromium
curl -fsS https://dl.brave.com/install.sh | sh


◈ পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট টুল ইন্সটল করা

ল্যাপটপে যারা ব্যাটারি পার্ফোমেন্স নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন তারা এই কমান্ড দুটো ব্যবহার করে দেখতে পারেন। এই ধাপে বহুল পরিচিত পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট টুল tlp ইন্সটল করে তা সক্রিয় করে দেয়া হবে।

sudo apt install -y tlp tlp-rdw
sudo systemctl enable tlp


◈ সিস্টেম ব্যাকআপ/রেসকিউ টুল (Timeshift) ইন্সটল করা

এই ব্যাকআপ টুলটি দারুণ কার্যকর। যারা ইতোমধ্যে ব্যবহার করেছে তারা এর কার্যক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা রাখে। সহজ করে বললে, এটি দিয়ে একটি ব্যাকআপ রাখা থাকলে আপার সিস্টেম ক্রাশ করা অবস্থা থেকে পুনরায় ফাংশনাল অবস্থায় ফেরত যেতে পারবেন নিমিষেই।

sudo apt install -y timeshift


◈ Flatpak সাপোর্ট চালু করা

নিচের কমান্ড দুটো ব্যবহার করে লিনাক্স জগতের জনপ্রিয় প্যাকেজ ফরম্যাট Flatpak এর সাপোর্ট সক্রিয় করা হবে। সাথে ইন্সটল হবে ফ্লাটপ্যাক এ্যাপ খোজার জন্যে এ্যাপস্টোর

sudo apt install -y flatpak gnome-software-plugin-flatpak
flatpak remote-add --if-not-exists flathub https://flathub.org/repo/flathub.flatpakrepo‌


◈ ফায়ারওয়াল

সবশেষে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে জোড়দার করতে ইন্সটল ও সক্রিয় করে নিন Firewall প্রোগ্রাম

apt install -y ufw gufw
sudo ufw status | grep -q "Status: active" || { sudo ufw --force enable && sudo systemctl enable --now ufw; }

 

 

এবার সিস্টেমটিকে একবার রিস্টার্ট করুন সকল পরিবর্তন গুলো সক্রিয় করার জন্য। তারপর আপনার পছন্দসই একটি থিম বেছে নিন Menu > Themes হতে।


◈ চলুন সহজে করি!!

যারা এত লম্বা ধাপ গুলো দেখে বিরক্ত হচ্ছেন, অথবা ঝামেলা মনে হচ্ছে তাদের জন্যে কাজটি সহজ করার জন্যে একটি স্ক্রিপ্ট লেখা হয়েছে। আপনি চাইলে এই সম্পূর্ণ কাজটি শুধুমাত্র নিচের কমান্ডটি ব্যবহার করে করতে পারেন।

wget https://shorturl.at/gZxeE -O deb13PIS.sh;sh ./deb13PIS.sh


Debian 13 Cinnamon Post Install Guide with Essential Tweaks
 

আপাতত এখানেই শেষ করছি। লেখায় অথবা কমান্ড গুলোতে ভুল থাকা স্বাভাবিক। আমার নজরে পড়লে সংশোধন করে দেয়ার চেষ্টা করব। পাশাপাশি কমান্ডগুলো ব্যবহার করতে গিয়ে আপনার কোথায় সমস্যা হয়েছে তা জানালে তা সমাধান করা অথবা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন গুলো করে নেয়া সহজ হবে। এই পুরো ব্যাপারটি সাজানো হয়েছে একজন (আমার নিজের) ব্যবহারকারীর প্রয়োজন ও পছন্দের উপর ভিত্তি করে। কিছু অংশ অথবা হয়ত পুরো প্রকৃয়াটিই হয়ত আপনার জন্য অপ্রাসঙ্গিক। তাই অনুরোধ থাকবে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়ে প্রয়োজনীয় অংশটি ব্যবহার করে দেখবার জন্য।


লিনাক্সের গ্যালাক্সিতে ডেবিয়ানকে নিয়ে আপনার জার্নি হয়ে উঠুক আনন্দময়।


সোমবার, আগস্ট ২৫, ২০২৫

ডায়েরিঃ আগস্ট ২৫, ২০২৫ঈ ॥ ১০১ দিন

পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে চলছে। সূর্য ওঠছে, আবার নিয়ম মেনে অস্ত যাচ্ছে; রাত নামছে, ফের ভোর আসছে; মানুষ আসছে-যাচ্ছে, বাঁচছে-মরছে; সবকিছু আগের মতোই চলছে। কিন্তু আমার কাছে পৃথিবীর রূপ আর আগের মতো নেই। পৃথিবীটাকে আমি আর আগের চোখে দেখতে পারি না। কারণ এই পৃথিবীতে জীবনধারণের ধরণ বদলে গেছে। সম্পর্কের ধরন পাল্টে গেছে, বিশ্বাসের ভিত্তি নড়ে গেছে, আর ভরসার জায়গাগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে।


আমি ভেবেছিলাম- কষ্ট গুলো ধীরে ধীরে মুছে যায়, সময়ের সাথে সাথে ক্ষতস্থান শুকিয়ে আসে। কিন্তু বাস্তবতা আমাকে অন্য শিক্ষা দিয়েছে। কষ্ট আসলে কখনোই মুছে যায় না, ম্লান হয়ে বিবর্ণও হয় না; বরং সময় তাকে আরও প্রকট ভাবে দৃশ্যমান করে তোলে। যত দিন যায়, কষ্ট তত গভীরভাবে হৃদয়ে গেঁথে বসে। ক্ষণিকের আঘাত সময়ের প্রবাহে গাঢ় ক্ষতচিহ্নে পরিণত হয়, আর সেই দাগ চিরস্থায়ী হয়ে যায়।


মানুষের প্রতি বিশ্বাস, ভরসা আর সম্মান- যা একসময় আমার কাছে অবিচল সত্য মনে হয়েছিল; এখন ক্রমেই ক্ষয়ে যাচ্ছে। জীবনের অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, মানুষকে সহজভাবে বিশ্বাস করা ছিল মস্ত ভুলের একটি। আমি যাদের কাছে আদর্শ খুঁজি, যাদের চোখে সাধুতা দেখি, তাদের ভেতরে আসলে এমন কিছু নেই। সবাই প্রয়োজনের খাতিরে সাধু হয়, আর প্রয়োজন ফুরোলেই সাধু ভং ধরা মুখোশটা খুলে কুটিলতায় ভরা প্রকৃত মুখটি প্রকাশ পায়। মানুষের এই দ্বিমুখী চরিত্র এত কাছ থেকে না দেখলে হয়ত কখনো বিশ্বাস করতাম না।


এই অল্প কয়েকদিনে জীবনের আরেকটি কঠিন সত্যও উপলব্ধি করেছি। যে সকল মানুষের হৃদয়ের ভেতর কুটিলতা ভর করেছে, যার হৃদয় কালশিটে ময়লা পড়ে পচে গেছে, যার চিন্তাধারায় কুটিলতা আর অনিষ্ট ছাড়া ভিন্ন কিছু কাজ করে না; তার সাথে আপনি যতই ভালো ব্যবহার করেন না কেন, যতই ধৈর্য ধারে সহ্য করে সমস্যার সমাধান খুঁজতে চান না কেন, কোনো লাভ নেই। তাদের স্বভাব পাল্টায় না, পাল্টাবার নয়। এদের মোহর লাগানো হৃদয়ের কথাই ওপরওয়ালা আমাদের বলেছেন, বিধাতার হুকুম ছাড়া এই মোহর আর কখনোই পরিষ্কার হবে না। বরং এই কুটিলতায় পূর্ণ নরকের কীট গুলো খুঁজে খুঁজে আপনার দুর্বলতা খুঁজে বের করে আপনাকে আরও গভীর সমস্যায় ফেলে দেবে।


আমার শূন্য হয়ে পড়া পৃথিবীটার বয়স আজ ১০১ দিন। ঠিক ১০০ দিন পূর্বে আমার আম্মা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে আপন শান্ত পরিবেশ খুঁজে নিয়েছেন। দিন হিসেবে ১০০ দিন খুব নগণ্য হলেও এই ১০০ দিনের পৃথিবী আমাকে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে, যেখানে নেই মায়ের মমতা, নেই সেই নির্ভরতার ছায়া। আছে কেবল ভান করা মায়া, সমাজের সামনে যাত্রা-নাটক প্রদর্শন করার মতো ভদ্রতা, আর স্বার্থের ফাঁদে জড়িয়ে থাকা সম্পর্ক। এই ১০০ দিনেই ‘পরিচিত’ আর ‘কাছের’ নামধারী সম্পর্ক গুলো চোখের পলকেই গিরগিটির মত রঙ বদলে নিয়েছে।


আমি কখনো ভাবিনি আম্মা আমাদের এত দ্রুত ছেড়ে চলে যাবেন। আমি ভেবেছিলাম আম্মা অন্তত আরও বিশটি বছর আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তাঁর ছায়াশীতল মমতা আমাদের আগলে রাখবে, আমাদের আঁচল ভরসার আকাশ হয়ে থাকবে মাথার উপরে। কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু থেমে গেল। যে মানুষটিকে ভরসার স্তম্ভ ভেবেছিলাম, তিনি হঠাৎ করেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। আর তার অনুপস্থিতি আমার হৃদয়ে এক বিশাল অবিশ্বাসের দেয়াল তুলে দিল।


আজ মনে হয়, ছোটবেলা থেকে যে মূল্যবোধের শিক্ষা পেয়েছিলাম, সেগুলো আসলে বাস্তব জীবনে অকার্যকর। সততা, নীতিকথা, সত্য-বচন- এসব আঁকড়ে ধরে আমি শুধু পিছিয়েই পড়েছি। আর চারপাশের মানুষগুলো নিজেদের স্বার্থের জন্য কোনোকিছু করতে দ্বিধা করেনি। এই ১০০ দিনে আমি দেখেছি রক্তের সম্পর্কও কেমন করে বিশ্বাসঘাতক হয়ে যায়। যাদের একসময় নিজের বলতে শিখেছিলাম, যাদের আপন ভেবে স্বস্তি আর মনের তৃপ্তি বুঝে নিতাম; তারাই স্বার্থ হাসিলে বেইমান হয়ে উঠেছে। মানুষ যে এতটা স্বার্থপর হতে পারে, এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, এত বড় মাপের নিমকহারাম হতে পারে; এমন করে না দেখলে কখনোই বিশ্বাস করতাম না।


সব আক্ষেপ, সব হতাশা, সব কষ্ট আর সব বেদনার শেষে আমার একমাত্র প্রার্থনা- মহান আল্লাহ যেন আমার আম্মাকে পরিপূর্ণ শান্তি দান করেন। তিনি যেন হাসরের ময়দানে আম্মাকে হাউজে কাউসারের শীতল পানীয় দিয়ে তৃষ্ণা নিবারণ করান। আর জান্নাতুল ফেরদৌসকে আম্মার জন্যে স্থায়ী আবাস হিসেবে ঘোষণা করে দেন।


আমার জীবন আজ শূন্যতায় ভরা। কিন্তু সেই শূন্যতার ভেতরও আমি মায়ের শান্তির জন্য হৃদয়ের অন্তঃস্থল হতে দোয়া করি। কারণ আমার সমস্ত বিশ্বাস, ভরসা আর আশ্রয় এক মানুষেই ছিল- আমার আম্মা। আর আজ তিনি নেই… ১০১ দিন।

সোমবার, আগস্ট ১৮, ২০২৫

একদিন ঠিক হারাবো গিয়ে বনে…

 

⠀⠀⠀⠀

প্রায়ই আমার এই শহরের ভিড় থেকে পালাতে ইচ্ছা করে। 

এই যে অলিগলি রাস্তা জুড়ে হাজর মানুষের হাঁটা-চলা, যান্ত্রিক জীবনের অনবরত শব্দ; এসবের মাঝে নিজেকে আমার দারুণ বন্দী মনে হয়। যদিও খেয়ে-পড়ে বেঁচে থাকার জন্যই এই শহর জীবন, কিন্তু সে তো আমাকে মুক্ত ভাবে শ্বাস নিতে দেয় না। কংক্রিটের এই জঙ্গলে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন মনে হয়, আমি ভুলে যাচ্ছি মুক্ত জীবনের স্বাদ।

হয়ত এই কারণেই মনে মনে ইচ্ছে হয় কোন এক হাঁটা-পা এর রাস্তা ধরে অচেনা কোন গহিন বনে হারাতে। আঁকাবাঁকা পথ, পাতায় ঢাকা, রঙে রঙে মোড়া পথ, কোলাহল বিহীন সেই পথে হেঁটে বেড়াতে। সেই বন আর বনের পথটি হবে একান্তই আমার নিজের।

শহরে বুকে কখনো যে গন্ধ মিলে না, সেই গন্ধে ভরে থাকবে আমার সেই বুনো পথ। মাটির কাঁচা গন্ধ, ঝড়া পাতার অচেনা সুরভি, আর হয়ত কোন অদৃশ্য ফুলের মৃদু সুবাস। সেখানে শ্বাস নিতে গিয়ে মনে হবে- আমি বেঁচে আছি, সত্যিই বেঁচে আছি। শহরের ধোঁয়া, গ্যাস, বর্জ্য কিংবা কৃত্রিম সুবাস এই সবই সেখানে থাকবে কেবলই এক দুঃস্বপ্ন হয়ে।

বনের গভীর নিস্তব্ধতাকে আগলে নেবো নিজের অস্তিত্বের সাথে। সেখানে থাকবে না এলোমেলো ব্যস্ত পদচারণা, থাকবে না কুৎসিত হর্ন, থাকবে না ট্র্যাফিক জ্যাম, থাকবে না পিচের গরম। থাকবে কেবল পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দ, থাকবে শুকনো পাতার উপর দিয়ে দৌড়ে যাওয়া অচেনা কোন প্রাণীর পদচারণা, থাকবে বাতাসের ফিস‍্‍‍ফিসানি আর থাকবে অন্তর জুড়ানো গাছের ছায়া। এই সবই প্রকৃতির আপন স্পর্শ, এগুলোই পৃথিবীর আসল ভাষা; যা আমরা ভুলে গেছি এই কোলাহলে মত্ত হয়ে। 

ফ্লুরোসেন্টের আলোর নিচে বসে এখন আমি এক অন্ধকার পৃথিবী দেখি। এই আলো হৃদয়ের গহিন কোণকে আলোকিত করতে পারে না। অথচ আমার সেই অরণ্যে খেলা করে বিস্ময়ের আলো নিয়ে। পাতার ফাঁক গলে যখন সূর্যের আলো যখন মাটির গায়ে পড়ে, মনে হয় যেন ছোট ছোট আলোর কণা মিছিল করছে সেখানে। আবার মাঝে মাঝে আলোর রশ্মি গুলো এমন এক বিভ্রম তৈরি করে, যেন মনে হয় সেখানে রয়েছে এক আলোর ঝলমলে দেয়াল। দেয়ালের ওপারে রয়েছে অন্য এক জগৎ, যেখানে নেই কোন দায়িত্ব, নেই কোন দৌড়ঝাঁপ, নেই কোন একঘেয়েমি। শুধু শান্তি- নির্মল, অনাবিল শান্তির বাস সেখানে।

এই যে শহরজুড়ে গায়ের সাথে গা ঘেঁষে তৈরি হয়েছে আকাশছোঁয়া দালানের জঞ্জাল। একের পর এক বিল্ডিং, যার জানালা দিয়ে নিচে তাকালে কেবল দেখা মেলে ছুটে চলা শহর, ধুলো, কালো ধোঁয়া আর মেকি জীবনের দৌড়ঝাঁপ। এখানকার প্রতিটি দালান, প্রতিটি ফ্ল্যাট, প্রতিটি খোপ-খোপ রুম যেন এক একটি কারাগার। জীবনের মায়ায় অন্ধ হওয়ার দোষে সবাইকে সেই কারাগার যাপনের আদেশ দেয়া হয়েছে এখানে। অথচ আমার বনে প্রতিটি গাছই জানালা, প্রতিটি পথ মুক্তির, আর বহমান বাতাসে বাজে জীবনের সুর।

আমার ভেতরের আমিটা বারবার বলে উঠে- “বারবার হারিয়ে যাও তোমার আরণ্যের গভীর থেকে গভীরে; ক্লান্তি ঘিরে ফেলার আগ পর্যন্ত হেঁটে বেড়াও আঁকাবাঁকা পথটি ধরে।” হয়ত কোনো একদিন সত্যিই সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাবো। খুঁজে বের করবো আমার সেই প্রিয় বনটিকে অজানা কোন প্রান্তে। যেখানে আমার সাথে থাকবে কেবল ‘আমি’। গাছ, পাখি, পো‌ঁকা আর মাটি -সবাই মিলে ঘুচিয়ে দিবে আমার হৃদয়ের অসীম নিঃসঙ্গতা। 

⠀⠀⠀⠀

তখন আর আমি এই শহুরে মানুষ থাকবো না; আমি হবো বনের সন্তান… 

⠀⠀⠀⠀

⠀⠀⠀⠀

⠀⠀⠀⠀

ছবি-সূত্রঃ u/myriyevskyy

শনিবার, আগস্ট ১৬, ২০২৫

তুমি তো আমাকে চেনো…

 


প্রথম ভাগঃ প্রারম্ভিকা

জানোই তো, ঘুম হল এক ধরনের প্রতারণা। ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নিতে তুমি চোখটা বন্ধ কর, ধীরে ধীরে তোমার শরীর শিথিল হতে শুরু করে। হৃৎস্পন্দন কমে আসে, কমে আসে শরীরের তাপমাত্রা। তুমি তখন নিজেকে নিরাপদ ভেবে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমাতে শুরু কর। 

আর ঠিক সেই সময়টাতেই তোমার বুকের উপর এমন কিছু একটা উঠে বসে, যার অস্তিত্বের কথা তোমার জানা নেই!

তবে আমি জানি, কারণ আমি তো সেটা দেখেছি।

আচ্ছা চল, তোমাকে আমার ঘটনাটা বলি, তাহলেই তুমি বুঝতে পারবে আমি কীসের কথা বলছি।

প্রথম রাতে আমি শুধু একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। শব্দটা মৃদু হলেও তার তীক্ষ্ম একটা অনুভূতি আমাকে ছুঁয়ে দিয়েছিল। নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল সেটি। অন্ধকারে, ঠিক আমার বিছানার কোণ থেকে শব্দটা হয়েছিল। কেমন একটা ঠান্ডা, গভীর, লম্বা একটা টান। আমি ভেবেছিলাম মনের ধোঁকা হয়তো, এত রাতে একা ঘরে কার নিঃশ্বাসের শব্দ হবে!

দ্বিতীয় রাতেও আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল, খুব অস্বস্তি লাগছিল। ওটা তখন আমার বুকের উপর বসে আছে। নড়তে পারছিলাম না, শ্বাসও নিতে পারছিলাম না। শুধু অনুভব করছিলাম সেই ঠান্ডা নিঃশ্বাসের মতই- ঠান্ডা, ভেজা হাতটি গলার চেপে ধরে আছে। চাপটা খুব অদ্ভুত, না শক্ত - না নরম; তবে ততটাই, যতটা থাকলে পরে তোমাকে আতঙ্ক আঁকড়ে ধরে।

দিনের আলোতে এই কথাগুলো নিজের কাছেই হাস্যকর লাগছিল। বিশ্বাস কর, মাকে গিয়ে যে কথা গুলো বলব, আমার তো নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল ছ’বছরের বাচ্চারা রাতে স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়ে যা করে, আমিও তেমন করছি।

তৃতীয় রাতেও আমি সেই ঠান্ডা হাতের অনুভব পেলাম। আমি ঠিক-ঠিক গুনে ফেললাম- সেখানে মোট ছ’টা আঙ্গুল আছে। তিনটা বামে, আর তিনটা ডানে। বরফ শীতল আঙ্গুলগুলো যেন গলার চামড়া ফুড়ে মেরুদন্ড ছুঁয়ে দিতে চাইছে!

তারপর, চতুর্থ রাত, আমি বুঝলাম ও আমাকে ডাকছে। ওকে আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু ওর কণ্ঠটা যেন আমার মস্তিষ্কের ভেতর ভেসে বেড়াচ্ছে। বলছে- ‘তুমি তো আমাকে চেনো….’

পরদিন সকালে মা আমাকে ডাকতে এসে দেখলেন, আমি চুপচাপ শুয়ে আছি। ডাক্তার বলল- ‘হার্ট অ্যাটাক’। সবাই সেটা বিশ্বাসও করে নিল। অথচ, আমি সেখানেই ছিলাম, আয়নাটার সামনে। যেখান থেকে আমি সেই ছায়াটাকে ধীরে ধীরে সরে যেতে দেখছিলাম, আর তার দৃষ্টি ছিল… থাক সে কথা।

⠀⠀⠀

এর ক'দিন বাদেই ওরা সবাই বাড়িটা খালি করে কোথায় যেন চলে যায়। আমি ওদের দেখেছি, ওরা ঘরের আসবাবপত্র বের করছে, সামানা গোছাচ্ছে, ভ্যানে ভরছে। কিন্তু ওরা আমাকে দেখে না। জানালা দিয়ে আমি কেবল ওদের চলে যাওয়াটুকুই দেখলাম। এরপর থেকেই আমি একা, একদম একা।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

দ্বিতীয় ভাগঃ বাড়ির নতুন বাসিন্দা...

শহর ছেড়ে এই গ্রামে এসেছি দিন দশেক হয়েছে। একটা প্রজেক্ট চলছে এখানে, আরও কয়েক মাস চলবে। প্রথম কয়েকদিন তো এখানকার কাজ-কর্মের কোন আগা-মাথা বুঝে পাচ্ছিলাম না। সবই চলছে নিয়ম মাফিক, আবার সবই এলোমেলো। সে সব গোছাতেই চলে গেছে এই কয়েকদিন। হেড অফিস থেকে জানাল, তারা এখানে নতুন কাউকে পোস্টিং দিবে বলে ভাবছে। তবে সেটা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমাকে একটু কাজগুলো গুছিয়ে দিতে বলল।

শহরের বাইরে আমার তেমন করে কখনো থাকা হয়নি। এখন এই কাজের কারণে না আসলে হয়ত এভাবে এতদিনের জন্যে আসা হতো না। শহরেই জন্ম, বেড়ে উঠা, আর শহরেই জীবনটার ইতি হতো। সারাদিন ভালোই কাটে, কাজের ব্যস্ততায়, সাইট ঘুরে দেখে। কিন্তু বিকেলের পর আর সময় কাটতে চায় না। তার উপর এমন একটা জায়গায় থাকবার ব্যবস্থা হয়েছে! ছোট একটা একতলা বাড়ি, একদম গ্রামের সীমান্ত ঘেঁষে। বাড়িটা অফিসের, এখানে তারা অন্য একটা প্রজেক্টের জন্য জমি কিনার সময় খুব কম দামে পেয়ে যায়, তাই কিনে নেয়। কারও থাকার উদ্দেশ্য না হলেও এখন এই প্রজেক্টের জন্যে আমার থাকার জায়গা হয়েছে।

ছিমছাম শান্ত পরিবেশ ঘেরা, ঝুপ করে সন্ধ্যা নামার পর নাম না জানা পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। এখানকার ম্যানেজার প্রথমে তার বাসাতেই থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আমার কারও বাসায় এভাবে থাকাটা পছন্দ হচ্ছিল না, তাই সেটা বাতিল করেছিলাম। এরপর তিনি একপ্রকার জোড় করেই খাবারের ব্যবস্থাটা নিজের ঘাড়ে নিয়ে নিলেন। এখন টিফিন কেরিয়ারে করে সন্ধ্যার পরপর খাবার চলে আসে তার বাড়ি থেকে। তবে এক ফাঁকে তিনি আমাকে জানালেন, এই বাড়িটার ব্যাপারে কিছু আজেবাজে কথা শোনা যায়। যদিও বিশ্বাস করার মত তেমন কোনো ভিত্তি নেই। তারপরও রাতে বাড়ি থেকে বের হতে বারণ করলেন। আর কোনো সমস্যা হলে যত রাতই হোক, তাকে যেন নির্দ্বিধায় ফোন করে জানাই -সে আশ্বাস আদায় করে নিলেন।

দিনভর দৌড়োদৌড়ির পর শান্ত পরিবেশ আর পেট পুরে খানা পেয়ে এখন ঘুমও চলে আসে দ্রুত। বড় জোড় রাত ১০টা পর্যন্ত জাগে থাকতে পারি, তারপর টুপ করে ঘুম ধরে বসে। অবশ্য আমিও যে খুব জেগে থাকতে চাই, তা না। সকাল সকাল খুব ফ্রেশ একটা ভাব চলে আসে এত লম্বা ঘুম পেয়ে। দিনের ক্লান্তিটা তখন আর তেমন গায়ে লাগে না।

এগারো তম রাতে হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কেমন একটা অস্বস্তি লাগছিল, ঠিক বোঝানোর মত না। কেমন যেন একটা অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এসেছে। জানালার ফাঁকা দিয়ে ফ্যাকাশে চাঁদের আলো এসে বিছানার একপাশে থেমে আছে। মনে হচ্ছে যেন সময়টাও আটকে গেছে। অস্বস্তিটা আমাকে এমনভাবে ঘিরে ধরেছে যে, উঠে বসে টেবিল থেকে মোবাইল বা ঘড়িটা পর্যন্ত নিতে ইচ্ছে হলো না। বেশ অনেকটা সময় পর হঠাৎ করেই সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। যেন কেউ রিমোট থেকে প্লে বাটনে চাপ দেয়ার সাথে সাথেই সব আগের মতই চলতে শুরু করেছে। অস্বস্তিটাও কেটে গেল প্রায় সাথে সাথেই। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি আবার ঘুমের সাগরে ডুবে গেলাম।

পরদিন আর এটা নিয়ে তেমন কিছুই মনে থাকলো না। সাইট ঘুরে কাজ দেখতে দেখতে দিন কেটে গেল।

সমস্যাটা হলো আবার রাতে। গতদিনের মতই ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ঠিক ভেঙ্গে গেল কিনা সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারছিলাম না। যেন ঘুমের গভীর কোন স্তরে ডুবে আছি, কোন নড়াচড়া কিংবা সাড়াশব্দ কিচ্ছু নেই। কেবল একটা চাপা অস্বস্তি।

হঠাৎ বুকের উপরে ভারী আর ঠান্ডা একটা চাপ অনুভব করলাম। কারও উপস্থিতি… না, কারও বসে থাকা। শরীর শক্ত হয়ে গেছে, আঙুল পর্যন্ত নড়ছে না। চিৎকার করতে গেলেও শব্দ বের হচ্ছিল না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।

তারপর ঠান্ডা, ভেজা একজোড়া হাত গলার দুই পাশে চেপে ধরলো। এমনভাবে চাপ দিচ্ছিল- যেন নিখুঁতভাবে আমার শ্বাস বন্ধ করতে চাইছে। চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথাটা ভোঁ ভোঁ করছে। আর কানের ভেতর একটা ফিসফিসানি-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আজকের পূর্বে আমার নিজেকে কখনো ভীতু মনে না হলেও, আজ আমার বুকের ভেতর ভয় ভয় জমে বরফ হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো নিঃশ্বাসও নেওয়ার দরকার পড়ছে না। গলার চাপ কমেনি, বরং বেড়েছে বলা যায়। অথচ শ্বাস টানার কোন আকুতি আর ফুসফুস করছে না। হয়ত অক্সিজেনের অভাবে উল্টোপাল্টা ভাবছি। কিন্তু এটাও বুঝতে পারছি যে মস্তিষ্ক পরিষ্কার চিন্তা করতে পারছে। আর প্রশ্নটা নিজে থেকেই এলো- তবে কি আমি মারা গিয়েছি? নাকি এটা পুরোপুরি কল্পনা? অথবা এই অনুভূতিটাই মৃত্যুর পরের অংশ?

পরের মুহূর্তেই উঠে বসলাম। বুক ধড়ফড় করছে, কিন্তু ঘরের পরিবেশ একদম স্বাভাবিক। জোরে জোরে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিচ্ছি, বা হাঁপাচ্ছি। বিছানাটা এলোমেলো, চাদর গুটিয়ে গেছে।

নামলাম বিছানা থেকে, হেঁটে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম। একটু আগে যে আতঙ্ক ভর করেছিল, তার ছিটে-ফোটাও লাগছে না এখন। উলটো নিজেকে যেন আরও হালকা লাগছে। বেসিনের ট্যাপ ছেড়ে চোখে-মুখে ঠান্ডা পানি ছিটিয়ে দিলাম। মাথা কিছুটা পরিষ্কার হলো। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বোকামিতে হেসে ফেলতে গেলাম,কিন্তু হাসি মিলিয়ে গেল পরের সেকেন্ডেই।

গলার দুই পাশে তিনটা করে সমান লালচে দাগ। যেন কারও আঙুলের চাপের ছাপ। আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম, হালকা গরম, কিন্তু কোনো ব্যথা নেই। আমার আতঙ্কিত হওয়ার কথা, কিন্তু তেমন কোন অনুভূতি হচ্ছে না। যেন এমনটা হবে আমি জানতাম!

এরপর আর ভালো ঘুম হলো না। বারবার কেবল ঘুরে ফিরে ঐ ফিস্‌ফিস শব্দটা মাথায় চলে আসছিল। "তুমি তো আমাকে চেনো…"

পরদিন সকালে অফিসে গিয়েই এখানকার ম্যানেজার সাহেবকে জানালাম জরুরি কাজে বাড়ি যাচ্ছি। হাতের কাজগুলো তাকে বুঝিয়ে দিয়েই গাড়িতে উঠলাম। হেড অফিসে কেবল অসুস্থতার ছুটির জন্য একটা মেইল পাঠিয়ে রাখলাম।

আট ঘণ্টার জার্নি দিয়ে ফিরলাম বাসায়। আমার কেবল মনে হচ্ছিল আমাকে যে করেই হোক ঐ জায়গাটা ছেড়ে আসতে হবে। তাই আর সামনে-পেছনে কোন কিছুই চিন্তা না করে সোজা বাসায় এসেছি। অবশ্য বাসায় এসে কাউকে কিছু বলে ভরকে দিতে ইচ্ছা হল না। ছুটি নিয়েছি, জানালাম কেবল। ওরা ভাবল, এভাবে হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে গ্রামে গিয়ে থাকা, আর লম্বা জার্নির কারণে আমাকে এমন ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।

ফ্রেশ হয়ে কোনোরকম রাতের খাবার শেষ করেই আমার রুমে গিয়ে ঢুকলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই ঘুম ঘুম ভাব চলে আসল। অনিচ্ছাতেও গভীর ঘুমে নিপতিত হতে থাকলাম।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

তৃতীয় ভাগঃ অবশেষ…

একটা ঘোরের মন লাগছে। মনে হচ্ছে জেগে আছি, আবার মনে হচ্ছে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। বিছানায় উঠে বসতেই আলমারির আয়নার দিকে চোখ পড়ল। পেছনে বাথরুমের দরজা আধখোলা, আর তার ফাঁক দিয়ে মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে আছে- অস্পষ্ট, ছায়ার মতো।

আমি চোখ মুছলাম, আবার তাকালাম- কই? কেউ তো নেই!

হঠাৎ বাতাস থেমে গেল।
না, আসলে বাতাস নয়, নিশ্বাস নেয়ার আকুতি; থেমে গেলো।

আয়নার ভেতরে আমার পেছনে অন্ধকার জমতে শুরু করলো। প্রথমে মনে হলো ছায়া, কিন্তু তা ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে- লম্বা, কঙ্কালসার হাত… প্রতিটি হাতে তিনটি লম্বা আঙুল।

আমার কাঁধের উপর দিয়ে সেই হাতের ছায়া এগিয়ে এলো। আয়নায় হাত দেখা গেলেও আমার গায়ে কোন কিছুর ছোঁয়া অনুভব করলাম না। আমি স্থির হয়ে রইলাম, চোখের পাপড়িও ফেলতে পারছি না।

তারপর সেই ছায়ার মাথাটা ঝুঁকে এল আমার ঠিক কানের পাশে। কোনো ঠোঁট নড়ছে না, কিন্তু এক বরফশীতল ফিসফিসানি মাথার ভেতর এক স্বরে বলেই চলেছে-
"তুমি তো আমাকে চেনো…"

আমি তখন আয়নার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম প্রতিফলনে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটা আসলে আমি নই।

প্রতিফলনের চোখ গাঢ় কালো হয়ে গেছে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি, আর গলার দাগগুলো রক্তিম লাল হয়ে জ্বলজ্বল করছে। ওটা আমাকে দেখছে… কিন্তু আমি ওটাকে... কি জানি!

⠀⠀⠀

বাথরুমের দরজা আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে গেল। অন্ধকার পুরো ঘরটাকে গিলে নিল।

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

⠀⠀⠀

বুধবার, আগস্ট ১৩, ২০২৫

বিকেলের রঙে হারানো দিনগুলো

 

⠀⠀⠀


মনিটরের পর্দায় এই ছবিটা দেখে মনে হল যেন কেউ আমার ভেতরের স্মৃতির দরজাটা আস্তে করে খুলে দিচ্ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই শৈশবের বিকেলগুলো- যখন গরমের দুপুর গুলিতে ভাতঘুম দিয়ে বিকেলের আগে আগে উঠতাম। তারপর বিকেল নামলে পরে যেতাম মাঠের দিকে। চারপাশে শুধু বিস্তীর্ণ সবুজ, দূর-সুদূরে অল্প কয়টিা বাড়ি আর ওপরে অনন্ত নীল আকাশ। মনে হতো, যদি কোনোভাবে ওই আকাশে উঠার সিঁড়িটা খুঁজে পেতাম! ভাবতাম নিশ্চই আকাশের একটা গোপন রাস্তা আছে, যা কেবল আমার চোখে ধরা পড়ে না!

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২২

প্রণয়িনী, তোমায় ঘিরে আমার ভাবনা...

প্রণয়িনী,

এই যে এত বিশাল মহাবিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড, এর মাঝ থেকে যদি কোন কেন্দ্র তৈরী হয় কেবলই আমার জন্যে; তবে সেই কেন্দ্র হচ্ছ তুমি। এই মহাবিশ্বের যে কোণেই আমাকে ছেড়ে দেয়া হোক না কেন, ফের তোমার পানে ফিরে আসবার তাগিদে ছুটে চলবো গ্রহ থেকে গ্রহান্তর। আর সেই যাত্রার বিরতি হবে শুধুমাত্র তোমার মনের আঙ্গিনায়। 

আমি জানি, এই সবই অতিরঞ্জন মনের কল্পনা। বাস্তবতার চাকা যখন তপ্ত মরুর পথ ধরে চলতে শুরু করে, তখন এই আবেগ অনেকটাই উবে যায় স্বেদ-বাষ্পে। কিন্তু তবুও যখন কোন মরুদ্যানের ছায়াতলে শীতল হয় মন, তখন সে শুধু তোমাকেই কল্পনা করে; তোমার কথাই ভাবে। রোদের তাপে তপ্ত এ শরীর যেমনি শীতল পানি পানের সময় তার বয়ে চলা অনুভব করতে পারে; একই ভাবে এই অতৃপ্ত লোভী হৃদয় তোমার কিছুমাত্র স্পর্শ পেলে পুরো অনুভূতি জুড়ে তোমার আনাগোনা অনুভব করে।

ভালোবাসা নামের অনুভূতিটা যবে থেকে বুঝতে শিখেছি, সেই তখন থেকেই আমি বুঝি, 'ভালোবাসা'র মানে হচ্ছো 'তুমি'। বিশাল এক সময় সমুদ্র পার করে যখন তোমার হাতটি ধরেছিলাম, তখনই বুঝেছিলাম 'ভালোবাসা'র বীজটির অঙ্কুরোদগম শুরু হয়ে গেছে। তারপর ঠিক বুঝে উঠবার আগেই সেটি বীজ থেকে চারা, আর চারা থেকে মহীরুহে রূপ নিয়েছে। তবুও নিজেকে ঢাল বানিয়ে আমি কিছু কাল সেই মহীরুহ ঢেকে রাখবার চেষ্টা করে গিয়েছিলাম। কিন্তু হৃদয় আঙ্গিনায় তোমার আনাগোনায় যে হিম বাতাস বয়ে চলতো, তাতেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে পড়েছিল আমার ঢাল। ভাঙ্গা ঢাল পেরিয়ে সেই মহীরুহ ধীরে ধীরে আমাকেই ঢেকে দিয়েছে তার মায়া মেশানো ভালোবাসার ছায়ায়। আমি দেখেছি, মহীরুহের প্রতিটি পাতায় তোমার নাম, তোমার স্পর্শ, তোমার উপস্থিতি। এরপর আমি আর কোনদিন সেই মহীরুহের ছায়াতল থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করি নি। হয়তো ক্ষনিকের জন্যে অভিমানে মহীরুহ পেরিয়ে সামনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রেখেছিলাম। কিন্তু তোমাকে ঘীরে ছায়ার মায়া আবারও আমাকে সেই মহীরুহের দিকেই ফিরিয়ে নিয়েছে। 

কেউ একজন বলেছিল, ভালোবাসা দিনে দিনে ভাগ হয়। আজ যাকে ভালোবাসো, যাকে ছাড়া ভালোবাসা শব্দটাই অচল মনে হয়, চিন্তায় চেতনায় শুধুমাত্র যার অনুভূতিই আজ তুমি অনুভব কর; কাল সেখানে অন্য কেউ আসবে, তোমার সমস্ত অনুভূতি সে চুরি করে মনোযোগ আকর্ষনী মুকুটটা মাথায় দিয়ে তোমার হৃদয় সিংহাসনটা দখল করে নিবে। সে মুহুর্তে কথাটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করলেও, আজ আমি জানি; কথাটা মোটেই মিথ্যে নয়। শূন্য থেকে তিলে তিলে নিজের মধ্যে ধারণ করে, সুদীর্ঘ ক্লিষ্ট পথটি পাড়ি দিয়ে যে উপহারটি তুমি আমার জন্যে নিয়ে এসেছ; সেটি এসেই আমার হৃদয় সিংহাসনটি দখল করেছে, কেড়ে নিয়ে মাথায় দিয়েছে হৃদয় আকর্ষনী মুকুটখানি। হ্যাঁ, আমি সেই উপহারটিও ভালোবাসি। নিজের চেয়ে অধিক নয়, বরং নিজের সমান ভালোবাসি। কিন্তু যার নামে পুরো রাজ্য গড়ে উঠেছে। যে রাজ্যের প্রতিটি নিশানায়, প্রতিটি পতাকায় কেবল তোমার নাম লেখা। সেখানে কেউ মুকুট মাথায় দিলেই ভালোবাসার পূর্ণ দাবিদার হয়ে উঠে না। বরং তার জন্যে ভালোবাসার নতুন হালখাতা তৈরি হয়, তৈরি হয় উপরাজ্য। তোমার জন্যে যে হৃদয় ব্যাকুল করা ভালোবাসা, সেটি ঠিক আগের মতই আছে। অধিকন্তু দিনকে দিন তা ফুলে ফেপে হৃদয় আঙ্গিনা ভরিয়ে তুলছে।

দিনকে দিন কত শত রূপে যে আমি তোমাকে আবিস্কার করেছি, তা কেবল আমিই জানি। আলসে তোমাকে আবিস্কার করেছি,  যে সারাটি দিন বিছানায় নিজেকে বন্দী করে নেয়। আবার কর্মঠ কর্মী রূপেও তোমাকে দেখেছি, যে ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত নিজেকে বিলিয়ে দেয়। বিরক্ত তোমাকে দেখেছি, যে সবকিছু ছুড়ে ফেলে ভেঙ্গে ফেলতে চায়। আবার মায়াময় তোমাকেই আবিস্কার করেছি, যে সবকিছু আগলে নিয়ে মুঠিতে জমায়। দেখেছি মায়াময় জননী রূপে, দেখেছি সেবিকায়, দেখেছি সুনাম প্রতিষ্ঠায়। দেখেছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তেজস্বী তোমার প্রতিবাদী রূপ, আবার তার বিপরীতে দেখেছি কারো কোন ছোট অন্যায় নিজের ভালোবাসার চাদর দিয়ে ঢেকে দিতে। বিশ্বাস কর, তোমার তোমার এই প্রতিটি রূপকেই আমি আমার মত করে ভালোবেসেছি।

তোমাকে হারাবার যে ভয় শুরু থেকে ছিলো; জানো কি, আমি আজও সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারি নি। আজও মনে হয় কোন এক দমকা হাওয়াতে আমি তোমায় হারিয়ে ফেলব। প্রায়ই মনে হয়, নিঝুম রাতটি শেষ করে যে ভোরটি নতুন দিন নিয়ে আসবে; সেই দিনটিতে তুমি হারিয়ে যাবে। যে বাগান ভর ফুলেল ঘ্রাণে আমি বিমোহিত হয়ে থাকি, সেই বাগান শুদ্ধ তুমি হারিয়ে যাবে। পড়ে থাকবে কেবল উদ্যান, আর পড়ে থাকব কেবল এই একলা আমি। আমি এই ভয়টা কোন ভাবেই কাটিয়ে উঠতে পারি না। তবুও ভোর হলে যখন তোমাকে দেখতে পাই, তবুও দমকা হাওয়ার তোড় কমলে যখন শক্ত মুঠিতে তোমাকে পাই, তবুও চোখ বুজে ফুলেল ঘ্রানে ফুসফুস পূর্ণ করে যখন চোখ মেলে দেখি তুমি এখনো রয়েছ দৃষ্টির সীমানায়। কেবল তখনই মনকে সান্তনা দেই এই বলে, "আজ নয়, আজ আর হারাবে না তুমি"।

আমার এই অর্থহীন আবেগী শব্দের স্রোত তোমাকে কতটুকু স্পর্শ করবে, তা আমি জানি না। জানি না বাক্যের এই মালা আদৌ তোমার মনকে গলাতে পারবে কি না। তবে আমি জানি, এইসব বর্ণের বাইরেও যে ভালোবাসা আছে তা আমার হৃদয়ে অনন্তকাল ধরেই থাকবে। সময়ের গর্ভে আমি বিলিন হবার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত তোমাকে নিয়ে এইসব অনুভূতি আমি ধারন করে যাবো। আর আমি বিশ্বাস রাখি, এই নশ্বর জগত পার করে যে অনন্ত জগতে গিয়ে পৌছবো, সেখানেও আমি তোমারই অপেক্ষা করবো, তোমাকেই চাইবো। প্রার্থনা থাকবে সমস্ত ইচ্ছে পূরণকারী সেই মহান স্বত্তা যেন আমার এই চাওয়াকে পূর্ণতা দেন। এই জগতের সকল ভালোবাসার অপূর্ণতা তিনি যেন ঐ জগতে পরিপূর্ণরূপে পূরন করে দেন। 



ইতি
তুমিহীন অপূর্ণ যুবক

ছবিঃ kellerdoll ( মূল ), ractapopulous ( মূল ), ঘষামাজা ( !?! )