শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২৬

জীবনের জটিল সমীকরণঃ সফলতার ভ্রম ও বাস্তবতা

⠀⠀

আমরা সাধারণত চোখের সামনে যা দেখি, তাকেই সত্য ধরে নিই। আজ কার লাভ হলো, কে উন্নতি করল, কে ক্ষমতার চেয়ারে বসল -এসব দিয়েই আমরা সফলতা আর ব্যর্থতার বিচার করি। অথচ জীবন এত সরল নয়। জীবনের হিসাব অনেক গভীর, অনেক বিস্তৃত। এখানে সময়ের সাথে সাথে জীবনের সমীকরণ বদলায়, আরও বদলে যায় সফলতার সংজ্ঞা।

একদিন তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠতে গিয়ে বাদামের ঝুড়ি হাতে রফিক মিয়া হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ট্র্যাফিক ছেড়ে দেওয়ায় কয়েকটি গাড়ির চাকার নিচে পিষ্ট হলো তার সারা দিনের পুঁজি -বাদামের ঝুড়ি। মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেল তার রুজি-রুটি। অসহায় মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। 

অন্যদিকে একই রুটে বাদাম বিক্রি করা শফিক মিয়ার সেদিন দারুণ লাভ হলো। রফিক না থাকায় দ্বিগুণ বিক্রি করল সে। হাতে এলো ভালো অঙ্কের টাকা। আপাতদৃষ্টিতে ঐদিনের জন্য শফিক হলো সফল, আর রফিক হলো ব্যর্থ, নিঃস্ব একজন। কিন্তু সন্ধ্যায় সারা দিনের আয় নিয়ে শফিক বসে গেল জুয়ার আসরে। রাত শেষ হতেই উপার্জিত সব টাকা হারিয়ে সেও শূন্যে নেমে এলো। সকালে দেখা গেল- রফিক আর শফিক দুজনকেই আবার শূন্য শুরু করতে হবে। তবে পার্থক্য এক জায়গায়। 

রফিক মিয়া ছিল সৎ, ভদ্র ও পরিশ্রমী মানুষ। সবাই তাকে বিশ্বাস করত। তাই সে যখন নতুন করে ব্যাবসা শুরু করতে চাইল, তখন মানুষ বিনা দ্বিধায় তাকে বাকীতে মাল দিল। মানুষের বিশ্বাসই হয়ে উঠল তার নতুন মূলধন। অন্যদিকে শফিকের জুয়ার নেশা আর অবিশ্বস্ততা কথা সবাই জানত। তাই কেউ তাকে বাকীতে মাল দিতে চাইল না। বিশ্বাসহীন মানুষের জন্য পৃথিবীর কোনো দরজাই কখনো খোলা থাকে না। 

এবার চলুন আরেকটি গল্প শুনি। গল্পটা সুমন নামের এক অফিসের সহকারী ম্যানেজারের। সারাদিন বসকে তোষামোদ করে সময় কাটাত, আবার আড়ালে তারই বদনাম করে বেড়াত। তবে তার একটা সুপ্ত ও গোপন ইচ্ছা ছিল। ইচ্ছেটি ছিল- কবে বসের চাকরি যাবে আর সে সেই চেয়ারে বসবে। অনেক দিন পর তার সেই চাওয়া পূরণ হলো। তার বস চাকরি ছেড়ে চলে গেল, আর সুমন পদোন্নতি পেয়ে হলো ম্যানেজার। 

মানুষের চোখে সে সফল। কিন্তু সফলতা আর ইচ্ছে পূরণ তো আর তার চরিত্র বদলাতে পারে না। আগের মতোই চললল তার অফিস পলিটিক্স, ষড়যন্ত্র, স্বজনপ্রীতি আর তোষামোদের রাজনীতি। ফলে বিশ্বস্ত, কর্মঠ ও যোগ্য কর্মচারীরা একে একে চাকরি ছাড়তে লাগল। শূন্য পদে নিয়োগ পেল অদক্ষ, তেলবাজ ও অনভিজ্ঞ লোকজন। আর এসব কারণে কোম্পানির ক্ষতি বাড়তে থাকল। শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সুমন ও তার গড়া পুরো দলকেই ছাঁটাই করলো। 

আরও একটি গল্প শোনা যাক। পরীক্ষায় একজন নকল করে ভালো রেজাল্ট করল, আর অন্যজন সততার সাথে পরিশ্রম করে মাঝারি ফল পেল। সবাই প্রথমজনকে মেধাবী বলল। কিন্তু সময়ের সাথে দেখা গেল- নকলের সাফল্য টেকেনি, আর পরিশ্রমী মানুষটি ধীরে ধীরে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। 

এই গল্পগুলো আমাদের চারপাশে ঘটে চলেছে। গল্প গুলো আমাদের শেখায়- সফলতা একদিনের অর্জন নয়, এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ফসল। সাময়িক লাভ, ক্ষমতা কিংবা বাহবা প্রকৃত সাফল্যের পরিচয় নয়। প্রকৃত সাফল্য গড়ে ওঠে সততা, পরিশ্রম, নৈতিকতা, ধৈর্য ও মানবিকতার ওপর ভর করে।

⠀⠀

⠀⠀

জীবনে দ্রুত সফল হওয়ার চেয়ে সঠিক পথে এগোনো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

জীবন এক নিরন্তর প্রবহমান ধারা। এই ধারার সামনে টিকে থাকার জন্যে সততা, পরিশ্রম, ধৈর্য ও নৈতিকতা -এই চারটি স্তম্ভ শক্ত করে গড়তে হবে। আর এই স্তম্ভের ওপর দাঁড়ানো সাফল্যই প্রকৃত সাফল্য। তাই কাউকে সফল বা ব্যর্থ বলার আগে একটু থামা উচিত। কারণ আমরা দেখি ঢেউয়ের তোড়, কিন্তু জানি না স্রোতের গতি। আর এই অদেখা স্রোতের কাছেই তো শেষ কথা বলার অধিকার থাকে।

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀

⠀⠀



শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২৬

ডায়েরির পাতা: মনের জ্যোৎস্না ও জ্বর



মৌসুমী ভৌমিকের গানটা আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল- "কেন শুধু শুধু ছুটে চলা, একে একে কথা বলা, নিজের জন্য বাঁচা নিজেকে নিয়ে.."। গানটা কেমন যেন আজকের দিনগুলোর মুখপাত্র হয়ে উঠেছে। শব্দগুলো শুধু সুর নয়, এখন আমার নিঃশ্বাসের অনুষঙ্গ।

দিনগুলি এখন হিসাবের বাইরে, বিচ্ছিন্ন পাথরের মতো যার যার মত ছড়িয়ে পড়ে আছে। গতকালের সকাল আর আজকের বিকালের মধ্যে কোনো সীমানা খুঁজে পাই না। দুই দিনকে আলাদা করার জন্য নতুন কোনো শব্দ নেই অভিধানে। প্রতিদিন একই জানালা, একই আলোছায়া, একই ঘড়ির কাঁটার দৌড়। বিরক্তির ভাঁজ কপালে জমে, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়- এইটুকুই বা কম কী? সময় তো আরো ভাঙচুর করতে পারত, তবু কিছুটা শৃঙ্খলা এখনো টিকে আছে।

গত কয়েকদিন ধরে শরীর বিদ্রোহ করে চলেছে। একদিন তো জ্বর এসে সময়ের হিসাবই লোপাট করে দিল। চোখ মেললাম- সকাল, আবার মেললাম- দুপুর, আরেকবার- দেখলাম সন্ধ্যা ইতোমধ্যে বিদায় জানাচ্ছে। জ্বর যদিও সেরে গেছে, কিন্তু ছেড়ে গেছে গলা-ব্যথা আর তার নিষ্ঠুর সঙ্গী মাথা-ব্যথাকে। সঙ্গে সঙ্গ দেয়ার জন্যে রয়ে গেছে মৃদু কাশি- অতি পরিচিত শত্রু। কাশির স্মৃতি আমার জন্য সাবান পানিতে ভেজা চামড়ার মতো, পুরোনো এক অসুখের ছায়া মনে ভর করে। কখনো কখনো শরীর মনে করিয়ে দেয়, স্মৃতি শুধু মনের নয়, দেহের কোষেও লেখা থাকে। 

আগে যা ভালো লাগত, এখন তা ধূসর মনে হয়। বইপত্র, গান, মুভি -সব যেন পানিতে ভেজা ধূসর কাগজের মতো নিষ্প্রাণ। সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- শিশুদের দেখলে আগে যে হৃদয় গলে যেত, এখন সেখানে কোনো না কোনো জায়গায় একটি বিরক্তি দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয়, ওদের কোলাহল থেকে দূরে থাকি, নিঃশব্দে থাকি। এই পরিবর্তনটাই বেশি ভয়ংকর -আগে যা জীবনকে স্পর্শ করত, আজ তা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। 

ছুটি!
শব্দটা এখন প্রার্থনার সমার্থক। কিন্তু, এ ছুটি কেবল দৈনন্দিন রুটিন থেকে নয়, এ ছুটি এই অভ্যন্তরীণ নীরবতা থেকে, এই আবেগহীন প্রবাহ থেকে। কখনো কখনো জীবন থেকেই ছুটি নেওয়ার ইচ্ছে জাগে, একটা দীর্ঘ, শান্ত নিদ্রার মতো। কিন্তু জীবনের প্রতি এক গভীর অনুক্ত মায়া, এখনো রয়ে গেছে। যেমন- একটা পুরোনো বাড়ি, যার দরজা-জানালা ভাঙছে, কিন্তু যার প্রতিটি ধূলিকণায় স্মৃতি লেগে আছে। তাই মায়াটাও এখনো রয়ে গেছে। 

জীবন কালের এই বয়সে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি হয় যে, জীবন একইসাথে 'বোঝা' ও 'বরাদ্দ'। অনেকটা পাহাড়ের মাঝপথে উঠে পেছনে ফিরে তাকানোর মতো। নিচের পথটুকু পেরিয়েছি, কিন্তু শীর্ষ ছোঁয়া এখনও বহুদূর। আর শরীরে জমা হয়েছে ক্লান্তি। তবুও এগোতে হচ্ছে, কারণ নিচে নামার পথটা অসম্ভব দুর্গম। 

আজকের এই এলোমেলো ভাবনা গুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম; হয়তো এই শূন্যতা পূর্ণতারই আরেক রূপ। সময় হয়তো হৃদয়কে শূন্য করে তুলছে পরবর্তী কোনো গভীর অনুভবের জন্য জায়গা তৈরি করতে। জ্বর সেরে যাওয়ার পর শরীর যেমন একটু বেশি সংবেদনশীল হয়, তেমনই হয়তো এই আত্মিক স্তব্ধতার পর কিছু দেখা বা বোঝার সূক্ষ্ম ক্ষমতা ফিরে আসবে। 

আজ শুধু এই কথাগুলোই লিখে রাখি, যেন এই মুহূর্তের ভার্চুয়াল সাক্ষী থাকে এই শব্দগুলো। হয়তো কোনো এক ভবিষ্যৎ দিনে ফিরে দেখব, এই শব্দগুলো পড়ব, আর তখন বোঝার চেষ্টা করব- যে ব্যক্তি এগুলো লিখেছিল, সে আসলে হারিয়ে যাচ্ছিল নাকি নতুন কোনো উপকূলের খোঁজ পেয়েছিল। 

জানালার বাইরে এখন রাত। দূরে কোনো বাড়ির জানালায় একটি বাতি জ্বলে আছে, এক টুকরো মানবিক উষ্ণতা। হয়তো জীবন আসলে এটাই- একটা অন্ধকারে জ্বলা বাতি খোঁজা, যে বাতি হয়তো অন্যের বারান্দায়, কিন্তু তার আলো আমাদের জানালাতেও পড়ে। আজকের মতো এটুকুই যথেষ্ট। আজ শুধু থাকব, আর শ্বাস নেব। এই অস্থির হৃদয় নিয়েই, এই অসুস্থ শরীর নিয়েই, এই স্তব্ধ সময় ধরেই। 

হয়তো, নিজেকে নিয়ে বেঁচে থাকার অর্থই হলো- এই ভাঙাচোরা মুহূর্তগুলোকেও আস্তে আস্তে, একটু একটু করে, স্পর্শ করে যাওয়া...